
ফেসবুক দিন দিন লেখালিখি কিংবা সাহিত্যচর্চার একটা অনুপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠছে । ভাষা কিংবা বানানব্যবস্থার যে বিকৃতি লক্ষিত হয়, তা দেখেই কিছুটা টের পাওয়া যায় । ভাষাকে সে এমনভাবে সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে, আপনি চাইলেও আপনার পছন্দের শব্দটা সেখানে বসাতে পারছেন না । ভাষার নিয়ন্ত্রণেই সে থেমে থাকে না । অজ্ঞাতে আড়ালে সে চিন্তাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায় । আর একজন লেখকের চিন্তাকে যদি একটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তখন নতুন জ্ঞান, নতুন চিন্তা, নতুন ভাষাশৈলী আপনি কীভাবে সৃষ্টি করবেন । আজকাল মনে হয়, লেখক নিজে লেখে না, সে ফেসবুকীয় একটা বাজারব্যবস্থার ভিতরে অন্য কারো জন্য পণ্য উৎপাদন তথা কন্টেন্ট বানিয়ে চলেছেন । অন্যভাবে বলতে গেলে, ফেসবুক আপনাকে দিয়ে তার চাহিদা মোতাবেক পণ্যসামগ্রী তৈরি করে নিচ্ছে । বিনিময়ে সে আপনাকে মোনেটাইজশনের কঠিন প্রতিযোগিতায় ফেলে কিছু উচ্ছিষ্ট উপহার দিচ্ছে ।
ফেসবুক যেদিন থেকে ইউটিউবের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে সেদিন থেকে সে টেক্সটের থেকে সরে গেছে ভিডিওর সস্তা দুনিয়ায় । টিকটকের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে সে ঢুকে পড়ল ‘রিলস’ নামক স্বল্পদৈর্ঘের চটুল বিজ্ঞাপনে । ফেসবুক চেতন হারিয়ে বিপননের দুনিয়ায় ঢুকে আপনার বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য আজকাল টাকা চায় । আপনার রিচ কমিয়ে সে আপনাকে পোস্ট বুস্ট করার পরামর্শ দিচ্ছে । ফেসবুক এখন বিশাল একটা বাজার । এখানে হয় আপনাকে বিক্রেতা হতে হবে নতুবা ক্রেতা । বিক্রেতা হতে হলে আপনাকে বিনিয়োগ করতে হবে বুস্টের মাধ্যমে । আপনাকে লেখার মধ্যে আনতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ রুচির উপাদান । আপনি যখন দেখবেন বড় লেখার চেয়ে ছোট লেখার রিচ বেশি । আপনি তখন কবিতা ছেড়ে কাপলেট লিখতে শুরু করবেন । যখন দেখবেন টেক্সট লিখতে গেলে আপনি শব্দগুলোর এক্স্যাক্ট বানান না লিখে নানাবিধ বিদঘুটে চিহ্ন ব্যবহার করতে হচ্ছে, তখন আপনি প্রকৃত অর্থেই যদি লেখক হয়ে থাকেন, আপনার বোধোদয় ঘটার কথা— জায়গাটা আপনার নয় । টেক্সট থেকে যখন দেখবেন,ভিডিওর রিচ বেশি, আপনি হয়ত ভিডিও কন্টেন্টে ঝুঁকবেন । আপনি লেখক থেকে হয়ে উঠবেন কন্টেন্ট ক্রিয়টরে । ফেসবুকীয় বাস্তবতায় আজকাল কবিতা হয়ে গেছে ফটোকার্ড, কবি পরিণত হচ্ছে আবৃত্তিকারে । এই বিশাল বাজারে ৩০০ কোটি ভোক্তা দৌঁড়াচ্ছে, ক্যালোফোর্নিয়ায় বসে মার্ক জাকারবার্গ দেখছেন তার সম্পদের পাহাড় আকাশ ফুঁড়ে ঈশ্বরকে ছুঁই ছুঁই করছে ।
ক্রিয়েটিভ রাইটিং বলতে কোনো কিছুতে যদি আপনি আমি নিজেকে ডেভেলপ করতে চান । তাহলে মিডিয়া হিসাবে আপনার আমার জন্য ফেসবুক অবশ্যই না । না মানে, না । আর আপনি যদি ভার্চুয়াল জগতে সৃষ্টিশীল মানুষের ভাবনাগুলোর সাথে পরিচয় ঘটাতে চান, তাহলে আপনাকে ফেসবুক থেকে বের হয়ে আসতে হবে । তবে অবশ্যই লেখককে আগে বেরোতে হবে । তারপর পাঠক । লেখক না বের হলে পাঠকও এলগরিদমীয় চক্রে নিজেকে সঁপে দিবে ।
মননশীলতা এবং সৃষ্টিশীলতার পরিবর্তে আমরা পাব যেকোনো উপায়ে ভাইরাল হওয়ার ধান্দায় নিমগ্ন একটা জড়বুদ্ধিসম্পন্ন প্রজন্ম ।
ফেসবুক নাকি বিপ্লব ঘটাচ্ছে দেশে দেশে । জেন-জিরা নাকি ফেসবুক নামক এক সুপারন্যাচারাল মাধ্যমে পৃথিবীর নিকৃষ্ট সব স্বৈরাচারীদের মসনদ কেঁড়ে নিচ্ছে । ফেসবুকের মতো মহান মিডিয়া পৃথিবীতে আর নেই । চীন আর রাশিয়া ফেসবুক ব্যবহার না করে পৃথিবীর অন্ধকার নরকে নিজেদের নিক্ষেপ করছে । এ জাতীয় প্রচার আমরা গত একযুগ ধরে পাচ্ছি । এগুলো স্রেফ সাম্রাজ্যবাদী প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না আমার । ফেসবুক অবশ্যই আমাদের জনজীবন, ব্যক্তিজীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে । এটা অস্বীকার করার উপায় নেই । এখানে মিলিয়ন লোকের জীবিকা অর্জিত হয়েছে । চাইলেই এটাকে এখন আমরা জীবন থেকে বাতিল করে দিতে পারি না । কী সামাজিক জীবন, কী ব্যক্তিজীবন । সেইসাথে এটাও সত্য ফেসবুক এখন লেখালিখি কিংবা সাহিত্যচর্চার মাধ্যম হিসাবে তার আবেদন পুরো হারিয়েছে । ছবি আর ভিডিও দিয়ে সে তৈরী হয়েছে একটা চিত্তবিনোদনের এলগরদমীয় গিঞ্জিতে । আর পৃথিবীতে ফেসবুক গণতন্ত্রের যে রপ্তানি ঘটাচ্ছে বলে বহুল প্রচার আছে, চীনে কিংবা রাশিয়ায় ফেসবুক নেই বলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না যে হায় হায় রব, তা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠাকামী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী কূটচালরই নামান্তর ।
ফেসবুক সেই গণতন্ত্রের মিডিয়া, যেখানে ফিলিস্তিন উপেক্ষিত, ইউক্রেন একটা মানবিক সংকট । নেতানেয়াহু একজন সন্ত্রাসদমনে সিদ্বহস্ত রাষ্ট্রনায়ক, আর ভ্লাদিমির পুতিন একজন সন্ত্রাসী । ফেসবুক নেতানিয়াহুর নিন্দা কিংবা পুতিনের প্রশংসা— কোনোটাই পছন্দ করে না । দুটোতেই সে রিচ কমায় । বিপরীতক্রমে আবার দুটোর রিচ বাড়ায় । যদি বুস্ট করতে পারেন, সে অন্য আচরণ করবে । সে জানে আপনার ইন্টারেস্ট, সেই অনুযায়ী আপনার নিউজফিড সাজায় । আবার সে আপনার ইন্টারেস্টের ভিতরে তার ইন্টারেস্টকেও ধীরে চাপানোর চেষ্টা করে । আপনি ভেঙে পড়লে, সে আপনাকে মুটিভেটেড ভিডিও কিংবা ফটোকার্ড দেখাবে । আবার আপনি প্রেমিকার সাথে ঝগড়া করলে, আপনাকে সেই বিক্ষত হৃদয়ে মলম লাগানোর বিজ্ঞাপন নিয়ে আসবে । মোটকথা সে আপনার কাছে বেচতে চায়, আবেগ বেচতে চায়, মোটিভেশন বেচতে চায় । এবং সবশেষ ভাইরালের প্রলোভনে আটকে আপনাকেই অন্যের কাছে বেচতে চায় । আপনার ভাষাকে সংযত করার নোটিশ সে দেয়, আপনার মতবাদ, চিন্তা, আদর্শ তার কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভঙ্গ হওয়ার ছলে আপনাকে থামিয়ে দেয় রেস্ট্রিকশনের মাধ্যমে । আপনার ভাষাকে সে একটা সুনির্দিষ্ট ফ্রেমে আটকে রাখতে চায়, যাতে আপনার ভাষা তার মার্কেটে কোনো বিঘ্ন ঘটাতে না পারে ।
পুঁজিবাদ কিংবা সাম্রাজ্যবাদ প্রতিটা আইডিয়াকে, প্রতিটা মানুষকে, প্রতিটা শিল্পকে পণ্য বানাতে চায় । বাজারজাতই তার শেষ এবং একমাত্র উদ্দেশ্য । সে ভোক্তাকে চাহিদা মোতাবেক পণ্য দিয়েই শেষ হয় না । তার ভিতর নতুন চাহিদা তৈরী করে । অপ্রয়োজনীয় চাহিদাকে সে আবশ্যক হিসাবে আপনার সামনে তুলে ধরে । আপনাকে জালবন্দি করে রেখে সে বলতে চায়, জালের বাইরের পৃথিবী অত্যন্ত বিপদজনক ।
এবার আপনারাই বলুন, এমন একটা রিয়েলিটিতে বসে আপনি নিজেকে কতটা শাণিত করতে পারবেন । একজন লেখক হিসাবে এত সব মার্কিটিং পলিসির জালে নিজেকে, নিজের সৃষ্টিশীলতাকে, নিজের সম্ভাব্য প্রতিভাকে হারিয়ে ফেলাই কি স্বাভাবিক নয় ?
তাহলে আমাদের সামনে বিকল্প কী? বিকল্প হল হারিয়ে ফেলা রাস্তাটাকে আবার খুঁজে ফেরা । ফেসবুকের আগ্রাসনে হারিয়ে যাওয়া ব্লগচর্চার পুনরুজ্জীবন । একসময় জনপ্রিয়তার টোপ দিয়ে ব্লগ থেকে আমাদের ব্লগারদের নিয়ে গিয়ে আজ সে বানাচ্ছে ভ্লগার । ব্লগারের জায়গায় আজ ভ্লগারের ছড়াছড়ি । রাইটারের জায়গায় আজ কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মাতামাতি । মার্কেটিং দৌরাত্মে টিকতে না পারা ব্লগগুলো ধীরে ধীরে মরে গেছে । মৎসন্যায়ের বাংলায় বড় মাছ ফেসবুক একে একে গিলে ফেলেছে ছোট ছোট মাছতুল্য কমিউনিটি ব্লগগুলোকে । এত প্রতিকূল পরিবেশে আজও বাংলার প্রথম ব্লগটা মুমূর্ষু হয়েও টিকে আছে । কিন্তু টিকে থাকাই তো সার্থকতা হতে পারে না । দরকার ব্লগটাকে বাঁচিয়ে তোলা । আর বাঁচিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ভ্লগারদের দুনিয়ায় ব্লগারদের জাগরণ । বড় তথা মহাপ্রাণ ‘ভ’ ছোট তথা অল্পপ্রাণ ‘ব’—কে গিলে ফেলবে নাকি ছোট ‘ব’ তার অল্পপ্রাণ নিয়ে সুকৌশলে সমপ্রাণে বেঁচে উঠবে, সেটা সময়ই বলে দিবে ।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



