somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পথে ঘাটে পর্ব -২৯ (২য় অংশ)

২৯ শে আগস্ট, ২০১৮ বিকাল ৪:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ছবিঃ নেট

অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে বসে পড়ে যাবার পরই ঘটনার চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেল। কয়েক মুহূর্ত কিংবা কতক্ষণ অজ্ঞান নামক অন্ধকারে ছিলাম সময়টা ফিক্সড করে বলতে পারিনা, তবে ব্যাপারটা উপভোগ্য ছিল, মানুষজনের এটেনশন পাবার যে একটা ব্যাপার দুনিয়ায় আছে এবং সেটা যে ভালো লাগে খুব তখনি উপলব্ধি করলাম, ব্যাপারটা এই রকম না যে, মঞ্চে উঠে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে ভাষণ দিয়ে নেমে যেতে যেতে লোকের করতালি এবং এপ্রিসিয়েটের ফ্লায়িং ওয়ার্ড শুনে এত চোখ এবং বাক্যের মাঝে কিছুই না অনুভুত হওয়া।
তবে সাধারণ লোকজন কিন্তু অসাধারণ কিংবা খ্যাতিমান মানুষজনই বেশি পছন্দ করে, মানুষই প্রশংসা করে করে সাধারণদের দেবতা বানিয়ে মাথায় তোলে, আবার মানুষই মাথার উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে দেবতাদের নীচে ফেলে।

আমি উপভোগ করছিলাম আমাকে ঘিরে সকলের, সকল অচেনাদের ব্যস্ততা, শঙ্কা, শোক; হ্যাঁ দুই একজনের তো শোকই মনেহল।

জ্ঞান ফিরে পাবার আরও মিনিট দুই পড়ে চোখ খুলে তাকাবার আগেই, আমাকে আমার মন মনে করিয়ে দিলো ট্রেনে আছি, আমায় ঘিরে নানান মানুষের নানান কথাবার্তার শব্দ হতে থাকলো, ট্রেনের পুরো কামরার ভেতরে সবার আমাকে নিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড আমাকে আরও কিছুক্ষণ অজ্ঞান থাকার উৎসাহ দিয়ে রাখলো।

তারপর যখন চোখ মেলে তাকাবার মতন শক্তি অনুভব করলাম এবং তাকালাম, দেখলাম অনেকগুলো হাত আমাকে আঁকড়ে ধরে আছে , অবশ্যই সেই কামড়ায় যেহেতু নারী ছিল না, কাজেই সবকটা হাত পুরুষের, অতো ভীরের ভেতরে এইটা আজগুবি হোক কিংবা অলৌকিক হোক, কেউ আমার শরীরের স্পর্শকাতর কোনখানে হাত রাখে নাই, দরজার কাছাকাছি ছিলাম গড়িয়ে পড়ে গেলে একেবারে চাকার নিচে চলে গিয়ে সরাসরি নরকের রাস্তা থেকে রক্ষার জন্যই তারা আমাকে আগলে রাখছেন।
যে ছেলেটা খারাপ ভাবে আমার গায়ে তার কনুই লাগানোর চেষ্টা করছিলেন, সে ও দেখলাম আমার এক বাহু ধরে আছে; এবার তার নিয়ত খারাপ নাহ, প্রকৃতই সাহায্য করবার চেষ্টা।

পাশে থাকা সেই হুজুর সরে গেছেন অথবা তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, তার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে সাদামাটা চেহারার রাস্তাঘাটে সচরাচর দেখা যায় এমন কর্মক্লান্ত চেহারার এক যুবক, সেই যুবককে ক্রস করে তার থেকে দেখতে তুলনামুলক সুদর্শন আরেক যুবকের আমাকে সাহায্য করবার পাঁয়তারা।
বেশ অনেকজনের গলা শুনতে পেলাম পানি পানি বলে, ঐ ভীরের মধ্যে কি করে যেন পানি যোগাড় ও হয়ে গেছে, পানি মুখে দেবার আগে বোতলের দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলাম বোতল খারাপ না, এই একই রকম বোতল আমার অফিসে আমিও একটা রাখছিলাম সিঙ্গাপুর থেকে আমার ভাইয়া এনে দিছিলো।

সবার এটেনশন অনেক পাওয়া হয়ে গেছে কাজেই উঠে দাঁড়ালাম, পুরা ট্রেনের তখন আমার প্রতি অনেক মায়া।:)
ওই ভিড়ের ভেতরে যেখানে একটি সুই রাখার জায়গা নেই সেখানে কি করে যেন সেকেন্ডের মধ্যে আমার বসবার জায়গা করে দিলো, ক্রেডিট আমাকে ঘিয়ে দাঁড়ানো দুই যুবকের,তারা সুপারম্যানের মতন ধরতে গেলে উড়িয়ে নিয়ে আমায় বসতে সাহায্য করলো।
মুরুব্বী টাইপের একজন জানতে চাইলেন আপনার সাথে লোক আছে কেউ? আপনি কি একা? কই যাবেন আপনি? পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠলো আমি আছি আমি, তারদিকে ফিরে বললাম, আপনি আমার লোক কীভাবে? আপনাকে তো চিনিনা, সে বলল আরে ম্যাডাম আমি আপনারে চিনি, আমি আপনার অফিসেরই একজন, তারপর লোকজনের দিকে তাকিয়ে বলল ম্যাডাম থাকে সারাদিন এসির মধ্যে এত গরম কোনোদিন দেখছে? অজ্ঞান হবে না তো কি হবে!

সবাই সেই লোকরে উপেক্ষা করে আমার খেয়াল ভালো মন্দ ব্যাপারগুলা নিয়ে কথাবার্তা বলতে বলতে কেউ একজন কোনখান থেকে আমার হ্যান্ডব্যাগ এনে দিলো, এতক্ষন ওটা কই ছিল কার কাছে ছিল আমার হুশ নাই। ব্যাগের ভেতর আছে আইফোন, মোবাইল, টাকার ব্যাগ, এক কোনা খুলে দেখি সব ঠিক আছে। ট্রেন থেকে নামতে নামতে সাদামাটা চেহারার যুবককে জিজ্ঞেস করলাম আপনার নাম কি, সে আমার হাত ধরে ট্রেনের উঁচু দরজা থেকে নামতে সাহায্য করলো, দুর্বল আমি তার সাহায্যের হাত ধরা ও আমার দরকার ছিল; জানালো তার নাম হাসান।

আমার জীবনে বিভিন্ন সময় অচেনা যুবকদের যে সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছি তাদের প্রায় প্রত্যেকের নাম হাসান। ট্রেন থেকে নামা সকল যাত্রীরা যারা আমাকে ট্রেনে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বিপদ সম্পর্কে জানেন, তাদের সবার দিকে চেয়ে বিদায় সুচক হাসি দিয়ে প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে রিক্সা নেয়ার পর দেখি, ট্রেনের তুলনামুলক সুদর্শন যুবক সামনে দাঁড়িয়ে, বললেন তার বাড়ি রংপুর ঢাকার কিছুই সে চেনেন না তবু যদি আমি রাজি থাকি কিংবা সাহায্যের প্রয়োজন হয় তবে আমাকে বাসায় পৌঁছে দিতে রাজি আছেন। দুই চোখে তার সরলতা, বললাম আমি ঠিক আছি একাই যেতে পারবো ডোন্ট ওরি।

ঘটনা ঘটার পাঁচদিন পর্যন্ত একটানা অফিসে যাই নাই। অফিসের অনেকে ট্রেনে অজ্ঞান হয়ে যাবার ঘটনা সম্পর্কে দুঃখ প্রকাশ করলেন,ট্রেনে আমি তার লোক বলা ব্যাক্তি সম্ভবত সবাইকে ঘটনার ওয়াকিবহাল করেছেন।
পাঁচদিন পর অফিসে যাবার পর মেইল পেলাম অফিস থেকে মেয়েদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করেছেন।
এক মেয়ে কলিগ আমার দিকে লোভী চোখে চেয়ে বললেন, আপনি আর কয়দিন আগেই যদি ট্রেনে চড়তেন।

আমাদের দেশে সব খারাপ হয়, দেশের সব মানুষ খারাপ, এই ধারণা আমার নানান সময় নানান অভিজ্ঞতায় মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। এই দেশে জন্মেছি বলে কখনো আক্ষেপ হয়নি। নিজের কাজ নিজে করির মতনই দেশের কিংবা দেশের মানুষকে খারাপ খারাপ করে গালি না দিয়ে নিজে কিছু করার জন্য এগিয়ে আসাই হচ্ছে প্রকৃত দেশপ্রেম। নিজের মা বস্তিতে থাকে বলে অট্টালিকায় থাকা অন্য কোন মহিলাকে যেমন মা ডাকা যায় না তেমনি অভিবাসি হয়ে অন্য দেশে পড়ে থেকে গর্ব করার মতন কি এমন আনন্দের ব্যাপার থাকতে পারে??


পথে ঘাটে পর্ব -২৯ প্রথম অংশ
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে আগস্ট, ২০১৮ বিকাল ৪:৩৪
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৩৬

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

USB Charger এর ভেতরে লুকানো ক্যামেরার ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৬



স্বাধীনতা পরবর্তী, পচাত্তর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ক্যু হয়েছে দেশে। সামরিক বাহিনীতে সংঘাত। বহু সদস্য হতাহত। জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাঝা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



বর্তমানে জনসংখ্যার বিচারে 'বিহার' ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য।
বিহারের রাজধানী পাটনা। বিহার মূলত দরিদ্র অঞ্চল বলা যেতে পারে। এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ছিলো মূলত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ক্যাশলেস সোসাইটি এর জন্য কি পারফেক্ট?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



এটা বাংলা কিউ আর কোড। বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাবসায়ীদের বাংলা কিউ আর কোড বাধ্যতামূলক করেছেনভ এটার ভালো দিক ও খারাপ দিক দুইটাই আছে। বাংলাদেশের সিস্টেম, কারিগরি দক্ষতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×