
বাসর রাইতে আমারে প্রথম যে কথাটা রায়হান কইছিল, সেই কথাটা এখনও কানের মধ্যে বাজে।
- মৌ আজ থেকে আমার পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তুমি।
আমি ঘোমটার নিচে চুপ কইরা বসা আছিলাম। উত্তর দেওনের মতো শক্তিও ছিল না আমার মধ্যে। মানুষ ভাবে, বাসর রাইত মানেই নতুন স্বপ্নের শুরু। আমার জন্য ওই রাইত আছিল একটা শেষ হয়ে যাওয়া জীবনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে থাকার শেষ কিছু।
আমার একটা বাচ্চা আছিল। পৃথিবীতে আইতে পারে নাই। আমার একটা মানুষও আছিল, যারে আমি বিশ্বাস করছিলাম। সেও আমারে নিজের কইরা রাখে নাই তার কাছে আমি কখনো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হই নাই।
তারপর একদিন আমি আইসা পড়লাম রায়হানের ঘরে।
লোকটা অদ্ভুত। সুন্দর, ভদ্র, একটু লাজুক। তারে দেখলেই মনে হইত, এই মানুষটার বুকের ভিতরেও বুঝি অনেক কবর চাপা আছে।
আমি কিছু কইলাম না। সে দীর্ঘশ্বাস ফালাইয়া পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো।
আমি তখন বারান্দায় আইসা দাঁড়াইলাম।
দখিনা বাতাস বইতেছিল। আকাশে চাঁদ উঠছিল। দূরে কুকুর ডাকতেছিল।
হঠাৎ আমার মনে হইল, আমি যেন কমলাপুর রেলস্টেশনে বসা একজন যাত্রী। কত্ত বছর ধইরা বসা আছি!
একটা ট্রেন আসবো; আমার সেই মানুষটা নামবে তারপর আমার হাত ধইরা কইবো,
চলো, আর কষ্ট পাইতে হইবো না কারন তুমি আমার জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বলে নাই, কত ট্রেন আসে, ট্রেন যায় মানুষ নামে, মানুষ উঠে,
শুধু আমার মানুষটা আর আসে না।
ঠিক ওই সময় পিছন থেইকা রায়হান ডাক দিল।
- এই যে
আমি ফিরা তাকাইলাম; কখন পেছনে আইসা দাঁড়াইছে টের পাইনাই। লোকটার চোখে কেমন মায়া আছিল, আমরা দোলনায় বইসা থাকলাম অনেকক্ষণ।
আমারে জিজ্ঞেস করলো,
- তোমার বয়স কত?
আমি কেমন লজ্জা পাইয়া কইলাম,
- ছাব্বিশ।
সে আর আমি হাসলাম।
মানুষটা আমারে সুন্দর কইল।
অনেকদিন পরে কেউ আমারে সুন্দর কইল।
জানেন, যেই মেয়ের বুক থেইকা তার না জন্মানো সন্তানরে কাইড়া নেওয়া হয়, সে আর নিজেরে সুন্দর ভাবতে পারে না।
আমি রায়হানের দিকে তাকাইয়া আছিলাম। লোকটার চোখেও অনেক ক্লান্তি অনেক অপেক্ষা অনেক না পাওয়ার ইতিহাস।
আমি বুঝতে পারছিলাম, এই মানুষটাও আমার মতোই।
আমরা দুইজনেই জীবনের ঘাটে বসে অপেক্ষায় থাকা যাত্রী।
কেউ একজন আইবো বইলা বহুদিন ধইরা অপেক্ষা করতেছি কিন্তু কেউ আসে নাই।
আমি ধীরে ধীরে কইলাম,
- জানেন, আমার খুব ইচ্ছা করে আপনার স্ত্রী হইতে। কিন্তু আমি পারবো কিনা বুঝতেছিনা। রায়হান কিছুক্ষণ চুপ থাকল তারপর আস্তে করে কইল,
- সময় নাও। আমি অপেক্ষা করতে পারবো।
আমি তার দিকে তাকাইয়া রইলাম।
এই পৃথিবীতে মানুষ অপেক্ষা করতে জানে না। সবাই তাড়াহুড়া করে, সবাই পেতে চায়।
কিন্তু এই মানুষটা কইতেছে, সে অপেক্ষা করবে। আমার বুকের মধ্যে কেমন জানি করল।
হয়তো ভালোবাসা এমনই ধীরে ধীরে মানুষের পাশে আইসা বইসা পড়ে। তারপর একসময় হাত ধইরা ফেলে। আমি আকাশের চাঁদটার দিকে তাকাইলাম।
প্রতিদিন আমি এই চাঁদরে একজন মানুষের মতো ভাইবা গল্প করি, কাঁদি, অভিমান করি।
আজ মনে হইল, এতদিন যারে খুঁজছিলাম, সে বুঝি খুব দূরে আছিল না, আমার পাশেই আছিল, আমার মতোই সে ও অপেক্ষা করতেছিল।
আমি তার দিকে তাকাইয়া মৃদু হাইসা কইলাম,
- রায়হান, আমরা দুইজনই বুঝি মুঠো ভর্তি নগন্য মানুষ?
সে অবাক হইয়া তাকাইলো।
আমি আবার কইলাম,
- আমাদের হাতে অনেক কিছু আছে। বাড়ি আছে, পরিবার আছে, নিঃশ্বাস আছে। কিন্তু যেই মানুষটার জন্য বুকের ভিতর এত শূন্যতা, সে নাই।
রায়হান কোনো কথা কইল না শুধু আমার হাতটা ধইরা রাখল।
সেই মুহূর্তে আমার মনে হইল, কমলাপুর রেলস্টেশনে অপেক্ষা করা যাত্রীরা সবসময় ট্রেন না পাইলেও তারা আরেকজন অপেক্ষায় থাকা যাত্রীর দেখা পাইয়া যায়।
তারপর দুইজনে মিলা বসে থাকে আমাদের মত; দুঃখ ভাগাভাগি করে; আকাশ দেখে; চাঁদ দেখে।
আর মনে মনে ভাবে, হয়তো এই মানুষটাই আমার না-পাওয়া মানুষটার বদলে পাঠানো কোনো উপহার বিধাতার তরফ থেকে।
সেদিন দখিনা বাতাস আমাদের দুইজনরে ছুঁইয়া গেছিল।
আর আমি প্রথমবারের মতো মনে মনে বলছিলাম,
একজন ভুল মানুষের জন্য আমি একটা জনম অপেক্ষা করেছি, আর অপেক্ষা করবো না, আজ থেকে সব অপেক্ষার ছুটি দিয়া দিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




