somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্পঃ সুখ

১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে সুমনের, জিপিএ ৫ পেয়েছে জানার পর পুরো দিনটিই বদলে গিয়েছে ওর আনন্দে।যেন পৃথিবীর সব খুশির দরজা একসঙ্গে খুলে গেছে ওর জীবনে।
ছেলেটা ওর বাবা মায়ের কাছে খুব বেশি কিছু চায়নি কোনোদিন। চাইবার অভ্যাসও বোধহয় তার তৈরি হয়নি কখনো। দিনমজুরের ঘরে জন্মানো ছেলেদের চাওয়ার কিছু থাকেনা আসলে। কোন জিনিসটা চাইলে বাবার কষ্ট হবে, কোনটা চাইলে মায়ের মুখটা মলিন হয়ে যাবে, কোনটা চাইলে সংসারের চাল-ডালের হিসাবটা এদিক ওদিক হয়ে যাবে, এসব খুব অল্প বয়সেই বুঝে ফেলেছে ও।

তবু ভালো রেজাল্ট করলে তার একটা ইচ্ছা ছিল বাবার কাছে; ভয়ে ভয়ে অনেক আগেই বলেছিল কথায় কথায় সেটা, মোবাইল চায় ও।
ওর বাবাও শুনে অনেকদিন ধরেই কথা দিয়েছিলেন, সুমন ভালো রেজাল্ট করলে একটা ভালো মোবাইল কিনে দেবেনই দেবেন।
ভালো মোবাইল বলতে অবশ্য সুমনের কল্পনায় খুব দামি কোনো ফোন ছিল না। বন্ধুদের হাতে থাকা ফোনগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে নিজের পছন্দের একটা মডেল ঠিক করে রেখেছিল সে। মাঝে মাঝে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁচের ভেতর সাজানো ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকতো। তারপর নিজের অজান্তেই একটু হাসতো।
বাবা সেসব জানতেন।

সেদিন সন্ধ্যায় আবদুল কুদ্দুস যখন কাজ থেকে ফিরলেন, তার পরনের শার্টটা ঘামে ভেজা। পায়ের ধুলো তখনো ধুয়ে ফেলা হয়নি। সারাদিন ইট, বালি আর সিমেন্টের সঙ্গে যুদ্ধ করে ফেরা মানুষটির হাতে ছিল মুঠো করে ধরা কিছু কুঁচকানো নোট, টাকাগুলো তিনি সুমনের হাতে দিয়ে বললেন, যা, তোর পছন্দমতো মোবাইল কিনে নে। কথাটা বলার সময় মানুষটার চেহারায় গর্ব ছিল, ছেলের রেজাল্ট ভালো হয়েছে।
তার ছেলে পেরেছে। এই পারাটা শুধু ছেলের ছিল না। এর মধ্যে তার নিজেরও অংশ ছিল। কতদিন দুপুরের খাবার না খেয়ে কাজ করেছে, কতদিন নিজের জন্য নতুন জামা না কিনে ছেলের বই কিনেছে, কতদিন অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজে গেছে, তার কোনো হিসাব সে রাখেনি বাবারা বোধহয় এসবের হিসাব রাখেও না।

সুমন টাকাগুলো হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বাবার হাতটা একটু শক্ত করে ধরল। ধরেই থাকলো; কিছু বলল না। পরেরদিন বিকেলে সে বাড়ি ফিরল একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে। আবদুল কুদ্দুস তখন উঠোনে বসে পুরানো স্যান্ডেল সেলাই করছিলেন। ছেলেকে দেখে প্রথমেই তার চোখ গেল ব্যাগটার দিকে। তার মনে হলো, যাক ছেলে মোবাইল কিনেছে আজ তার ছেলে নিশ্চয়ই খুব খুশি।
তিনি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, কি মোবাইল কিনছিস?

সুমন হাসল। সেই হাসির মধ্যে মোবাইল কেনার আনন্দের বদলে অন্যরকম কিছু ছিল। ব্যাগটা খুলে সে প্রথমে একটা নীলচে রঙের পাঞ্জাবি বের করল। বাবার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-এটা তোমার জন্য।
আবদুল কুদ্দুস কিছুক্ষণ শার্টটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমার জন্য?
- হ্যাঁ।
তারপর বের হলো একজোড়া বাদামী রঙের চামড়ার জুতা, বললো এটাও তোমার, পায়ে দিয়ে দেখো সাইজ ঠিক আছে কিনা।
বাবা আর কিছু বললেন না একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন বিস্ময়ে।

সুমন এবার মায়ের কাছে গিয়ে ব্যাগের ভেতর থেকে ছোট্ট একটা বাক্স বের করল। বাক্সটা মায়ের হাতে দিল, মা বাক্স খুলে থমকে গেলেন।
ছোট্ট একজোড়া সোনার কানের দুল সেটায়, এক মুহূর্তের জন্য পুরো বাড়ি বিস্মিত হয়ে রইলো, মা বাবা দুজনেই অবাক চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর আবদুল কুদ্দুস বললেন, তোর মোবাইল?
সুমন এবার একটু হেসে বলল,‌ মোবাইল পরে কিনব, বাবা।
- কেন?
সুমন মাটির দিকে তাকিয়ে আবারো‌ বলল, মোবাইল তো পরেও কিনতে পারব। কিন্তু তোমাদের কে কিছু কিনে দেয়ার সুযোগটা তো হতো না এখন।
ওর বাবা হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছলেন। তারপর নাক টেনে স্বাভাবিক গলায় বললেন,
- তুই একটা পাগল। বলেই সুমনকে জড়িয়ে ধরলেন, বাবার হঠাৎ আলিঙ্গনে সুমন বাবাকে শান্তনা দেবার জন্য হাসলো। মাও হাসছেন, তবে সেই হাসির আড়ালে তিনজনই আসলে কাঁদছেন, এক অপার্থিব মুহুর্তের খুশির কান্না।
জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে,বাইরের পৃথিবীর কাছে এগুলোর কোনো মূল্য নেই। কিন্তু একটা দরিদ্র পরিবারের কাছে এগুলো কখনো কখনো একটা সম্পূর্ণ জীবনের সমান দীর্ঘ সুখ হয়ে যায়।

(সমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৪১
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে “উপজাতি” নাকি “আদিবাসী”? আন্তর্জাতিক আইন ও ইতিহাসের নির্ভেজাল সত্য!​

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭


সূচনা ও প্রেক্ষাপট:
লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০০১ সালে তিনি যখন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন, তখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে 'উপজাতীয়' (Tribal) হিসেবে ডাকা হতো। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালের দিকে সেখানে পুনরায় পোস্টিং পাওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হঠাৎ কেন ঢাকায় র প্রধান?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:২২


দিল্লী দখল ঠেকাতে ঢাকায় চলে এলেন র প্রধান!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনলেন। ক'দিন ঐ র‍্যাডিসন ব্লুতে বসে অনেকের হাতে-পায়ে ধরলেন; বললেন, "তোমরা প্লিজ দিল্লী আক্রমণ করো না। আমাদের মিসাইল, অস্ত্র সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী কারা

লিখেছেন কিরকুট, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬


বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কথা আসে। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবী!

লিখেছেন করুণাধারা, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৩



১)
দেবী খুবই বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী। এক উচ্চাভিলাষী পরিবারে দেবীর জন্ম, এমনই উচ্চাভিলাষী যে তাদের একমাত্র ভাবনা কীভাবে সবাইকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠা যায়! দেবীর যখন জন্ম হলো তখন তার ভাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

র-প্রধানের ঢাকা সফর: খবর শুনেই হাসপাতালে ভর্তি পাকিস্তানের হাইকমিশনার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৭


রসিকতা বাদ দিয়ে বলি, দুটি ঘটনাই সত্যি। বাংলাদেশে RAW এর প্রধান পরাগ জৈন এসেছেন এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার এখন হাসপাতালে আছেন। দুটি ঘটনা আসলে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×