somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চা ইতিবৃত্ত ... অতীত থেকে বর্তমান

১৬ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৩:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি যদি বলি, বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অন্যতম প্রধান পানীয় কি ... সবাই এক বাক্যে উত্তর দিবে চা । কিন্তু আমরা সবাই চা সম্পর্কে কম-বেশী অতটা জানি না ...জানলেও কোন সচ্ছ ধারণা হয়ে উঠে নাই । আমাদের দেশে চা সেই ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকে চাষ হয়ে আসছে । চা সাধারণত উচু-নিচু ঢালু জায়গায় ভাল হয় ।আর এ জন্য চা চাষের জন্য আমাদের দেশে সবচেয়ে উপযোগি জায়গা হলো পাহাড়ী ও পার্বত্য অঞ্চল । বৃহত্তর চট্রগ্রাম,সিলেট অঞ্চলেই সর্বাধিক চা বাগান রয়েছে । চা-বাগানের জন্য সবচেয়ে উপযোগী জায়গা হলো বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল । প্রায় ১৬০ টি চা-বাগানের মধ্যে সিলেট অঞ্চলেই রয়েছে ১৩০ টি । এক-সময় আমরা প্রচুর পরিমানে চা রপ্তানি করতাম । কালের বিবর্তনে সীমাহীন চাহিদা পূরনের জন্য আমাদেরকে আজ চা আমদানি করতে হয় । তারপরও চা উৎপাদনে পৃথিবীতে আমাদের অবস্থান নবম । আর বিশ্বে সবচেয়ে বেশী চা উৎপাদিত হয় ইন্ডিয়াতে ।

চা ছাড়া আমদের অনেকের জন্য একদিন বেঁচে থাকাটা অকল্পনীয়ই বটে । চা পানে আমদেরকে ফ্রেশ অনুভুতি দেয়, শুধু স্নায়ুকেই উত্তেজিত করে ন একই সাথে শান্ত এবং সতর্ক করে ।এছাড়াও আমাদেরকে ক্লান্তি-অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে ; কাজ-কর্মে গতি নিয়ে আসে । কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি কি ... মানুষ ঠিক কবে থেকে চা পানে অভ্যস্থ হলো বা বৃক্ষ জাতীয় কোন উদ্ভিদের পাতা থেকে কিভাবে প্রক্রিয়াজাত চা তৈরি করা হয় বা পাওয়া যায় ।

চা গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস (Camellia sinensis)। ছেঁটে ঝোপের আকার করে রাখা হলেও এটা আসলে বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ। চায়ের প্রকৃত এর উৎপত্তি স্থল চীন। একটা মিথ প্রচলিত আছে যে, একজন বুদ্ধ গুরু ধর্ম প্রচারের জন্য চীন দেশে যান। তিনি অনেক মেডিটেশন করতেন। একদিন তিনি ধ্যান করতে করতে ঘুমিয়ে যান। জেগে উঠে উনি নিজের উপর ভীষন রাগান্বিত হয়ে চোখের দুই পাতা কেটে ফেলেন যাতে আর ঘুমিয়ে পড়তে না হয়।তিনি যেখানে চোখের পাতা ফেলেছিলেন সেখানে গজিয়ে উঠে প্রথম চা গাছ যার যাদুকরি প্রভাবে ঘুম কেটে যায়। যাই হোক , মিথ তো আর কখনো সত্যি হয় না । শেনং নামে একজন ব্যাক্তি যাকে চাইনিজ এগ্রিকালচার এর জনক বলা হয়, তার মাথায়ই রয়েছে পানীয় হিসাবে চা আবিষ্কারের মকুট । কথিত আছে তিনি একটি চা বৃক্ষের নীচে ঘুমানোর আয়োজন করেন সেই সাথে একটি পাত্রে কিছু পানি ফুটতে দেন। পানিতে গাছের কিছু পাতা পড়ে সেদ্ধ হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে শেনং সুগন্ধি পানীয়র প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চুমুক দেন এবং খুব ফ্রেশ অনুভব করেন। এভাবেই শুরু হয় পানীয় হিসাবে চায়ের যাত্রা। তবে আগে মেডিসিন হিসাবেই এটা বেশি চলত। চীনে চায়ের বানিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় দুই হাজার বছর আগে হান ডাইনেস্টির সময়। তবে এমন অনেক প্রাচীন নথিপত্র পাওয়া গেছে , যেখানে দেখা যায় প্রায় খ্রিস্টের জন্মের পনেরশ বছর আগে থেকে চীনের মানুষ-জন চা এর সাথে পরিচিত ছিল । চা দুনিয়াজুড়ে মানুষের এক নম্বর পছন্দের পানীয়। এশিয়ান ও ইউরোপীয় কালচারের সাথে এটা এত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে যে, একটি সন্ধ্যাও চা ছাড়া কল্পনা করা যায় না।

ইন্ডিয়াতে চা চাষ শুরু হয় ১৮১৮এর দিকে। ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশরা সিলেটে চা গাছ আবিষ্কার করে ও ১৮৫৭ সালে মালনীছড়ায় চা চাষ শুরু হয়। তারপর ব্রিটিশরা আস্তে আস্তে আমাদের দেশে আরো বৃহত্তর পরিসরে চা চাষ শুরু করে । কথিত আছে , শুরুতে এদেশের মানুষকে বিনা মূল্যে চা বিতরন করে পানে উৎসাহিত করে । এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে জোর-জুলুম করে ব্রিটিশরা আমাদের মানুষ-জনকে চা পান করিয়েছিল ।

চা সাধারণত বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ । তবে চা উৎপাদনের সুবিধার্থে এর শাখা-প্রশাখা কেটে কেটে ছোট ঝোপের আকৃতি দেওয়া হয় । চা পাতা থেকেই চা-পাতি প্রস্তুত করা হয় । আর এই চা পাতা সংগ্রহের সুবিধার জন্যই চা-গাছকে ঝোপের আকৃতি দেওয়া হয় । ইংরেজীতে যাকে বলে টি বুশ ( Tea Bush )। সাধারণত চা-গাছের শীর্ষ মুকুল হতে দুটি পাতা ও একটি কুড়ি সংগ্রহ করা হয় । বছরে প্রথম বৃস্টি হবার কিছুদিন পর আমাদের দেশে চা পাতা টি-বুশ হতে চয়ন করা হয় এবং এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে প্রায় শীতকাল আসার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। শ্রমিকরা এই পাতা সংগ্রহ করে ফ্যাক্টরিতে নিয়ে আসে । সেখানে বহুবিদ ইউনিট অপারেরেশনের মাধ্যমে প্যাকেটজাত চা তৈরি হয়ে থাকে । স্বাদ-গন্ধ-লিকারের উপর ভিত্তি করে চা কে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয় । তবে আমরা যে চা হর-হামেশা দেখে থাকি বা পান করে থাকি তা হলো ব্ল্যাক টি । ব্ল্যাক টি সমগ্র পৃথিবীতে বানিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত হয়ে থাকে । এছাড়াও গ্রীন-টি সবার মাঝে ব্যপক জনপ্রিয় । গ্রীন টি উৎপাদনের জন্য অল্প বয়সী পাতা ও কুড়িকে বিশেষ ধরনের ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ার মাঝে দিয়ে যেতে হয় । চায়ে ক্যাফেইন নামে এক ধরণের রাসায়নিক উপাদান থাকে । এজন্যই চা আমাদের কাছে স্নায়ু-উত্তেজক পানীয় হিসাবে মনে হয় । চায়ে শতকরা প্রায় চার শতাংশের কিছু বেশী ক্যাফেইন থাকে ।

এছাড়াও চা-গাছে চমৎকার ফুল দেখা যায় । এর ফল ও বীজ হতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভেষজ তেল পাওয়া যায় । আমরা প্রতিনিয়ত যে চা পান করে থাকি এইগুলা সরাসরি চা-বাগান হতে প্যাকেট হয়ে আসে না । প্রথমে খোলা চা-পাতি টেন্ডারের মাধ্যমে ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানীগুলো বাজারজাত করার জন্য নিলামের মাধ্যমে কিনে থাকে । এরপর চাপ-পাতি গুলো বিভিন্ন গ্রেড ও পরিমানের উপর ভিত্তি করে প্যাকেটজাত করে বাজারে সরবরাহ করা হয়ে থাকে ।

বাংলাদেশে প্রধান প্রধান চা বাগানগুলো হলো Duncan Brothers , Kedarpur Tea, M Ahmed Tea & Lands , Finlay Bangladesh . আমাদের দেশে পর্যটন শিল্পে চা-বাগানের আকর্ষনীয় ও গুরিত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । তবে চা-বাগান বেড়াতে যেতে হলে সংশিস্ট কর্তৃপক্ষের নিকট হতে অনুমতি নিতে হয় এবং যথেস্ট নিরাপত্তা ব্যবস্তা নিশ্চিত করে যেতে হয় । ভ্রমন পিপাসুদের কাছে চা-বাগান গুলো সবসময়ই পছন্দের শীর্ষ তালিকায় থাকে

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৩:১৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×