
ভোরের ঠিক আগের সময়টা বড় গোলমেলে। ঘড়িতে তখন চারটা বেজে কুড়ি। একটা জীর্ণ ছাদে নামহীন এক যুবক ভাঙা টাইলসের টুকরো দিয়ে মেঝের ওপর একটা মানচিত্র আঁকছে। তার আঙুলে লেগে থাকা সিমেন্টের ধুলো হালকা বাতাসে উড়ে যাচ্ছে, ঠিক যেন মাঝরাতে দেখা কোনো অর্থহীন স্বপ্নের অবশিষ্টাংশ। সে জানেও না, তার পাশ দিয়ে একটা ছায়া নিঃশব্দে সরে গেল। ছেলেটা জানেও না, ঠিক তার পাশ দিয়ে এক দীর্ঘ ছায়া নিঃশব্দে সরে গেল। যেমন করে তুমি চলে গিয়েছিলে কোনো এক হেমন্তের দুপুরে।
এই শহরের বাতাসে স্মৃতিরা আঠার মতো লেগে থাকে। বিছানার নিচে লুকানো ভূতের মতো সেগুলো মানুষের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে। মেট্রোরেলের যান্ত্রিক ঘড়ঘড়ানিতে কখনো সেই স্মৃতিরা চাপা পড়ে যায়, আবার কখনও বৃষ্টির দিনে জানলার ঝাপসা কাঁচে ফিরে এসে কড়া নাড়ে। রাস্তার মোড়ে পড়ে থাকা রোদের টুকরোটা আজ কেমন জানি সন্দেহজনকভাবে নরম। ডাস্টবিনের পাশের পচা গন্ধেও হঠাৎ ভোরের আলোর একটা পবিত্র ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। বারান্দার পাশের ভেজা পাতায় অকারণেই মায়া জন্মায়, যেমন করে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা দুই অচেনা মানুষের চোখাচোখি হলে এক সেকেন্ডের জন্য তারা একটা যৌথ সংসারের মিথ্যে ভবিষ্যৎ কল্পনা করে ফেলে। তারপর বাসের কর্কশ হর্নে সেই ঘোর ভেঙে যায়, তারা আবার আলাদা হয়ে যায় যার যার গন্তব্যে।
আসলে এই কর্পোরেট ইঁদুরদৌড়, মাসকাবারী বেতনের হিসাব, এসি রুমে সারাদিন কী-বোর্ডের খটখট আওয়াজ আর এটিএমের ঘরঘর শব্দ জীবনের মানে পাল্টে দিতে পারে না। ওই নামহীন ছেলেটার মতো আমারও একটা ব্যক্তিগত ম্যাপ আছে। যার শেষ সীমানায় কোনো বড় অফিস নেই, প্রমোশনের টেনশন নেই; আছে শুধু পাহাড়ের কোলে একটা ছোট্ট কাঠের ঘর। খুব সাধারণ জীবন। সকালে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা মেঘের আনাগোনা।
সময় আমার গলায় একটা অসমাপ্ত সুরের মতো আটকে থাকে। যে নামটি কোনোদিন ডাকা হয়নি, যে চোখের দিকে তাকিয়ে পূর্ণিমা দেখা হয়নি; তাদের নীরবতা থেকেই জন্ম নেয় একটা অদ্ভুত দাগ। সেটা প্রেম নয়, আবার অপ্রেমও নয়। ওটা হলো একটা হিমু-মার্কা নির্লিপ্ততা। এটা হলো এক ধরণের মায়া, যা মানুষকে মাঝরাতে একা ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাতে বাধ্য করে।
যা শুধু বলে—"জীবনটা তো একটাই, খামোখা টাকার পেছনে ছুটে এটাকে নষ্ট করার মানে কী?"
আমি বরং পাহাড়ের সেই ছোট্ট ঘরে বসে বৃষ্টির শব্দ শুনবো। এক ফোঁটা বৃষ্টি যদি সেই ঘরে ভুল করে ঢুকে পড়ে, ক্ষতি কী?
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



