somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সাখাওয়াত হোসেন  বাবন
ব্লগিং শুরু করি প্রথম আলো ব্লগে "আমার কবিতা নামে" আমি ব্লগিং করি মূলত নিজের ভেতরে জেগে উঠা ব্যর্থতা গুলোকে ঢেকে রাখার জন্য । দুনীতিবাজ, হারামখোর ও ধর্ম ব্যবসায়িদের অপছন্দ করি ।

বিহঙ্গ -২য় পর্ব (সমসাময়ীক কাল ও স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তী পটভূমিতে লেখা উপন্যাসটি )

০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



রমনা পার্ক । সকাল ৬ টা ।

শেষ রাতের দিকে মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে গেছে । বেলা বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টি কমে গেলেও আকাশে মেঘের ঘনঘটা পুরোপুরি কাটেনি । মিহি বরফ কুচির মতো এখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে । যে কোন সময় বৃষ্টির দাপট বাড়তে পারে ।

বিবর্ণ পোশাক, নগ্ন পায়ে রমনা পার্কের প্রবেশ দারে'র দু'পাশে তিন তরুণের একটা দল অনেকক্ষণ যাবত অপেক্ষা করছে। তাদের সকলের বয়স চব্বিশ এর কোঠায়। দেখে কেমন নেশাখোর, নেশাখোর মনে হয়৷

আধ ময়লা জিন্স এর উপর কালো হাফ সাট পরিহিত উষ্কখুষ্ক চুলের লম্বা যুবকটি হেলান দিয়ে বসে আছে পূর্ব পাশের ভেজা বেঞ্চিতে। সেখান থেকে গেট দিয়ে কারা পার্কে ঢুকছে, কারা বের হয়ে যাচ্ছে তা পরিষ্কার দেখা যায় । যুবকটি বিষন্ন চোখে গেটের বাহিরে ফুটপাত লাগোয়া ডাবের দোকানের সামনে ছোটখাটো একটা জটলাটার দিকে তাকিয়ে আছে। জটলায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি ব্যক্তিকে সে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে ।

পার্কে ভ্রমণ করতে আসা লোকজন প্রাত ভ্রমণ সেরে ফিরে যাবার আগে ওই দোকান থেকে ডাবের পানি কিনে খায় । দোকানের মালিক লোকটাকে আজ দোকানে দেখা যাচ্ছে না । তার জায়গায় নতুন একটা ছেলে ডাব বিক্রি করছে । দোকানদার লোকটার মতো ডাব কাটায় সে দক্ষ নয় বলে রেগুলার কাস্টমদের মেইন্টেইন করতে ছেলেটা হিমশিম খাচ্ছে। সে কারণেই জটলার সৃষ্টি হয়েছে।

বেঞ্চিতে বসে ছেলেটি জটলায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষের মুখ,আচাড় আচরণ,মুভমেন্ট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে ।

গেটের দক্ষিণ পাশে প্রকাণ্ড শিরিষ গাছে পেছনে জিন্সের উপর কালো রং এর টি সার্ট পরিহিত অন্য দুটি ছেলে পিঠে প্লাস্টিকের বস্তা নিয়ে কাগজ কুড়াতে কুড়াতে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে হাসাহাসি করছে ।

ঠাট্টার ছলে একে অন্যে শরীরে ধাক্কা দিয়ে নিজেরাই লুটিয়ে পরছে ভেজা ঘাসের উপর। পরক্ষণেই আবাত উঠে দাড়িয়ে ভেজা প্যান্ট ঝাড়তে ঝাড়তে কাগজ কুড়াতে মনোযোগ দিচ্ছে৷ জগৎ সংসারের তাদের কোন সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না।

তাদের এই ছেলেমানুষি পার্কের ভেতর থেকে পরিষ্কার দেখা গেলেও পার্কের বাহির থেকে শিরিষ গাছের আড়ালের কারণে দেখা যায় না । তবে কেউ দেখুক বা না দেখুক সেদিকে এ দু'জনের ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না।

বেঞ্চিতে বসে থাকা ছেলেটির সঙ্গে এ দুটি ছেলের একটা জায়গাতে বেশ মিল রয়েছে তারা তিনজনই কিছুক্ষণ পর পর গেটের দিকে তাকাচ্ছে ।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টি একেবারে কমে যাওয়ায় একজন, দু'জন করে পার্কে মানুষের আনাগোনা বাড়ছে । পার্কের ভেতরের ওয়াকওয়ে'তে লোকজন হাটতে শুরু করেছে ।

বৃষ্টির কারণে ফেরিওয়াদের দলটা না আসায় পার্কের ভেতর অন্যদিনের তুলনায় এতোটাই নির্জন যে, ভাল করে কান পাতলে গাছ থেকে পানি পড়ার টুপটাপ শব্দ শোনা যায় । দু'টো শালিক আর তিন, চারটে আধ ভেজা কাক ঘাসের উপর খাবারের খোঁজে সর্তক ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ঠিক সাড়ে ছটার সময় কালো রং এর একটা মারসিটিস বেঞ্জ এসে থামল পার্কের গেট থেকে মিটার পাঁচেক এগিয়ে গিয়ে ফুটপাত ঘেঁষে । গাড়ীর প্রতিটি অংশে যত্নের চিহু স্পষ্ট । ড্রাইভার তার সিট থেকে দ্রুত নেমে এসে ডান পাশের দরজা খুলে দিতে হালকা নীল রং এর ট্রাউজার স্যুট পরিহিত ষাট, পঁয়ষট্টি বছরের এক ভদ্রলোক নেমে এলেন গাড়ি থেকে ।

ক্লিন সেইভ । মাথার সাদা পাকা চুল ছোট করে ছাটা । চোখে সোনালী ফ্রেমের দামী চশমা । উচ্চতা পাঁচ ফুট ছ ইঞ্চির মতো । ফর্সা চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট । গেটের সামনে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের অনেকেই গাড়ি ও মালিকের দিকে তাকাচ্ছে।

গাড়ি থেকে নেমে ভদ্রলোক রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে উঠে আড়মোড় ভেঙ্গে আকাশের দিকে তাকালেন । তারপর ডান হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টির তেজ পরীক্ষা করে দেখলেন ।

এরপর ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বললেন, "আবারো বৃষ্টি শুরু হতে পারে । আজ বেশিক্ষণ হাঁটবো না । শামিম; তুমি বাজার থেকে জিনিসগুলো নিয়ে এসো। আমি এর মধ্যে দুটো চক্কর দিয়ে আসি ।

প্রতি উত্তরে ড্রাইভার শামীম কিছু না বলে মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেলো ।

ভদ্রলোক এবার চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে তারপর এগিয়ে গেলেন গেটের দিকে । গেটের পাশে দাঁড়ানো সিকিউরিটি গার্ড ভদ্রলোকটিকে দেখা মাত্র মাটিতে পা ঠুকে শব্দ করে লম্বা একটা সালাম দিয়ে বলল, "স্যার ভালো আছেন?"

সিকিউরিটি গার্ডের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সালামের প্রতি উত্তরে ওলাই কুম আস সালাম বলে সিকিউরিটি গার্ডের উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়ে ভদ্রলোক পার্কের ভেতর ঢুকে পূর্বপাশের ওয়ার্কয়ে ধরে হাটতে লাগলেন ।

প্রতিষ্ঠিত ধনী মানুষেরা অহেতুক কথা খরচ করেন না। কথা হচ্ছে , তাদের কাছে ব্যাংকে জমানো ডিপোজিটের মতো । স্থান,কাল, পাত্র দেখে তবেই তারা কথা খরচ করেন ।

বেঞ্চিতে বসা যুবকটির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েক মুহূর্তের জন্য সে মুখ তুলে তাকাল লোকটির দিকে । পরক্ষণেই মুখে ঘুরিয়ে তাকাল দক্ষিণ পাশের শিরিষ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে দুটির দিকে।

ছেলে দুটিও এদিকেই তাকিয়ে ছিলো। তিনজনের চোখাচোখি হতেই যুবকটি আপন মনে উপর নীচে মাথা নাড়াল । দেখে অন্তত তাই মনে হলো ।

সঙ্গে সঙ্গে শিরিষ গাছের নিচে দাড়িয়ে থাকে দু'জনের একজন ঘাসের উপর পড়ে থাকা বস্তা তুলে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে ভদ্রলোকটি যে ওয়ার্কয়ে ধরে হাট ছিলেন সেই ওয়ার্কয়ে উঠে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাগজ খুঁজতে খুঁজতে লোকটার সঙ্গে কয়েক কদম ডিসটেন্স রেখে তার পেছন পেছন হাটতে লাগলো ।

লোকটি পুরো পার্ক একবার চক্কর দিয়ে আবার শিরিষ গাছটির আসতেই আগে থেকে গাছটির নীচে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য ছেলেটি এবার পিঠের বস্তা সমেত দ্রুত লোকটির সামনের ওয়াক ওয়েতে উঠে এসে খুব ধীরে ধীরে হাটতে লাগলো।লোকটা সেহেতু দ্রুত হাঁটছিল সেহেতু তার খুব একটা বেশি সময় লাগলো না ছেলেটির পেছন পৌছতে ।

ওয়ার্কওয়েটা ছোট হওয়ায় তার উপর ছেলেটির কাঁধে মস্ত একটা বস্তা থাকায় পুরো ওয়াকওয়েটিই ব্লক হয়ে গেছে । ভদ্রলোকটি ময়লা বস্তাটি যেনো তার শরীরে না লাগে সে জন্য থেমে গিয়ে ধমকের সুরে বললেন, "এই রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? সর , যেতে দে।"

ততক্ষণে বস্তা পিঠে অন্য ছেলেটির চলে এসেছে লোকটির পেছনে । তিন জনের মাঝে হাত তিনেক ব্যবধান ।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি লোকটির কথা শুনতে পেয়েছে বলে মনে হল না । সে আগের মতোই পথ রোধ করে দাড়িয়ে রইলো ।

লোকটার বিরক্তি ততক্ষণে আরও বেড়ে গেছে। তিনি ইংরেজিতে বকাঝকা করতে করতে করতে ছেলেটি বস্তা ধরে টান দিলেন । ঠিক সেই মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ এক ছুরির ফলা লোকটি ডান কোমরের পেছন দিয়ে ঢুকে কিডনি ও নাড়িভুঁড়ি র অনেকটা অংশ কেটে নিয়ে বের হয়ে এলো ।

হঠাৎ আঘাতে লোকটা একেবারে জমে গেলেন । মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হল না । অবাক বিস্ময়ে তিনি ঘুরে পেছনে তাকালেন । পেছনের ছেলেটি ততক্ষণে তার হাতের ছুরিটি বস্তার ভেতর ঢুকিয়ে ফেলেছে ।

লোকটা ছেলেটির দিকে এগিয়ে যাবার জন্য পা বাড়াতেই পেছন থেকে বাম কোমরের নরম অংশে অনুরূপ আঘাতে তার পুরো শরীর কেপে কেপে উঠলো। এই আঘাতের মাত্রা এতোটাই মারাত্মক ছিলো যে, ভদ্রলোক এর দখল সহ্য করতে না পেরে হাঁটু ভেঙ্গে মাটিতে বসে পড়লেন ।

ছেলে দুটি এবার একসাথে ঘুরে তাকাল বেঞ্চিতে বসে থাকা অন্য যুবকটির দিকে । সঙ্গে সঙ্গে যুবকটি ডান চোখ টিপ দিয়ে মাথা কাত করে ইশারা করতেই ছেলে দুটো আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পায়ে হেটে পার্ক থেকে বের হয়ে গেলো । ভদ্রলোকটির নিথর দেহ কিছুক্ষণ হাঁটুর উপর স্থির হয়ে থাকার পর এক সময় কাত হয়ে পড়ে গেলো ওয়াক ওয়ের বাহিরে ভেজা ঘাসের উপর ।


চলবে ......
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:০৯
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলে গেছো তাতে কি? নতুন একটা পেয়েছি, তোমার চেয়ে করে বেশী চাঁন্দাবাজিইইই....

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২৭

আমি কবিতা লিখি না কখনও। চেষ্টাও করি না। আমি মূলত কবিতা অপছন্দ করি। কিন্তু....



আমি যখন ক্লাস ৪/৫ এ পড়ি, তখন স্কুলের বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগীতার সময় নিজের লেখা গল্প-কবিতা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজব পোশাক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৪৬


এক দেশে ছিল একজন রাজা। রাজার হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। সিপাহী-সামন্ত লোকলস্করে রাজপুরী গমগম। রাজার ধন-দৌলতের শেষ নেই। রাজা ছিল সৌখিন আর খামখেয়ালি। খুব জাঁকজমক পোশাক-পরিচ্ছদ পরা তার শখ। নিত্যনতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাচনী অঙ্গীকার চাই ফুটপাথ ফেরাও মানুষের কাছে

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৬


ভোটের মিছিলে কথা হয় অনেক
পোস্টারে ভরা উন্নয়নের ঢাক
কিন্তু বলো তো ক্ষমতাপ্রার্থী দল
ফুটপাথ কার এ প্রশ্নের কি জবাব?

ঢাকা ছোটে না, ঢাকা পায়ে হেটে ঠেলে চলে
শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই পড়ে কষ্টের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালুর নিচে সাম্রাজ্য

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫১


(ডার্ক থ্রিলার | কারুনের আধুনিক রূপক)

ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
কাঁচের অট্টালিকাগুলো আলো জ্বেলে রাখে—যেন শহর নিজেই নিজের পাপ লুকাতে চায়।

এই আলোর কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে ছিল করিম গ্লোবাল টাওয়ার
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×