somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পার্বতীরা তিন বোন (অনুগল্প)

১২ ই জুন, ২০১৪ ভোর ৫:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘দেখেছিস উইমলা, ছেলেগুলো ক্যামন ড্যাব ড্যাব করে তাকাচ্ছে?’
‘হু, কিন্তু তুমি তাকাচ্ছো কেন, মিহনী? মেয়েদের গোসল করতে দেখলে তো ওরা তাকাবেই।’
এক পশলা মুগ্ধ হাসিতে গুন্নেদু বললো, ‘আমার কিন্তু খারাপ লাগছে না। ছেলেগুলো সুন্দর আছে...।’
তিন কন্যার একে অপরের চোখে চোখ পড়তেই বাঁধভাঙ্গা হাসি, পর্বতের নিরবতা ভাঙ্গা হাসি। থামেই না। হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে পড়ছে, ঝরনায় জলকেলী করছে। রূপবতীদের কিন্নরী হাসিতে অরন্যের ঝরনায় স্বর্গীয় তাল বেজে উঠে। এক পর্বতের গা থেকে আরেক পর্বতের গায়ে প্রতিধ্বনি হতে থাকে। এমন বসন্ত দিন নীল পর্বতে আর কখনও আসেনি।
সেই হাসিতে নেপিয়ান উপজাতির পথ হারানো রাজপুত্ররা শুধু শিকার করতেই ভুলে গেল না, নিজেরাই শিকার হয়ে গেল। কাটুম্বা উপজাতির রাজকন্যারা ঝরনায় নিয়মিত স্নান করতে আসে, রাজপুত্ররাও রূপের মায়ায় হারিয়ে যেতে থাকে। দিনে দিনে রূপের সাথে রূপের, মনের সাথে মনের এক ঐশ্বরিক যোগাযোগ বাড়তে থাকে। রূপমুগ্ধ পুরুষ, প্রেমময়ী নারীর সেই যোগাযোগ সব কিছুকে ছাপিয়ে উঠে। কিন্তু এভাবে মনের কথা মনে মনে আর কত দিন বলা যায়? তাই রাজপুত্ররা বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু উজানের সাথে কি ভাটির মানুষের সম্পর্ক কখনো ভালো থাকে? থাকে না। কাটুম্বা ঝরনার পানির উপরই নেপিয়ানদের বাঁচা-মরা। নেপিয়ান নদীর জীবন। পানির জন্য দুই উপজাতির মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহও কম হয়নি। তা ছাড়া কাটুম্বাদের মধ্যে ভিন্ন গোত্রে বিবাহ স¤পুর্ন নিষিদ্ধ। কেউ করলে শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
রাজপুত্ররা কোনো ভাবেই তা মেনে নিতে পারে না। যে কোনো মুল্যে কাটুম্বার রাজকন্যাদেরকেই বিবাহ করবে। কিন্তু কাটুম্বা রাজার এক কথা-- প্রয়োজনে যুদ্ধ তবুও বিবাহ নয়। ভয়াবহ যুদ্ধ বেঁধে গেল। সেই যুদ্ধে উভয় গোত্রের অনেকে নিহত হলো। যুদ্ধ যখন নেপিয়ানদের জয়ের দ্বার প্রান্তে ঠিক তখন কাটুম্বাদের এক বৃদ্ধ যাদুকর রাজকন্যাদের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য পর্বত বানিয়ে ফেলে। সেই থেকে তারা হয়ে গেল পার্বতী। যাদুকর ছাড়া আর কেউই জানে না, কোন পর্বতগুলো সেই রাজকন্যারা? শুধুমাত্র সেই যাদুকরের মন্ত্র কিংবা রাজকন্যাদের প্রকৃত প্রেমিকই পারবে রাজকন্যাদের জীবন ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু সেই যাদুকর পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে দাস হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে হঠাৎ একদিন আত্মহত্যাকেই বেছে নিল।
যুদ্ধ শেষে পার্বতীরা প্রেমিকদের প্রতীক্ষায় দিন গুনতে থাকে। কিন্তু প্রেমিকরা তো আর আসে না। রাজকন্যারা পর্বত হয়ে গেলেও একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে। বাতাসের কানে আকাশের পানে বিরহের গান করে। চাঁদ, তারার সাথে কথা বলে। রাতের আকাশে উল্কার জ্বলে ওঠা দেখে মনে মনে উইশ করে। প্রতিদিন কত কত অভিমানী কথা ঠিক করে! রাগ হয়...আবার ভুলেও যায়। আবার রাজপুত্রদের স্বপ্ন দেখে। ঝরনার জলে স্নান, জলকেলীর সেই বসন্ত দিনগুলি। আরো কত কী...।
রাজপুত্ররা বনফুল হাতে একের পর এক পর্বতের কাছে হাটু গেড়ে প্রেম নিবেদন করতে থাকে। কোনো পর্বতই সাড়া দেয় না। বিষধর সাপ, লাল মাকড়শায় ভরা শাপদ-সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে দুর্গম গিরিপথে ছুটে চলে। এক পর্বতের গুহা থেকে আরেক পর্বতের গুহায় রাত কাটায়। কিছুতেই প্রিয়তমাদের খুঁজে পায় না।
ওদিকে শেষ বিকেলের কনে দেখা আলোয় পার্বতীরা সোনার মেয়ে হয়ে বসে থাকে। প্রতীক্ষা করতে করতে বিরহ-বেদনায় নীল হয়ে যায়। অষ্ট্রেলিয়ার আকাশে দ্বিগুন বড় চাঁদ উঠে। জোৎস্না রাতে মেঘের ছায়া কখনও চাঁদের, কখনও পার্বতীদের মুখ ঢেকে দেয়। এমনই কোনো এক রাত্রীর দ্বিপ্রহরে চাঁদ ডুবে যাবার আগে আগে গুন্নেদু মিহনীকে জিজ্ঞেস করলো--
‘ওরা বেঁচে আছে তো?’
‘হু, আছে।’
‘কিভাবে বুঝলে?’
‘প্রকৃতি কি এত নিষ্ঠুর হয়?’
‘ওরা কী সত্যিই আমাদের ভালোবাসে?’
‘...বাসে।’
‘কিন্তু একবারও তো বলেনি।’
উইমলার আর ভালোলাগে না। তাই একটু রেগেমেগেই বলে উঠে, ‘ভালোবাসে... না ছাঁই। একটুও বাসে না। তাহলে কী আর এত দিন লাগে?’
কিছুক্ষণ পর মিহনী একটা দীর্ঘ নি:শ্বাস নিয়ে বললো,--‘ভালোবাসা... অপেক্ষায়ও মধুর। ‘ভালোবাসি’ কথাটি বলা লাগে না রে...।’
----------------------------------------------------------------------
* (অস্ট্রেলীয় রূপকথা ‘থ্রি সিষ্টারস’ এর ছায়া অবলম্বনে।)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০১৪ ভোর ৬:৪৬
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোহভঙ্গ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:৪৮



পদ্মা সেতু নিয়ে কত অপবাদই না দেয়া হয়েছিলো! বলা হয়েছিলো- বাংলাদেশ কখনো নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় প্রকল্প করতে পারবে না। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ায়। অথচ শেষ পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×