গত মাসের ২৫ তারিখ সকাল ৬ টায় বাসা (জিগাতলা) থেকে বেরিয়ে আজিমপুর হয়ে ধানমন্ডি লেক ঘুরে ৮:৩০ আবার ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলো।
আড়াই ঘন্টার কিছু স্মৃতি নিয়ে আত্মকথন শিরোনাম দিয়ে লিখে ফেললাম
১) Click This Link
২) Click This Link
৩) Click This Link
এর মাঝে লেকের অনেক জল গড়িয়েছে, সূর্যটা গাছগাছালির ওপাশ থেকে উঁকি দিয়ে আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠেছে, বেলা গড়িয়ে সাঁঝ হয়ে রাত্রি নেমেছে, আবার সকাল হয়েছে - দিন-রাত্রির পরিক্রমায় বন্দী আমি তাকাই নিজের দিকে- দেখি, বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মত স্মৃতিরা আমায় প্লাবিত করে দিচ্ছে। তাই মনের আলাদা একটা ফ্রেমে কিছু ছবি, কথা গুছিয়ে রাখি সুন্দর করে বলার জন্য- সময় থাকলে চলুন দেখি, শুনি।
সেদিন সকালের রেশটা সারাদিন অনুভব করলাম, কাজে-কর্মে বেশ জোর পাচ্ছি, শরীরটাও বেশ ঝরঝরা লাগছে। মনে মনে একটা প্ল্যান করি। তবে বাসায় গিন্নীকে জানাই না। কারণ এর আগে আমার অনেক দৃঢ় পরিকল্পনা কিছুদিন সদর্পে চালানোর পরে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
এবং সেসবের উদাহরণ টেনে গিন্নী হালকা রসিকতা করেন সুযোগ পেলেই। সুতরাং এবার গোপন মিশনে পরদিন সকালে ফজরের নামাজে যাওয়ার আগে কেডস পরে সন্তর্পনে বের হলাম, গিন্নী গভীর ঘুমে।
জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের যাত্রী ছাউনর পাশের গেট দিয়ে লেকে প্রবেশ করি। সকালের না-ফোটা আলোয় আরো দু'এক জনকে দেখতে পেলাম, হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে এগিয়ে যাই, তার পর বহু বছর পর দৌঁড়তে শুরু করলাম। খেলার মাঠের অদম্য দমের সেই ছেলেটা, ভুলে গেল আজ বয়সটা। ভাবি, রোজা রেখেও বাসার পিছনের মাঠে ঘন্টার পর ঘন্টা ফুটবল খেলেছি। বাবা রাগ করতেন, রোজা রেখে কেউ বল খেলে? ফুটবল পাগল আমার হুশ থাকত না, সাইরেনের একটু আগে তাড়াহুড়ো করে বাসায় ফেরা, বাবার মৃদু বকুনি। পাঁচ মিনিট দৌঁড়ে হাঁপাতে লাগলাম, গতি কমিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম - হায় বয়স। লেকের দু'পাড়ের মাঝের সংযোগ ব্রিজটা পেরিয়ে মৃদু বাতাস বুক ভরে টেনে জলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাঁটি, কি যে ভাল লাগে!
রবীন্দ্র সরোবরে কাছাকাছি এসে মিলিত স্বরের হা..হা...হা... শুনতে পাই, দেখি কিছু লোক হালকা ব্যায়াম করছে। বিশেষ কিছু না ভেবেই তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে আমিও শুরু করে দেই-অনেক ভেবে চিন্তে পরিকল্পনা করে আমার কিছু করা হয়ে ওঠে না। যখন যেটা ভাল লাগে, হুট করে শুরু করে দেই।পরে জেনেছি উনারা পরমায়ু সংঘের সদস্য।
ছবি দেখুনঃ
১।

উনারা ৫:৪৫ এ শুরু করেন, ৩০ মিনিটা চলে। ছবিতে দেখছেন ৩ জন, এটা ছিল শুরু তারপর আরো লোকজন আসে। ব্যায়ামের শেষে সবাই একটু বিশ্রাম নেয়, আমিও সামিল হই। গাবতলা মসজিদের আরোক নিয়মিত মুসল্লিকে পেয়ে যাই, নতুন করে পরিচয় হয় বাচ্চু ভাইয়ের সাথে। উনি অন্যদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেন। এই ব্যায়াম পরিচালনা করেন একজন লিডার, কবির ভাই। উনি বললেন, যাক জিগাতলার লোক কমে যাচ্ছিল, বাচ্চু ভাই, আপনাদের একজন সদস্য বাড়ল। এর মধ্যে দেখি লিডার নতুন ঘোষণা দিলেন, "পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পাশেই বটতলায় অনুষ্ঠান হবে, যারা অংশ গ্রহণ করতে চান, জন প্রতি ... করে দিতে পারেন।"
সদ্স্য হিসাবে পাকাপোক্ত হবার এমন একটা মোক্ষম সুযোগ আমি হাত ছাড়া করতে চাইলাম না, মানিব্যাগ হাতিয়ে দেখি আছে।
আমাদের ব্যায়ামের সময় ১,২,৩,৪ করে একজন আওয়াজ দেয়, অন্যরা তাকে অনুসরণ করে। এর মধ্যে কিছু রসিক লোকের কথা-বার্তাও চলতে থাকে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, এত কিছুর মধ্যেও দেখি পাশেই অঘোরে ঘুমাচ্ছে পথশিশুরা। কেউ একজন ওদের এই সুখনিদ্রা দেখে আফসোসের সাথে বলল, "ওষুধ খেয়েও ঘুম আসে না, আর এরা ....."।
দেখুন, লেকের তরল জলের পাশে সোনাঝরা রোদের আলোয় সুখনিদ্রায়রত পথশিশুরাঃ
২।

সাঙ্গ হলো খেলা (ব্যায়াম), এবার বিদায়ের পালা। ধানমন্ডির সদস্যরা ৮ নম্বরে ব্রিজের দিকে পথ ধরল, ৭ সদস্যের জিগাতলার সদস্যদের সাথে লিডার যোগ দিল, আমরা ৮ জন চললাম জিগাতলার নতুন হোটেল ইউনাইটেডের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য সকালের নাস্তার উদ্দেশ্যে্। হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে গল্পে গল্পে পরিচয় হলো করিম ভাইয়ের সাথে, আরো ৪ জনের সাথে ( নাম গুলো স্মরণে আসছে না)। উনাদের খাওয়া-দাওয়ার বহর দেখে আমি মনে মনে আনন্দিত ও একই সাথে শংকিত হয়ে পড়লাম। আনন্দ এই জন্য, আহারে এখনো আমার খুবই রুচি আর শংকা এই ভেবে, ব্যায়ামের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যটুকু বিলীন না হয়ে যায় !!!
দেখুন, কতবড় বেকুব (অকৃতজ্ঞ) আমি। আধঘন্টার নতুন সংগীদের পেয়ে বেমালুম ভুলে গেলাম সারাজীবনের সংগীর কথা !!!
হোটেলের দিকে আসার পথে মোবাইলটা বেজে ওঠে ছিল,দেখি গিন্নীর ফোনঃ
-হ্যালো ।
-কোথায় তুমি?
-এই তো লেকে।
-এতক্ষণ হয়ে গেল, কোন খবর নেই।
তাঁর গলার উৎকন্ঠাটা ভাল লাগে।
আমি নিস্পৃহ গলায় উত্তর করিঃ
-তাই বুঝি।
ওপাশ থেকে তাড়া দেয়ঃ
-তাড়াতাড়ি এসো।
-ঠিক আছে, বলে কথা শেষ করি।
ওর উৎকন্ঠাটা আমি বুঝি, তাও না বোঝার ভান করি। আজকাল বাড়ি থেকে বেরুলে বাসার লোকজনদের উৎকন্ঠিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ পত্রপত্রিকা ও টিভি খুললেই সবাই টের পাই। চোখে ভেসে ওঠে রবীন্দ্র সরোবরে শুয়ে থাকা স্নেহ বঞ্চিত ছেলেগুলো - ওরাই কি অথবা যাদের আমরা দেখতে পাইনা অথচ বেড়ে উঠছে সুরম্য আবাসে স্নেহ-ভালবাসাহীন পরিবেশে, একদিন বড় হয়ে নিষ্ঠুর "ছিনতাই" পেশাটাকে আয়ের উৎস করে নেবে?
কলিং বেল বাজার সাথে সাথে দরজা খুলে যায়-উৎকন্ঠা সর্বত্র।
চেয়ারে বসে কেডসটা খুলছি, ওর বিস্ময়।
আমার কেডস পরার গূঢ় রহস্য বেমালুম চেপে গেলাম।
ও নাস্তার আয়োজন করে, খাব না বলতে গিয়েও একটা ব্রেক দেই-পরমায়ুর ব্যাপারটা আপাততঃ চেপে যাই।
আমরা ৩ জন গল্পে গল্পে নাস্তা শেষ করি। যদিও ভরা পেটে আবারও খেতে একটু কষ্ট হচ্ছিল।
আগামী কয়েকদিন আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, সকালের ব্যায়ামটা চালিয়ে নিতে পারব কি?
সদস্যপদটা বহাল রাখতে পারব তো?
নোটঃ লেখার শেষে ইচ্ছে করেই "চলবে...." কথাটা যোগ করি না, যদি এ বিষয়ে আর লেখতে ইচ্ছে না করে, তখন কথা না রাখার অপরাধ বোধটা কাজ করবে।
ঢাকা
৩০ এপ্রিল ২০১৬
সর্বসত্ব সংরক্ষিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



