রোদ্রকরোজ্জল ফালগুনের সকালে ছোট্ট এক ফুলের বাগানে একঝাক প্রৌঢ় ছবি তুলছে । সবার-ই চুলে, দাঁড়িতে পাক ধরেছে, সাদা রংয়ের আধিক্য । কিন্তু মনটা এখনো সবুজ, এই ফুলে শোভিত বাগানের মতই । বেলা তখন ১০ টা । শুক্রবার ছুটির দিনে এই সময় এদের অনেকেই বিছানা ছেড়ে ওঠে না । অথচ আজ সকাল ৮ টায় ঢাকা ক্লাবের গেস্ট হাউসে সবাই সমবেত । ৮০-৮২ সালে নটরডেম কলেজে পড়ার সময় তো এটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল । সেই দিনগুলোর স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য এক সকালের ঘুমকে বিসর্জন দিয়ে ২৮ জন একত্র হয়েছিল ।
.
শুনতে যতটা সোজা মনে হচ্ছে, বহুকাল বিচ্ছিন্ন এতগুলো লোককে একত্র করা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয় । এই কৃতিত্বের সিংহভাগ বুলুর – ওর বিশাল নামটা ছোট হয়ে এই প্রিয় নামেই বন্ধুরা ডাকে । মেসেঞ্জারে বুলু ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে নাস্তার দাওয়াত দিল । অনেকেই সাড়া দিচ্ছে । দিল্লির সুলতানের মত আমাদের একজন সুলতান আছেন । উনি সুলতানদের মতোই খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে খুব সিরিয়াস; প্রায়ই বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের ছবিসহ ফেসবুকে পোস্ট দেন । মহামান্য সুলতান খাবারে মেনু জানতে চাইলেন । মেনুর আইটেম দেখে আমি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলাম, জিভে জল এসে গেছে । সুতরাং ১০০০ টাকা নাস্তাবাবদ খরচ ধার্য হলেও পেট পূজার এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না ।
.
সকাল ৮:২৬ এ ঢাকা ক্লাবের গেটে । উনাকে(স্ত্রী) একটা ফোন দিলাম । নতুবা উনি চিন্তিত থাকেন । কারণ মুঠোফোনের সাথে আমার সখ্যতা মোটেই সুখের নয় । ওরা প্রায়ই আমাকে ছেড়ে ছিনতাইকারীর হাতে চলে যায় । নিরাপত্তারক্ষী আমার কাছে জানতে চায় কোথায় যাব? বললাম, গেস্ট হাউস । উনি পথ দেখিয়ে দিলেন । উনার নির্দেশিত পথে পৌঁছে গেলাম আমাদের মিলন মেলায় – গেস্ট হাউসে । দেখি প্রবেশমুখে জাওয়াদ সুখটান দিচ্ছে সিগারেটে, সাথে শশ্রুমন্ডিত, সাজ্জাদ (লাইক থেকে নামটা পেলাম।) । (যাহ, নামটা মনে আসছে না। অনেকের নামই মনে নেই; তবে চেহারা দেখলেই চিনতে পারি কলেজের বন্ধুকে।) আড্ডায় গেলে আমি বন্ধুদের থেকে সিগারেট চেয়ে খাই; এমনিতে খাওয়া হয় না । সিগারেট খেতে খেতে আলাপ চলছে । এর মধ্যে শাফিনের গাড়ি এসে থামল, খালেদ সহ জনা চারেক বন্ধু নামলো । সবাই মিলে ভিতরে ঢুকলাম । ততক্ষণে খাওয়ার টেবিলের চারিদিকে জড়ো হয়ে গেছে প্রায় বিশ জন । এতো সকালে উত্তরা থেকেও বন্ধুরা এসেছে । তাই দেখে সোহেল রসিকতা করে বলল, উত্তরাবাসীরা এতো সকালে কেমন করে আসলো? তারা কি বিশেষ কোন পেশার লোক কি-না? ( মানে চুরি বিদ্যার সাথে জড়িত কি-না।) এমন ছোটখাট আরো অনেক রসিকতায় সকালটা গড়িয়ে যেতে থাকলে । তার দু’চারটা বলাই যায়।
.
আমার পাশে বসেছিল, নামটা মনে আসছে না, জাহিদকে মোবাইল ডাইলের ফ্যাক্টরি সম্বন্ধে জানতে চাইলো । জাহিদ ওর স্বভাবসুলভ মজার ভাষায় বলে চলেছে; আমরা সবাই হাসছি । আমি নিশ্চিত, এই ঘটনাটা আমি বললে সবাই এভাবে হাসতো না । বলাটা একটা আর্ট, সবাই পারে না । হাসির রেশ না কাটতেই জাহিদ ওর স্টক থেকে দ্বিতীয়টা বের করলো । একজন চাকরিপ্রার্থী যুবককে ইন্টারভিউ বোর্ডের এক সদস্য জিজ্ঞেস করলো,
- ‘আপনি কোথায় থাকেন?’
প্রার্থী বললো, ‘বাহ্মণবাড়িয়া’।
প্রশ্নকর্তা হাসি হাসি মুখে বললে, বানান করুন তো ‘বাহ্মণবাড়িয়া’?
প্রার্থী তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, ‘না, না, আমি ঢাকায় থাকি ।‘
আবারও হাসি ।
আরো হাসি, আরো মজার কিছু কথা ছিল । তবে সে গুলো শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ছাপার অক্ষরে লিখলাম না । কিন্তু আমি নিশ্চিত, সবাই সেসব স্মরণ করে অবসরেও একচোট হেসে নেবে; আর স্মরণ করবে সুলতানের সুলতান ক__ম কাহিনি, জসিমের বিজ্ঞাপন চমক, গাজীর রাজা কাহিনি এবং জাহিদের করোনা নিয়ে কৌতুক।
.
সকালে নাস্তার প্রতিটি উপাদানই খুব মজার ছিল । নাস্তার সাথে সাথে চলছে আলাপ। করোনা থেকে ব্যাংক, কিছুই বাদ যাচ্ছে না । চা খেয়ে নাস্তা পর্বের ইতি টেনে বাইরে এলাম । মাহবুবের কাছ থেকে ধারকরা সিগারেট নিয়ে সুখটান দিচ্ছি।
.
জুম্মার দিন । তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আর খালেদ বেরিয়ে আসলাম । চলমান জীবনের ভিড়ে হারিয়ে গেলাম শাহবাগে । পিছনে পড়ে রইলো একটা মিষ্টি সকালের কিছু অমূল্য স্মৃতি ।
.
মো. শামছুল ইসলাম
০১ মার্চ ২০২০

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০২০ দুপুর ১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



