এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে আবির। জমে থাকা কালো মেঘ বৃষ্টি হয়ে মুছে দিচ্ছে তার চোখ। ব্যস্ত হয়ে সবাই ছুটছে গন্তব্যে। আবিরের চোখ জুড়ে শ্রাবণের উষ্ণ জল কেউ দেখতে পাচ্ছে না। চশমার ভেজা কাঁচের আড়ালে কাকে যেন খুঁজছে সে। মায়ের মুখটা যেন হঠাৎ দেখতে পেল আবির। কি কোমল ভালাবাসা মাখা একটি মুখ। হাত বাড়িয়ে অদৃশ্যেই ছোঁয়ার চেষ্টা করল সে। আবিরের মনে পড়ল শেষ বার মায়ের মুখটা দেখেছিল বছর চারেক আগে। সাদা কাপড়ে জড়ানো শ্বেতশুভ্র একটি মুখ। সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল। আবিরের বাবা হাসান সাহেব কঠিন মানুষ। কখনও বাবাকে কাঁদতে দেখেনি আবির। বৃষ্টির মধ্যেও সেদিন আবির স্পষ্ট দেখেছিল তার বাবার চোখে জল। ছোট্ট জীবনে প্রথমবারের মত সে বুঝতে শিখেছিল কান্না কি। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত আবির জেগে ছিল। দেয়ালের ওপাশে হাসান সাহেবও জেগে ছিলেন। দুজনের চোখেই বৃষ্টি।
আবিরের বাবা হাসান সাহেব সরকারী কর্মচারী। মাসের শেষে যে মাইনে পান তাতে সংসারের প্রয়োজনীয় খরচের পর আবিরের হাত খরচের টাকা জোগাড় হয়না। বাবাকে না জানিয়েই দুটো টিউশানি করে আবির। ওতে যা আসে তাতে আবিরের বেশ ভালই চলে যায়। আলমারির ভেতর রাখা মাটির ব্যাংকটায় সে একটু একটু করে টাকা জমায়। মা কিনে দিয়েছিলেন কারুকাজ করা মাটির ব্যাংকটা। বলেছিলেন কয়েন জমাতে। যেদিন কয়েনে পূর্ণ হয়ে যাবে সেদিন বেড়াতে যাবেন সবাই মিলে। সেদিন আর আসেনা। আবির জানে কখনও আর আসবেও না।
এস.এস.সি তে জি.পি.এ ৫ পাওয়ার পর মাটির ব্যাংকটার নিচে সামান্য একটু ফুটো করে অল্প কিছু টাকা বের করে বাবার জন্য এক কেজি চমচম কিনেছিল আবির। রেজাল্ট জানার পর হাসান সাহেব কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন ছেলের দিকে। কোন ফাঁকে আবির এত বড় হয়ে গেছে খেয়ালই করেননি তিনি। বাবার ক্লান্ত কালি পড়া বৃদ্ধ চোখে অনেক দিন পর সেদিন আবির খুশির অশ্রু দেখেছিল। অনেকক্ষণ সেদিন স্ত্রীর একমাত্র ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসান সাহেব। পেছন থেকে আবির দেখছিল তার বাবার শরীরটা কেমন থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। কাঁদছিলেন হাসান সাহেব।
আজকে সকালে নাস্তা না করেই বেড়িয়ে পড়েছিল আবির। কাঁধের ব্যাগে প্রয়োজনীয় কাগজগুলো ঠিক আছে কিনা বাস এ দাঁড়িয়েই বেশ কয়েকবার দেখে নিয়েছে সে। আজকে সিটি কলেজে ভর্তির জন্য বাছাইকৃতদের নাম প্রকাশ করা হবে। যেহেতু পরীক্ষা নেই তাই এস.এস.সি রেজাল্টের ভিত্তিতেই ভর্তি নেয়া হবে। সকাল সকাল পৌঁছেও বিশাল লাইনের পেছনে দাঁড়াতে হল আবিরকে। লাইনে বিশাল হুলুস্থুল কাণ্ড। কেউ কেউ আবার বন্ধুদের জায়গা করে দিচ্ছে। অগত্যা আরও পিছিয়ে যেতে হল আবিরকে। এসব আমলে না নিয়ে আশেপাশে দেখতে লাগল আবির। সবার চোখে স্বপ্ন। এর মধ্যে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে একচোট হাতাহাতি হয়ে গেল একদম সামনে দাঁড়ানো কয়েকটা ছেলের মধ্যে। বোধ হয় কোন স্যার হবেন, ধমকে লাইন ঠিক করতে এগিয়ে এলেন। এক ধাক্কায় হুড়মুড় করে পিছিয়ে গেল সবাই। ধাক্কার স্রোতটা ভেসে আসতে আসতে প্রবল রূপ নিল। সরতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে গেল আবির। উঠে দাঁড়িয়ে রক্তাক্ত কনুইটা এক নজর দেখল সে। পকেট থেকে রুমাল বের করে জড়িয়ে নিল। বুক পকেটে রাখা ১০০ টাকার নোটটা জায়গামত আছে কিনা চেক করে নিল সে। হাসান সাহেব সকালে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন কলেজে ভর্তি হবার পর টাকাটা কোন গরীবকে দান করে দিতে। হঠাৎ কেমন একটা হুড়োহুড়ি লেগে গেল। দ্বিতীয় আরেকটা লাইন হচ্ছে। সামনে দাঁড়ানো সেই স্যার চেঁচিয়ে বলছেন,‘যারা গোল্ডেন ‘এ’ প্লাস তারা নতুন লাইনে দাঁড়াও’। আবির জানে, তবুও ব্যাগ খুলে মার্কশিটটা দেখল। সেখানে বাংলা, ইংরেজি আর সমাজের পাশে ‘এ’ লেখা। মার্কশিটটা আবার যত্ন করে ব্যাগে রেখে দিল সে। কোন দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দিতে চাইলনা। গোল্ডেন ‘এ’ প্লাস সব ভর্তি হয়ে যাবার পর এবার ডাক পড়ল আট এবং সাত সাবজেক্টে ‘এ’ প্লাস পাওয়া ছাত্রদের। দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আবিরের লাইনটা ছোট হয়ে এসেছে। সবার চোখে হালকা ভয়। ঘোষণা এল এবার ছয় সাবজেক্টে ‘এ’ প্লাস পাওয়া ছাত্রদের ভর্তি করা হবে। সবাই যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। যার যার ব্যাগ থেকে কাগজপত্র বের করে গুছাতে লাগলো সবাই। মাইকে আবার ভেসে এল সেই স্যারের কণ্ঠ। বললেন,‘আর ৩৬ টা সিট খালি আছে তাই যাদের ৬ সাবজেক্টে ‘এ’ প্লাস তাদের মধ্য থেকে বয়সের ভিত্তিতে যাদের বয়স বেশি সেই ৩৬ জনকে নেয়া হবে’। এবার স্বপ্নভঙ্গের পালা। সার্টিফিকেটে দেয়া জন্ম তারিখটা দেখল আবির। এটা তার আসল জন্ম তারিখ নয়। বয়স কমানো যেন একটা রীতির মত, শেষ বয়সে দু-এক মাস চাকরি বেশি করতে পারব এই লক্ষ্যে। নিরাশ হল না আবির। শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো সে। একের পর এক মাস ডেকে যেতে লাগলেন সেই স্যার। আগস্ট পর্যন্ত ডাকতে শুনল আবির। আর এক মাস। অক্টোবর ডাকলেই আবিরের পালা। চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো আবির। দেখতে দেখতে এল সে মাহেন্দ্রক্ষণ। সেপ্টেম্বর শেষ এবার অক্টোবরের পালা। মাইকে স্যার বলে চললেন,‘দুঃখিত...আমাদের ভর্তি প্রক্রিয়া এখানেই সমাপ্ত...আর সিট খালি নেই’। দীর্ঘশ্বাসগুলো আর্তনাদে রূপ নিল। স্বপ্নের বদলে চোখগুলতে জায়গা করে নিল এক আকাশ নিরাশা। সইতে না পেরে সামনে একজন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তাকিয়ে আছে আবির, শূন্য দৃষ্টিতে, এক ঝাঁক অবিশ্বাস নিয়ে। দারোয়ানের তাড়ায় হুঁশ হল আবিরের। টলতে টলতে বেরিয়ে গেল সে। বাহিরে বৃষ্টি। কিন্তু আবিরের যেন এসবে একদমই খেয়াল নেই। ভিজতে ভিজতে এগিয়ে চলল সে, বড় রাস্তার মোড়ের দিকে। এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে আবির। তার ভেজা সাদা শার্টের পকেটে ১০০ টাকার নোটটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হাজারটা কষ্ট মনের গোপনে নীল রঙের ডালপালা মেলে দানা বেঁধে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে। কাঁপছে আবিরের শরীর। স্বপ্নভঙ্গ অশ্রুজল বৃষ্টির সাথে হয়েছে একাত্ম। কাঁদছে আবির...হ্যাঁ...কাঁদতে শিখে গেছে সে...
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০১৫ রাত ১২:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



