বিশ্ববিদ্যালয় কনসেপ্ট নিয়ে নানা জ্ঞানগর্ভ বর্ক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু সেইসব কনসেপ্ট তো থাকে কাগজে-কলমে। বাস্তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কনসেপ্ট হলো এটা এখন আমজনতার নয়, শক্তিমানদের প্রতিষ্ঠান। আপনারা জানেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ড. তাহের হত্যামামলার অন্যতম আসামী সালেহী আগামী 28 আগস্ট থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিতে বসছেন। তা যখন তিনি ছাত্র, তখন তো এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন জানা যায়, তার সারা বছর ক্লাশে মাত্র 16 শতাংশ হাজিরা ছিলো তখন কি আর তা স্বাভাবিক থাকে? বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী তার পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ নেই। এভাবে ক্লাশে হাজিরার অভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই কতো যে ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন না তার ইয়ত্তা নেই। এইতো সেদিন বাংলা বিভাগের 6 জন শিক্ষার্থী হাজিরার অভাবে পরীক্ষা দিতে পারলেন না। তাদের ক্ষেত্রে কোনো ক্ষমা নেই। কিন্তু খুনের আসামী হয়েও সালেহী দিব্যি পরীক্ষা দিতে বসছেন, কারো কিছু করার নেই। কারণ? ওই যে শক্তিমানদের প্রতিষ্ঠান।
বিষয়টি পরিষ্কার করতে এখানে আমি সমকালে এ নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি : 'রাবি ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ জানান, বিভাগ থেকে সালেহীর মাস্টার্স পরীার কোনো অনুমতি দেয়া হয়নি। কেবলমাত্র উপাচার্যের চাপে ফরমটি গ্রহণ করে পরীা নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়। পরে পরীা নিয়ন্ত্রক সালেহীর কাশে হাজিরার হার জানতে চাইলে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির 557 তম বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়। ওই বৈঠকের 3 (খ) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সালেহীর হাজিরার হার 16 শতাংশ বলে পরীা নিয়ন্ত্রককে জানানো হয়। ওই বৈঠকের 3 (ক) সিদ্ধান্তে বলা হয়, বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির নিজস্ব বিবেচনায় নয়, বরং উপাচার্যের নির্দেশে ওই ছাত্রের ফরম গ্রহণ করা হয়। সেখানেও অনুমতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি বলে সভাপতি জানান।
পরীা নিয়ন্ত্রক দফতরের একটি সূত্র জানায়, বিভাগের প থেকে অনুমতি না দেয়ায় এবং 16 শতাংশ হাজিরা থাকায় পরীা নিয়ন্ত্রক বিধি অনুযায়ী ওই ফরমটি পাঠান উপাচার্যের কাছে। কিন্তু উপাচার্য তার বিশেষ মতাবলে সালেহীকে পরীা দেয়ার অনুমতি না দিয়ে জানিয়ে দেন, যেহেতু বিভাগ থেকে ফরম ছেড়ে দিয়েছে; তার মানে বিভাগই পরীার অনুমতি দিয়ে ফেলেছে। এেেত্র তার বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন নেই বলে উল্লেখ করে ওই ফরম আবারো পরীা নিয়ন্ত্রক দফতরে ফেরত পাঠানো হয়। সেখানে সহকারী পরীা নিয়ন্ত্রক আলাদা নোটে 'উপাচার্য অবহিত হয়েছেন' লিখে পরীা নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠান। পরীা নিয়ন্ত্রক নোট দেখে 'যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক' লিখে আবারো তা সহকারী পরীা নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠান। এ অবস্থাতেই পরীা নিয়ন্ত্রক দফতর থেকে সালেহীর পরীা প্রবেশপত্র ইসু্য করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর আলতাফ হোসেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বুধবার বিকেলে জানান, তিনি সালেহীর পরীার ব্যাপারে কোনো বিশেষ অনুমতি দেননি। তার প্রবেশপত্র ইসু্য করার বিষয়টিও তিনি জানেন না।
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যালেন্ডার ভলিউম-1 (পৃষ্ঠা নং 135)-এ উল্লেখ আছে, জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদ থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জনের েেত্র পরীার্থীকে পরীায় অংশ নেয়ার জন্য অবশ্যই কাশে 75 শতাংশ উপস্থিত থাকতে হবে। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগের একাডেমিক কমিটির বিশেষ বিবেচনায় অতিরিক্ত ফিস প্রদান করে 60 শতাংশ উপস্থিত থেকে পরীায় অংশ নেয়া যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবদুস সালাম জানান, অধ্যাদেশ অনুযায়ী 60 শতাংশের কম উপস্থিতির েেত্র সেই শিার্থীকে অনুমতি দেয়ার এখতিয়ার আর সংশ্লিষ্ট বিভাগের থাকে না। তখন ওই শিার্থীকে আলাদা করে সে কী কারণে কাশে হাজির ছিলো না- এই ব্যাখ্যা দিয়ে উপাচার্য বরাবর আবেদন করতে হয়। সেই আবেদন বিভাগের মাধ্যমে উপাচার্যের কাছে এলে তিনি যদি সঙ্গত মনে করেন তাহলে তাকে বিশেষ মতাবলে কিংবা বিশেষ বিবেচনায় অনুমতি দেয়া হলো বলে লিখতে হবে। তাহলেই কেবলমাত্র সেই ছাত্র পরীা দেয়ার অনুমতি পাবে। কিন্তু সালেহীর পরীার প্রবেশপত্র ইসু্য করার েেত্র বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের এইসব নিয়মের কোনোটিই মানা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর আলতাফ হোসেন অবশ্য বুধবার দাবি করেন, বিভাগীয় সভাপতি সালেহীর ফরমে স্বার করে দেয়ার কারণে নিয়মানুযায়ীই তার প্রবেশপত্র ইসু্য করা সম্ভব। এেেত্র অধ্যাদেশ লঙ্ঘনের কোনো প্রশ্ন ওঠে না বলে তিনি দাবি করেন।'
বুঝুন অবস্থাটা। উপাচার্যই বা কী করতে পারেন? তিনি তো হাতের পুতুল। ওইসব রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতারা খেপে গেলে তো তার গদিটাই থাকবে না। আর যারা গদি নিয়ে চিন্তা করেন না, তাদের শঙ্কিত হয়ে থাকতে হয়, বাধা দিলে যদি পরিণতি ড. তাহেরের মতোই হয়! তাই সালেহীর মতো শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেবে। হয়তো ফার্স্টক্লাশও বাগিয়ে নেবে। তারপর রাজনৈতিক বিবেচনাতে আবার এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক হবে। এভাবেই চলছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চরম সর্বনাশ করে বড়লোকদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চাঙা করে তোলার এই অপকৌশল কবে যে আমাদের দেশের মানুষেরা (যাদের ট্যাক্সের টাকায় চলে বিশ্ববিদ্যালয়) ধরতে পারবে। সেদিনের অপেক্ষায়ই তো আছি। জানি না, কতোদিন আরো অপেক্ষা করে থাকতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০০৬ রাত ২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



