যে বক্তব্য নিয়ে এতোকিছু তার সেই কথাগুলো কী ছিলো? হাসান আজিজুল হক বলেন, '21 আগস্ট শিা আন্দোলন মঞ্চের যে সেমিনারটি ছিলো তার বিষয় ছিলো সেকু্যলারিজম, রাষ্ট্র ও শিা। সেটা ধম নিয়ে কোনো আলোচনা জায়গা ছিলো না, ধর্মসভা তো সেটি ছিলোই না। আমি ছিলাম সভাপতি। চেয়েছিলাম, মুক্ত আলোচনা হবে, সবাই যেখানে অংশ নিতে পারবে। নির্ধারিত আলোচকদের আলোচনার পর আমরা প্রায় 50 থেকে 60 টি প্রশ্ন পেয়েছিলাম। সভাপতি হিসেবে আমি নিজে দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নগুলো সবাইকে পড়ে শুনিয়েছি এবং উত্তর দিয়েছি। সেখানে আলোচনায় যা উঠে এসেছিলো, তা হলো, আমরা যদি মুক্তভাবে খোলাচোখে দেশের শিার সব পরিকল্পনাগুলো দেখি, তাহলে মনে হবে শিাটা সবার জন্য নয়। শিাটা যেনো একটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। গোটা বাংলাদেশ কি তবে ট্রেডিং সেন্টার হয়ে গেলো? এই দেশটা কি তবে ট্রেডিং কোম্পানি? আর বাকি সমসত্দ বন্দোবসত্দ কি সেই ব্যবসা চালানোর জন্যই? এখানেই তখন সেকু্যলারিজমের কথাটা এসেছিলো। আমরা কাউকে আঘাত করে বা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলিনি। আমরা যা দেখেছি তা বলেছি। আমরা যা বলেছি তা দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্যই। আমরা আরো বলেছি, বাংলাদেশের সংবিধানে কী আছে? এটি তো গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। একে তো আমরা স্বেচ্ছাচারতন্ত্র বলছি না। আমরা এটাকে কোনো মোল্লাতন্ত্র বা পুরোহিততন্ত্রও বলছি না। এদেশের সংবিধানেই তো আছে এখানে বসবাসকারী সমসত্দ নাগরিক সমান অধিকার পাবে। তাহলে শিাব্যবস্থায়ও তার প্রতিফলন থাকতে হবে।'
ইসলাম ধর্মকে কটূক্তি করেছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে সে ব্যাপারে তিনি বলেন, 'আমি বিষয়টি সেদিন সেমিনারেও দেখেছি। ধর্ম উল্লেখ করলেই ইসলামকে বোঝানো হচ্ছে। যেনো পৃথিবীতে আর কোনো ধর্ম নেই। ধর্ম বলতে আমি তো অন্য সব ধর্মকেও বুঝিয়েছি। আর সেইসব ধর্ম নিয়ে তো আমি কোনো কটূক্তিও করিনি। আমাদের এই দেশে তো বহু ধর্মের মানুষের অবস্থান। আমি বলতে চেয়েছি, আমরা যদি রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপে না করি তাহলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়ায়? খুব সাধারণ কথায় বলি, আজকে দেশে একটি ধর্ম বা সবগুলো ধর্মের ওপর ভিত্তি করেই যদি আলাদা আলাদা আইন হয় আর তা যদি প্রয়োগ করা হয় তাহলে দেশটা কি খণ্ড খণ্ড হয়ে যাচ্ছে না? এ কারণেই আমি বলেছিলাম, সমগ্র জনসাধারণের কল্যাণের কথা বললে রাষ্ট্রকে অবশ্যই জাতি-বর্ণ-ধর্মের উধের্্ব উঠতে হবে। উধের্্ব ওঠা মানে এঘুলোকে ত্যাগ করতে হবে তা তো নয়। এখানে ধর্ম, ধর্মবোধ, ধর্মচেতনা নিয়ে তো আমি কোনো কথা বলিনি। ধর্মকে অবলম্বন করে যেখানে একে মতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে সেখানে কী হয়েছে? সেদিন সেমিনারে যদিও আমি এ কথা বলিনি, আজ প্রশ্নের প্রেেিত বলছি। জেএমবি বলছে আমরা রাষ্ট্রের আইন মানি না। আমরা খোদার আইন বাসত্দবায়ণ করতে চাই। কিন্তু সেই আইনটা যে কী সে বিষয়ে কিন্তু তাদের নিজেদেরই স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। তাহলে আমাদের শিাব্যবস্থাচটাকে যদি এই পথে যেতে দিই তাহলে তো তা আমাদের কোথাও নিয়ে যাবে না শেষ পর্যনত্দ। এই কথাটাকে স্পষ্ট করার জন্য আমরা বলেছিলাম, সেকু্যলার শিা ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ শিাব্যবস্থাটা এমন হতে হবে যে এই মুহূর্তে এই সময়ের উপযোগী মানুষটি যাতে আমরা তৈরি করতে পারি।
মাদ্রাসা শিার বিষয়ে কী বলেছেন সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'কওমী শিাব্যবস্থাকে যে সমমানের বলে দেয়া হলো, তা কীসের ভিত্তিতে? একটি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা পড়ানো হয়, তার সঙ্গে কি সেখানকার পড়ালেখা সসমানের হচ্ছে? আমরা বলেছি, এভাবে সমমানের বলে দেয়াটা আমাদের দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। এইসব কথা তো কারো মনে আঘাত দেয়ার মতো নয়।'
ধর্মতন্ত্রের প্রয়োগ আমাদের দেশেই শুধু হচ্ছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ্তুজেএমবি আমাদের দেশে যা করেছে তা কিন্তু অন্য দেশেও হচ্ছে। ভারতে হিন্দু পরিষদ গুজরাটে কিংবা বাবরি মসজিদ নিয়ে যা করলো আর আমাদের দেশে জেএমবি যা করেছে- এই দু্থটোকে তো আমরা একই চোখে দেখি। রাষ্ট্র ও মানুষের কল্যাণের দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে আমরা দেখতে পাবো, একই জিনিসের দুই রকম চেহারা। ধর্ম যখন ধর্মতন্ত্রের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে তখনই আমরা বিষয়গুলোকে এভাবে চিহ্নিত করছি।'
রাষ্ট্র থেকে ধর্ম বাদ দেয়ার জন্য তিনি বলেছেন বলে যে কথা উঠেছে সে বিষয়ে হাসান আজিজুল হক বলেন, 'নেপালকে হিন্দুরাষ্ট্র বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। সেখানেও তো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু। কিন্তু কী হয়েছে? আজকে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের সেই হিন্দুতন্ত্রের সঙ্গে রাজতন্ত্রের একটি যোগ রয়েছে। এই তো সেখানে রাজতন্ত্র তো প্রায় পুরোপুরি পতনের পথে। আমার মনে হয়, সেই হিন্দুতন্ত্রেরও পতন ঘটতে খুব বেশি সময় লাগবে না। কাজেই ধর্মতন্ত্র মানেই ওই একই অবস্থা দাঁড়ায়। ধর্মের যে বিশুদ্ধ চেতনা তা রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কাজে টেনে আনার ফলে নষ্ট হয়ে যায়। এইসব কথাই আমি সেদিন বলেছিলাম।'
তাহলে তার বিরুদ্ধে এভাবে অপপ্রচার চলছে কেনো? বরেণ্য এই কথাসাহিত্যিক বলেন, 'খুব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এসব করা হচ্ছে। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, যেকোনো সৎ কিছুর মুখোমুখি হতে আমি প্রস্তুত। সেটা যতো কঠিন, আর আমার প েগ্রহণ করা যতো কষ্টকরই হোক। কেউ যদি সেমিনারের রিপোর্ট করে কাগজে আমার বক্তব্য ছাপাতে চান, তাহলে বিষয়গুলো সৎভাবে আসবে এই আশা তো আমি করতেই পারি। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একটা বক্তব্যকে সরাসরি না এনে অন্যভাবে সেটিকে বিকৃত করে নিয়ে আসা হয়েছে। দু্থটো কাগজে ছাপা হয়েছে দু্থটোরই একই অবস্থা। তবে বিকৃত করা হলেও কিন্তু তার মধ্যে একটা ধাঁচ আছে। যে ধাঁচ দেখে মনে হতে পারে, আমি ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে আঘাত করেছি। অত্যনত্দ আপত্তিকর, অসৎ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই আমি এই অপচেষ্টাকে মনে করি। কারণ সেমিনারে যে অজয় রায় আসেননি তার নামটিও বক্তা হিসেবে ছাপা হয়েছে। তার মানে কি ঠিকমতো না জেনেশুনেই একজনকে তোপের মুখে ফেলতে এই কাজগুলো করা হয়েছে। আমার তো মনে হয় এগুলো একটি বড় ষড়যন্ত্রের অংশ।'
কারা, কী উদ্দেশ্যে সেই ষড়যন্ত্র করতে পারে বলে আপনার ধারণা? তিনি বলেন, 'তা আমি একেবারে ঠিক ঠিক বলতে পারবো না। কিন্তু আমার মনে হয়, এটা সামপ্রদায়িক একটা উস্কানি তৈরি এবং সেটার সুযোগে একজন মানুষকে তোপের মুখে ফেলার বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই এই কাজটি করা হয়েছে।'
তার বিরুদ্ধে নেয়া কর্মসূচির ব্যাপারে তিনি বলেন, 'বিষয়টাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে নিইনি কিংবা খুব একটা গায়েও মাখিনি। তবে আমি মনে করি, এই লণ খারাপ। একজন ব্যক্তিকে তোপের মুখে ফেলে দেশ ও জাতির যেকোনো শুভ উদ্যোগকে বাধা দেয়ার এই চেষ্টা আমাদের জন্য ভবিষ্যতে বড় বিপদ ডেকে আনবে।'
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



