প্রতিদিন অফিস থেকে বাড়ি ফেরের পথে বনানী আর বিজয় সরণিতে বিদঘুটে জ্যামে পড়তে হয় ।ট্রাফিক বাতি গুলো লাল সিগন্যাল জ্বালে। আমার ভাবনার রাস্তায় তখন সবুজ সিগন্যাল জ্বেলে সংকেত দেয়। সে রাস্তায় কোনো জ্যাম নেই। ট্রাফিক নেই। গতি রোধকের বালাই নেই।আমি শুধু ড্রাইভিং সিটে স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকি। ভাবনার রাস্তা অজানা গন্তব্যহীন। খুব সহজেই ছেলেবেলায় পৌঁছে যাওয়া যাই। আমার পুকুরপাড় ,আমার ইমরান খান ব্যাট কিংবা পরিচিত রাস্তা ধরে আমার প্রিয় স্কুলটা।
আমি হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে ছিলাম ১৯৯৪ সালে ক্লাস সিক্সে। সাদা শার্ট আর নেভি প্যান্ট , জাম্প কেডস , ব্যাগ ঘাড়ে করে প্রথম স্কুলে গেলাম। এইতো সেদিনের কথা। আমাদের সময় স্কুল ড্রেস বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই স্কুল ড্রেস পড়ে গিয়ে খুব লজ্জা লাগলো।
অতি পরিচিত মানুষ গুলোকে অচেনা লাগতে লাগলো। আব্বা (হেডস্যার), আজিম স্যার (এসিস্ট্যান্ট হেডস্যার ) , বিনোদ স্যার , আব্দুল্লাহ স্যার কিংবা দপ্তরি কেরামত চাচা, হামিদ ভাই সবাই যেন অচেনা। আমার এতকালের পরিচিত শৈশবকে আচমকা পাল্টে দিলো স্কুলটা।
আসলে স্কুলের সাথে পরিচয় আমার অনেক আগে থেকে। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা , ঈদ এ মিলাদুন্নবী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান খুব মনে পড়ে। বিনোদ স্যারের পরিচালনায় সুন্দর সুন্দর নাটক হতো- কাঁকলাস, গাধা।প্রথম কৃষ্ণচূড়া গাছ চিনেছিলাম স্কুলের শহীদমিনারে পাশের গাছটাকে দেখে। এখন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয় কিনা না জানি না। নাটকের রিহার্সাল , সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক , সেসব তো কবেকার কথা। সবকিছুতেই আব্বার সাথে চলে যেতাম। তাই সেই ছোটকাল থেকেই স্কুলটাকে নিজের মনে হতো।
বড় ক্লাসে হেডস্যারের নিয়মিত ক্লাস ছিল। তিনি আসতেন চতুর্থ পিরিয়ডে, টিফিনের আগে। তিনি পড়াতে পড়তে টিফিনের ঘন্টা পরে যেত। আমরা জানলার বাইরে তাকিয়ে অন্য ক্লাসের ছাত্রদের বের হয়ে যেতে দেখতাম। টিফিনের ঘন্টা পড়ে গেলেও কিছুটা সময় বেশি পড়তেন।অনেকেই ছটফট করতো।আমাকে সবাই খোঁচাতো। আমি একদিন বাড়িতে গিয়ে আম্মাকে বললাম , আব্বা (হেডস্যার )আমাদের টিফিনের ঘন্টা পড়ার পরেও ক্লাস নেন। আম্মা হেসে বললো, এসিস্টেন্ট হেড স্যারের কাছে জানাতে।
মনে মনে ভাবলাম , এসিস্টেন্ট হেডস্যার কাছে যাওয়ার চাইতে টিফিন পিরিয়ডে না খেয়ে থাকা ঢের ভালো ! সামনে পড়লে হাঁটু কাঁপে, গলা শুকিয়ে আসে। এসিস্টেন্ট হেডস্যার ব্যাপারে আমার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আছে।
১৯৯৪ সালে সার্ক চারজাতি টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় আসর অনুষ্ঠিত হয়। এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ। আমি গিয়েছিলাম ছুটি নিতে। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সব দলের অধিনায়কের নাম মুখস্ত করে গেলাম। কিন্তু স্যার আমার কাছে জানতে চাইলেন ফিল্ডার পজিশন। খুব কষ্টে পার করেছিলাম সে যাত্রা ।
তারপরেও গেলাম স্যারের কাছে। স্যার শুনে মিটিমিটি হেসে বললেন , “তুমি তো গুরুতর অভিযোগ নিয়ে এসেছো !" অনেক কষ্টে মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো , জ্বি-ই স্যার।
স্যারের রুম থেকে বেরিয়ে একবুক নিঃশ্বাস বুকে নিয়ে সোজা চলে গেলাম ক্লাসের তিন নম্বর বেঞ্চে। এর পরে আর একা একা স্যারের রুম মুখ হয়নি।
মধ্যবিত্ত মেধার ছাত্র হওয়ার দরুন ফাস্ট বেঞ্চে বসতে চাইতাম না।সংশয়ে সংকোচিত হয়ে থাকতাম। থার্ড বেঞ্চে বসে ভাবতাম কখন ছুটি হবে। টিফিন পিরিয়ডে সময় কাটানোর রসদ হিসেবে রাখা থাকতো নন্টে ফন্টে , চাচা চৌধুরী , টিনটিন, রাশিয়ান বই আর তিন গোয়েন্দা ! টিফিন পিরিয়ডে চলে যেতাম মসজিদ গলির পাশে মির্জা ভাইয়ের দোকানে। সেখানে মজাদার প্যাটিস আর লাভলী চানাচুর। কখনো আবার স্বপন হোটেলের জিলাপি আর সিঙ্গারা। বাইরের খাবার খেতাম কম , মাঝে মধ্যে। আসলে স্কুলের গন্ডি থেকে বের হতাম একেবারেই কম।
মধ্যবিত্ত মেধা বিষয়ে সংশয় দূর করেন ক্লাস এইটের বিজ্ঞানের শিক্ষক রব স্যার। স্যার আমাকে ফাস্ট বেঞ্চে বসান। অনুপ্রেরণা দেন।স্যারের কথা খুব মনে পরে। ক্যান্স্যারের সাথে লড়াই করে স্যার মারা যান। আমরা খবর পেলাম সকালে।
ওয়াজেদ ভাই নোটিশ নিয়ে এলো। স্যারের মৃত্যু সংবাদ সাথে ছুটির নোটিশ... হুম ছুটিই তো!
প্রথম পিরিয়ডের পর আর কোনো ক্লাস হবে না।
ছুটির নোটিশে আমরা কোনো আনন্দ পেলাম না। কোনো শোরগোল হলোনা। কেবল , কেবলই চোখটা ঝাপসা হয়ে উঠলো। বাদ জোহর স্যারের জানাজা হলো। জানাজা পড়ালেন হাফেজ আব্দুর রশিদ ( হাফেজ স্যার) ।
তিনি হু হু করে কাঁদলেন। কাঁদালেন। রব স্যার আমার বড় ক্ষতি করে চলে গেলেন। মধ্যবিত্ত মেধার কিন্তু ভীষণ অভিমানী ছেলেটি ফাস্ট বেঞ্চ ছেড়ে আবার চলে গেলো থার্ড বেঞ্চে।
মশিউর স্যার এবং তার স্কাউটিং এর কথা খুব মনে হয়। ক্যাম্পিং , হাইকিং ছিল শাহরিয়ার কবিরের বইয়ের মত এডভেঞ্চারময় ! জীবনে যা ভালো কিছু শিখেছি তার প্রায় সবই স্কাউটিং থেকে।
সময় কত দ্রুতই না চলে যায় !
ঢং ঢং ঢং.... । ভেড়ামারা পাইলট হাইস্কুলের আমাদের শেষ ক্লাসের শেষ ঘন্টাটা বেজে উঠলো।চতুর্থ পিরিয়ডে আমাদের ছুটি হয়ে গেলো।যে যার মত হৈ রৈ করতে করতে ক্লাস থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। আমি চলছি ধীরে। চারপাশের কলরব আমার কানে আসছে না। মাথার মধ্যে কেমন যেন সব ফাঁকা মনে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত মেধার স্কুল ফাঁকিবাজ ছেলেটির এই প্রথম স্কুলের জন্য খারাপ লাগতে লাগলো। ঝাপসা চোখে কৃষ্ণচূড়া গাছ , শহীদ মিনার ,মঞ্চ , পাশে বাতাসে ওরা পতাকা , দূরে গোলপোস্ট।
যে গোলপোস্টে আমি কোনোদিনই গোল দেয়নি , তারপরও খারাপ লাগতে লাগলো।
হেঁটে হেঁটে চলে এলাম হেড স্যারের রুমের সামনে। তিনি বসে কাজে করছেন। তারসামনে একটা মিষ্টি , একটা সিঙ্গারা আর এককাপ চা রাখা। অনেকেই হয়তো জানেনা, তিনি স্কুলের তিরিশ টা বছর দুপুরে শুধু একটা মিষ্টি, একটা সিঙ্গারা আর এককাপ চা খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন।
হেড স্যারের রুমে আর গেলাম না।ভীষণ এক অদ্ভুত অনুভূতিকে পুঁজি করে পেরিয়ে এলাম স্কুলের চৌকাঠ। পেছনে আমার স্কুল। আমার স্কুলটা।
২০ শে জানুয়ারি , ২০১৮। শনিবার। ভেড়ামারা হাইস্কুল প্রাঙ্গনে বিশাল প্যান্ডেল । সারি সারি চেয়ার সাজানো। সুসজ্জিত স্কুল ময়দান। ভেড়ামারার প্রধান সড়ক গুলো পরিষ্কার , সাজানো। ছিমছাম , স্বপ্নের মত।
স্বগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা স্কুলটা। শহীদ মিনার , কৃষ্ণচূড়া গাছ কিংবা একজন হেডস্যার আর সাথে আমরা---ইতিহাস। জানুয়ারীর শীতল সকালের সূর্যটা আভা ছড়াবে। ছড়িয়ে যাবে রেলির একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।
বাস থেকে নেমে হঠাৎ মনে হলো------
আমরা যখন শতবর্ষ উদযাপন করছি কিংবা স্মৃতিচারণ করছি ঠিক সেসময় শোভন মাহমুদ , মোনায়েমুল কিংবা মোমিনুলরা পৃথিবীর আরেক প্রান্তে কনস্ট্রাক্শন হেলমেট টা মাথায় লাগিয়ে নিচ্ছে , কেউ গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে চেপে বসে আছে।
এরপরেও কিছু সময়ের জন্য তারা আমাদের সাথে মিশে যাবে। জায়গা করে নিবে সারিবদ্ধ চেয়ারে , শোভা যাত্রার মাঝখানে , স্মৃতিচারণ মঞ্চে। কিংবা .... কিংবা ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে।
ভাবনার রাস্তায় সবুজ সিগন্যাল ধরে সোজা আমাদের সাথে। আসতেই হবে। এটাই নিয়তি!
** এই লেখাটি আমার স্কুলের শতবর্ষ উপলক্ষে লেখা হয়েছিল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

