
অফিসে খুব ঝামেলাপূর্ণ একটা কাজের দায়িত্ব আমাকে পালন করতে হয়; তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ঈদ ছাড়া আমার গ্রামে যাওয়ার খুব একটা সুযোগ হয় না । যেটা এবার জাতিয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভব হলো । ভোটের আগে ও পরে কয়েক দিন বাড়তি ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গেলাম । যদিও আমার ভোট ছিল ঢাকাতেই; কিন্তু আমি জানতাম, আমার এ পোড়া দেশে সেটা সম্ভব হবেনা কিংবা ভোট দেওয়ার কোন প্রয়োজনই পড়বে না । তাহলে মিছে ভোটের জন্যে কেন ঢাকাতে পড়ে থাকব ? তার চেয়ে বরং মাটির কাছ থেকে ঘুরে আসি ।

গ্রামে গেলাম । ভোটের একদিন আগে যথারীতি আমার গ্রামের ভোটের পরিবেশ ও শহরের রেখে আসা পরিবেশের মধ্যে তেমন একটা তফাৎ খুঁজে পেলাম না । এখানেও নৌকা প্রতীক ছাড়া অন্য কোন প্রার্থীর প্রতীক, প্রচারণা কিংবা কোন কর্মীও চোখে পড়লো না । পরে জানলাম, ভোটের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই প্রতি রাতেই কোন না কোন গ্রামে চিরনি অভিযান চলছে । তারপর থেকে ভিন্ন মতের কোন কর্মীই নাকি বাড়িতে থাকতে পারেনা । আরো জানলাম, যারা এখনো ধরা পড়েনি তারা রাত হলে বাড়ির পিছনের কোন জঙ্গল কিংবা মাঠে গিয়ে আশ্রয় নেয় । পৌষ মাসের এই হাড় কাঁপানো শীতে তারা প্রতি রাতেই জঙ্গলে নাকি ঘর বানায়; যার নাম দেওয়া হয়েছে মোবাইলঘর; দিন হলেই যে ঘর প্রতিদিন ভেংগে ফেলতে হয় ।

এরকম ঘটনার কথা শুনে মনে মনে কিছুটা কষ্ট পেলেও একটু রোমান্সিত হলাম যে, পৌষ মাসের শীতেও জঙ্গলের ভেতর মোবাইলঘর বানাতে হয়, সূর্য উঠার আগেই তা আবার ভেংগে ফেলতে হয় - কী দারুণ ব্যাপার !
আমার স্কুল জীবনের একজন বন্ধুকে পেলাম, বাড়িতে গেলে যার সাথে আমার প্রায়ই দেখা হয় । এবার গিয়ে দেখলাম, সে নৌকার দরবারে বসে আছে । পাশ দিয়ে যেতেই কথা হলো, বললাম - বেশ বেশ, ভোট কর । অথচ এতদিন জানতাম, বন্ধুটি আমার অন্য ঘাটের মাঝি ছিল । ভোটের মাত্র কয়দিন আগে সে ডিম-খিচুড়ি খেয়ে শপথ করে নৌকায় উঠেছে । গ্রামে এরকম আরো অনেকের কথায়ই শুনলাম, যারা তড়িঘড়ি দল বদল করেছে । এতে করে তাদের সব চেয়ে বড় যে লাভটি হয়েছে, তা হলো তারা অন্তত: নির্ভয়ে গ্রামে চলাফেরা করতে পারছে ।

এখানে উল্লেখ্য যে, ৭১-এএতদিন আমরা শুধু রাজাকারের কথা শুনে এসেছি, যারা পাকিস্তান আর্মির সহযোগি হিসেবে স্বাধীনতা বিরোধী কাজে অংশগ্রহণ করেছে; কিন্তু আমরা কখনো কখনো এও শুনেছি যে, ঐ সময় কিছু মানুষ রাজাকার হয়েছিল তৎকালীন পরিস্থিতির শিকার হয়ে; যাদের অন্তরে প্রবল দেশাত্ববোধ থাকার পরও নিজেকে বাঁচানোর জন্য, তার পরিবারকে রক্ষা করার জন্য কিংবা তার গ্রাম বা পুরো এলাকাকে প্রটেকশন দেওয়ার জন্য রাজাকার সাজতে বাধ্য হয়েছিল । আজ আমরা যারা ৭১ পরবর্তি প্রজন্ম তারা ৭১ না দেখেও কয়েক প্রকার রাজাকার দেখার বিরল সুযোগ পেলাম ।
যাইহোক, আমি মনে করি আমার এলাকায় যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হতো তাহলেও নৌকায়ই ৯০ ভাগ জেতার সম্ভাবনা ছিল । কারণ নৌকার যিনি প্রার্থী ছিলেন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র নেতা, শিক্ষিত, নের্তৃত্তগুণ ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ, ধানের শীষের প্রার্থীর চেয়ে । কথায় আছে, কেউ যখন নিজের ছায়া দেখে ভয় পাও্য়া শুরু করে, তখন তার আর কোন কিছুতেই বিশ্বাস থাকেনা ।
প্রথমে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, এসব কিছুর মধ্যেও আমার গ্রামে যাবার আনন্দটুকু মোটেই মাটি হয়নি । মাঠে গেছি, নদীতে গেছি, বাগানে ঘুরেছি, সবুজের সাথে কথা বলেছি, আর বাড়ির পাশে ইংরেজ আমলে তৈরী বিলুপ্তপ্রায় একটা আড়তবাড়ীর বেশ কিছু ছবিসহ তথ্য সংগ্রহ করেছি; যা অন্য আরেকটি পোষ্টে অন্য আরেক দিন শেয়ার করব ।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জানুয়ারি, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




