বাচ্চা ছেলেটার জীবনে প্রথম বিশ্বকাপ খেলা। সে কিছু বোঝার আগেই তাকে তুমি কার সাপোর্টার, আর্জেণ্টিনা! বলতে বলতে নীল সাদা পলি ব্যাগ কেটে পতাকা বানিয়ে তার দুই হাতে, দুখানা ধরিয়ে দেয়া হলো। মাথায় পরিয়ে দেয়া হলো আর্জেণ্টিনা লেখা কাগজে তাত্ক্ষনিক বানানো টুপি। সে সময় এমন তৈরি জার্সি পরার চল শুরু হয়নি বাংলাদেশে। খেলা শুরু হওয়ার খানিক আগে তাকে দলের সাপোর্টা বানিয়ে নিল অন্যন্য সমথর্করা। দুই কি তিন বয়সের বাচ্চাটি নতুন এই পতাকা আর মাথায় ক্যাপের নতুন বেশ ভুষা পেয়ে বেশ খুশি মনে, আর্জেণ্টিনা বলে লাফঝাপসহ শ্লোগান দিতে থাকল। দৌড়ে বেড়াতে লাগল ঘরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত আর শেষে খেলা দেখতে বসল সবার সাথে। সেই থেকে তার মনে গেঁথে গেলো আর্জেণ্টিনা নামটি।
বিশ্বকাপ খেলায়, নানান মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তা দেখার জানার, সুযোগ হয়েছে এখন, সেই সুবাদে দেখছি অনেক মা তাদের বাচ্চাদের দলকে সাপোর্ট করছেন, নিজে অন্যদলের হয়েও। কিন্তু কোন বাবাকে দেখি নাই, বাচ্চাদের দল সাপোর্ট করতে। বাচ্চাদের মন খুশি করার জন্য। বরং বাচ্চাটি বাবার দলের সমর্থক, ভক্ত হয়ে যাচ্ছে।
এ ভাবে একটি শিশু মেয়েও অন্যের সমর্থনের সাথে তাল মিলিয়ে ইতালীর সাপোর্টার হয়ে যায়। থাকে শেষ যে বার ইতালী কাপ জিতল সে পর্যন্ত ইতালীর ভক্ত হয়ে। অবশেষে নিজেই সে হয়ে যায় ফুটবল প্লেয়ার। খেলার মর্ম বুঝে নিজের পছন্দর দল ব্রাজিলকে সমর্থন করে।
আজ মজা হচ্ছিল অনেক আমার । হাসছিলাম সবার স্ট্যাটাস আর মন্তব্য পরে। ফেবু তো খেলার মাঠ হয়ে গেছে। আমি ছাড়া এ পর্যন্ত সবাই খেলা নিয়েই সারাক্ষণ ব্যাস্ত দেখতে পাচ্ছি।
খেলা নিয়ে অস্থির আবেগ প্রবণ। ব্যস্ত মানুষরাও খেলার জন্য ব্যস্ত। বুঝতে পারি না, সবাই কাজকাম কিভাবে সামলাচ্ছে।
আমার খেলা দেখার আগ্রহ খুব একটা কখনও নেই। শুধু যখন প্রথম আমাদের টিভি দেখার সুযোগ হলো, তারপরের বছর, সেই আটাত্তর সনে প্রথম বিশ্বকাপ খেলা দেখার সুযোগ হলো ঘরে বসে। সেবার টিভিতে আমরা প্রথম বিশ্বকাপ দেখলাম। খেলা শুরুর ক'দিন আগে মাকে পটিয়ে টাকা নিয়ে, ভাই তখনকার সবচে বড় পর্দার সাতাশ ইঞ্চির টিভি কিনে আনল। খেলা শুরু হওয়ার আগে প্রতিদিন ঘর থেকে টিভি বের করে, বারান্দায় চৌকির উপর টেবিল দিয়ে তার উপর টিভি বসিয়ে, অ্যান্টেনা নাড়াচাড়া দিয়ে ছবি ঠিকঠাক করে, আয়োজন করে বসা হতো খেলা দেখার জন্য। টানা বারান্দা জুড়ে সোফা, চেয়ার, বেঞ্চ, মোড়া পেতে দেয়ার পরও শহরের অসংখ্য মানুষ সারা সময় ধরে বারান্দা এবং উঠান ভর্তি হয়ে দাঁড়িয়েই খেলা দেখত কোন অভিযোগ ছাড়া মাঝরাত পর্যন্ত। আর সবাই উতেজনায় টানটান হয়ে থাকত। সমর্থকদের মধ্যে কথায় কথায় লাগালাগি, চলত খেলা শুরুর আগে। আর খেলা শুরুর সময় কত কণ্ঠেযে গোল উচ্চারিত হতো এক সাথে। সমর্থক দলের বিপর্যে উহ, আহা শব্দ ভাণ্ডার উপচে উঠত। আবার কখনও টানটান নিরবতা, খেলার উত্তেজনার মূহুর্তে। চোখের মনি আটকে আছে খেলোয়াড়ের পায়ে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একএক জনের উত্তেজনায়। একবার একজন তো গোলোর সাথে লাফিয়ে উঠে টেবিলের উপর উঠে দাঁড়িয়ে গেলো। ক্ষ্রীপ্ততার ছুটে যাওয়া, যেন নিজেই একটা বল হয়ে গোলের ভিতর ঢুকে গেলো অনেক দর্শক টপকে।
এসব মনে হলে; মনে হয় সত্যি কোথায় কত দূরে অচেনা কতগুলো মানুষ খেলছে অথচ ওদের সাথে একাত্ম হয়ে যায় কিভাবে দর্শক। এতটা আবেগ প্রবণ হয়ে উঠার কি প্রয়োজন। খেলা তো খেলাই। একবার যে ভালো খেলেছে আবার ঠিক একই রকম খেলতে পারবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। অথচ দর্শক, ভক্তকুলের আশা তারা বারবার জয়ী হোক। একই রকম খেলুক। আরো ভালো খেলা দেখাক।
আরো একবার মনে হয় রোজার মধ্যে খেলা পরেছিল। তখন ঘরে ঘরে টিভি। বাড়িতে কি উৎসাহ সবার, সারারাত জেগে খেলা দেখার আনন্দে মাতোয়ারা। নানারকম খাওয়া চা পানিয় নিয়ে খেলার জন্য বসা। পাশের ঘরে খেলার শব্দ ঘুমানোর অবস্থা থাকত না। যদিও আমি রাতজাগা মানুষ কিন্ত সে সময় আমার অনেক ঘুম পেতো। আর হৈ চৈ এ ঘুমাতে না পারার জন্য বিরক্ত হতাম খুব।
শুনেছি অনেকে খেলাদেখার জন্য বিশেষ স্পেটর্স চ্যানেল নিয়েছেন, আলাদা পয়সা দিয়ে। অথচ আমার ঘরে বিনা পয়সায় টিভিতে খেলা চলছে। অথচ কেউ দেখছে না এবার।
ব্রাজিলের সাপোর্টার বুঝি বিশ্ব জুড়ে সব চেয়ে বেশী। এরপর মনে হয় আর্জেন্টিনার ভক্তকুল। ম্যারাডোনার জন্যই আর্জেণ্টিনার ভক্ত অথচ ম্যারাডোনা একবারের পর আর মাঠেই নামতে পারল না। একবারের পর যাও নামল দু এক খেলার পরই নিষিদ্ধ হয়ে গেলো। ফুটবল খেলার ঈশ্বরের বরপুত্র, অনেক ঘটনা, অঘটনায় পটিয়সি এই দূর্দন্ত খেলোয়াড়ের খেলা তেমন একটা উপভোগই করতে পারল না মানুষ। তবে খেলাতে যে কখন কি হয় কেউ আগে থেকে জানে না। অথচ ভক্তরা অন্ধ কিউপিড ভালোবাসায়।
খেলাকে কেন্দ্র করে ঘটে আবার নানান ঘটনা। একবার ক্যামেরুন হঠাৎ করে খুব লাইম লাইনে চলে এলো। সেমি ফ্যাইনাল বা ফ্যাইনালে গিয়েছিল মনে হয়। তারপর হারল। পরের দিন পত্রিকার পাতায় একটা খবর এলো ক্যামেরুনের হেরে যাওয়ার কারণে গৃহবধুর আত্মহত্যা। অনেক পরে পাওয়া গেলো স্বামী মেরে ঝুলিয়ে রেখে, গলায় ফাঁস দিয়ে স্ত্রীর আত্মহত্যার গল্প ফেঁদে ছিল। এবছরও নির্বিঘ্নে খেলা দেখবে বলে স্ত্রী ও তিনটি বাচ্চাকে মেরে রেস্টুরেন্টে বসে মজা করে বিশ্বকাপ দেখছিল এক লোক ইতালীতে।
এবছর খেলা শুরুর আগে আরো একটা ভয়াবহ খবর দেখে মন খারাপ হয়েছিল। ব্রাজিলের গোলকিপার ব্রুনো ফার্নান্ডেজ দে সুজা বান্ধবীকে মেরে কুকুরকে দিয়ে খাইয়েছিল দুইহাজার দশে, কারণ সে তার কাছে বাচ্চার বাবার অধিকার চেয়েছিল। তার বাইশ বছরের জেল হয়েছে দুই হাজার বারোয়। তাকে এবছর খেলায় দেখা যাবে, এমন খবর শোনা যাচ্ছিল। এমন একজন নির্দয় মানুষ খেলবে আর তার জন্য দর্শকরা হাততালী দিবে এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি। এছাড়া খেলা শুরুর দিন খুদ ব্রাজিলে খেলার বিরুদ্ধে আন্দোলনের খবর মন খারাপ করে দিয়েছিল। লাখ লাখ মানষকে গৃহহীন করে সাজানো হয়েছে বিশ্বকাপের আয়োজনে। যা আমাকে সুখ দেয়নি। খেলার জন্য মানুষকে কষ্টে পরতে হবে কেন। মানুষের জীবন যাপনটা আগে, তারপর খেলাধূলা। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় করা কোন খেলোয়াড়ের মনে কী এতোটুকু কষ্ট লেগেছিল? ঐসব অসহায় মানুষদের জন্য?
দেশে সব ঘরে নাকি বিদেশী পতাকা উড়ছে। এখানে দেখছি গাড়ির উপর ভিন্নদেশী পতাকা লাগিয়ে সব ছুটছে। এক মহিলাকে দেখলাম গাড়ির দুই পাশে দুই রকম পতাকা লাগিয়েছে। তারমানে বাড়ির দুইরকম সমর্থকের জন্য এই আয়োজন।
আগে দু একবার আগ্রহ করে দু একটা খেলা দেখলেও এবার একটা খেলাও দেখিনি। গতবার ফ্যাইনালের দিন, মেরুনার বাসায় অনেক লোকের সমাগম হলো, দিনটা ছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত কবি মিল্টন হাসনাতের জন্মদিন। একক মিল্টন চারবছর পরে, স্ত্রী এবং দুই বাচ্চাসহ সংসার করছে। ওর বাচ্চারও নিশ্চয়ই এখন বাবা বা মা এর দলের সমর্থক, ভক্ত।
খেলার খেলোয়াড়রাও কত বদলেছে। নামটা শুনছিলাম নেইমার কিন্তু কোন দলের কিছুই জানতাম না। জানলাম যেদিন ছেলেটা খেলা থেকে ব্যাকবোন ভেঙ্গে বিদায় নিল। আজ ওর চেহারাটা দেখলাম বড় মায়া লাগল। বাচ্চা ছেলে কি সুন্দর চেহারা, প্রজাপতির মতন ছন্দ তুলেই সে নিশ্চয় খেলছিল। ভবিষ্যতটা যেন নষ্ট না হয়ে যায়। আবার যেন ফিরে আসতে পারে তার ক্যারিয়ারে।
আসলে খেলা সুন্দর, ফূর্তি করার জন্য। কিন্তু খেলার কারণে জীবন যখন হয়ে উঠে ভয়ঙ্কর হঠাৎ ব্যথা পেয়ে কি ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে একটা মানুষের জীবনে। মোহসীন নামের প্রথম সারীর একজন ফুটবল খেলোয়াড়ের সাথে দেখা হয়েছিল সি এম এইচ এ। অনেকদিন আমি যেতাম আমার রোগীর তদারকি করতে আর উনি পরেছিলেন হাসপাতালের বেডে পা ভেঙ্গে। অস্থির সময়টা কেমন নিরব হয়ে থমকে ছিল অসুস্থতায়। প্রতিদিন আশার স্বপ্ন ঘিরে থাকত তার চোখে। কবে আবার মাঠে বল নিয়ে দৌড়াবেন। উনাকে দেখার জন্য কাউকে আসতে দেখিনি। একজন খেলোয়াড় যতক্ষন ভালো খেলবে ততক্ষণ তার সম্মান। একটু খানী ব্যিচুতি ঘটলে, কেউ তার খবর রাখে না আর। হারিয়ে যায় অজানায়।
যে ছেলেটা আর্জেন্টিনার ভক্ত হয়ে উঠেছিল সেই ম্যারাডোনার আমলে, তার একটা বন্ধু টেবিল টেনিস খেলতে গিয়ে পরে গিয়ে একদম কমায় চলে যায় সাথে সাথে। বছর দুই পরে এই সেদিন সে হাসপাতাল থেকে ঘরে ফিরেছে। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি তবে বেঁচে আছে। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা গ্রেজুয়েট ছেলেটার এমন ভয়াবহ জীবন দেখতে কার ভালোলাগে।
খেলোয়াড় মেয়েটি নিজের দলের খেলা শেষে, পাটি শেষে যখন পরীক্ষার পড়া করবে তখন সে হায়ার হয়ে অন্য দলের জন্য খেলতে গেলো একদিন। হঠাৎ করে অন্য একটি খেলোয়াড়ের সাথে ধাক্কা লেগে মাথায় ব্যথা পায়। তার খেসারত দিতে হয়েছে অনেক দিন ধরে।
খেলা খেলা, খেলা নিয়ে অস্থির হওয়ার কোন কারণ দেখিনা। অথচ অকারণ একদলের সাপোর্টার অন্যদলের সাপোর্টার কে টিজ করে মজা লুটছে। কখনও সেটাও হয়ে উঠে অনেক বাড়াবাড়ি পর্যায়ের। খেলা থাকুক খেলা হয়ে আনন্দ আর ভালোলাগায় শত্রুতায় নয়।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুলাই, ২০১৪ রাত ২:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




