
কিছুদিন আগে আমি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে গিয়েছিলাম। প্রথম যখন যাদুঘরটি স্থাপিত হয়েছিল সে সময় কয়েক বার গিয়েছিলাম। আবার গেলাম অনেক বছর পর এ বছর। এখন অনেক সুশৃঙ্খল সুন্দর গোছানো। পাশে একটি গ্রন্থাগার এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের দোকান তৈরির কাজ চলছে ।
সাথে ছিল আমার ছবি তোলার যন্ত্র। ইচ্ছে ছিল সব ছবি তুলে নিয়ে আসব, ধরে রাখব নিজের কাছে সব স্মৃতি, কিন্তু নিয়ম ছবি না তোলার। তাই গাড়িতে ক্যামেরা, ব্যাগ, মোবাইল সব রেখে। গাছে ঢাকা আঙ্গিনায় কয়েকটি মোরাল । ছায়া ঘেরা জায়গাটা পেরিয়ে, দোতালা বাড়ির সবটা জুড়ে আমি হাঁটছিলাম, নির্ধারিত পথে আপন মনে যুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত ঘরগুলোতে।
আমার চলা এতই শ্লথ হয়ে যাচ্ছিল প্রতিটি জিনিসের সামনে থেমে আমি ফিরে যাচ্ছিলাম সেই যুদ্ধের দিনগুলিতে। বন্দুকের শব্দ, কান্না, রক্ত, হাহাকার, ভয়ার্থ মানুষের মুখ, অন্ধকার সময়, আমাকে আবিষ্ট করে রাখছিল। মহান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার, জীবন সেই সময়ের উপলব্ধি সব আমাকে টাইম মেশিনে বাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ইতিহাসের কাছে। কল্পনা বিস্তার করে ঠিক সেই অবস্থার সাথে মিলে যাচ্ছিলাম। কেমন ছিল মানুষগুলোর মুখ।কেমন তাদের আচার আচরণ, কি অবস্থার সম্মুখিন ছিলেন তারা সেই দুঃসহ সময়ে।
প্রতিটি অক্ষর প্রতিটি লেখা পাঠ করছিলাম মনোযোগ সহকারে। ব্যবহূত জিনিস পত্র দেখতে দেখতে আমার চোখ ভিজে উঠছিল। আমার শরীর জুড়ে শিউরে উঠা শিহরণ বিস্তার করছিল। আরো অল্প কিছু দর্শনার্থি দেখছিলেন আমার সাথে। কারো মুখে কোন সাড়া শব্দ নাই। নিঃশব্দ পদচারণা। অন্যরা আমার ঘরটি ছাড়িয়ে অন্য ঘরে চলে যাচ্ছেন আমি একা হয়ে যাচ্ছি অনেকটা সময় ধরে যুদ্ধের স্মৃতির সাথে একা আমি। এক সময় নতুন কিছু মানুষ আমার পাশে যোগ দিচ্ছেন। ঠিক যুদ্ধ সময়ের মতন যেন, ঘুরে ঘুরে নুতন মানুষের সাথে চলেছি।
নীচতলার কয়েকটি ঘর ইতিহাসের ধারাবাহিকতার ছবি। একটার পর একটা ঘুরে সিঁড়ি বেয়ে এক সময় উপরে উঠে গেলাম। গোলাবারুদ, বন্দুকে সাজানো ঘর। পেরিয়ে চশমা, কলম, বই খাতা, থালা, বাটি, মগ, প্যান্ট সার্ট, টুপি, জুতা কত কি মুক্তি যোদ্ধাদের ব্যবহূত বস্তু আত্মিয় স্বজন দিয়ে গেছেন।
সেখানে ছোট্ট একটি জামা বাঁধানো কাঁচের ভিতর। এই ছোট বাচ্চাটি কি মুক্তি যোদ্ধা ছিল? ছোট মেয়েটিও মুক্তিযোদ্ধা আসলে যে এই যুদ্ধের কারণে জীবিত থাকতে পারেনি অশান্ত দেশে। তার গল্পটি এমন। বাবা মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন, বলে ছোট্ট দু মাসের শিশুটিকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে পাকজান্তব বুটের নীচে পিষে।
বাবা যুদ্ধের ভয়াবহ সময়ে জন্ম নেয়া মেয়ে শিশুটিকে দেখার সুযোগ পাননি কখনো। যুদ্ধ থেকে ফিরে পান শুধুই সেই মেয়েটির রক্ত ভেজা একটি জামা। বাবার কাছে মেয়ের স্মৃতি ছোট্ট একটি রক্তে ভেজা জামা। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে সে জামাটি বাবা দিয়ে যান স্মৃতি স্বরূপ। যা স্বযত্ন রাখা আছে বাংলাদেশের যুদ্ধ ইতিহাস কালের সাক্ষী হয়ে।
সুযোগ পেলেই আমি এই গল্পটি বলি। আমার মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে এই গল্পটি আমি সংযোজন করে দিয়েছি।
পাক সেনারা কতটা বর্বর ছিল, দুধের শিশু হত্যা করতেও তাদের হূদয় কাঁপেনি; হূদয়ই নেই!
অথচ যুদ্ধ শেষে পয়তাল্লিশ বছর পরে স্বাধীন দেশে যদি গর্ভ থেকে শিশুকে লাথী মেরে বের করে মেরে ফেলা হয় তাদের হূদয় কি দিয়ে তৈরি। তারা কি সেই পাক সৈনিকের প্রতাত্মা নয়। ভাবতে গিয়ে গুলিয়ে উঠছে গা। এ কোন ভয়াবহ মানসিকতা নিয়ে চলছে মানুষ। কেন স্বাধীন দেশে এমন নাজেহাল হতে হচ্ছে কেন, কারা এই অস্থিরতা তৈরী করে চলেছে একের পর এক।
স্বাধীনতা মানে কি শিষ্টাচার শূন্য পেশী শক্তির ব্যবহার। ভয়াবহ জান্তব তাণ্ডবের ঘটনা একের পর এক স্থবীর করে দেয় শান্তি প্রিয় মানুষের জীবন। এত হিংস্রতা নির্মমতা মানুষের মনে।কেন এত রাগ কার উপরে। কেন শুধুই নিজস্ব পাওয়ার এবং চাওয়ার ভাবনা দখল করে আছে মানুষের মন। মানুষ হওয়ার একটি পাঠশালা কি চালু হবে না দেশে। যেখানে মানবিকতা শিখা যাবে। নমনিয়তা, সহযোগীতা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়া। যেখানে জাতীয় ঐতিহ্য শিক্ষা দেয়া হবে । যেখানে শিক্ষা লাভ করে এক জাতির ঐতিহ্যময় গৌড়বময় জীবনের ধারনা পাবে প্রতিটি মানুষ। প্রতিটি মানুষ হয়ে উঠবে মানবতাময় মানুষ আর সব চাওয়া পাওয়ার উর্ধে থাকবে দেশের জন্য ভালোবাসা, একই রকম প্রতিটি নাগরিকের।
বেরিয়ে আসার পথে দেখা হলো অস্থায়ী গ্রন্থাগারে ক'জনের সাথে। তাদের সাথে কথা বলে, আমার মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাসটি দিলাম গ্রন্থাগারের জন্য। দেখা শেষ করে ফিরে এসে মন এতটাই ভরা ক্রান্ত হয়ে ছিল। সেদিন আর অন্য কোন কাজ করা হয়ে উঠল না।এখনও মাঝে মাঝে স্মৃতি দুয়ারে হানা দেয়। আমাকে আবেগাপ্লুত করে ফেলে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




