ইচ্ছে ছিল পনেরো বছর আগের মতন এবার একুশের প্রহরে রাত বারোটায় দূর বরফের দেশে অস্থায়ি বানানো শহিদমিনারে ফুল দিব। সব বাঙালিদের সাথে শহিদমিনারে উপস্থিত হবো।ভাষাশহিদদের স্মরণ করতে।
কিন্তু দারুণ অর্স্তনিহিত এক দুঃখ নদী বয়ে যায় প্রবাহিত হয় এই সময়ের সাথে একান্ত আমার নিজের মনে। ইচ্ছে অনেক বছর থেকে বাস্তব হয় না। সেই সময়ের মতন আর কোন অনুষ্ঠানে জড়িয়ে পরতে পারিনা আমি, বিশেষ করে এই সময়ে। ঠিক কুসংস্কারের মতন আবৃত করে রাখে আমার মন আমার চেতনা। তবু এআমার নিজস্ব অনুভূতি নিজস্ব বেদনার নীল চাদর। একে জড়িয়ে রাখি বুকের কাছে স্বযত্নে।
একুশের প্রহর পেরিয়ে গেলেই বুঝি পেয়ে যাবো এক দারুণ দুঃসংবাদ। সব আনন্দ স্থিমিত হয়ে যায়। সব ভালোলাগা থেমে যাওয়ার মতন খবর আমাকে নিঃশ্চুপ করে দিবে। ঠিক সেই বছর আবেগ উদ্দেল আমার হৃদয়ে শূন্যতার অবগাহণ ঢেলে দিয়ে যেমন চলে গিয়েছিল আমার প্রাণ প্রিয় পুরুষ আমার বাবা, আমার জীবন থেকে। সেবছর প্রথম অস্থায়ী শহিদমিনার স্থাপিত হয়েছিল এখানে। প্রচণ্ড বরফ ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে আমি একুশের গান গেয়েছিলাম রাত বারোটায় আর কিছু মানুষের সাথে। সারা সন্ধ্যা বিকাল ছিল ব্যস্ততার। ছিল আবেগময় উৎসব; ভিন্ন দেশে মানুষের মাঝে, নতুন প্রজন্মের শিশুদের মঝে ছড়িয়ে দেয়ার। সেই উৎসাহ স্তিমিত হয়ে গেছে আমার মনে, সবার মাঝে যাওয়ার বিশেষ একটা সময়কে উজ্জাপন করার। বরঞ্চ এখন আমি ধারণ করার চেষ্টা করি সারাক্ষণ নিজের মনে, অর্ন্তগত নির্যাস আরোহণ করার চেষ্টা করি নিজের মনে উজ্জাপন করার।
ভাষা যেমন সারাক্ষন ঘিরে থাকে আমাকে। ঠিক তেমনি ভাষাশহিদের অবদানও থাকে আমার মনে সব সময়। বিশেষ একটি মূহুর্তের সাথে কোন পার্থক্য নাই। এত বছর অন্য ভাষার মধ্যে থেকেও এক বিন্দু দূরে সরে যায়নি ভাষা আমার মন থেকে। বরং বিদেশের ভাষা আয়ত্ম করতে গিয়ে আরো বেশী আঁকড়ে ধরেছি বাংলাভাষাকেই। যতই অন্য ভাষায় কথা বলি যত লেখালেখি কাজ বন্ধুত্ব করি ভিন্ন ভাষায়। নিজের মনের ফল্গুধারা ঝরিয়ে দিতে বাংলাভাষার সমকক্ষ আর কোন ভাষা হয়ে উঠে না আমার কাছ্। প্রাণ নির্যাসিত সুধা সহজ সাবলীলতায় ঝরাতে পারে শুধু আমার মাতৃভাষা। আমার প্রাণের বাংলাভাষা। এই ভাষাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। এই সুন্দর সাবলীল চিন্তাধার প্রকাশের মাধ্যম হয়ে যেতো স্থবীর যদি না সেদিন ৫২ র একুশে ফেব্রুয়ারি, প্রতিবাদে পথে নানামতো বাঙালি ভাষার জন্য বুকের রক্ত না ঢালতো পথে। এই ভাষা আমি এবং আমার মতন বহু মানুষ দেশের বাইরে অবস্থান করেও বুকে ধরে রাখেন দারুণ প্রার্থ্ণার মতন।
অনেকে প্রবাসের লেখক হিসাবে গর্বিতবোধ করেন। দেশের মানুষ প্রবাসের লেখক বলে আখ্যায়িত করেন দেশের বাইরে অবস্থিত লেখকদের। কিন্তু আমি মনে করি আমি বাংলা ভাষার লেখক। যেমন ঢাকা বরিশাল, রংপুরের লেখক হয়না তেমন আমেরিকা, বিলাত, মধ্যপ্রাচ্যের লেখক নয়। সবাই বাংলা ভাষার লেখক। ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভাষা প্রকৃতিতে বসবাস করে বাংলা ভাষায় ধারন করেন মনের ভাবনা, নির্যাস প্রকাশ করেন বাংলা ভাষায়। তারা বাংলাভাষার লেখক পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন। তারা বাংলা ভাষায় চর্চা করেন নিজের মতন এবং ছড়িয়ে দেন ভিনদেশি মানুষের মাঝে বাংলাভাষা।
ভিন্ন ভাষাভাষি আগ্রহী হয়ে উঠেন ভাষা সম্পর্কে জানতে। আমি অনেক সময় দেখেছি। আমার ল্যাপটপে অবাক তাকিয়ে অনেকে প্রশ্ন করেছে, এটা কী ভাষায় তুমি লিখছো? বা বাংলাভাষার কথা শুনে পাশ থেকে কেউ থমকে থেমে জানতে চেয়েছে কি ভাষায় এত মধুর ভাবে কথা বলছো তোমরা? এই প্রচার হোক যতই ছোট, একজন মানুষের মনে দাগ কাটা। একটি দেশ একটি ভাষার কথা জানাতে উৎসাহিত হই। গর্ব করে বলতে পারি। আমার ভাষার জন্য রক্ত দেয়ার ইতিহাস। আমাদের প্রতিবাদ, নির্যাতন সয়ে তার থেকে মুক্তি পাওয়া এবং স্বাধীনতা পাওয়ার স্বর্ণ উজ্জল ইতিহাস। একটি মনে আমার দেশ নিয়ে, ভাষা নিয়ে ভাবার খোরাক যোগিয়ে দেই। এতে ভালোলাগে আমার।
কাল ছিল একুশের প্রহর বাংলাদেশে। কাল সারাদিন ছুটেছিলাম অনেক দূরের পথে আমার মুখে আমার গাড়িতে বাজছিল রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারির গান। ট্রাফিক লাইটে পাশে দাঁড়ানো গাড়ির উৎসুক অনেকে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল ভিন্ন রকম সুর উচ্চ তানে বাজানো সুরের মায়ায়। কাল শীতের প্রকোপ ছিল কম তাই খুলে দিয়েছিলাম গাড়ির কাঁচ। যখন বিভিন্ন কাজে নেমেছিলাম মানুষের মাঝে তখনও চলছিল আমার বাংলায় গান গাওয়া অথবা কবিতার সুর ভাঁজা। আমি ভিন্ন পথে মায়া ভরা বাংলার সুর দিয়ে কাল থেকে আজ পর্যন্ত অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এই টুকু সুখ। এই আমার নিজেস্ব একুশ পালন। আমি দূর প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছি বাংলার মধুর সুর। আমি গঙ্গা পদ্মকে মিশিয়ে দিয়েছি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে ভিন্ন জলের ধারায়। পাখিদের সাথে গাছদের সাথে কাল ছিল শুধু বাংলায় কথা বলা দিন। যেখানে থাকি সেখানে আমি বাংলায় কথা কই।
নাই বা হলো যাওয়া রাতের অস্থায়ি শহিদমিনারে। শহিদ মিনার আমার হৃদয়। উৎসর্গ ফুলের নিবেদন আমার মুখের পথে পথে ছড়ানো বচন ।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ভোর ৫:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



