এবার শীতে বাড়ি গিয়ে শুনলাম খেজুর গাছ কাটার মতো লোক আর পাওয়া যাচ্ছে না। একটা বয়স্ক লোক খেজুর গাছ কটাতো কিন্তু এখন সে অসুস্থ তাই আর কাটতে পারছে না। এখনকার জেনারেশনের কেউ আর এসব কাজ করতে চায় না। তাই দেখলাম খেজুর গাছ গুলো নিষ্প্রাণ দাঁড়িয়ে আছে তাকে নিয়ে আর কোনো হাকডাক নেই। অথচ ছোটবেলায় এই খেজুর রসের সাথে আমার এক অদ্ভূত সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। আমদের ২০ টা মতো খেজুর গাছ ছিল এবং শীতকালে সপ্তাহে প্রায় ৭-৮ ভাড় রস হতো। আমাদের গাছ কাটতো বৃহষ্পতি নামক একজন গাছী। গ্রাম্য ভাষায় সবাই তাকে ব্রেস্পতি বলে ডাকতো। যেদিন গাছ কাটতো তার আগের দিন বাবার সাথে পুকুর ঘাটে বসে ভাড়গুলো খেজুরের ছোবড়া দিয়ে পরিস্কার করে রোদে শুকাতে দিতাম। এরপর খেজুর গাছ কাটার দিন সকালে ভাড়গুলো শুকনো লতাপাতার দুইপাশে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে আগুনে পোড়ানোর পর ভাড়ের গলায় দড়ি (আমাদের এলাকায় কানাচ বলে) লাগিয়ে প্রত্যেক গাছের নীচে রেখে স্কুলে যেতাম। এবার স্কুল থেকে ফিরেই চলে যেতাম গাছ কাটা দেখতে। গাছী গাছ কাটতো আর আমি তার সাথে ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম। গাছ কাটার পর দেখতাম কোন গাছ থেকে কতটুকু রসের ফোটা পড়ছে। গাছীকে জিজ্ঞাসা করতাম অমুক গাছে কাল এক ভাড় রস হবে কিনা? গাছী তার মতামত জানাতো। গাছী যখন বলতো অমুক গাছে কাল একভাড় রস হবে এরপর বিকাল থেকে শুরু হতো রস দেখার পালা, একটু পর পর গিয়ে দেখে আসতাম রস কতটুকু হলো। বিকেল বেলা সুন্দর পাটকাঠি ভেঙে নিয়ে একবারে পাইপের মতো করে তৈরি করে যে গাছের রস মিস্টি সেই গাছে উঠে যেতাম রসাস্বদনে। এরপর ভোরে উঠে মাথায় থাকত সেই গাছের রসে ভাড় পূর্ণ হলো কিনা..তাই বাবা ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমি তীব্র শীত উপেক্ষা করে গাছে উঠে দেখে আসতাম আসলেই ভাড় পূর্ণ হলো কিনা! অপূর্ণ থাকলে মনটাই খারাপ হয়ে যেত আর পূর্ণ হলে কি যে অপার্থিব আনন্দ পেতাম সেটি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। এরপর বাবার সাথে ঘুরে ঘুরে রস পেড়ে আনতাম এবং ইচ্ছা মতো রস খেতাম। রস খাওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট উঁচু গাছ ছিল, সেই গাছের রস আলাদা করে রাখা হতো। রস আস্বাদনের পর গায়ে কাপুনি দিয়ে উঠতো। তখন একটা পাটি নিয়ে চলে যেতাম পুকুর পাড়ে। পুকুর পাড়ে রোদে বসে বই পড়তাম আর অপেক্ষায় থাকতাম কখন বাবার রস জ্বালানো শেষ হবে আর গুড়ের মিষ্টি গন্ধ এসে মনটা ভরিয়ে দিবে। রস জ্বালানো শেষ হলে এবার গুড় খাওয়ার পালা। কলা গাছের পাতায় গুড় নিয়ে আঙুল দিয়ে রসিয়ে রসিয়ে গুড় খাওয়া। আর পৌষ মাস আসলে পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে পিঠা খাওয়ার উৎসব....আর এগোতে পারছিনা খুব নস্টালজিক হয়ে পড়ছি..আবার সেই বৃহষ্পতিরা ফিরে আসত!!!আবার সেই পাগলামিতে ভরা খেজুর রসের প্রেমে পড়া দুষ্টু-মিষ্টি দিনগুলো ফিরে পেতাম!!!! ফিরে পাব কি!!!!!!!!!!
সেই ছেলেবেলা-সেই খেজুর রস!
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:১৯
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
কলকাতায় নিয়মিত যারা যাতায়ত করেন তারা এই প্রশ্নের মূখোমুখি হবেন প্রায়ই।
আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে যারা কলকাতায় যাতায়ত করে থাকেন তারা স্হানীয়দের কাছেকি এই প্রশ্নটির মূখোমুখী হয়েছেন নিয়মিতভাবে: দেশভাগের সময় বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ আর ভারতকে দেয়া হয়েছিলো খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
শেখ হাসিনা কেন কওমী জননী হয়েছিলেন ?

আওয়ামী লীগ করেন এমন অনেক মানুষ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেন। শেখ হাসিনা কেন কওমি জননী উপাধি গ্রহণ করলেন? আসলে সবাই যা বলতে চান,আওয়ামী লীগের রাজনীতি তো এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর
আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন
Sajna

Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন
বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।