somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সাইয়িদ রফিকুল হক
আমি মানুষ। আর আমি ত্বরীকতপন্থী-মুসলমান। আমি মানুষ বলে আমার ভুলত্রুটি হতে পারে। বই পড়তে খুব ভালো লাগে। আমি সাহিত্য ভালোবাসি। আর লেখালেখি আমার খুব শখের বিষয়। কিন্তু, বর্তমানে আমি বাংলাদেশ-রাষ্ট্র ও গণমানুষের জন্য লেখনিশক্তিধারণ করেছি।

গল্প: আত্মহত্যার আগে

১৮ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গল্প: আত্মহত্যার আগে
সাইয়িদ রফিকুল হক

কলেজের শুরুতে আসিফের দিনগুলো ভালোই কাটছিল। এখানে, সে বেশ কয়েকজন নতুন বন্ধুবান্ধব পেয়েছে। এটা ছেলে-মেয়েদের সহশিক্ষার কলেজ। সে সবার সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে দিনগুলো বেশ আনন্দে পার করছিল। হঠাৎ একদিন তার জীবনের মোড় ঘুরে গেল। তার স্বাভাবিক আনন্দময় জীবনে কেমন করে যে একটা ছন্দপতন ঘটে গেল! আর এইরকম একটি ঘটনার জন্য সে আগে থেকে কখনো প্রস্তুত ছিল না।

সময়টা তাদের কলেজের প্রথম বর্ষ সমাপনী পরীক্ষার কয়েকদিন আগে। একদিন শেরপুর থেকে একটি মেয়ে এলো তাদের কলেজে ভর্তি হতে। এতদিন সে শেরপুর কলেজে ছিল। কিন্তু তার পিতা হঠাৎ বদলি হওয়ায় নিতান্ত বাধ্য হয়ে তাদের এখানে আসতে হয়েছে।
ওর নাম অনামিকা। সবার পছন্দের একটি মেয়ে। কী যে হাসিখুশি সে!
অনামিকা এখানে ভর্তি হয়েই নিয়মিত ক্লাস করতে লাগলো। সে দেখতে খুব সুন্দর। প্রায় সব ছেলেই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায়। সবাই তার সঙ্গলাভে খুব খুশি হয়। তবুও আসিফ ওর সঙ্গে মিশতে চায় না। প্রথম দেখাতেই অনামিকাকে তার বেশ ভালো লেগেছিল। তবুও সে তার কাছ থেকে সবসময় দূরে সরে থাকতে চাইতো। আর তখনও তাদের এত ভালোভাবে পরিচয় হয়নি। শুধু ক্লাসমেট হিসাবে ক্লাসে তাদের দেখাদেখি হয়েছে মাত্র।
কলেজের অনেক ছেলে যেখানে যেচে তার সঙ্গে কথা বলতে লাগলো—সেখানে সে একেবারে নীরব ও নিশ্চুপ। কেউ দেখলে ভাববে, তার সঙ্গে বুঝি অনামিকার ঝগড়া হয়েছে! অন্যরা এমনটি করলেও আসিফ কখনো যেচে কিংবা এমনিতে তার সঙ্গে কথা বলতে যায়নি। সে মন দিয়ে পড়ালেখার চেষ্টাই করছিল। তার পিতার একটি বড় স্বপ্ন রয়েছে: ছেলে বড় হয়ে এলাকার ম্যাজিস্ট্রেট হবে। আসিফও নিজেকে সেভাবে তৈরি করছিল। পড়ালেখার দিক দিয়ে এই কলেজে আসিফের স্থান প্রায় সবার কাছে ঈর্ষণীয়।
শুধু আসিফ কথা না বললে কী হবে? দিন-দিন কলেজে অনামিকার জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগলো। তার আশেপাশে সহপাঠী ও সহপাঠিনীরা সবসময় ভিড় করে থাকে। তবে সহপাঠিনীদের চেয়ে সহপাঠীদের সংখ্যাটাই সর্বাধিক। ছেলেরা খুব আগ্রহভরে একদিন তাকে কলেজের ডিবেট-সোসাইটির আহ্বায়ক করে বসলো। তবুও সেখানে আসিফের দেখা নাই!

মাত্র কয়েকদিনে অনামিকা যেন পুরা কলেজটা জয় করে ফেললো। তা সত্ত্বেও, আসিফ এসব থেকে কয়েকদিন একটু দূরেই ছিল। হঠাৎ একদিন অনামিকা ওর পাশে এসে বসলো। সেই থেকে ওদের প্রথম বন্ধুত্ব। তারপর ক্লাসের ফাঁকে-ফাঁকে ওদের আলাপচারিতায় কেমন করে যেন ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। অনেকে বুঝতে পারলো, ওদের সম্পর্ক বুঝি বন্ধুত্বের সীমানা পেরিয়ে অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। নিয়তি কী চাইছিল আসিফ তা জানে না। তবে প্রথম বর্ষ সমাপনী পরীক্ষার পরে সে অনামিকার প্রেমে পড়ে গেল। এটা তার বন্ধুরাও সময়মতো ঠিক জেনে গেল। জমে উঠলো তাদের প্রেম। আসিফ কিছুতেই বুঝতে পারে না যে, কীভাবে কী হয়ে গেল! তবে সে এটা বুঝতে পারে যে, সে এখন মজনু।
অনামিকাও তাকে বেশ প্রশ্রয় দিচ্ছিলো। দুজনে ক্লাসের ফাঁকে-ফাঁকে ক্যান্টিনে বসে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা আড্ডা দিতো। গল্প করতো। চা, সিঙ্গারা আর সমুচা খেত। তবে তাদের মধ্যে মাঝে-মাঝে পড়ালেখার বিষয় নিয়েও কথাবার্তা হতো। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হলো গভীর প্রেমের সম্পর্ক। এসব দেখেশুনে অন্যরা বলাবলি করতো, ওরা যেন নয়া-জামানার লাইলি-মজনু! এসব দেখে আড়ালে-আবডালে তাদের নিয়ে দুই-একজন হাসি-ঠাট্টা করলেও বাকীরা তাদের ভালোবাসতে লাগলো।

প্রেম কখনও গোপন থাকে না। কলেজে তাদের প্রেমের কথা বাতাসে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। এ-খবর অনামিকার বাবার কানেও গেল। তিনি স্থানীয় থানার দারোগা। প্রথমে তিনি তো রেগে একেবারে আগুন। কিন্তু পরক্ষণে যখন জানলেন, ছেলেটা স্থানীয়, এবং তার বাবা উপজেলার চেয়ারম্যান। তখন দারোগাসাহেব শান্ত হলেন। আর খুব শান্ত হয়েই রইলেন। তবে তার ভিতরটা বুঝা গেল না।
দারোগাসাহেব মনখারাপ করে সারাদিন গুম হয়ে বাসায় বসে রইলেন। তিনি কারও সঙ্গে তেমন-একটা কথাও বললেন না। এমনকি মেয়ের সঙ্গে বিন্দুমাত্র রাগারাগিও করলেন না। খুব নীরবে সারাটা দিন শুয়ে-বসে কাটালেন। অফিসে গেলেন একেবারে সন্ধ্যার পরে। তার হাবভাব দেখে মনে হলো, তিনি যেন আজ থেকে অন্য মানুষ। তবে তার মনে যে রাগ নাই—তা বলা যাবে না। মানুষের ভিতরটা পড়তে পারলে তো দুনিয়ায় এত আজাব, গজব, শয়তানী, ভণ্ডামি, নষ্টামি, কষ্ট ও বিপত্তি দেখা দিতো না। আসলে, এটা হলো বড়সড় ঝড়ের আগে একটা গুমোটভাব। তাই, দারোগাসাহেবের মনোভাব কিছুই বুঝা যাচ্ছে না।

অনামিকা পর-পর সাতদিন কলেজে এলো না। সবাই ভাবলো, হয়তো তার কোনো অসুখ হয়েছে। আসিফের বন্ধুরা বললো, “তোর একবার ওর খোঁজ নেওয়া উচিত। ওর কী হয়েছে তা জানা দরকার। মেয়েটি তোকে অনেক ভালোবাসে।”
আসিফ তেমন-একটা গা না করে বললো, “হয়তো আজকালের মধ্যে সে এসে পড়বে।”
এরপর সে কিছুটা চিন্তিতমুখে বললো, “তবে ওর মোবাইল-ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি আজ সাতদিন যাবৎ।”
সব শুনে সবার মনে কেমন যেন একটা সন্দেহের কালোমেঘ ঘনিয়ে আসতে শুরু করে। ওরা বিরাট ভাবনায় পড়ে গেল। কিন্তু হঠাৎ করে ওদের বাসায় যাওয়াটাও ঠিক মনে করলো না। মানুষের মনে অনেক সন্দেহ, সংশয় ও অবিশ্বাস সবসময় খেলা করে। তাই, মানুষ অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না।

পরদিন বিকালে আসিফ সকল প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে থানার কাছে অনামিকাদের বাসায় গেল। সেখানে একজন কনস্টেবল ওদের বললেন, “স্যার তো এখানে থাকেন না। তিনি তো গতকাল রাতেই সপরিবারে ঈশ্বরদী না পীরগঞ্জ থানায় বদলি হয়ে চলে গিয়েছেন। তবে ঠিক কোথায় গিয়েছেন তা আমরা জানি না। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে তার বদলির স্থান আমাদের কাছে গোপন করে রেখেছেন। আপনারা কারও কাছে খোঁজ নিয়েও তা হয়তো জানতে পারবেন না। পুলিশ-লাইনের বড় অফিসাররা শুধু তা জানেন।”
খবরটা শোনামাত্র আসিফের আনন্দময় জীবনে আঁধার ঘনিয়ে আসতে থাকে। হতাশায় তার বুকটা একনিমিষে ভরে যায়। তার বুকটা ভেঙে যায় নদীর পাড় ভাঙার মতো করে বারবার। আর তা বারবার ভাঙতেই থাকে। একসময় সে ভীষণভাবে মুষড়ে পড়ে।
তার টালমাটাল অবস্থা দেখে বন্ধুরা তাকে ধরাধরি করে বাসায় নিয়ে এলো। তারপর তাকে শুইয়ে দিলো বিছানায়। সবাই বুঝলো, ওর এখন পরিপূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন। তবে দুই-একজন বন্ধু সেদিনের মতো তার কাছে রয়ে গেল।
জীবনসম্পর্কে আসিফের খুব একটা বড়সড় বা বেশি কোনো ধারণা ছিল না। সে একজনের সঙ্গে সুন্দর একটা যৌথজীবন চেয়েছিল। অনামিকাকে খুঁজে পেয়ে তার স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পথেই ছিল। কিন্তু হঠাৎ এই বিনা মেঘে বজ্রপাতে সে যারপরনাই মুষড়ে পড়েছে। সে নিজেকে কোনোভাবেই স্থির রাখতে পারছে না।

আসিফ কয়েকদিন কলেজে এলো না। বন্ধুরা ভাবলো, হয়তো সে দুঃখভারাক্রান্ত হয়েছে বলে বাসায় শুয়ে-বসে নিজেকে স্বাভাবিক করার কাজে নিয়োজিত। তাই, কেউ তার বাসায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো না। বন্ধুরা মনে করলো, একা থাকলে সে আরও ভালো থাকবে। ক্যাম্পাসে বসে সবাই তার মঙ্গল কামনা করতে লাগলো।

আটদিন পরে আসিফ কলেজে এলো। সঙ্গে তার প্রতিদিনের প্রিয় সেই ব্যাগটিও ছিল। বন্ধুরা তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগলো। কিন্তু সে কারও কোনো কথায় কর্ণপাত না করে সোজা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে থাকে। তার এই হতাশাগ্রস্ত মনোভাব লক্ষ্য করে একজন তাকে জাপটে ধরে পথ আগলে তাকে আটকাতে চেয়েছিল। এসময় সে কোথায় গিয়ে কী করে তার কোনো ঠিকঠিকানা নাই। কিন্তু এই বন্ধুটির চেষ্টাও সে দুহাতে দূরে ঠেলে বিমর্ষচিত্তে উপরে উঠতে লাগলো।। একসময় সে বন্ধুদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কলেজের আটতলার ছাদে উঠে আসে। তারপর নিচে অবস্থানরত তার বন্ধুদের দিকে চেয়ে বলতে লাগলো, “শোনো বন্ধুরা, এ-জীবন আমার কাছে এখন দুর্বিষহ। অনামিকার সঙ্গলাভ ব্যতীত আমার মনের দুঃখ কখনও ঘুচবে না। তাই, আমি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমি আজ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবো। কেউ আমাকে ঠেকাতে পারবে না। আমার এই জীবনের কোনো প্রয়োজন নাই। আমি এখন সর্বস্বান্ত একজন মানুষ। আমার বেঁচে থেকে কোনো লাভ নাই। আমি চললাম বন্ধুরা। বিদায় ক্যাম্পাস। বিদায় পৃথিবী। বিদায় বন্ধুরা।”
তার কথা শুনে পুরা কলেজ হায়-হায় করে উঠলো। কেউবা তাকে নিষেধ করতে থাকে। আবার কেউবা কান্না জুড়ে দিলো। আবার বুদ্ধিমানদের মধ্যে দুই-একজন কোত্থেকে একখানা চাদর এনে কয়েক বন্ধুর সঙ্গে মিলে নিচে মেলে ধরলো। যাতে সে লাফ দিলেও তাকে বাঁচানো যায়। হায় রে মানুষের প্রচেষ্টা! আত্মহননকারীকে বাঁচাতে চায় ছোট্ট একটা চাদর মেলে! যার বুকের ভিতরে মরে যাওয়ার দুঃস্বপ্ন বাসা বেঁধেছে তাকে কখনো ছোট্ট চাদর দিয়ে বাঁচানো যায়? ওর প্রয়োজন পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্নেহ, মমতা ও প্রেম। শুধু ভালোবাসা দিয়ে এবং নতুন স্বপ্ন ওর মনে জাগিয়ে আজ ও-কে বাঁচাতে হবে। কিন্তু সেই কাজটি করবে কে?

পুরা কলেজের ছেলে-মেয়ে নিচে জমায়েত হয়েছে। এমন সময় ভিড় ঠেলে ভবনের সামনে এসে দাঁড়ালেন কলেজের বাংলার সহকারী অধ্যাপক জামালউদ্দিন সাহেব ওরফে জামাল-স্যার। তিনি আসিফের দিকে তাকিয়ে একটা প্রচণ্ড হুংকারে বলে উঠলেন, “তুমি আত্মহত্যা করবে ভালো কথা। কিন্তু তার আগে তুমি আমার একটি প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাও। একজন শিক্ষক হিসাবে এটি তোমার কাছে আমার শেষ-অনুরোধ।”

আসিফ এখন মরণমুখী। সে কিছুটা চেঁচিয়ে বললো, “বলুন স্যার, আপনার কী প্রশ্ন?”
জামাল-স্যার বললেন, “তোমাকে নিচে এসে আমার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।”
জামাল-স্যারের সঙ্গে আসিফের কথোপকথন চলছে|
ততক্ষণে কয়েকজন পিছনের সিঁড়ি দিয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে দিয়েছে।
আসিফ বললো, “আপনি প্রশ্ন বলুন স্যার। আমি এখান থেকেই উত্তর দিবো।”
জামাল-স্যার তার চশমাটা খুলে বললেন, “আসিফ, তুমি আমার প্রিয় ছাত্রদের একজন। তুমি কারও সঙ্গে কখনো বেআদবি করোনি। আমাকেও তুমি সদাসর্বদা ভক্তিশ্রদ্ধা করো। আজ তোমার জীবনের শেষদিনে তুমি আমাকে এতগুলো ছেলেমেয়ের সামনে অবজ্ঞা করবে? বাবা, আমি তোমাকে কোনো ধোঁকা দিচ্ছি না। তুমি একবার নিচে নেমে আসো। আর আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তারপর না হয় আত্মহত্যা করবে। কিন্তু আমার প্রশ্নটা তো গোপনীয়। আমি কথা দিচ্ছি এরপর তোমাকে আর বাধা দিবো না।”
আসিফ কী যেন ভাবতে থাকে। এমন সময় পিছন থেকে তাকে জাপটে ধরে ফেলে তার বন্ধুরা। সবাই মিলে তাকে পাঁজাকোলা করে নিচে নামিয়ে আনলো। আসিফ নিচে এসেও বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করে শেষে জামাল-স্যারকে দেখে মাথানিচু করে তার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। তাকে এখন একজন বড়সড় অপরাধীর মতো লাগছে।
জামাল-স্যার কোনোপ্রকার ভনিতা না করে সরাসরি তাকে বললেন, “এই জীবনটা কি তোমার?”
আসিফ সাধারণ এই প্রশ্নটা শুনে থতমত খেয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকে। শেষে বোকার মতো বলে বসলো, “জ্বি স্যার, এটা আমার জীবন।”
জামাল-স্যার বললেন, “তুমি মিথ্যা বলছো। তোমার এই জীবনের মালিক আল্লাহ। আর তোমার এই জীবনের ওপর সবচেয়ে বড় অধিকার রয়েছে মহান আল্লাহর, এবং তোমার জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী পিতামাতার। তুমি আল্লাহর হক আদায় করোনি। আবার তোমার পিতামাতার আশা-ভরসা বিনাশ করে স্বার্থপরের মতো তুমি আত্মহত্যা করতে চলেছো! এই জীবন তোমার নয়। তাই, তুমি এ-কে হত্যা করতে পারো না। তুমি কখনও আত্মহত্যা করতে পারো না। তোমার আত্মহত্যা করার কোনো অধিকার নাই। আজ আত্মহত্যার আগে তুমি ভাবো—তোমার আত্মহত্যা করার কোনো অধিকার আছে কিনা? আর এই জীবন শুধু তোমার কিনা?”
তারপর জামাল-স্যার একটুখানি থেমে আবার বলতে লাগলেন, “আর সামান্য একটা মেয়ের জন্য কেউ কখনও এতবড় একটা জীবন বিনাশ করে! এই জীবনের কত মূল্য! এ-তো মহাজীবন। আর পরকালে এর মূল্য অপরিমেয়। তা তুমি জানো না। তুমি তোমার ভবিষ্যৎ না জেনেই মনগড়াভাবে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছো। অথচ, তোমার ভবিষ্যৎ তোমার মনোবাসনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণও হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে—তোমার সঙ্গে কোনো একদিন অনামিকার দেখা হবে। তোমাদের বিয়েও হতে পারে। কিন্তু তাই বলে ঝোঁকের বশে এভাবে আত্মহত্যা করাটা অনৈতিক ও বোকামি। এখন তুমিই ভেবে দেখো, তোমার কী করা উচিত। আর আমার শেষকথা: জীবনের পরিণতিসম্পর্কে আরও বেশি করে ভাবো। এতো তুচ্ছ বিষয়ের জন্য এই মহাজীবনকে এভাবে শেষ করার কথা কখনও ভেবো না। জীবনসম্পর্কে অত্যুচ্চ ধারণা পোষণ কর। আমাদের জীবনের পরিণতি যেন সৎভাবে, সত্য, সুন্দর ও মহাজীবনের পথে ধাবিত হয়—তা-ই আমাদের সবসময় ভাবতে হবে। আত্মহত্যার মতো পাপের পথ থেকে ফিরে আসো, যুবক। আর জীবনের সর্বক্ষেত্রে একমাত্র মালিক মহান আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখো। আর আল্লাহর রহমত থেকে কখনও দূরে সরে যেয়ো না। আল্লাহর রহমত থেকে কখনো তোমার মুখটি ফিরায়ে নিয়ো না। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা তোমার।”
জামাল-স্যার চলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ আসিফ বলে উঠলো, “স্যার, এছাড়া আমার আর-কিছু করার নাই।”
স্যার এবার যেন বাঘের মতো গর্জে উঠলেন। আর বললেন, “তোমার স্পর্ধা কত! তুমি আত্মহত্যা করতে চাও! তুমি তো স্বার্থপর বেঈমান। শুধু নিজের স্বার্থে আত্মহত্যা করে সুখ পেতে চাও। আর সংগ্রামমুখর জীবন থেকে পালিয়ে যেতে চাও। কিন্তু যে পিতামাতা তোমাকে অনেক সুখের জন্য লালনপালন করেছেন, তোমাকে বড় মানুষরূপে খুব দেখতে চান, তুমি তাদের কথা একবারও ভাবছো না।! কতটা নরাধম তুমি হয়েছো! আরে, সামান্য একটা মেয়ের জন্য কেউ আত্মহত্যা করে নাকি? তুমি জীবন দিবে ভালো কথা। তবে দেশের জন্য জীবন দাও। জাতির পক্ষে জীবনবাজি রাখো। আর মানুষ ও মানবতার স্বার্থে তোমার এই অমূল্য জীবনকে বিসর্জন দাও। কিন্তু তাই বলে একটা মেয়ের জন্য এভাবে কেউ কখনো জীবন দিতে পারে? এগুলো গাধাদের কাজ। তুমি তো ভালো ছাত্র। তোমার জীবন কেন এভাবে নিঃশেষিত হবে? এই মহাজীবনের মূল্য উপলব্ধি করতে শেখো। আগে নিজেকে ভালোবাসতে শেখো। তারপর অন্যকে ভালোবাসবে। আর যে নিজেকে ভালোবাসতে পারে না—সে কখনো কাউকে ভালোবাসতে জানে না। তোমার আবেগ ও যাবতীয় প্রাক্ষোভিক চেতনা এখনই নিয়ন্ত্রণ করো। এই জীবন বড় মধুর ও সুন্দর। তুমি বেঁচে থাকলে একদিন-না-একদিন তোমার অনামিকার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। কিন্তু এভাবে মূর্খের মতো জীবনবিসর্জন দিলে তাতে তোমার বা অনামিকার কী লাভ বলো? আর অনামিকা যদি তোমাকে ভালোবাসে সেও তোমার এই আত্মহননকে একদিন ঘৃণা করবে। সে তো তোমাকে পেতে চাইবে। কিছু আবেগ, কিছু জেদ আর কিছু তুচ্ছবিষয়ে দুঃখের বশবর্তী হয়ে এই মহাজীবনকে নরকযন্ত্রণার পথে ধাবিত কোরো না। ভালো থেকো বাবা। বেঁচে থাকো দীর্ঘকাল। চেয়ে দেখো, পৃথিবী এখনও কত সুন্দর! তুমি কি জানো না—আর ক’দিন পরেই ফুটবে ভালোবাসার কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া। আরও কত নাম-না-জানা ফুল। ফাল্গুন আসছে পৃথিবীতে। আর তুমি চলে যাবে সব ফেলে? পৃথিবীর এত-এত শোভা রেখে তুমি কেন মরবে যুবক? ভুল করে তুমি কেন মরবে যুবক?”

কথাগুলো শেষ করে জামাল-স্যার বীরদর্পে বেরিয়ে গেলেন ভিড় ঠেলে। তিনি কোনোদিকে না তাকিয়ে শুধু সামনের দিকে হাঁটতে লাগলেন।
সবার মনে হলো: তিনি যেন একজন ফেরেশতা! তাইতো আসিফকে দেখিয়ে গেলেন মহাজীবনের পথ।

পুরা কলেজ আসিফের চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর সে মাথানিচু করে কী যেন ভাবছে। আত্মহত্যা করার আগে তাকে আরও ভাবতে হবে। নাকি সেও ভাবছে মহাজীবনের কথা?


পুনশ্চ: জীবনের মানে কী—তা আসিফ আজও ভালোভাবে জানে না। তবে সে এসব এখন জানার চেষ্টা করছে। অনামিকার কথা সে এখন একটু কম ভাবে। আর সে-সব ভাবতে গেলে তার মাথাটা সবসময় ঝিমঝিম করে। তাই, সে দিনের বেশিরভাগ সময় বাসার বারান্দায় বসে বই পড়ে কাটায়। বই পড়তে তার এখন খুব ভালো লাগে। জামাল-স্যারের সংস্পর্শে থেকে সে দিনে-দিনে সাহিত্যবিষয়ক বই পড়তে শিখেছে। সাহিত্যের প্রিয় বইগুলো তার কাছে জামাল-স্যারের মতো মনে হয়। একটা বই পড়া শেষ হতে-না-হতেই সে জামাল-স্যারের কাছে গিয়ে আরেকটি নতুন বইয়ের নাম জেনে তা কিনে তবেই বাসায় ফেরে।
সে কৃতিত্বের সঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে। পছন্দমতো একটা বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হওয়ার জন্য সে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবখানে তার অভিভাবক হয়ে কাজ করছেন জামাল-স্যার। তাঁর নির্দেশনায় আসিফ ঢাকা-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে একজন মানুষের মতো মানুষ হতে চায়।
যদি কারও হাতে কখনো একটুখানি সময় হয়—তবে সে যেন যায় মির্জাপুরে আব্দুল জলিল মির্জার বাড়িতে। গিয়ে দেখবে, সেখানে খুব সুন্দর একটা দ্বিতল-ভবনের বারান্দায় বসে সকাল-বিকাল একাগ্রচিত্তে বই পড়ছে মির্জা মোহাম্মদ আসিফউদ্দিন বাহার আসিফ। তার মনে এখন...। থাক, আর লিখে কাজ কী?


© সাইয়িদ রফিকুল হক
০৬/১১/২০১৮





সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:১২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাস্তায় পাওয়া ডায়েরী থেকে-১১১

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:২২



দুটি হাঁসের পিছনে একটি হাঁস, দুটি হাঁসের সামনে একটি হাঁস, এবং দুটি হাঁসের মাঝখানে একটি হাঁস। মোট ক’টি হাঁস রয়েছে?

১। লোকে যে কেন বসন্তের গুনগান করে বুঝতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মোয়াবিয়া ছিল সত্যদ্রোহী, হাদিস শরীফ দ্বারা প্রমাণীত

লিখেছেন রাসেল সরকার, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:৩৩




عن أَبِي سَعِيدٍ الخدري ، قَالَ: " كُنَّا نَحْمِلُ لَبِنَةً لَبِنَةً وَعَمَّارٌ لَبِنَتَيْنِ لَبِنَتَيْنِ ، فَرَآهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَنْفُضُ التُّرَابَ عَنْهُ ، وَيَقُولُ: وَيْحَ... ...বাকিটুকু পড়ুন

গাড়ীর সবকিছু এক নম্বর শুধু ব্রেকটা একটু নড়বড়ে!

লিখেছেন শাহিন-৯৯, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:০২




দলের ভিতর শেখ হাসিনার চলমান শুদ্ধি অভিযান দেখে উপরের শিরোনামটি মনে পড়ল, ভাল কিছু করতে হলে আগে নৈতিক স্বচ্ছতা থাকতে হয় তাহলে মানুষ মন থেকে নিবে।
ছাত্রলীগের... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি রক্তাক্ত লাল পদ্ম

লিখেছেন ইসিয়াক, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:৫৪


সেল ফোনটা বেজেই চলেছে ।বিরক্ত হয়ে ফোনটা তুললাম। রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে বলে নাম্বারটা না দেখেই চেঁচিয়ে বললাম ।
-এই কে ?
- আমি ।
মিষ্টি একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সবাই যদি দেশকে ভালোবাসে, এত ভালোবাসা যায় কোথায়?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ৮:১৮



সবাই ভালোবাসা চায়, সবাই ভালোবাসতে চায়, নারীরা হয়তো একটু বেশী চান, এটাই প্রকৃতির নিয়ম! কোন দেশ তার নাগরিকের কাছে কোনদিন ভালোবাসা চাইতে আমি শুনিনি; বিশেষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×