somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সাইয়িদ রফিকুল হক
আমি মানুষ। আর আমি ত্বরীকতপন্থী-মুসলমান। আমি মানুষ বলে আমার ভুলত্রুটি হতে পারে। বই পড়তে খুব ভালো লাগে। আমি সাহিত্য ভালোবাসি। আর লেখালেখি আমার খুব শখের বিষয়। কিন্তু, বর্তমানে আমি বাংলাদেশ-রাষ্ট্র ও গণমানুষের জন্য লেখনিশক্তিধারণ করেছি।

গোয়েন্দা-গল্প: গোয়েন্দা লালভাই: অধ্যাপক-খুনের রহস্য (চতুর্থ পর্ব)

০৮ ই নভেম্বর, ২০১৯ রাত ৮:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গোয়েন্দা-গল্প: গোয়েন্দা লালভাই
অধ্যাপক-খুনের রহস্য (চতুর্থ পর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

প্রথম পর্বের লিংক: Click This Link
দ্বিতীয় পর্বের লিংক: Click This Link
তৃতীয় পর্বের লিংক: Click This Link

আজ সকালে আমাদের তিনজনের ব্যস্ততা খুব বেড়ে গেছে। আমরা ধামরাইয়ে যাওয়ার আগে নিজেদের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সকল কাজকর্ম গুছিয়ে নিচ্ছি। আর সবখানে আমাদের শতভাগ মনোযোগ কাজ করছে। আমরা দুই ভাই—আমি আর লালভাই নিজেদের গোপন-ক্যামেরাসহ যাবতীয় সরঞ্জামাদি শরীরের জ্যাকেটে ও কাঁধ-ব্যাগে বহন করছি।

আমরা দ্রুত নাস্তা শেষ করে ফেললাম। তারপর একসঙ্গে প্রবেশ করলাম লালভাইয়ের পাঠকক্ষে। আতিক ভাই খুব সকালে আমাদের এখানে এসে হাজির হয়েছেন। তিনি খুব সুন্দরভাবে একজন পেশাদার-রিক্সাওয়ালার বেশধারণ করেছেন। আমরা দুই ভাই এখন নিজেদের কাজে ব্যস্ত। লালভাই তার দাড়ি-গোঁফ লাগানোর ফাঁকে-ফাঁকে বলতে শুরু করলেন:

সাজিদ, সবসময় আমার কাছে-কাছে থাকার চেষ্টা করবি। আমি না বললে কাউকে কোনো বিশেষ একটা প্রশ্ন করতে যাবি না। তবে আমি কোথাও ঢুঁ মারতে গেলে কিংবা তদন্তের প্রয়োজনে তোর সামনে থেকে সরে গেলে তখন বিশেষ কারণে দরকারি-কথা বললে কোনো সমস্যা নাই। আর আমি কোনোকিছু ইঙ্গিত করার সঙ্গে-সঙ্গে তা বোঝার চেষ্টা করবি। ওই বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গে তুই সবকিছু খুব সাবধানে ও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভিডিও-ধারণ করতে থাকবি। এব্যাপারে কখনো কোনোরকম গাফিলতি করবি না। আর বিশেষ-বিশেষ জায়গাগুলো খুব ভালোভাবে ভিডিও করবি। বাড়ির সকলকে ভিডিওয়ের আওতায় আনবি। কাউকে গুরুত্বহীন মনে করে তাকে ভিডিও-ধারণ করা থেকে বাদ দিবি না। আবারও বলছি: আমি যখন কোনো কাজে কোথাও ঢুঁ মারতে যাবো বা কোনো তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্য হাতসাফাইয়ের কাজ করতে যাবো—তখন তুই বাড়ির লোকদের প্রশ্ন করে ব্যস্ত রাখবি। মানে, তাদের তোর কাছে ধরে রাখবি। যাতে আমি নিরাপদে আমার কাজগুলো সাবধানে করতে পারি। খুব সাহসের সঙ্গে নিজের কাজ করবি। এখানে, কোনো ভয়ের কিছু নাই। আমরা আজ সত্যিকারের পেশাদার-সাংবাদিক। নিজের পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখিস। আর মনে রাখিস: ওই বাড়ির লোকজন কিন্তু খুব ধূর্ত বা চালাক। ওদের ম্যানেজ করেই আমাদের সবকিছু করতে হবে। আতিক আমাদের সঙ্গে বাড়ির ভিতরে যেতে পারবে না। কারণ, সে আজ একজন রিক্সাওয়ালা। তবুও আশা যে, সে মেইন গেইটের বাইরে থাকবে। আর গেইটের পাহারারত পুলিশের সঙ্গে নানারকম গল্প জমাবার চেষ্টা করবে।

তারপর তিনি বিশেষভাবে আতিক ভাইয়ের দিকে চেয়ে বললেন, “তুমি আজ খুব সতর্ক থাকবে। আমরা ভিতর থেকে কোনো ইঙ্গিত করলে তুমি সঙ্গে-সঙ্গে তা পালন করতে থাকবে। এব্যাপারে কোনোপ্রকার কালবিলম্ব করবে না।”
আতিক ভাই হেসে বললেন, “আমি গেইটের পাশেই থাকবো। তুমি যা বলবে তা-ই পালন করবো। এব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।”
লালভাই একটু হাসলেন। তারপর আতিক ভাইয়ের কথায় সন্তুষ্ট হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই আজ খুব সাহসী হয়ে উঠবি। কোনো ভয় পাবি না। নিজেকে একজন সাংবাদিক ভাববি। আর গতকাল থেকে তোকে তো আমাদের দৈনিক সত্যবাণীর সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়েছে। তুইতো এখন জেনুইন সাংবাদিক। কাজেই কোনো ভয় পাবি না। আর সবকিছু ভিডিও করার পাশাপাশি ওদের বক্তব্যও রেকর্ড করবি। আর কোনোকিছুতে যেন ফাঁক না থাকে। আজকের দিনটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
আমি লালভাইয়ের কথায় সম্মতি জানালাম। আর ভিতরে-ভিতরে আমি এখন বেশ সাহসী হয়ে উঠেছি।
সকল প্রস্তুতিশেষে এখন থেকেই আমাদের চোখ-কান খোলা রেখে আমরা বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। তিনজনে রিক্সায় চড়ে এলাম বাসস্ট্যান্ডে। এখন একটা বাস ধরার অপেক্ষামাত্র।
আজ সকালে বাসে তেমন-একটা ভিড় নাই। আমরা তিনজনে বাসে উঠে পড়লাম। আর যথারীতি তিনজনে সিটও পেয়ে গেলাম। বাসে বসে আমরা কোনো কথাবার্তা বললাম না। এই ফাঁকে আমি আমার কাজগুলো মনে মনে আবার গুছিয়ে নিতে লাগলাম।

সকালে রাস্তা একদম ফাঁকা থাকায় খুব তাড়াতাড়ি আমরা ধামরাই-বাসস্ট্যান্ডে এসে নামলাম। আর এখান থেকেই শুরু হলো আমাদের সবরকমের সতর্কতা। আমরা তিনজন খুব হুশিয়ার হয়ে রাস্তা পার হলাম। তারপর সরকারপাড়া যাওয়ার রাস্তার মুখে এসে দাঁড়ালাম।
আতিক ভাই আমাদের চেয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন। বুঝতে পারলাম, তিনি সেই রিক্সাটা খুঁজছেন। আর একটু পরে তা পেয়েও গেলেন ধারেকাছেই।
আতিক ভাই আমাদের আজকের প্রয়োজনে বিশেষ রিক্সাটা চেনার জন্য তার বন্ধুর কাছে দ্রুত ফোন করলেন। এর কিছুক্ষণ পরে একটা রিক্সাওয়ালার কাছে ফোন এলো। আর ফোন পেয়ে রাস্তার পাশ থেকে রিক্সাসহ একটা লোক আতিক ভাইয়ের কাছে এসে তাকে হাসিমুখে সালাম দিয়ে খুব সম্মানের সঙ্গে বললো, “স্যার, আপনে কি শফী ভাইয়ের বন্ধু?”
আতিক ভাই মাথা ঝাঁকাতেই সে রিক্সাটা তার সামনে রেখে বললো, “স্যার, আপনাদের যতক্ষণ খুশি এটা ব্যবহার করবেন। আর কাজ শেষ হলে ফোনে আমাকে জানাবেন। আমি এসে রিক্সাটা নিয়ে যাবো।”
আতিক ভাই ওর ফোন-নাম্বার রেখে দিলো। সে যাওয়ার সময় আমাদের জানালো—তার নাম আব্দুস সাদেক। লোকটাকে আমাদের ভালো লেগেছে।
আমাদের এই রিক্সা-হস্তান্তর খুব কৌশলের সঙ্গে করা হলো। যাতে কেউ এটার কোনো কারণ বুঝতে না পারে।
কাজ শেষে আমরা দুই ভাই রিক্সায় উঠে পড়লাম। আর আতিক ভাই চালকের আসনে। শক্তিমান আতিক ভাইয়ের প্যাডেলে আমাদের রিক্সা এখন অশ্বগতিতে ছুটছে!

আমরা অত্যন্ত স্বল্পসময়ে সরকার-মঞ্জিলের কাছাকাছি চলে এসেছি। লালভাই মঞ্জিলের একেবারে কাছে না গিয়ে এখানেই আতিক ভাইকে থামতে বললেন। একটু বাড়তি কৌশল অবলম্বনের জন্য যে তিনি এমনটি করছেন—তা আমার বুঝতে বাকি রইলো না।
লালভাই রিক্সা থেকে নেমে আতিক ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, “তুমি আপাতত এখানে দাঁড়াও। আমরা ভিতরে গেলে তারপর তুমি সরকার-মঞ্জিলের মেইন গেইটের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। আর সবসময় চোখ-কান খোলা রাখবে। আর তোমার পকেটের মোবাইলটা এখন হাতে রাখো। ভিতর থেকে আমাদের কোনো ইনফরমেশন পেলে সঙ্গে-সঙ্গে তা পালন করবে।”
আতিক ভাই ‘ঠিক আছে’ বলে লালভাইয়ের কথায় সায় জানালেন।
আমরা দুইজন সামনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। একটু পরেই এসে দাঁড়ালাম সরকার-মঞ্জিলের মেইন গেইটের সামনে।
গেইটের কাছে এসে দেখি, আজকে পুলিশ দুইজন। লালভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “নিরাপত্তা মনে হয় আগের চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে। আর সম্ভবত ওদের মনে ভয় ঢুকে গেছে।”
পুলিশ দুইটার চোখে-মুখে বেশ রাগ-রাগ-ভাব। বুঝতে পারছি, ওরা বেশ কড়া ডিউটি দিচ্ছে আজকাল। লালভাই এসব দেখে আমার দিকে একবার তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন। তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে আমাকে বললেন, “নিজেকে একজন সাংবাদিক ভাবতে থাক। আজ ওদের মেজাজ খুব কড়া।”
ওদের মেজাজ যতোই কড়া থাক না কেন—লালভাই এসব পাত্তা না দিয়ে সরকার-মঞ্জিলের মেইন গেইটের একেবারে কাছে এসে দাঁড়ালেন। তা দেখে একটা পুলিশ গেইটের ভিতর থেকে আমাদের খুব কাছাকাছি এসে বললো, “আপনারা কাউকে চাচ্ছেন?”
এদের কথাবার্তা একেবারে চাঁছাছোলা। ভদ্রতার সামান্যতম লেশমাত্র নাই।
লালভাই আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত বিনীতভঙ্গিতে বললেন, “আমরা দুজন সাংবাদিক। মরহুম অধ্যাপকসাহেবের ওপর একটা বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য আমরা এখানে এসেছি। এজন্য বাড়ির ভিতরে আমাদের ঢুকতে হবে।”
একথা শুনে পুলিশটি সঙ্গে-সঙ্গে পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলতে লাগলো, “দাঁড়ান, দাঁড়ান। আগে ওসিসাহেবরে ফোন দেই। তিনি যদি আপনাদের ভিতরে ঢুকতে দেন তাইলে ঢুকতে পারবেন। আর তা-না-হলে আপনাদের এখনই ফিরে যেতে হবে। এখানে অনর্থক কারও ঘোরাফেরা করা একদম নিষেধ।”
লালভাই এসব শুনে কিছু বললেন না। তিনি খুব সাবধানী আর কৌশলী। কখন-কোন বুদ্ধি বের করতে হয় তা তিনি বেশ ভালোভাবেই জানেন। কারও সঙ্গে অহেতুক বাক্যালাপ করাটা তার স্বভাব নয়।
পুলিশটি ততক্ষণে ফোনে ওসির সঙ্গে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে।
একপর্যায়ে পুলিশটি আমাদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, “আপনাদের পত্রিকার নাম?”
লালভাই কোনোপ্রকার ভনিতা না করে বললেন, “দৈনিক সত্যবাণী।”
এরপর পুলিশটি গেইটের ভিতর থেকে লালভাইয়ের দিকে তার হাতের ফোনটি এগিয়ে দিয়ে বললো, “ধরেন, ওসিসাহেবের সঙ্গে একটু কথা বলেন।”এরপর সে গেইটের কাছেই দাঁড়িয়ে রইলো।
লালভাই ফোনটা কানে লাগানোর আগে স্পিকার অন করে নিলেন—যাতে আমিও সবকিছু ভালোভাবে শুনতে পাই।
মুহূর্তের মধ্যে ওপাশ থেকে ওসিসাহেবের কর্কশকণ্ঠ ভেসে এলো, “আপনার নাম কী?”—আগের পুলিশটির মতো একেবারে চাঁছাছোলা কথা। এখানেও সামান্য ভদ্রতার কোনো লেশ নাই।
লালভাই স্মিত্যহাসে বললেন, “আমার নাম আবুল খায়ের মোহাম্মদ।”—স্বাভাবিক কণ্ঠ তার। সাংবাদিক পরিচয়ের জন্য তিনি সবসময় এই নামটি ব্যবহার করে থাকেন। এটি তার বড়সড় নামটার প্রথম অংশ মাত্র।
“আপনার পত্রিকার নাম?”—ওসি বিরক্তির সঙ্গে এবার প্রশ্ন করলো।
“দৈনিক সত্যবাণী।”—এবারও লালভাইয়ের কণ্ঠ একেবারে স্বাভাবিক।
“এই নামে বাংলাদেশে কোনো পত্রিকা আছে?”—ওপাশ থেকে ওসিসাহেব বেশ ঝাঁঝ নিয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথাটা বললো। আর তার কণ্ঠে ছিল প্রচণ্ড বিদ্রুপভাব।
লালভাই সঙ্গে-সঙ্গে বলিষ্ঠকণ্ঠে বললেন, “আছে দেখেই তো আমরা এসেছি। এটা হলো ভদ্রলোকের পত্রিকা। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভদ্রলোকই এই পত্রিকার নাম জানেন।” —লালভাই ওসিকে ভদ্রভাবে জুতা মেরে দিলেন।
“তা আপনারা কী করতে চান।”—লোকটার ঝাঁঝ ও তেজ এখনও কমেনি।
“বেশি কিছু না। এই নিহত অধ্যাপকসাহেবের বাড়িটা একটু ঘুরে দেখবো। তারপর অধ্যাপকসাহেবের আপন-ভাগ্নে যে এমন একটা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে—তা আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদনে তুলে ধরবো। আর সঙ্গে অধ্যাপকসাহেবের পুত্রবধূর একটা সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নিবো, এই আরকি।”—লালভাই কৌশলগত কারণে খুব সহজ একটা রিপোর্ট তৈরির কথা বললেন।
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ পরে গমগমে আওয়াজ ভেসে এলো: “আচ্ছা উনার সঙ্গে বেশি কথা বলবেন না। ভদ্রমহিলা এমনিতেই ভীষণ শকড্। আর বুঝতেই পারছেন এই মামলা তো শেষপর্যায়ে। অধ্যাপকসাহেবকে উনার আপন-ভাগ্নেই খুন করেছে। এব্যাপারে আমার চার্জশিট প্রায় কমপ্লিট। আচ্ছা, এরচেয়ে বেশি কিছু জানার থাকলে আপনারা আমার থানায় আসবেন।”
লালভাই বললেন, “জ্বি, আচ্ছা।”
তারপর ওসি ওপাশ থেকে বললো, “ঠিক আছে, আপনারা বেশি সময় নিবেন না। আর আপনার হাতের ফোনটা আমার কনস্টেবলকে দিন তো।”—তার একথাটার মধ্যেও একটা আদেশভাব।
লালভাই ফোনটা সেই কনস্টেবলকে দিয়ে একটু ঘুরে দাঁড়াতেই দুই পুলিশ আমাদের জন্য গেইট খুলে দিলো। আমরা ভিতরে ঢুকে পড়লাম। আর তখন থেকেই আজ আমাদের তদন্তের কাজ শুরু হয়ে গেল।
ভিতরে ঢুকে আমি একটু পিছনফিরে তাকিয়ে দেখি—আতিক ভাই তার অবস্থানে রয়েছেন।

অনেকবড় বাড়ি। আমরা আজ মেইন গেইট দিয়ে ঢোকার পর থেকে সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখতে লাগলাম। আর আমাদের সঙ্গে লুকানো ক্যামেরা দ্বারা সবকিছু ভিডিও করতে লাগলাম।
একটা পুলিশ আমাদের পিছনে আসছে। আমরা সেটা আড়চোখে দেখে নিলাম। ভেবেছিলাম, পুলিশটি আমাদের সঙ্গে সারাক্ষণ ঘুর ঘুর করে বিরক্ত করবে। দেখলাম, তা নয়। সে বরং আমাদের উপকারই করলো। ভিতরবাড়ির গেইট খোলার ব্যাপারে সহযোগিতা করলো।

শাহীনা বেগম আজ অত্যন্ত নীরসবদনে গেইট খুলে ভবনের ভিতরে আমাদের ঢুকতে দিলো। পুলিশটি আমাদের সঙ্গে আর ভিতরে ঢুকলো না। তারপর নীরবে সে যে-ভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে গেল। তা দেখে মনে মনে আমরা তাকে ধন্যবাদ জানালাম।
ভবনের ভিতরে ঢোকার সময় লালভাই আমাকে বললেন, “প্রথমে হয়তো আমাদের ড্রইংরুমে বসতে দিবে। আমি কোনো একটা অজুহাতে বা ছুতো খুঁজে ঘরের ভিতরে ঢুকে যাবো। তুই এইসময় শাহীনা বেগমকে নানারকম প্রশ্ন করে ব্যস্ত রাখবি। আর মনে রাখিস: সমস্ত বক্তব্য কিন্তু আমাদের রেকর্ড করতে হবে। আর এসব যেন শাহীনা বেগম কখনো টের না পায়। তাহলে, সে আমাদের সঙ্গে অনেক কথা এড়িয়ে যাবে।”
লালভাইয়ের কথাই সত্য। শাহীনা বেগম আমাদের প্রথমে ড্রইংরুমেই বসতে বললো। আমরা তার কথামতো সেখানেই বসলাম।
আমাদের বসতে বলে সে ভিতরের দিকে গেল। আর বললো, “ছেলে-মেয়ে দুটো বাইরের লোকজন দেখলে ভয় পায়। তাই, ওদের কাজের মেয়েটার জিম্মায় রেখে আসি। তারপর আপনাদের সঙ্গে কথা বলবো।”
আমরা এতেই খুশি। আমাদের যা করার আমরা এখন থেকেই তা করতে শুরু করে দিয়েছি।
শাহীনা বেগম ভিতরে ঢুকে যেতেই লালভাই পাশের রুমটাতে ঢুকে পড়লেন। তিনি অত্যন্ত সতর্ক আর সজাগ। তার মনটা সবসময় অনুসন্ধানে তৎপর।
ড্রইংরুমে এখন আমি একা বসে রয়েছি। আর ভাবছি: কখন লালভাই আসবেন!
লালভাই পাশের রুমে ঢুকে পড়ায় আমার মনে কেমন যেন একটা ভয়-ভয়-ভাব বিরাজ করছে। চারিদিকে কয়েকবার তাকাতে লাগলাম। কোনোপ্রকার আলামত আমার চোখে পড়ছে না। আমার সঙ্গে থাকা ক্যামেরা দুটো এখনও সচল রয়েছে। একটা হাতে। বাকিটা শরীরের এমন জায়গায় লাগানো রয়েছে যে, তা শাহীনা বেগম কেন ওসি গোলাম মওলার বাপও ঠিক পাবে না।

আমি চুপচাপ বসে লালভাইয়ের মঙ্গল কামনা করতে লাগলাম। দশ মিনিট পেরিয়ে গেলেও শাহীনা বেগমকে আসতে দেখলাম না। এদিকে লালভাইও আসছেন না! আমার মনটা অনেককিছু ভাবতে থাকে।
আরও কয়েক মিনিট পরে শাহীনা বেগম ড্রইংরুমে ঢুকলো। তার আগে দেখি, আমার ডানপাশের একটা খোলা দরজা দিয়ে লালভাই আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। লালভাই এত দ্রুত রুমে প্রবেশ করেছেন যে, শাহীনা বেগম তাকে দেখে কোনোকিছু সন্দেহ করতে পারলো না।
শাহীনা বেগম খুব জড়সড় হয়ে আমাদের সামনের সোফাটায় বসলো। আর আমরা দুজন তার মুখোমুখি বড় সোফাটায় বসেছি। তার মধ্যে একটা জড়সড়-ভাব। কিন্তু মানুষের ভয়ভীতি বলে যে একটাকিছু থাকে—তা এই মহিলার মধ্যে একবারও দেখতে পেলাম না।
আমরা যে গতকাল গোয়েন্দা হিসাবে এখানে হাজির হয়েছিলাম—তা সে বুঝতে পারেনি। আমাদের সাজপোশাকে আজ অন্যরকম লাগছে। আর বেশ মানিয়েছে আমাদের।
তাকে চুপচাপ বসতে দেখে লালভাই বললেন, “শুভসকাল। কেমন আছেন আপা?”
শাহীনা বেগম একটু হাসার চেষ্টা করে বললো, “জ্বি, ভালো।”
তারপর সে খুব রুক্ষভাবে আমাদের উদ্দেশ্যে বললো, “আপনাদের যা জিজ্ঞাসা করার তাড়াতাড়ি করেন। আমার হাতে অনেক কাজ জমে আছে। বুঝতেই তো পারছেন, ছোট-ছোট দুটি ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমার সংসার। কত কাজ যে পড়ে আছে!” কথাটা শেষ করে সে ব্যস্তসমেত এদিক-ওদিক কয়েকবার তাকালো।
লালভাই বললেন, “আপনাদের বাসার আগের কাজের মেয়েটা কোথায়? তাকে দেখছি না যে!”—লালভাই এমনভাবে কথাটা বললেন যেন ওই মেয়েটাকে তিনি কতদিন ধরে চেনেন।
কথাটা শোনামাত্র শাহীনা বেগম খুব বিরক্তির সঙ্গে বললো, “সে চলে গেছে।”
লালভাই বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, “কেন?”
এবার আরও রুক্ষভাবে শাহীনা বেগম বললো, “কেন আবার? তার অন্য কোনো জায়গায় হয়তো কাজ হয়েছে।”
“মেয়েটার নাম কী ছিল?”—লালভাই স্বাভাবিককণ্ঠে জানতে চাইলেন।
অনেকটা ভেংচি কাটার মতো করে শাহীনা বেগম বললো, “মরিয়ম।”
লালভাই বললেন, “ওর বয়স কত?”
অন্যদিকে তাকিয়ে মনভার করে শাহীনা বেগম বললো, “বাইশ-তেইশ হবে।”
“আপনাদের বাসায় কতদিন কাজ করেছিল? এব্যাপারে একটু বলুন।”—লালভাই বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন।
আগের মতো মুখভার করে শাহীনা বেগম বলে, “তা বছর আষ্টেক হবে।”
“এতদিন কাজ করার পর হঠাৎ সে চলে গেল! কেন?”—লালভাই খুব বিস্মিত হয়ে বললেন। তিনি যেন নিজের সঙ্গে হিসাব মিলাতে পারলেন না। এসময় তিনি কী যেন ভাবতে লাগলেন।
কিন্তু শাহীনা বেগম বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বললেন, “তা তাকে জিজ্ঞাসা করেন গিয়ে। সে কেন গেল আমি তার কী জানি?”
“না, আপনি কিছু জানেন কিনা?”—তবুও লালভাই কিছু জানার জন্য তাকে অনুরোধ করলেন।
শাহীনা বেগম এবার সোজাসাপটা বললো, “এব্যাপারে আমার কিছুই জানা নাই।”
লালভাই বললেন, “মরিয়মের গ্রামের বাড়ি কোথায়? যদি বলতেন।”
শাহীনা বেগম হঠাৎ একটুখানি নরম হয়ে বললো, “আমি এতকিছু জানি না। শুনেছি, ময়মনসিংহের কোথায় যেন ওদের বাড়ি। আমরা তাকে এত ভালোভাবে চিনতাম না। আমার শ^শুরের এক ছাত্র ও-কে আমাদের এখানে কাজের জন্য নিয়ে এসেছিল। সেই থেকে সে দীর্ঘদিন আমাদের সঙ্গে ছিল। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর সে কাউকে কিছু না বলে পরদিন কোথায় যেন চলে গিয়েছে! তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
শাহীনা বেগম এমনভাবে কথা বলছেন যেন অধ্যাপকসাহেব স্বাভাবিকভাবে মারা গিয়েছেন।
“যে ছাত্রটি মরিয়মকে এখানে এনেছিল সেই ছাত্রটির নাম কি জানা যাবে?”—লালভাই যেন একটা ক্লু পেয়ে গেছেন। তাই, খুব জরুরি মনে করে তাকে প্রশ্নটি করেছেন।
শাহীনা বেগমের ঝাঁঝ আবার বেড়ে গেল। আর খুব রাগতস্বরে বললো, “আমি তাকে চিনি না—জানি না।”
“আপনার শ্বশুর যখন খুন হন তখন আজাদ কালাম কোথায় ছিল?”—লালভাই এই প্রশ্নটি করে নিষ্পলকদৃষ্টিতে শাহীনা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই প্রশ্নটি যে খুব গুরুত্বপূর্ণ তা আমি তার হাবভাব দেখেই বুঝতে পারলাম।
শাহীনা বেগম কয়েক সেকেন্ড কী যেন চিন্তা করে খুব দক্ষতার সঙ্গে বললো, “সে তো ঘরেই ছিল। আর আমার শ্বশুরের পাশের রুমে ছিল। সেই তো হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বুড়ো মানুষটাকে খুন করেছে। আমরা তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি।”—কথাটা শাহীনা বেগম এমনভাবে বললো যেন সে কতটা আন্তরিক।
“আপনার শ্বশুর যখন খুন হচ্ছিলেন তখন আপনি কোথায় ছিলেন?”—লালভাইয়ের এই প্রশ্নে যেন শাহীনা বেগম ভিতরে-ভিতরে কিছুটা চমকে উঠলেন।
তারপর শাহীনা বেগম নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “আমি ভিতরের রুমে মেয়েটাকে পড়াচ্ছিলাম। ও তো সবেমাত্র স্কুলে যায়। আর ছোটটি আমার কাছেই বসা ছিল। আর ওসিসাহেব ছিলেন ড্রইংরুমে। তিনি আমাদের খামারবাড়ির কাজে এসেছিলেন।”
এরপর লালভাই শাহীনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপাতত আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ এখানে মুলতবী রইলো। বাকিটা আপনার শ^শুর যে ঘরে থাকতেন সেটা দেখার পর করবো।”—কথাটা বলে লালভাই সেই রুমটা দেখতে চাইলেন। আর এই কথাটা শেষ করে লালভাই উঠে দাঁড়ালেন।
শাহীনা বেগম কিন্তু উঠে দাঁড়াবার কোনো নাম করলো না। সে চুপচাপ আগের মতো বসে থেকে খুব ঠাণ্ডাগলায় বললো, “ওই রুমটা তো ওসিসাহেবের নির্দেশে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আর এর চাবিও আমার কাছে নাই। ওটা ওসিসাহেবের কাছে। রুমটা দেখতে চাইলে আপনারা থানায় যান। ওসিসাহেবের নিকট থেকে চাবি নিয়ে আসেন।”
কথাটা শোনার পর আমাদের মনে হলো সে যেন আমাদের বিদ্রুপ করছে। অবশ্য আমরা তা গায়ে মাখলাম না।
লালভাই দ্রুত কী যেন ভাবছেন। আমি স্থিরদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। তিনি একটু হেসে বললেন, “ঠিক আছে, এটা কোনো ব্যাপার নয়। আমরা পরে ওসিসাহেবের নিকট থেকে চাবি নিয়ে পরেও রুমটা দেখতে পারবো। আপাতত আপনার পুরো বাসাটা আমরা একটু ঘুরে দেখতে চাই। যদি আপনি রাজী থাকেন?”
এতে শাহীনা বেগম তেমন কোনো আপত্তি না করলেও মুখটা ভয়ানকভাবে মলিন করে কোনোরকমে উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের ভিতরের দিকে নিয়ে গেলেন। লালভাইয়ের নির্দেশে, চোখের ইশারায়, আগের পরিকল্পনা মোতাবেক এই মুহূর্তে আমি সবকিছু ভিডিও করতে লাগলাম। এই মুহূর্তে আমাকে একজন দক্ষ সাংবাদিকই মনে হচ্ছে।
আমরা প্রতিটি রুম খুব ভালোভাবে দেখতে লাগলাম। এই বাসার কোনোকিছুই আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে না। আর পুরো বাসাটা আমি ভিডিও করছি।

আমরা যখন বাসাটা দেখে ড্রইংরুমে এসে বসেছি, তখন দেখলাম, বাসার মেইন গেইটের কলিংবেল বেজে উঠলো। অমনি শাহীনা বেগম আমাদের কাউকে কিছু না-বলে ছুটে গেল দরজার কাছে। তারপর কাকে যেন কী-জন্য অপেক্ষা করতে বলে নিজে খুব দ্রুততার সঙ্গে ভিতরে ঢুকে পড়লো।
লালভাই আর কালবিলম্ব না করে গেইটের কাছে ছুটে গেলেন। এবার আমি আর বসে রইলাম না। লালভাইয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আর দেখলাম, গেটের বাইরে একটা আঠারো-উনিশ বছরের ছেলে ব্যস্তভাবে অপেক্ষা করছে। আমাদের দেখে সে কেমন যেন চমকে উঠলো। লালভাই স্থিরদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণ করে আমার হাতে সামান্য একটা গুতো দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লেন।
তারপর তিনি সোফায় বসে একদিকে চেয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, “ছেলেটোকে চিনতে পেরেছিস?” এরপর তিনি আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে বললেন, “গতকাল এই ছেলেটাই আমাদের উড়ো চিঠি দিয়েছিল। সে এদের ডাকপিয়ন। ওর পিছু নিতে হবে। দাঁড়া, আতিককে বলে দিচ্ছি। এই বলে তিনি সোফা থেকে উঠে ডানদিকের জানালাটার পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুততার সঙ্গে ফোনে আতিক ভাইকে বললেন, “শোনো, একটা ছেলে এখনই বাইরে বের হবে। তুমি তার পিছু নিবে। আর যে করেই হোক, তার গন্তব্যস্থল আজ আমাদের জানতেই হবে। আর এরমধ্যেই এই কেসটার আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। তুমি এখন থেকেই প্রস্তুতিগ্রহণ করতে শুরু করে দাও। রেডি হও।”
কথাটা শেষ করে তিনি ফোন রেখে আবার সোফায় বসে পড়লেন। কোনোদিকে না তাকিয়ে তিনি কী যেন ভাবতে লাগলেন।
আমরা বসতে-না-বসতে দেখি, শাহীনা বেগম দুইটা বড়সড় টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার নিয়ে বাসার মেইন গেইটের দিকে গেল। আমরা তা দেখেও না-দেখার ভান করে সোফায় আগের মতো বসে রইলাম।
লালভাই হঠাৎ আবার তার সেলফোনটা বের করে খুব আস্তে-আস্তে আতিক ভাইকে বলতে লাগলেন, “শোনো, ভিতরে যে ছেলেটা ঢুকেছে সে যদি সাইকেল নিয়ে আসে আর তা যদি সে বাড়ির বাইরে মেইন গেইটের কাছে বা তার আশেপাশের একজায়গায় রাখে তাইলে তুমি তার সাইকেলের পিছনের চাকার টিউবটা খুব সাবধানে ছিদ্র করে দাও। যাতে সে সাইকেলে চড়ে খাবার নিয়ে অজ্ঞাতস্থানে পালাতে না পারে। আমাদের ওর গন্তব্যস্থল আজ জানতেই হবে। ওর সাইকেলের দফারফা হলে তখন সে বাধ্য হয়ে তোমার রিক্সায় উঠবে। দ্রুত এই কাজটা সমাধা কর তো। আর লক্ষ্য রাখবে: কেউ যেন তা না দেখে। বাইরে গেইটের কাছে কিন্তু দুই-দুইটা পুলিশ রয়েছে। তুমি খুব সাবধানে কাজটা শেষ করবে।”
তারপর শাহীনা বেগম ফিরে আসার আগেই তিনি আমার কনুইয়ে জোরে গুতা দিয়ে ইশারা করলেন, “তুইও বাইরে যা। আতিক একা সব ঠিকঠাক করতে পারছে কিনা দেখে আয়। আর ছেলেটা মেইন গেইটের কাছে পৌঁছানোর আগে তুই পুলিশদের একটু ব্যস্ত রাখ্। আর ওদের বলবি যে তুই আমার জন্য বাইরে এক প্যাকেট সিগারেট আনতে যাচ্ছিস। যা, এখনই যা।”
আমি দ্রুত উঠে পড়লাম। এই সুযোগ কোনোভাবেই আজ হাতছাড়া করা যাবে না।

লালভাইকে ভিতরে একা রেখে আমি ঝড়ের গতিতে বাইরে বেরিয়ে এলাম। আর দেখলাম, সেই ছেলেটা কিছুটা দূরে চলে গেছে। তবে তার দুই হাতে বড়সড় দুইটা টিফিন-ক্যারিয়ার থাকায় সে বেশি জোরে হাঁটতে পারছে না। এই সুযোগে আমি ওর আগেই বাড়ির মেইন গেইটের কাছে চলে এলাম। পুলিশ দুটোকে কয়েকটা অহেতুক প্রশ্ন করে ওদের ব্যস্তও রাখলাম। ছেলেটা মেইন গেইট পর্যন্ত আসার আগেই আতিক ভাই ওর সাইকেলটার দফারফা একেবারে শেষ করে ফেললেন। এতক্ষণে তিনি সম্ভবত ওর সাইকেলের দুই চাকার পাম্পই বের করে ফেলেছেন।
আমি আতিক ভাইয়ের দিকে বেশি না তাকিয়ে মেইন রোডের দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে একটা দোকান থেকে সিগারেট কিনতে গেলাম। তবে এবার আড়চোখে চারিদিকের সবকিছুও দেখতে লাগলাম।
সিগারেট কিনে মেইন গেইটের কাছাকাছি ফিরে আসতেই দেখলাম, ছেলেটা তার সাইকেল দেখে খুবই হতাশ। সে তার সাইকেলটা সরকার-মঞ্জিলের মেইন গেইটের একপাশে ফেলে রেখে আতিক ভাইকে কী যেন বললো। বুঝলাম, সে আতিক ভাইয়ের রিক্সাটা ভাড়া করতে চাচ্ছে। একটা দক্ষ রিক্সাওয়ালার মতো আতিক ভাই ভাড়াটারা মিটিয়ে ছেলেটাকে তুলে নিলেন। আমি মনের আনন্দে দ্রুত আবার ভিতরবাড়িতে ঢুকে পড়লাম।

ভিতরে ঢুকে আমার চক্ষু চড়কগাছ! দেখি, আমাদের লালভাই এখন শাহীনা বেগমের সঙ্গে খুব খাতির জমিয়েছেন। তার রুপযৌবনের খুব প্রশংসাও করছেন। এতে দেখলাম, এখন আর আগের শাহীনা বেগম যেন নাই। সে মুহূর্তের মধ্যে রঙবদল করে ফেলেছে। আমি লালভাইয়ের পাশে বসার আগেই শাহীনা বেগম লালভাইয়ের দিকে তাকিয়ে খুব মোলায়েম হাসিতে বললো, “আপনাকে চা করে দিই?” ‘আপনাদের’ না বলে শুধু ‘আপনাকে’ বলায় আমি যারপরনাই বিস্মিত। বুঝলাম, লালভাই তাকে খুব ফুলিয়েছেন! আর নয়তো কিছু-একটা বলে তাকে ভীষণভাবে পটিয়েছেন।
আমাদের লালভাই স্মিতহাস্যে শাহীনা বেগমের চোখে চোখ রেখে খুব ভদ্রভাবে বললেন, “তা পান করা যায়। আর কফি হলে কিন্তু আরও ভালো হয়।”
একথা শুনে শাহীনা বেগম হাসিমুখে উঠে পড়লো। আর ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল। লালভাই আগের মতো আবার কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আর হাতে কোনো কাজ না থাকায় আমি সোফার টেবিলের নিচে রাখা পুরানো পত্রিকাগুলো ঘাঁটতে লাগলাম। আর এখানেও আমার ভিডিও ধারণের বিষয়টি সমানতালে চলছে।

কফিপানের পর আমাদের লালভাই দেখতে-দেখতে শাহীনা বেগমের সঙ্গে আরও ভালোভাবে আলাপ জমিয়ে ফেললেন। তার আলাপ জমানোর কায়দাকানুন খুবই ভালো। যেকোনো মানুষের সঙ্গে তিনি অতিসহজে মিশতে পারেন। আমাদের লালভাইয়ের মতো এতো মিশুক মানুষ আমি এই জীবনে আর দেখিনি।

শাহীনা বেগমের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে আমাদের খুব একটা লাভ যে হয়েছে তা বলা যাবে না। আর আমার মনে হচ্ছে: বাইরের দিক থেকে মহিলা আমাদের সঙ্গে কিছুটা মিশলেও ভিতরে-ভিতরে এখনও সে খুবই সতর্ক, এবং চালাকির আশ্রয়গ্রহণ করে রয়েছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সে আমাদের কাছে কোনোভাবেই প্রকাশ করছে না।
লালভাই নানান কায়দায় তাকে বশীভূত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। তবে ব্যর্থ হলেও আমাদের প্রতি তার আগের মতো রাগটা আর নাই। সেখান থেকে হয়তো শাহীনা বেগম কিছুটা হলেও সরে এসেছে। অবশ্য আমার তা-ই মনে হচ্ছে—কিন্তু এই মুহূর্তে লালভাই কী ভাবছেন তা আমার জানা নাই।

ভিতরে একটা শব্দ হওয়ায় শাহীনা বেগম প্রায় একদৌড়ে ভিতরে চলে গেল।
এই সুযোগে লালভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “খুব ভয়ংকর একটা মহিলা রে! বাইরে এখন কিছুটা নরমপ্রকৃতির ভাব দেখালেও আসলে ভিতরে-ভিতরে সে এখনও খুব কঠিন। এ-কে হাতকরা এতো সহজ নয়। আর একটা ব্যাপার দেখেছিস, বাড়ির ভিতরে কিন্তু শিশুদের কোনো আওয়াজ নাই!”

আমরা যখন এখানে আরও কিছুটা সময় থাকার পরিকল্পনা করছিলাম ঠিকই তখনই লালভাইয়ের ফোন বেজে উঠলো। তিনি ফোন রিসিভ করতেই আতিক ভাইয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো, “প্রোফেসর, দ্রুত খামারবাড়িতে চলে এসো। যেকোনো একটা রিক্সাভ্যানে চড়ে আসো। জায়গাটার নাম শিবমন্দিরের মোড়। যেকোনো রিক্সাভানওয়ালাই চেনে। আমি এখানে রাস্তার একপাশে বসে রয়েছি। তোমরা এলে কথা হবে। শুধু এখন শুনে নাও—দারুণ একটা খবর আছে।”
কথা শেষ হওয়ামাত্র ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আমি লালভাইয়ের একদম পাশে বসায় সব কথাই শুনতে পেয়েছি। তাই, এব্যাপারে লালভাইকে আর-কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না।
লালভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “চল, এখানকার কাজ আপাতত শেষ। সামনে মনে হয় ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আতিকের কণ্ঠস্বর শুনে আমার তা-ই মনে হলো।”

শাহীনা বেগম ফিরে আসতেই লালভাই আগের মতো বিনয়সহকারে বললেন, “আজ তবে আসি, যদি কোনো বিশেষ প্রয়োজন হয় তাহলে আমাদের আর-একবার আসার প্রয়োজন হতে পারে। ভালো থাকবেন।”

আমাদের একথা শুনে শাহীনা বেগম যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। তার মুখে এখন দারুণ পরিতৃপ্তির একটা হাসি।
তবে এসব দেখার সময় আমাদের হাতে নাই। আমরা খুব দ্রুত বাসার ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। আরও দ্রুত পার হলাম বাড়ির মেইন গেইট। তারপর লালভাইয়ের পিছনে হাঁটতে লাগলাম সরকারপাড়া-গোরস্থানের রাস্তার দিকে।
গোরস্থান পার হয়ে লালভাই বললেন, “এই দিকেই মাইল তিনেক দূরে সরকারসাহেবের খামারবাড়িটা। এতোটা রাস্তা হেঁটে গেলে সময় বেশি লাগবে। এইমুহূর্তে আমাদের একটা রিক্সাভ্যান খুবই প্রয়োজন।”
আমরা এখানটাতেই দাঁড়িয়ে পড়লাম।

এদিকের রাস্তাটা এখনও কাঁচা। গ্রামের কাঁচাসড়কের মতো উঁচু করে ফসলি জমির ওপর দিয়ে রাস্তাটা তৈরি করা হয়েছে। তবে এটাকে দীর্ঘদিনের কাঁচাসড়ক মনে হচ্ছে। একদিন তো এইসব গ্রামই ছিল। শহরে মানুষবৃদ্ধি পাওয়ায় আজ চারিদিকে মানুষের আবাসন গড়ে তোলার হিড়িক পড়ে গেছে।

মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর আমরা একটা রিক্সাভ্যান পেলাম। দরদাম করেই তাতে উঠে পড়লাম। ভাড়া চল্লিশ টাকা। আমরা এতে যথেষ্ট সন্তুষ্ট।
একটা বিশ-বাইশ বছরের তরুণ দ্রæতগতিতে ভ্যানটা চালাচ্ছে। তবে কাঁচামাটি বলে পাকারাস্তায় চালানোর মতো স্পিডটা সে এখানে শত চেষ্টা করেও যেন তুলতে পারছে না। দেখতে-দেখতে আমরা শিবমন্দিরের মোড়ে এসে পৌঁছুলাম। আমরা তাকিয়ে দেখি, সামনেই সরকারসাহেবের খামারবাড়ি।
আমাদের দেখে আতিক ভাই একলাফে কাছে এসে দাঁড়ালেন।
আমি ভ্যানভাড়া মিটিয়ে দিতেই তিনি লালভাইয়ের হাত ধরে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, “তোমার কথামতো আমি ছেলেটাকে আমার রিক্সায় তুলে এখানে নিয়ে এসেছি। ছেলেটাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে আমি রিক্সাটাকে একটানে খামারবাড়ির গেইটের কাছে নিয়ে গিয়ে থেমেছি। যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তারপর ছেলেটা আমার রিক্সাভাড়া ভিতর থেকে নিয়ে আসার কথা বলে আমাকে খামারবাড়ির গেইটের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে ভিতরে যায়। এই সুযোগে আমি চোখ-কান খোলা রেখে আশেপাশের অনেককিছু বুঝতে চেষ্টা করেছি। এখানে, অনেক আলামত আছে। আর এখানে আমি একটি মেয়ের কান্নার আওয়াজ শুনেছি। সে বারবার কাদের কাছে যেন কাকুতিমিনতী করছিল আর বলছিল: ‘ভাই, আমরারে ছাইড়ে দেন। আমি, তো কিছু করি নাই। আমি কাউরে কিছু বলবো না। আমরারে ছাইড়ে দেন ভাই। আমি গফরগাঁও চইলে যাবো।’ তারপর কে যেন মেয়েটির মুখ চেপে ধরে খুব ঝাঁঝালোকণ্ঠে বলতে লাগলো: এই মাগী, চুপ করে থাক। আর-একটা কতা কইবি কি তোরেও কিন্তু প্রোবেচরের কাছে পাঠায়ে দিমু। চুপ মাগী, চুপ। তারপর আর-কিছু শুনি নাই। আমি একা দেখে আর বেশি কিছু করার চেষ্টা করিনি। তবুও ওই ছেলেটা যখন মিনিট কয়েক পরে আমার রিক্সাভাড়া দিতে এলো তখন আমি তার কাছে ইচ্ছে করে এক গেলাস পানি চাইলাম। আমার উদ্দেশ্য এখানে আরও কিছুটা সময় ক্ষেপণ করা। সে কিছুক্ষণ পরে পানি নিয়ে এলে আমি তা সময়ক্ষেপণ করে পান করেছি। আর কান পেতে আরও কিছু শোনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আর-কোনো আওয়াজ পাইনি।”

একথা শোনার পর লালভাইয়ের ফর্সা মুখখানি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, “আমরা কেসটার শেষমুহূর্তে এসে পৌঁছেছি। আমরা যাকে খুঁজছি সে এখানেই রয়েছে। কাজের মেয়ে মরিয়মকে এখানেই আটকিয়ে রাখা হয়েছে। এই মামলাটা ওসি গোলাম মওলা যদি একবার আজাদ কালামের বিরুদ্ধে শক্তমতো দাঁড় করাতে পারতো তাহলে মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী মরিয়মকে হত্যা করে তার লাশটা কোনো হাইওয়ের পাশে ফেলে রাখতো। তারপর আর কী? মামলা খতম হয়ে যেত! কেসটা বেশ ভালোভাবে সাজিয়েছে ওসি গোলাম মওলা। কিন্তু কেসের আখেরটা মনে হয় আমাদের পক্ষে।”
লালভাই এরপর খুব চঞ্চল হয়ে উঠলেন আর বললেন, “আমাদের এক্ষনি এই মেয়েটাকে উদ্ধার করতে হবে। তার আগে আমাদের জানতে হবে এখানে কয়টা লোক আছে। ওদের সংখ্যাটা না জেনে এই উদ্ধার-অভিযান পরিচালনা করা ঠিক নয়।”

লালভাই আমাদের সবার বেশভূষা খুলে ফেলে আসল গোয়েন্দারূপে আবির্ভূত হতে বললেন। আমরা একনিমিষে তা-ই করলাম। আমি দেখতে পাচ্ছি, লালভাই ও আতিক ভাই তাদের রিভলবার ঠিকঠাক করে নিলেন। এটি উদ্ধার-অভিযানের প্রাথমিকপ্রস্তুতি।

লালভাইয়ের বুদ্ধি মোতাবেক আমি আর লালভাই জমিজমা ক্রয়ের কথা বলে খামারবাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লাম। বাইরে গেইটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলেন আতিক ভাই। আমরা কোনো বিপদে পড়লে তিনি ভিতরে ছুটে আসবেন।
এখানকার গেইটা খুব একটা মজবুত নয়। আমাদের হঠাৎ বাড়ির ভিতরে এভাবে ঢুকতে দেখে সকালের নাস্তাবহনকারী ওই ছেলেটি দৌড়ে এলো। তারপর আমাদের দেখে কেমন যেন একটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। সে মনে হয় আমাদের চিনে ফেলেছে। তারপর সে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে ‘হাশেম ভাই’ বলে কাকে যেন ডাকতে লাগলো।
ওর ডাক শুনে হাশেম নামের একটা ষণ্ডামার্কা লোক আমাদের কাছে ছুটে এলো। আর এসেই সে ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললো, “আপনেরা! আপনেরা এখানে কী চান? এখানে ঢোকা নিষেধ—তা জানেন না?”
লালভাই একগাল হেসে বললেন, “আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। আর কিছু জমিজমা কিনতে চাই। আপনারা এখানকার স্থানীয় লোক। যদি এর একটা সন্ধান দিতে পারেন... তা-ই...।”
এতে লোকটার রাগ কিছুটা কমলেও সে হন্তদন্ত হয়ে বললো, “আচ্ছা, এবার বাইরে আসেন তো। বাইরে আসেন, তাড়াতাড়ি। ভিতরে ঢোকা তো নিষেধ। আপনেদের সাহস কত!”
আমরা বাইরে এসে দাঁড়ালাম।
লালভাই বললেন, “আপনি যদি আমাদের সঙ্গে একটু উত্তরদিকের মাঠে আসেন তাহলে আমাদের খুব সুবিধা হয়। ওদিকটায় নাকি জমি বিক্রয় করা হবে। আমরা একটা জমি দেখেছি। আপনি যদি দেখেশুনে...।”
এতে লোকটা ক্ষেপে গিয়ে বললো, “না-না, আমার হাতে এতো সময় নাই। তাছাড়া, এতোবড় খামারটা আজ আমরা মাত্র দুইজন পাহারায় রয়েছি। একজন গ্রামে গেছে। এখন যাইতে পারবো না।”
লালভাই মনে হয় এইটাই চেয়েছিলেন। তিনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন—এখানে ওরা কয়টা রয়েছে।
ইতোমধ্যে আতিক ভাই লোকটার পিছনে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি লালভাইয়ের চোখের ইশারা পাওয়ামাত্র লোকটাকে ওরফে হাশেমকে একটা ল্যাং দিয়ে চিৎ করে ফেলে তার বুকে রিভলবার চেপে ধরে বললেন, “চুপ, একদম চুপ। একচুল নড়বি তো গুলি করে তোর মাথার খুলি উড়িয়ে দিবো।”—এতে হাশেম নামের লোকটি যারপরনাই বিস্মিত। সে যেন স্বপ্নেও এমনটি ভাবেনি।
হাশেম নামের লোকটা আর টুঁশব্দটি করার সাহস পেলো না। সে খুব অসহায়ভঙ্গিতে মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে।
এই আকস্মিক ঘটনা দেখে সেই ছেলেটি দৌড়ে পালাতে চেয়েছিল। আমি আর লালভাই তাকে দৌড়ে ধরে মাটিতে শুইয়ে দিলাম।
তারপর দুইটাকে শক্ত রশি দিয়ে পিঠমোড়া করে হাত বেঁধে খামারবাড়ির ভিতরে নিয়ে এলাম। এরপর ওদের পা-দুটোও বেঁধে ফেললেন আতিক ভাই। ওদের মোবাইল-ফোন দুটোও আমরা নিয়ে নিলাম। এ-দুটো তদন্ত-কাজে লাগবে।
আতিক ভাইয়ের সন্দেহ মোতাবেক সেই ঘরটাতে ঢুকে আমরা মরিয়মের দেখা পেলাম। তাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। তার সামনে আধখাওয়া নাস্তার একটা থালা। হঠাৎ আমাদের দেখে সে ভীষণভাবে চমকিত ও বিস্মিত। তবে তার মধ্যে কোনো ভয়ের ভাব দেখলাম না। তার চোখে-মুখে শুধু বাঁচার আকুতি ফুটে উঠলো।
লালভাই তাকে অভয় দিয়ে বললেন, “সত্যঘটনা খুলে বললে তোমার কোনো ক্ষতি হবে না। আমরা গোয়েন্দা। তোমাকে উদ্ধার করার জন্যই এখানে এসেছি। আমরা জানি, তোমার নাম মরিয়ম।”—এতে মেয়েটার স্বাভাবিক হতে বেশি সময় লাগলো না।
লালভাইয়ের নির্দেশে আমি ক্যামেরা রেডি করলাম। এবার ওদের সবার জবাববন্দি নিতে হবে।
প্রথমে সেই নাস্তাবহনকারী ছেলেটিকে অধ্যাপকসাহেবের খুনের ঘটনাসম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই সে হাউমাউ করে কেঁদে বললো, “সাহেব, আমি কিছু জানি না। আমি এইখানকার গার্ড। হাশেম ভাইয়ের আন্ডারে থাকি। আর বছরখানেক আগে কাজে যোগ দিছি। হাশেম ভাইয়ের নির্দেশেই গতকাল আমি আপনাদের সামনে ওই চিঠিটা ফেলছিলাম।”
লালভাই বললেন, “তোমার নাম বলো?”
সে কাঁদ-কাঁদ গলায় বললো, “আমার নাম মো. সোহেল খান।”
সে বারবার বলতে লাগলো, “আমি কিছু জানি না, স্যার। আমি কিছু জানি না, স্যার।”
হাশেম এবার নিজে থেকে মুখ খুললো আর সেও বললো, “আমিও তেমনকিছু জানি না। শুধু জানি, প্রোবেচর সাহেব খুন হইছেন। আর এই খুনটা ওসিসাহেবের নির্দেশেই হয়েছে। তিনিই সবকিছু করেছেন। তার নির্দেশেই আমরা দুইজন এ কয়েকদিন শুধু এই মরিয়মকে পাহারা দিচ্ছিলাম। আমাদের সঙ্গে এখানে আরও একজন গার্ড আছে। ওর নাম ইদ্রিস। ও গতকাল সকালে দেশের বাড়ি বরিশাল গিয়েছে। ওসিসাহেব আমাদের বলেছিলেন, ‘মামলাটা আজাদ কালামের নামে ভালোমতো আটকে গেলে মরিয়মকে পরে খুন করে একখানে ফেলে রাখা হবে। যাতে এই মামলার কোনো সাক্ষী-প্রমাণ না থাকে।’ এর বাইরে আমরা আর-কিছু জানি না, স্যার। সব জানেন ওসিসাহেব। আর মরিয়মও সব জানে। তাকে একবার সব জিজ্ঞেস করেন, স্যার।”
আমাদের মনে হলো: সভয়ে হাশেম সত্যকথাই বলেছে। লালভাই তাকে আর-কোনো চাপ দিলেন না।
ক্যামেরার সামনে এবার মরিয়মকে দাঁড় করিয়ে দিলাম। তাকে যথেষ্ট অভয় দেওয়া হয়েছে। সে আমাদের কথা বিশ্বাস করে বেশ সাহসের সঙ্গে বলতে লাগলো:

ঘটনার দিন আমি সন্ধ্যার সময় রান্নাঘরে চা-নাস্তা বানানোর কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এমন সময় প্রোবেচর চাচাজানের গলা শুনলাম, তিনি খুব রেগে কাকে যেন বলতিছিলেন: তুমি আর-কখনো আমার বাড়িতে আসবে না। তুমি এতো খারাপ তা আমি আগে বুঝতে পারিনি। তুমি আমার বাড়ি থেকে আজ-এইমুহূর্তে বেরিয়ে যাও। আর কখনো এখানে আসবে না। আজ থেকে তোমার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই। তুমি আমাদের ঘরের বউয়ের ওপর হাত দিয়েছো! তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি তোমাদের ডিআইজিকে বিষয়টা জানাতে বাধ্য হবো। যাও, এখান থেকে এক্ষনি বেরিয়ে যাও।
এতো উত্তেজনা দেখে আমি বাইরের রুমে এসে দেখি, চাচাজানের সামনে ওসিসাহেব মুখভার করে বসে রইছেন। চাচাজান তাকেই এতক্ষণ এসব কথা বলেছেন। তখন ওসিসাহেবের পাশে বসে ছিলেন চাচাজানের ছেলের বউ শাহীনা ভাবি। তাগো দুইজনের চরিত্র ভালো না। আমি আগে থেকে এসব জানতাম। আর কালাম ভাই হয়তো আমার মতো সব জানতেন না। তারা দুইজন স্বামী-স্ত্রীর মতো থাকতো। কিন্তু আমি ভয়ে কাউরে কিছু বলার সাহস পাই নাই। সেদিন চাচাজান ওদের দুইজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেছিলেন। এই হইলো আসল ঘটনা।
এরপর এশার নামাজের কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ চাচাজানের ঘর থেকে বিরাট চিৎকার ও চেঁচামেচির আওয়াজ। চাচাজান বাঁচাও-বাঁচাও বলে চিৎকার করছেন। এইটা মরণ-চিৎকার। বুকফাটা কান্নার আওয়াজ।
আমি রান্নাঘরের কাজ ফেলে বাইরের রুমে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি, শাহীনা ভাবি তার গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে চাচাজানের দুই-পা ধরে রয়েছেন। আর ওসিসাহেব চাচাজানের বুকের ওপর বসে তাকে জবাই করছেন। আমি সেই সময় এতো ভয় পাইছিলাম যে আমি চিৎকার দিতেও ভুলে যাই। তখন আমার মুখ দিয়ে কোনো চিৎকার বের হয় নাই। আমার জীবনে এইরকম ঘটনা আর কখনো দেখি নাই। হঠাৎ আমার গলা দিয়ে ‘চাচাজান’ বলে একটা চিৎকার বেরিয়ে আসে। তা দেখে ওসিসাহেব চাচাজানের বুক থেকে নেমে সোফায় বসে পড়লেন। আমি ছুটে গিয়ে চাচাজানকে জড়িয়ে ধরলাম। তাকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু তার বুকে ছুরি মারা হয়েছিল। আর তাকে জবাই করার ফলে তিনি আস্তে-আস্তে মারা গেলেন। আমি তখন কিছুই করতে পারি নাই।
এরপর আমার চুলের মুঠি ধরে ওসিসাহেব বললেন, “তুই যদি কাউরে কিছু বলছিস তো তোকেও এই অবস্থা করা হবে।” আর শাহীনা ভাবি ওসিসাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ও-কে এখানে রাখা ঠিক হবে না। একটাকিছু করেন।”
ওসিসাহেব গম্ভীরমুখে বললেন, “তাইতো ভাবছি।”
এরপর ওসিসাহেব আমার গায়ের রক্তমাখা জামা-কাপড় খুলে নিয়ে এই খামারের গার্ড হাশেম ভাইকে ডেকে তার হাতে আমাকে তুলে দেন। যেন মামলা চলা পর্যন্ত আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। তারপর চাচাজানকে ওরা কী করছে আমি আর জানি না। আমি সেসব বলতে পারবো না। কিন্তু একটা কথা সত্য। আমি নিজের চোখে ওসিসাহেব আর শাহীনা ভাবির হাতে প্রোবেচর চাচাকে খুন হতে দেখেছি।

এবার লালভাই বললেন, “এসব আমরা জানি। শুধু আমাদের সাক্ষ্যপ্রমাণের প্রয়োজন ছিল। আমরা গোরস্থান থেকে তোমার আর শাহীনার রক্তমাখা পোশাক পেয়েছি। তোমাদের কাজ আপাতত শেষ। এবার তোমরা সবাই কিছুদিন র‌্যাবের হেফাজতে থাকবে। আর সেখানে সবাই যদি সত্যি কথাটা বলো তাহলে তোমাদের কোনো ক্ষতি হবে না, এবং তোমাদের খুব তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু নিজেদের বক্তব্য কখনো পরিবর্তন করার চেষ্টা করবে না। কারণ, তোমাদের আজকের সবকিছু আমরা রেকর্ড করেছি। আর তা যথারীতি আমাদের কাছে সংগৃহীত থাকবে।”

মরিয়ম দীর্ঘসময় কোনোরকমে খেয়েদেয়ে জীবনটা বাঁচিয়ে রেখেছিল। তাকে ভীষণ দুর্বল মনে হচ্ছে। এজন্য আমরা তাকে খাওয়ার সুযোগ দিলাম। তার সকালের আধখাওয়া নাস্তা শেষ হলে লালভাই তাকে প্রশ্ন করলেন, “খুনের সময় আজাদ কালাম কোথায় ছিল?”
“চাচাজানের পাশের রুমে, তার ঘরে।”—মরিয়ম এবার বেশ দ্রুত উত্তর দিলো।
“সে তার মামাকে বাঁচাতে ছুটে আসেনি কেন?”—সবিস্ময়ে বললেন লালভাই।
মরিয়ম মনভার করে বললো, “তা তো আমি জানি না, স্যার।”
“তাকে আগেই বেঁধে রেখেছিল ওসিসাহেব। বেচারা সেখানে হয়তো বন্দি-অবস্থায় তার মামার হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যটি পরোক্ষভাবে দেখতে পেয়েছে।”—লালভাই আচমকা কথাটা বলে আমাদের সবাইকে চমকিয়ে দিলেন।

লালভাই শুধু অস্ফুটস্বরে বললেন, “এরা ভয়ংকর পশু।”
তারপর তিনি ভাবতে-ভাবতে বললেন, “খুনের সময় অধ্যাপকসাহেবের নাতি-নাতনিরা কোথায় ছিলেন? তাদের রক্তমাখা খেলনা আমরা পেয়েছি!”
মরিয়ম মনখারাপ করে বলে, “ওরা সবসময় চাচাজানের কাছে থাকতো। ওদের খেলনাপাতিও তার বিছানায় পড়ে থাকতো। খুনের সময় ওরা ওদের ঘরে বসে পড়ছিল আর খেলছিল। ওদের রুমের দরজা আগেই বাইরে থেকে বন্ধ করে রেখেছিলেন শাহীনা ভাবি। তারপর থেকে ওরা কোথায় আছে আমি জানি না।”
লালভাই আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শাহীনা বেগম আজ আমাদের কাছে একটা বড়সড় মিথ্যা বলেছে। সে তার সাক্ষাৎকারের সময় ছেলে-মেয়েদের একটা রুমে কাজের মেয়েটার কাছে রেখে আসার কথা বলেছিল—আসলে এটা মিথ্যা কথা। সেই সময় বাসার ভিতরে অন্য কেউ ছিল। আমরা যেন তা বুঝতে না পারি সেইজন্যে সে এই কৌশল অবলম্বন করেছিল। সে ভয়ানক নিষ্ঠুরপ্রকৃতির মহিলা। আমি কয়েকবার এজন্য বাসার ভিতরে ঢুঁ মেরেও তা জানতে পারিনি। আমার মনে হয়: তখন বাসার ভিতরে ওসিসাহেবই বসে ছিল। আমাদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য সে ছেলে-মেয়েদের নাম করেছে।”

লালভাই প্রশান্ত মনে এরপর কাকে যেন ফোন করলেন। ঘণ্টাখানেক পরে দেখলাম, বাইরে র‌্যাবের একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় র‌্যাব-কমান্ডার খামারবাড়িতে ঢুকে লালভাইকে অভিনন্দন জানালেন, এবং মামলার আরও আলামত সংগ্রহের জন্য এই বিষয়টি গোপন রাখার কথাও তাকে জানালেন। র‌্যাব-অধিনায়ক খামারবাড়িটা সীলগালা করে দিলেন। মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। একসময় লালভাই তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় দিলেন।

খামারবাড়িটায় আরও কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে একসময় আমরাও ফিরে এলাম সাভারে। আর বাসায় ফেরার আগে আব্দুস সাদেকের রিক্সাটা আমরা ফেরত দিয়ে এসেছি।


পড়ন্ত দুপুরে আমরা খাবার খাচ্ছিলাম। লালভাই বললেন, “আমাদের হাতে আরও কিছু প্রমাণ প্রয়োজন। নইলে ওসি গোলাম মওলা পুলিশের লোক হওয়ায় সে এই মামলার ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারে। এজন্য আমরা আগামীকাল সকালে আবার সরকার-মঞ্জিলে যাবো। আর এবার সরাসরি গোয়েন্দারূপে। দেখি, আরও কিছু তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে পারি কিনা।”

আমি আর আতিক ভাই ভেবেছিলাম, মামলা এখানেই শেষ। কিন্তু লালভাইয়ের কথায় আমাদের নাকে আবার রহস্যের গন্ধ আসতে শুরু করলো। আমরা কাল সকালের অপেক্ষায় রইলাম।


সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৫/০২/২০১৯
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৯ রাত ৮:১৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছবি ব্লগ-২

লিখেছেন পৌষ, ১১ ই নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ১১:১৯


সকালের স্নিগ্ধ ছড়ানো শিউলি ফুল


দুপুরের ঝুম বৃষ্টি, ফার্মগেট


বিকেলের শান্ত বেলায় জাতীয় পাখি


গোধূলীবেলা, আজকের মতো বিদায় পৃথিবী!


আপন খেয়ালে কাঠ ঠোকরা


আপন মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রভু তোমার দরবারে

লিখেছেন ইসিয়াক, ১১ ই নভেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:০৭


প্রভু তোমার দরবারে তুলেছি দুহাত
ক্ষমা করো মোরে করি মোনাজাত।
তুমি ছাড়া কেউ নেইতো আমার
তোমার তুলনা তুমি বলি বারবার ।।

সৃজিলা তুমি মোরে কত ভালোবেসে
অবাধ্য হলাম আমি নিজেরই দোষে।
আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভৌতিক গল্পঃ অ-স্পর্শ (তৃতীয় পর্ব)

লিখেছেন নীল আকাশ, ১১ ই নভেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:০৮



ঘটনার ধারাবাহিকতার জন্য পড়ে আসুনঃ
ভৌতিক গল্পঃ অ-স্পর্শ (দ্বিতীয় পর্ব)
ভৌতিক গল্পঃ অ-স্পর্শ (প্রথম পর্ব)

...........রুপা জ্ঞান হারিয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ার আগে শেষবারের মতো দেখল ওর লম্বা চুলের ঝুটি ধরে ওকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাবি আন্দোলন- বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সরকারী বরাদ্দ বন্ধ করে দেবার প্রধানমন্ত্রীর হুমকি....

লিখেছেন কিরমানী লিটন, ১১ ই নভেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:৩০




আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে সরকার কি কারো উত্তরাধিকার? কারো পৈতৃক সম্পত্তি? কারো বংশানুবাদ? সরকার কি বিত্ত- বৈভবের উৎপাদক কোন লাভজনক প্রতিষ্ঠান?... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ছুঁবার আশায়

লিখেছেন হাবিব স্যার, ১১ ই নভেম্বর, ২০১৯ রাত ৮:৩১



হৃদয় কোষের প্রতিটি সাইটোপ্লাজম
শ্লোগানে শ্লোগানে মিছিলে শামিল
মিছিলের নেতৃত্বে মাইটোকন্ড্রিয়া
প্লাস্টিডেরা ব্যানার হাতে এগিয়ে চলছে সদর্পে
একটাই দাবী, একটাই চাওয়া
মেলানিন বিহীন তোমার হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলী ছুঁবে।

অনাদায় থেকে গেলে দাবী-দাওয়া
জলকামান আর রাবার বুলেট... ...বাকিটুকু পড়ুন

×