somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সাইয়িদ রফিকুল হক
আমি মানুষ। আমি ত্বরীকতপন্থী-মুসলমান। আমি মানুষ বলে আমার ভুলত্রুটি হতেই পারে। বইপড়তে আমার ভালো লাগে। সাহিত্য ভালোবাসি। লেখালেখি আমার খুব শখের বিষয়। বাংলাদেশরাষ্ট্র ও গণমানুষের জন্য আমি লেখনিশক্তিধারণ করেছি।

গল্প: জেসির বান্ধবী মুম্মিতা

১৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ৯:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গল্প: জেসির বান্ধবী মুম্মিতা
সাইয়িদ রফিকুল হক

রিক্সা থেকে আলগোছে রাস্তার একপাশে—নীলক্ষেতের মোড়ে তেঁতুলগাছটার নিচে নামলো জেসি। তার মনের মধ্যে আজ তেমন-একটা তাড়াহুড়ার ভাব না থাকলেও সে এখানকার কাজ শেষ করে হাতে একটু সময় ধরে রাখতে চাইছে। সেজন্য সে রিক্সা থেকে নেমে দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হঠাৎ তার চোখ গেল রাস্তার ওপারে। আর সে খুব ভালোভাবে দেখলো—রাস্তার ওপাশে মুম্মিতা মিম্মা দাঁড়িয়ে রয়েছে। হঠাৎ তাকে এইমুহূর্তে এভাবে এখানে দেখে তার যেন কিছুতেই বিস্ময়ের ঘোর কাটতে চায় না। তারা দুজন ঢাকার খুব কাছাকাছি আর পার্শ্ববর্তী একটা পাবলিক-বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সাবজেক্টে পড়ে! স্বাভাবিকভাবেই এজন্য তাদের মধ্যে সখ্যতা ও ঘনিষ্ঠতা একটু বেশি।
জেসি নিজের চোখ দুটোকেও যেন এখন কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে চাইছে না! তার মনে হচ্ছে—সে এখন নিশ্চিত ভুলটুল দেখছে! তা নয় তো কী! সে একটু আগেও এই মুম্মিতাকে খুব করে হাতধরে জিজ্ঞাসা করেছিল, “এখন আমার সঙ্গে একটু ঢাকায় যাবি?”
তার একথা শুনে মুম্মিতা স্পষ্টভাবে বলেছিল, “না। আজ আমার সেখানে যেতে ইচ্ছে করছে না।”
কিন্তু এখন? আর কীভাবে সে এতো তাড়াতাড়ি এখানে এলো? জেসির মনের ভিতরে দুরন্ত ভাবনার একটা বিশাল ঝড় বয়ে যেতে থাকে যেন!

সে আজ রোকেয়া হলে যাবে বলে আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিল। সেখানে তার সাবজেক্টে পড়ুয়া এক বড়বোন থাকে। তার কাছে ভালো-ভালো কয়েকটি নোট আছে। সামনে তার অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা। সে ভেবেছিল, পরীক্ষার বেশ কিছুদিন আগেই এই নোটগুলো হস্তগত করবে। নইলে, কে-কখন তা নিয়ে যাবে—তার কোনো ঠিকঠিকানা নাই। কিন্তু মুম্মিতাকে এখন রাস্তার ওপাশে একঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মনে জিদ চেপে গেল। সে রাস্তার ওপারে যাওয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠলো। কিন্তু রাস্তায় ট্রাফিক-সিগন্যাল না পড়ায় সে সহজে রাস্তাপার হতে পারলো না। তবুও সে রাস্তাপার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে রইলো।

সে কয়েকটি বই কিনবে। তার প্রয়োজনীয় কয়েকটি বই অনেকদিন যাবৎ কেনা হচ্ছে না। কিন্তু এই তাড়াহুড়ার মধ্যে সে বইকেনা আপাততঃ বন্ধ রেখে রাস্তার ওপারে যাওয়ার জন্য লোকজনের সঙ্গে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। একটু পরে একটা সিগন্যাল পড়তেই সে দ্রুত রাস্তাটা পার হয়ে নিরাপদে নিউ-মার্কেটের দুই-নাম্বার গেইটের পাশে মুম্মিতার একেবারে সামনে এসে দাঁড়ালো।
আর তাকে এভাবে এখানে দেখে মুম্মিতা যেন ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে! তার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল! আর জেসির মনে হলো—ভূতটুত দেখলেও আজকাল মানুষ এতো চমকায় না!
জেসি তার এই বিবর্ণ চেহারা দেখে তার একটা হাতধরে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, “কী রে, কথা বলছিস না কেন? আর আমাকে দেখে এতো ভয় পেয়েছিস যে! তুই না একটু আগে—ঢাকায় আসবি না বলে ছিলি! হঠাৎ চলে এলি যে! ব্যাপারখানা কী?”
মুম্মিতা এইমুহূর্তে জেসিকে দেখে সত্যি যেন বোবা হয়ে গেছে! আর সে জেসিকে কিছুই বলতে পারে না। সে শুধু মুখভার করে আছে। আর জেসির দিকে ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। আসলে, একটু আগেই সে জেসিকে খুব শক্তভাবে বলেছিল—আজ সে কিছুতেই ঢাকায় যাবে না। ভার্সিটিতে তার জরুরি একটা কাজ আছে। অথচ, সে-ই কিনা জেসির আগে এখানে উপস্থিত হয়েছে!
কিছুক্ষণ পরে সে জেসিকে ম্যানেজ করার জন্য বলে, “না, মানে, এই এমনি! হঠাৎ হলে ভালো লাগছিল না! তো তাই...ভাবলাম এখানে এলে হয়তো কারও সঙ্গে একটু দেখা হয়ে যাবে। আর মনও ভালো হয়ে যাবে! এই আর কী!”
জেসি মুখটিপে হেসে বলে, “নাকি অন্যকিছু?”
মুম্মিতা ও-কে বাধা দিয়ে বলে, “না-না, তেমনকিছু নয় রে। আমার কারও সঙ্গে প্রেমট্রেম নাই। আর ওসবে আমি বিশ্বাসীও নই।”
“কিন্তু আমাকে মিথ্যা বললি কেন?”—জেসি যেন তাকে কিছুতেই ছাড়তে চায় না।
এইসময় মুম্মিতা মনে মনে একটা মিথ্যাঅজুহাত বানাতে চেষ্টা করে। কিন্তু এইমুহূর্তে তার মনের মধ্যে কোনো যুৎসই মিথ্যা তৈরি হলো না। সে মনভার করে বলে, “স্যরি দোস্ত, কিছু মনে করিস না। আমার খুব ভুল হয়ে গেছে। এরকম আর কখনো করবো না।” কথাটা বলে সে একটু হাসবার চেষ্টা করলো। কিন্তু তার সে হাসি যেন কান্নায় পরিণত হলো!

জেসি এতোক্ষণে ভালোভাবে লক্ষ্য করলো, মুম্মিতা আজ খুব সুন্দর করে সেজেছে। সে সবসময় সাজগোজ করে থাকে। কিন্তু এখন যেন তাকে আরও বেশি বর্ণিল, আকর্ষণীয় ও লোভনীয় কোনো এক মানবী মনে হচ্ছে! তার মাথায় বাঁধা রয়েছে পোশাকের সঙ্গে ফ্যাশন করে মানানসই খুব পাতলা কাপড়ের হিজাব।
সে আবার মুম্মিতার হাতধরে বললো, “চল, এবার রাস্তার ওপারে যাই। আমি কয়েকটি খুব দরকারি বই কিনবো। তোরও তো বই দরকার। চল, একসঙ্গে দেখেশুনে বইগুলো কিনি। পরে দুজনে তা ভাগ করে পড়তে পারবো।”
মুম্মিতা যেন একটু বিরক্ত হয়ে বলে, “না রে, তুই যা। আমার অন্য একটা জরুরি কাজ আছে। এখন আমি তোর সঙ্গে কোথাও যেতে পারবো না। আমি একজনের জন্য এখানে অপেক্ষা করছি।”
জেসি এবার হেসে বলে, “তা তো আমি আগেই ভেবেছিলাম। একটু আগে তুইইতো ‘প্রেমট্রেম’ করিস না বলে—তা না করে দিয়ে ছিলি। তুই এতো মিথ্যাবাদী কেন রে?”
মুম্মিতা আর-কিছু বলে না। জেসি যে তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে—তাও সে আর খেয়াল করে না। আপনমনে সে কী যেন ভাবতে থাকে। ভীষণ চিন্তাযুক্ত মনে সে বারবার শুধু এদিকওদিক তাকাচ্ছে। আর অন্যমনস্কভাবে নিজের লেডিস ব্যাগ থেকে তার দামি মোবাইলফোনটা বের করে ব্যস্ততার সঙ্গে সময় দেখতে লাগলো।
জেসি তবুও বলে, “আয় না একটু। দুজনে...।”
আর তখনই একটা ফোন এলো মুম্মিতার মোবাইলফোনে। সে ফোনটা রিসিভ করতেই মুখটা তার হাসিতে ভরে উঠলো! আর সে খুব হাসিমুখে বললো, “হ্যাঁ, আমি এখন নিউ-মার্কেটের দুই-নাম্বার গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছি।”

জেসির মনে হলো মেঘের আড়াল থেকে হঠাৎ যেভাবে সূর্য বেরিয়ে আসে ঠিক তেমনই হয়েছে মুম্মিতার মুখের অবস্থা। সে যেন এসবের কিছুই বুঝতে পারে না। বিস্ময়ের ঘোরলাগা চোখে সে এবার ফ্যাল-ফ্যাল করে শুধু মুম্মিতার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আর মুম্মিতা তার ফোনটা ব্যাগে রাখতে-রাখতে তাকে বলে, “তুই না খুব আনাড়ি আর আনস্মার্ট! মানুষের প্রাইভেসিকে সম্মান দিতে শিখিসনি এখনও। তোরা একেবারে গ্রাম্যভূত আর ক্ষ্যাত!”
জেসি হঠাৎ করে মুম্মিতার এই দুর্ব্যবহারের কোনো কারণ বুঝতে পারে না। সে এতে লজ্জা পাওয়ার চেয়ে অপমানবোধ করে বেশি। তাই, সে বান্ধবীকে কিছু-একটা বলার জন্য একটুখানি রেগে ঘুরে দাঁড়াতেই সে দেখলো, একটা খুব দামি গাড়ি মুম্মিতাকে যেন চিলের মুরগীর বাচ্চা নেওয়ার মতো করে ছোঁ মেরে তুলে নিলো! আর চোখের পলকে গাড়িটা কোথায় যেন মিলিয়েও গেল! সঙ্গে সে মুম্মিতার হাসিমাখা মুখটিও একনজর দেখতে পেয়েছিল!


সে আবার আগের মতো ফ্যাল-ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে রইলো মুম্মিতার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পথে। এখন তার কোনো কষ্ট নাই। শুধু মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে!



সাইয়িদ রফিকুল হক
১৫/১২/২০১৯
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ৯:৩৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাও সে তুং-এর 'পিপলস কমিউন' ব্যবস্থা যেভাবে ৩-৪ কোটি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬



চীনের আধুনিকায়নে মাও সে তুং-এর নেওয়া সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি ছিল কৃষির সমবায়িকরণ এবং "পিপলস কমিউন" ব্যবস্থা, ১৯৫০-এর দশকে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থার মূল... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার রিসাচ পেপার পাবলিশভ

লিখেছেন মোঃ মােজদুল ইসলাম, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:৩৪

Hailstorm, Rain, Dust The effect of Climate Change in Bangladesh
XXXX
IOSR Journal of Environmental Science, Toxicology and Food Technology
2319-2402
International Organization of Scientific Research
www.iosrjournals.org
Open Access Publishing
Blind Peer Review Process
Indexed Refereed Journal
20
06
10.9790/2402-2006020106 ...বাকিটুকু পড়ুন

সংস্কৃতি হারালে, বাংলাদেশ শুধু মানচিত্রে থাকবে- আত্মায় থাকবে না

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৫৯

সংস্কৃতি হারালে, বাংলাদেশ শুধু মানচিত্রে থাকবে- আত্মায় থাকবে না

একটি জাতিকে ধ্বংস করতে সব সময় যুদ্ধ লাগে না।
তার ভাষা, সাহিত্য, গান, নাটক, ইতিহাস আর সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করে দিলেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুমুখোচিন্তা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:১৬

সব মৃত্যু গণনায় আসে না। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি পুরনো নিয়ম আছে। মৃত্যু সমান মৃত্যু নয়। কোনো মৃত্যু পত্রিকার প্রথম পাতায় যায়, কোনো মৃত্যু জয়পুরহাটেই থেকে যায়। এই বাছাইটা দৈবাৎ হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×