স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাদ দিয়ে ছাপা হচ্ছে সংবিধানের নতুন সংকলন। এর মুখবল্পেব্দ বদলে যাচ্ছে স্ট্বাধীনতার ইতিহাস। অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের ভিত্তি। রাষ্ট্রেক্ষমতা ত্যাগের আগেই সরকার সংবিধানের নতুন এ সংকলন প্রকাশ করে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বিজি প্রেসে এ সংকলন ছাপার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর পরই নতুন সংস্করণ প্রকাশ করার কথা থাকলেও যথাসময়ে তা করা হয়নি। সংবিধানের কপিরাইট সরকারের পক্ষে আইন মন্পণালয়ের। নির্ভরযোগ্য অনুমোদিত পাঠ হিসেবে সংবিধান মুদ্রণ ও প্রকাশ করার দায়িত্বও এ মন্পণালয়ের। সংবিধান সংশোধন করা হলে সরকারের রুলস অব বিজনেসের মাধ্যমে পাওয়া ক্ষমতায় আইন মন্ততনালয় সংশোধিত সংস্ট্করণ ছেপে প্রকাশ করে। কিন্তু গত 2004 সালের 17 মে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর পর থেকে এ যাবৎ আইন মন্পণালয় এ সংস্ট্করণ প্রকাশ করেনি। সংবিধানের নতুন সংস্ট্করণ মুদ্রণ ও প্রকাশের সুযোগ নিয়ে সরকার কাগ্ধিক্ষত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে এ সময়টি বেছে নিয়েছে। তীব্র রাজনৈতিক প্রতিত্রিক্রয়ার আশগ্ধকা থাকায় বিতর্কিত এ কাজটি করার জন্য সরকার প্রায় দু'বছর অপেক্ষা করেছে। জানা গেছে, সংবিধানের বর্তমান সংকলনটি থেকে "স্ট্বাধীনতার ঘোষণাপত্র", 1972 সালের "আইনের অবিরাম কার্যকরতা আদেশ" এবং 1972 সালের "বাংলাদেশ অস্ট্থায়ী সংবিধান আদেশ" নতুন এ সংকলন থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানের আইনগত ভিত্তি এ তিনটি দলিল। এগুলো বাদ দিতে নতুন সংকলনের উপত্রক্রমনিকায় (মুখবল্পেব্দ) বলা হচ্ছে, "এসব পরিশিষদ্ব সংবিধানের কোনো অংশ নয় বিধায় বাহুল্য বর্জনের লক্ষ্যে বর্তমান সংকলন থেকে এগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।" আর একই সঙ্গে প্রজাতন্পের সর্বোচ্চ দলিল হিসেবে বিবেচিত সংবিধানের নতুন সংকলনটির মুখবল্পেব্দ বলা হচ্ছে, " ... বাংলাদেশের বীর জনগণ নয় মাসব্যাপী সশস্ট্প সংগ্রাম ও সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে 1971 সালের 16ই ডিসেল্ফ্বর বিজয় অর্জন করে। প্রতিষ্ঠিত হয় স্ট্বাধীন গণপ্রজাতন্পী বাংলাদেশ।" অথচ সংবিধানের প্রস্টস্নাবনার শুরুতেই উল্ক্নেখ রয়েছে, "আমরা, বাংলাদেশের জনগণ 1971 খ্রীষদ্বা্বেন্ধর মার্চ মাসের 26 তারিখে স্ট্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় স্ট্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদব্দের মাধ্যমে স্ট্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্পী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।" এভাবে বাংলাদেশ নামের রাষদ্ব্রটির প্রতিষ্ঠা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষদ্বির মধ্যেই সরকার সীমাবদব্দ থাকছে না; ইতিহাস বিকৃতির চূড়ানস্ন করতে আরো কিছু বিষয় সংযোজন করা হচ্ছে। বিএনপির রাজনৈতিক দাবির দালিলিক রূপ দিতে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় সংবিধানের এ সংকলনে ছাপানো হচ্ছে, "... জনগণের নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্দ্ব সেই ঘোর দুঃসময়ে আত্রক্রানস্ন দেশবাসীকে কোন দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন। সেই অবস্ট্থায় সময়ের অনিবার্য দাবীতে প্রতিরোধ যুদব্দের নেতা হিসেবে সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র হইতে স্ট্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন।" এর আগে ও পরে যেভাবে বাংলাদেশ নামের এ রাষদ্ব্রটি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সংবিধানের সংকলনের মাধ্যমে রাষদ্ব্রীয়ভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তাতে মহান মুক্তিযুদব্দের পটভূমিও নতুন মাত্রা পাবে। স্ট্বাধীনতার ঘোষক সমঙ্র্কিত বিএনপির রাজনৈতিক দাবিকে সংবিধানের নয়া সংকলনে নতুনভাবে উপস্ট্থাপন করা হয়েছে। মহান মুক্তিযুদব্দের সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানীর অস্টিস্নত্দ্বকে মুছে দিতে মেজর জিয়াউর রহমানকে আখ্যায়িত করা হয়েছে 'প্রতিরোধ যুদব্দের নেতা' হিসেবে। আর এর আগের দুটি বাক্যে বলা হচ্ছে, "... সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আশা আকাগ্ধক্ষাকে পদদলিত করিয়া এই অঞ্চলে কায়েমী স্ট্বার্থ ও শাসন-শোষণ বজায় রাখিবার উদ্দেশ্যে 1971 সালের 25শে মার্চ দিবাগত রাত্রে নিরস্ট্প জনগণের উপর পাকিস্টস্নান সেনাবাহিনী অতর্কিতে আত্রক্রমণ চালায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে তাহার বাসভবন হইতে গ্রেফতার করিয়া তদানিনস্নন পশ্চিম পাকিস্টস্নানে লইয়া যাওয়া হয়।" আর মুক্তিযুদব্দের পটভূমি হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমানের স্ট্বাধীনতার ঘোষণা সমঙ্র্কিত বাক্যটির পরে লেখা হচ্ছে, "... তখন এই অঞ্চলের জনগণ স্ট্বাধীনতার প্রত্যয়ে রুখিয়া দাঁড়ান এবং সৈনিক, পুলিশ, আনসার, রাইফেল বাহিনীর সদস্য ও ছাত্র-তরুণেরা স্ট্বতঃসম্ফহৃর্তভাবে হানাদারদের বিরুদব্দে প্রতিরোধ গড়িয়া তোলেন, প্রতিরোধ যুদব্দ উল্পম্নীত হয় জাতীয় স্ট্বাধীনতার ঐতিহাসিক মুক্তিযুদব্দে।" মুক্তিযুদব্দের এ পটভূমি উদব্দৃত করা হলেও পরিশিষদ্ব আকারে বর্তমান সংকলনে সল্পিম্নবেশিত থাকা স্ট্বাধীনতার ঘোষণাপত্র নতুন সংকলন থেকে বাদ না দেওয়া হলে মহান মুক্তিযুদব্দ ও স্ট্বাধীনতার বিকৃতি সহজেই ধরা পড়ত। 1971 সালের 10 এপ্রিলের এ 'স্ট্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে' মুক্তিযুদব্দের প্রেক্ষাপট ও স্ট্বাধীনতার ঘোষণা ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের আইনগত ভিত্তিটিও এ ঘোষণাপত্র। স্ট্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমেই বাংলাদেশের স্ট্বাধীনতা দিবস হিসেবে 26 মার্চ আইনসল্ফ্মত স্ট্বীকৃতি পেয়েছে। এর ষষ্ঠ প্যারায় উল্ক্নেখ আছে, "এবং যেহেতু এইরূপ বিশ্বাসঘাতকতামহৃলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসল্ফ্বাদিত নেতা বঙ্গবল্পব্দু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্দ্মনিয়ন্পণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে 1971 সনের 26শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্ট্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখ-তা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।" স্ট্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে ভূতাপেক্ষ (রেট্রোসপেকটিভ) কার্যকারিতা দিয়ে এর শেষ প্যারার আগের প্যারাটিতে বলা হয়েছে_ "আমরা আরও সিদব্দানস্ন গ্রহণ করিতেছি যে, স্ট্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্র 1971 সনের 26 মার্চ তারিখে কার্যকর হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।" আর এর আগে 14তম প্যারায় বাংলাদেশ নামের রাষদ্ব্রটি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা ও স্ট্বাধীনতার অনুমোদন করেন তৎকালীন জনপ্রতিনিধিরা। এই অংশে বলা আছে_ "সার্বভৌম গণপ্রজাতন্প রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম এবং তদ্দারা বঙ্গবল্পব্দু শেখ মুজিবুর রহমান কতর্ৃক ইতিপহৃর্বে ঘোষিত স্ট্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করিলাম।" অর্থাৎ নতুন সংকলনটি প্রকাশের পর বাংলাদেশ নামের এই স্ট্বাধীন রাষদ্ব্রটির প্রতিষ্ঠার তারিখ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকবে। এর মুখবল্পেব্দ "...বাংলাদেশের বীর জনগণ নয় মাসব্যাপী সশস্ট্প সংগ্রাম ও সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে 1971 সালের 16ই ডিসেল্ফ্বর বিজয় অর্জন করে। প্রতিষ্ঠিত হয় স্ট্বাধীন গণপ্রজাতন্পী বাংলাদেশ" লেখা থাকায় যে কেউ দাবি করতে পারবে যে, 1971 সালের 16ই ডিসেল্ফ্বর স্ট্বাধীন গণপ্রজাতন্পী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রসঙ্গত বাংলাদেশের এবং এর সংবিধানের আইনগত ভিত্তি হচ্ছে, জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশে 1970 সালের 7 ডিসেল্ফ্বর থেকে 1971 সালের 17 জানুয়ারি পর্যনস্ন বাংলাদেশের বর্তমান ভূখ-ে যে নির্বাচন হয় তাতে এদেশের জনগণ 169 জন প্রতিনিধির মধ্যে আওয়ামী লীগ থেকে 167 জনকে নির্বাচিত করে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারাই স্ট্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে একটি গণপরিষদ গঠন করেন। এ গণপরিষদ 26 মার্চের স্ট্বাধীনতার ঘোষণা অনুমোদন করে বাংলাদেশ নামের রাষদ্ব্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন এবং এর সরকার গঠন করে পাকিস্টস্নানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে মুক্তিযুদব্দ পরিচালনা করেন। 16 ডিসেল্ফ্বর বিজয়ের পর "1972 সালের অস্ট্থায়ী সংবিধান আদেশ" এর মাধ্যমে গণপরিষদকে পহৃর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়নের এখতিয়ার দেয়া হয়। গণপরিষদ 1972 সালের 4 নভেল্ফ্বর সংবিধান পাস করার পর 16 ডিসেল্ফ্বর থেকে এ সংবিধানটি কার্যকর হয় এবং গণপরিষদ ভেঙে যায়। ::::সমকাল ::::
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০০৬ বিকাল ৫:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



