
ফিমা সুন্দর। বেশ ভালোই সুন্দর। ক্যাম্পাসে তার হাসির একটা বিশেষ খ্যাতি আছে। ক্যাম্পাসে সবাই তাকে সুহাসিনী বলে ডাকে। কেউ কেউ ডাকে সুস্মিতা বলে। ফিমা অবশ্য এতে বেশ গর্ব বোধ করে। ক্যাম্পাসে এলে এজন্য তার হাসির মাত্রাও বেরে যায় অকারণ। প্রায় প্রতিদিন সে দু’ একটা করে প্রপোজাল পায়। প্রেমের প্রপোজাল। প্রপোজালের জালে অবশ্য সে নিজেকে জড়াতে চায় না। সবাই তার মন পাওয়ার জন্য মরিয়া। কিন্তু ফিমা ধরা দেয় না। নিজে ধরা না দিলেও সবাইকে ধরে রাখার কাজটা সে বেশ ভালোই পারে। এটা একটা খেলা। ঘুরঘুরান্তি খেলা। এই ঘুরঘুরান্তি খেলাটায় ফিমা বেশ মজা পায়। একটা ছেলের সাথে প্রেমে জড়িয়ে পার্কের বেঞ্চে বাদাম খাওয়ার চেয়ে ঘুরঘুরান্তি খেলায় হাজার গুণ বেশি মজা।
ফিমার পুরো নাম ফাতেমা তুজ জোহরা। ডাক নাম, ফাতেমা। ফিমা নামটা এই ফাতেমার সংক্ষিপ্ত রূপ। বিকৃত রূপ। অতি আধুনিক রূপ। ফিমা অতি আধুনিক মেয়ে। ফাতেমা নাম তার পছন্দ হওয়ার কথা নয়। ফিমারও পছন্দ হয় নি। তাই ফাতেমাকে ভেঙে সে ফিমা করেছে। এক ধরনের হীনমন্যতা। ফিমার বাবা একটু আপত্তি তুলেছিলেন। নড়বড়ে আপত্তি। কাজ হয় নি। সবাই এখন তাকে ফিমা বলেই ডাকে। ফিমার বাবাও ডাকেন। মেয়েকে তিনি ভালোবাসেন।
প্রতি বৃহস্পতি বার বিকেলে ফিমা একবার পার্লারে যায়। বিউটি পার্লার। আজ বৃহস্পতি বার। ফিমা বাড়ি থেকে বের হয়ে রিক্সায় উঠেছে। কুয়াশা বিকেল। বিন্দু বিন্দু কুয়াশা পড়ছে। ফিমার গায়ে আজ তাই গোলাপি রঙের একটা পাতলা সোয়েটার আছে বাড়তি। রিক্সা এসে থামলো একটা বিউটি পার্লারের সামনে। প্রিয়দর্শিনী বিউটি পার্লার। প্রিয়দর্শিনী বিউটি পার্লারের সামনে যে কয়েকজন প্রিয়দর্শিনীর ছবি দেখা যাচ্ছে তারা অবশ্য সবাই বিদেশিনী। কোন স্বদেশিনীর ছবি নেই। স্বদেশে কি কোন প্রিয়দর্শিনী নেই?
প্রিয়দর্শিনী বিউটি পার্লার থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা বেশ ঘন হয়ে এলো। ফিমা পার্লার থেকে বের হয়ে হাঁটতে শুরু করেছে। রিক্সা পায় নি। পার্লারটা একটু ভেতরে। কলাবাগান ডলফিন গলির এক চিপার মধ্যে। পার্লার থেকে বের হয়ে তাই রিক্সা পাওয়া যায় না। একটু হাঁটতে হয়। ফিমা একটু হাঁটছে। একটা ছেলে পেছন থেকে ফিমার হাত চেপে ধরলো হঠাৎ। ফিমা ফিরে তাকালো। আবির। আবিরের চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ। ফিমা বেশ অবাক হলো। আবির এই সন্ধ্যা বেলা কলাবাগানের চিপা গলিতে কি করছে?
আবির বিষণ্ণ দৃষ্টিতে ফিমার মুখের দিকে চেয়ে আছে। কথা বলছে না। ফিমা বললো, কিরে আবির তুই এখানে কি করছিস? আবির কোন উত্তর দিলো না। ফিমা একই প্রশ্ন আবার করলো সংক্ষেপে। আবির এবার মুখ খুললো। বললো, আমি তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ফিমা বেশ বিস্মিত হলো যেনো।
- আমি যে প্রিয়দর্শিনীতে আছি তুই সেটা জানলি কিভাবে?
- জানলাম। শোন, তোকে আমাদের বাড়িতে যেতে হবে এখনই। পারবি না?
- ক্যান? তোদের বাড়িতে যেতে হবে ক্যান? তোর বিয়ে না-কি?
- মা অনেক কাঁদছে রে। রাগ করেছে। তুই মাকে গিয়ে একটু সান্ত্বনা দে। গিয়ে বল যে আমি আর কখনও তাঁর কথা অমান্য করবো না।
- ঠিক আছে যাচ্ছি। তুই আসবি না আমার সাথে?
- আমি আসছি। চল তোকে রিক্সায় উঠিয়ে দেই। মা তোকে অনেক পছন্দ করে বুঝলি। আজ থেকে মায়ের কাছে মাঝে মাঝে যাস। শোন, আমার টেবিলের ওপরে একটা ডায়রি আছে খুলে দেখিস।
আবির ফিমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। সবসময় হাসিখুশি থাকে। বিষণ্ণতা ওকে স্পর্শ করতে পারে না কখনও। ফিমা আজ প্রথম তাকে এতো বিষণ্ণ বদনে দেখলো। আজ সে কথাও বলছে কেমন অদ্ভুত?
ফিমাকে রিক্সায় উঠিয়ে দিয়ে আবির উধাও হয়ে গেছে তৎক্ষণাৎ। ফিমার রিক্সা চলছে ঘোরের মধ্যে। জগাখিচুড়ি ঘোর। প্রিয়দর্শিনী পার্লারের কথা আবির জানলো কিভাবে? আবির কি গোপনে গোপনে তার সবকিছুর খোঁজখবর নেয়? কখন থেকে সে অপেক্ষা করছিলো প্রিয়দর্শিনীর সামনে? ডায়রি খুলেই বা দেখতে বললো কেনো? তাহলে কি আবির তাকে পছন্দ করে? সে কি ডায়রিতে তার মনের কথা লিখে রেখেছে?
ঘোরের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে ফিমা আবিরদের বাড়িতে চলে এসেছে। আবিরদের বাড়িতে এসে সে এখন বাকরুদ্ধ। এটা কিভাবে হতে পারে? সে কি সত্যি জেগে আছে না-কি এগুলো সব ঘুমের মধ্যে হচ্ছে। ঘুমের মধ্যে হবে কেনো? এইমাত্র প্রিয়দর্শিনী পার্লার থেকে সে বের হয়ে এলো। এইতো সদ্য ছাঁটানো ছোট চুল। মুখে পার্লারের গন্ধ লেগে আছে। পার্লার থেকে বের হয়ে আবিরের সাথে দীর্ঘ কথা। তাহলে কি সে আবিরের সাথে কোন কথা বলে নি? এটা কিভাবে সম্ভব? আবিরের কথাগুলো এখনও তার কানে বাজছে। তাহল এই রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত লাশটা কার? ওই তো আবিরের মা। আবিরের লাশ জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আবিরের টেবিলে সত্যি কি কোন ডায়রি আছে? না-কি এটা তারই মনের লুকানো কথার প্রতিধ্বনি, যে কথা তার মনের ডায়রিতে লিখা আছে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


