“অভিনন্দন!! প্রায় তিন লক্ষ হটমেইল ব্যবহারকারীর মধ্যে ইউনিক লটারিতে আপনার ইমেইল ঠিকানাটি নির্বাচিত হয়েছে। যার ফলে পুরস্কার হিসেবে আপনি পাবেন চার কোটি পাউন্ড! ইউএনডিপি লন্ডন এর আওতায় প্রতিবছর উক্ত লটারি প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। উক্ত পুরস্কার দাবী করার জন্য আপনাকে নিম্ন লিখিত ইমেইল ঠিকানায় আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় বিবরণী, যেমনঃ নাম, ঠিকানা, বয়স, পেশা, ফোন ইত্যাদি দ্রুত পাঠানোর অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।”
হায়! এই ছিল আমাকে দেওয়া ইমেইল টোপ। গত সপ্তাহ ব্যাপী ফিশিং স্কাম (হটমেইল এর ভাষায়) বা স্প্যাম জাঙ্ক ( ইয়াহু, গুগল এবং অন্যান্য ভাষায়) ইমেইলের ঝড়ে ব্যতিব্যস্ত ছিলাম আমি। উপরের ইমেইলটি শেষ রাতে পাওয়ার সাথে সাথে বুঝলাম ভণ্ডামি আর প্রতারণা মূলক দুষ্টুমি ছাড়া কিছু নয়। আমি এমনিতেই মুছে দিতে পারতাম, আর ওদের উত্তর না দিলে ওরাও থেমে যেত। তবুও, কি এক অ্যাডভেঞ্চারের বুনো নেশায় আমার পরিচিতি মূলক উত্তর দিয়ে দিলাম। আর পাশাপাশি খুঁজতে লাগলাম ইমেইল ঠিকানাটির ([email protected]) আইপি হদীস। ব্যস, আর যায় কোথায়। হটমেইল জাঙ্ক তালিকায় পেয়ে গেলাম আইডি। সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলাম যে, অনলাইন (email fraud) প্রতারণার প্রচেষ্টা এটা। তবু অনুসন্ধিৎসু মন, বাজিয়ে দেখতে চায় সব কিছু!
পরের রাতের ঘটনা, ওদের প্রতিউত্তর ইমেইল পেলাম। আমার নাম উল্লেখ করে বলা হয়- আপনার যাবতীয় তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত করা হচ্ছে যে, আপনি সমগ্র টাকা পাবেন এবং আমরা আপনাকে এটিএম মাস্টার কার্ড ইস্যু করে দিচ্ছি। ফলে আপনি সর্বোচ্চ দশ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দৈনিক তুলতে পারবেন বাংলাদেশের যে কোন এটিএম বুথ থেকে। আরেব্বাহ! নিজেকে তখন মুকুটহীন সম্রাট সম্রাট লাগছিল। যদিও জানি ওরা এক সময় টাকা চাইবে এই মাস্টার কার্ড ইস্যু বাবদ, অথবা পুরোটাই ভুয়া, তবুও মনে মনে হিসেব করে ফেলছিলাম ঐ বিশাল অংকের টাকা দিয়ে কী কী করব, কোথায় ভ্রমণে যাব- ইত্যাদি !! বাঙ্গালীর লোভী মন বলে কথা, ফ্রি পেলে নাকি আলকাতরাও খায়!
ঐ ইমেইলে ইন্টারলিঙ্ক এক্সপ্রেস পার্সেল ডেলিভারি সার্ভিস লিমিটেডের একটা ইমেইল ঠিকানা দেওয়া ছিল। ওদের হেড অফিস ছিল লন্ডনে, যেটা আমি ওয়েবসাইটে যাচাই করে দেখেছিলাম। সুতরাং ইন্টারলিঙ্ক ভুয়া নয়, তবে পুরস্কারের ইমেইলটি নিছক হয়রানিমূলক। আমাকে একটি সাজানো ক্লিয়ারেন্স কোড নাম্বার দিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়, পার্সেল এর জন্য ইন্টারলিঙ্কে যোগাযোগ করতে। আমি তো- দেখি কী হয়, এই দারুণ নেশায় কথামত সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করছি একের পর এক। ঠিক ঠাক মত ইন্টারলিংকে ইমেইল পাঠালাম।
দুদিন পর ঠিক আশানুরূপ উত্তর পেলাম, যা ভেবেছিলাম। তারা আমাকে (মাস্টার কার্ড সহ!) পার্সেল প্যাকেট টি আবাসিক ঠিকানায় পাঠাবে, তবে অগ্রিম পরিশোধ করতে হবে তিনশ পাউন্ডের মত। আমার আকাশ কুসুম কল্পনার গুঁড়ে বালি! সাথে সিমেন্ট, কাঁকর সব ছিল। অতঃপর উভয় ইমেইলে আমি অগ্রিম টাকা দেওয়ার অপারগতার কথা জানালাম। কাহিনীর সেখানেই রফা দফা। সপ্তাহ খানেক হয়ে গেল, অনলাইন প্রতারক চক্রের আর খবর নেই। আরেকটা কথা, এরই মাঝে ঐ ইমেইল ঠিকানাদ্বয় রিপোর্ট করে দিয়েছি ফিশিং স্কাম হিসেবে। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে আর তারা আমাকে লোভের টোপ দিতে পারবে না, নিশ্চিত!! টোপ দিতে গেলে নতুন আইডি খুলে তবেই...
সতর্ক বার্তা/ ফাঁদ লক্ষণঃ
১/ জাঙ্ক ফোল্ডারে যে ইমেইলই আসুক না কেন, তা এড়িয়ে চলা মঙ্গল জনক, অত্র মেইলটি জাঙ্ক হিসেবে এসেছিল- তবুও আমি পরখ করেছিলাম! আমাকে মফিজ বানাতে পারেনি তারা, অর্থাৎ কোন ক্ষতি আমার হয়নি, শুধু সাকুল্যে ঘণ্টা দুয়েক সময় নষ্ট হয়েছে, এই যা।
২/ জাঙ্ক এ ঘন ঘন অপ্রয়োজনীয় ইমেইল আসলে তা স্প্যাম হিসেবে চিহ্নিত করে দিলে আসা বন্ধ হয়ে যায়।
৩/ সাধারণত র্যাফেল ড্র বা ইমেইল লটারির পুরস্কারের খবর আসলে, সেই ইমেইল সেন্ডারের আইপি বা অবস্থান ঠিকানা যাচাই করা বাঞ্ছনীয়। যাচাই পদ্ধতি বেশ সহজ। সত্য না ভুয়া- তা লিখে সার্চ করলেই ব্ল্যাক রেটেড ঠিকানাগুলোর তালিকা চলে আসে। ইমেইল ঠিকানা দেখেও সত্যতা যাচাই করা যায়। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান গুলো তাদের হোমসাইট থেকেই যোগাযোগ করে। যেমন- undp.org এরকম স্বতন্ত্র পরিচয় প্রকৃত ইমেইল ঠিকানায় সাধারণত থাকে।
৪/ ইমেইল স্প্যাম কিনা তা ইংরেজির গঠন ও ভাষা- বানান দেখেও বোঝা যায়। অধিকাংশ বানানে অসঙ্গতি থাকে। যা দেখে খটকা লাগবেই। অফিস বা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাও ভুল উল্লেখ করা থাকে।
৫/ কোন পুরস্কার পাওয়ার জন্য অগ্রিম মূলধন জমা দিতে হয় না কখনো। এরকম কেউ চাইলে ধরে নিতে হবে ভুয়া। আবার অবিশ্বাস্য টাকার পরিমাণ উল্লেখ থাকলে তাও নিখাদ ভুয়া।
সালতামামিঃ
অনুগ্রহ করে কেউ ইমেইল ফ্রড তথা প্রতারণার শিকার হবেন না যেন, সর্বদা সতর্ক মন নিয়ে থাকবেন, অধিক লোভে পড়বেন না। ক্রেডিট কার্ড ডাকাতিও হয় অনলাইনে। সুতরাং, স্বল্প পরিচিতজনদের নিজের পাসওয়ার্ড দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। সাইবার জগতে পদে পদে মফিজ হওয়ার আশংকা থাকবে, সব জয় করে বীরপুরুষের মত চলতে হবে কিন্তু।।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০১২ রাত ১১:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



