{ রম্যর তুলনায় গুরুগম্ভীর লেখনী এবং ওজনদার টেক ব্লগেই আমার আগ্রহ। তবু ঈদ স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে অত্র লেখনী শেষ করলাম অনেকটা অজান্তেই। প্রতিক্রিয়া চেখে দেখার আশায় সবার মাঝে ছড়িয়ে দিলাম লেখাটি---}
তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, ২০০১ সালের প্রথম দিকের কুরবানির ঈদের তিন-চারদিন আগের কথা। শুক্রবার বাদ জুমা হাট। সেবার প্রথম কুরবানির গরুর হাটে যাওয়ার বায়না ধরলাম। শুরুতে বাধ সাধলেও অতঃপর পীড়াপীড়িতে বাবা আমার হাটগমনে সম্মতি দিলেন। উত্তেজনার পারদ তখন তুঙ্গে, হাটে যেতে হবে- না জানি কী ভিয়াইপি এক কারবার! যদিও দুপুরের আগ থেকেই বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম, তবু জুমার নামাজ শেষ করে মধ্যাহ্নের খানা পিনা শেষ করেই হাটে গমনের সময় নির্ধারিত। সকাল থেকেই আমার প্রহর গোনা শেষ হয়না। ঈদের কেনা লাল জামাটি বারবার খুলছি আর দেখছি, উদ্দেশ্য ছিল অবশ্য সেই জামাটি পরেই হাটে যাওয়ার। বিকেলের একটু আগে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যেই রক্তলাল জামায় বাবু সেজে ছাতা মাথায় গরু খরিদের নিয়তে বের হলাম বাবার সাথে। আমাদের যাত্রাসঙ্গী হল আরও দুজন- খলিল ভাই আর পরিতোষ কাকা। বাবার আপত্তি সত্ত্বেও আমার লাল জামা পরায় সঙ্গী দুজন কিন্তু খুব খুশি, সানন্দে বলছিল লাল জামায় গরু মহাশয়ের আদরের কথা! (পরে অবশ্য বুঝেছিলাম, আদর কাকে বলে!) আমি তো মনে মনে আহ্লাদিত, বাহ! এই না যোগ্য সমঝদার।
কর্দমাক্ত হাটে পৌঁছানোর সাথে সাথে দেখলাম হাম্বা হাম্বা রবে মুখরিত পরিবেশ। খয়েরি, সাদা, কালো, ধূসর রঙের বাহারি আকৃতির গরুতে হাট বর্ণিল। কিন্তু একি, একপাশে আবার ভ্যা-ভ্যা খ্যাত ছাগলের সমারোহ! তবে কি গরুর হাটে না এসে ভুল করে... ওমনি শুরু হয়ে গেল আমার অবুঝ কান্না। কান্না জড়ানো কণ্ঠে বাবার কাছে শুধু গরুর হাটে যাওয়ার আর্তি চলছে তো চলছেই, কোন সান্ত্বনাতে কাজ হচ্ছেনা। উপরন্তু সাথী দুজনের তির্যক খোঁচাখুঁচিতে আমার হাট উপভোগের গুঁড়ে বালি। এরপর ঘটল আসল কাহিনী। আমার গায়ে পরিহিত লাল জামাকে আদর করতে এগিয়ে এল বাঁকা চোখা শিং যুক্ত এক কালো ষাঁড় মামা, তা টেরই পাইনি। ঘাড়ের কাছে যেইনা গরম নিঃশ্বাস আর লালায়িত জিহ্বার স্পর্শ পেলাম, ওমনি কোনদিক না তাকিয়ে হাতের ছাতা ফেলে বৃষ্টির মধ্যেই দিলাম উন্মাতাল ছুট। গগন বিদারী ভয়ার্ত চিৎকারে নিজেকে আবিষ্কার করলাম ছাগলের সারির মাঝে। আমার আর্তনাদ আর ছাগলের ভ্যা ভ্যা ডাক একাকার হয়ে গেল, নিজেকে ক্ষণিকের জন্য ছাগল প্রজাতির অংশ হিসেবে অনুভব করলাম। আমার জন্য হঠাৎ করেই হাটজুড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কিঞ্চিৎ উত্তেজনা। বেরসিক গরুর ধাওয়ায় উত্তেজিত আমাকে নিবৃত্ত করতে ছুটে এলেন বাবা সহ আরও কয়েকজন ব্যাপারী।
ষাঁড় মামার ঐ উষ্ণ অভ্যর্থনায় আমার ছাগল প্রীতি প্রবল ভাবে জেগে উঠল। গরু এবং ষাঁড় কেনা বন্ধ, তৎক্ষণাৎ আমার এক দফা এক দাবী- নিরীহ ছাগল কিনতে হবে। কেননা ছাগলে ভয়ানক আদররূপী ধাওয়া খাওয়ার আশংকা নেই, বরঞ্চ আমার বিপদেও তারা সুর মিলিয়ে কাঁদে (ভ্যা ভ্যা করে)। তাই অন্তত নিরাপত্তার খাতিরে আমার জন্য ছাগলই সুখকর। অতঃপর তীব্র গাঁইগুই এবং ক্রন্দনের পর সেই ঈদে ঢাউস আকারের এক খাসী (যদিও খাসী-ছাগল নিরূপণ করতে এখনো খটকা লাগে) কেনা হল। সেই সাদা কালো মিশ্রিত রঙের খাসী হয়ে গেল আমার তিন চারদিনের দিন যাপনের বন্ধু আর খেলার সাথী। বাসার সম্মুখস্থিত ফুলের বাগানে সকাল বিকাল ভোজন, ফলশ্রুতিতে মায়ের গালমন্দ; খেলার মাঠে তার উপস্থিতি, খেলা চলাকালীন ক্রিকেট পিচে তার হঠাৎ ভ্রমণ- সবই দারুণ উপভোগ করতে লাগলাম। মনে হত, যেন এক ঘোড়ার মালিক হয়ে গেছি!
সেই যে গরুর হাটদর্শনে গিয়েছিলাম, বহু বছর পার হলেও আর ও পথে পা বাড়াইনি। আজো সেই অবিমিশ্র ঘটনা মনে পড়লে অজান্তেই মুচকি হেসে উঠি, বিশেষ করে কুরবানির ঈদের আগে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ১২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



