এক
এখন কেমন লাগে? মজা বোঝো। হাতির মতো স্বাস্থ্যের অধিকারী তিতিল ও আরো দুই বাচ্চা তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলে রেখেছিল বেঞ্চটা। দুই বেঞ্চের পায়ার মাঝে পড়ে হুমার পায়ে রক্ত জমে গিয়েছে। চাপায় পড়ে ফেটে গিয়েছিল প্লাষ্টিকের জুতা। ব্যথায় চাখ মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। তবু চোখে পানি নেই। এমন সময় ঘন্টা বাজলো।
তিলিসহ সবাই একে এক চলে গেল। পা নাড়াতে পারছিল না হুমা। ভাবছিল জুতার কথা মাকে কি বলবে? কালই বাবা কিনে এনেছেন ওটা।
বাচ্চাদের খাতা দেখায় ব্যস্ত ছিলেন হেলেন শামসি। বিএএফ শাজীন কলেজ। বিশাল ক্লাস রুম। অনেক বাচ্চা। টু’র ক্লাস। পুরো ঘটনাটা চোখ এড়ালো না হেলেনের। প্রথমে ভাবলেন, বাচ্চারা যেহেতু গন্ডগোল না করে নীরবে খেলছে সেহেতু কিছু বলার দরকার নেই। কিন্তু এই অবস্থার পরও বাচ্চাটার আচরণ দেখে কিছুটা বিস্মিত হলেন তিনি। হুমা নালিশ করেনি, তাতে কি! নিজে গিয়ে কেন অন্য বাচ্চাদের কেন থামালেন না ভেবে অপরাধ বোধ বুঘছিলেলন তিনি।
বাচ্চাটা একটু অন্য রকম হওয়ায় শুরু থেকেই ওকে অবজার্ভ করছিলেন হেলেন। প্রথম দিন তার নাম জানতে চাওয়া হলে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলেছিল, আমি নুঝাত হুমায়রা । নামের মানে প্রফুল্ল সুন্দরী।
মেয়েটিএকদম অন্য রকম। একবার দেখলে আজীবন মনে রাখার মতো চেহারা।
কিছুদিন আগে হেলেন দেখেন ক্লাস শুরুর আগে বাচ্চারা কুতকুত খেলছে। তা দেখে হুমা বলছিল, ও পুরনো নিয়মে খেলবে না। নিজেই নাকি একটা চমৎকার নিয়ম বানিয়েছে।ওভাবে খেলবে।
অন্যরা তাতে রাজি হলো না। বলল, আমরা সব সময় এভাবেই খেলি। তোমার কথাতেই হবে নাকি?
এক বাচ্চার আবার হুমায়টাই বেশি ইন্টারেসটিং মনে হলো। তখন তারা দুজন আলাদা খেলে হেলেনের কাছে ব্যাপারটা বেশ মজার লাগে।
পরদিন ক্লাসে এলনে হেলেন। নাম ডাকতে গিয়ে দেখেন হুমা অনুপস্থিত। ক্লাস শেষ করে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় দেখলেন হুমার মা, সঙ্গে আরেক বাচ্চার মা এদিকেই আসছেন।
মনে মনে হেলেন ভাবলেন, ডেঞ্চারাস বাচ্চাতো। নিজে কিছু বলল না, মাকে পাঠিয়ে দিল! হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, ভালো আছেন? হুমা এলো না?
ম্যাডাম, আর বলবেন না। মেয়েটার বাসায় যাওয়ার পর থেকে জ্বর এসেছে। পায়ে কিভাবে যেন ব্যথা পেয়েছে। সামনে পরীক্ষা। তাই আমিই পড়া নিতে এলাম।
হেলেন একটু হোচট খেলেন।
আচ্ছা ম্যাডাম, এবার যে সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্নগুলো লিখে দিয়েছেন ও গুলোর উত্তর খুজতে গিয়ে তো হিমশিম খেতে হচ্ছে। লিজার মায়ের সঙ্গে উত্তর মেলাতে এসে দেখি দুজনের খাতায় দুই রকম প্রশ্ন।
তা কি করে সম্ভব! লিজারটা ঠিকই আছে। কিন্তু এ কি, হুমার খাতার গুলো তো আমি লিখে দিইনি! কিছু প্রশ্ন খুব ইন্টারেষ্টিং। মেযন, দুই টাকার নোটের এক পিঠে দোয়েলের ছবি থাকলে অন্য পিঠে কি? কয়েকটি আবার উপরের ক্লাসে আসে। হেলেন প্রায়ই দেখতেন, ও টিফিনের সময় খেলা বাদ দিয়ে খুব মনোযোগসহ কিসব বই ঘাটাঘাটি করছে। কিন্তু এখন এ ঘটনার আকস্মিকতায় মুখে কিছু বলতে পারেন না হেলেন। পরে কেন সে এমনটা করলো এ নিয়ে হেলেন এবং হুমার মা তাকে অনেক প্রশ্ন করলেন।
হেলেন বললেন, তুমি তো ক্লাসে দুষ্টুমি করো না, চুপচাপ থাকো। কোনো একটা প্রশ্নের উত্তর যখন কেউ পারে না তখন তুমি পারো। কিন্তু এমন করলে কেন?
সে একদম চুপ ছিল।
তারপর বেশ কিছু দিন কেটে যায়। একদিন হেলেন দেখলো হুমা পাঁচ-ছয় বাচ্চাকে কি যেন বলছে আর তা নিয়ে হুমাসহ অন্য বাচ্চারা গোল হয়ে গবেষণা করছে। বাহ, হুমার বেশ কদর বেড়েছে দেখছি। ভাবেন তিনি।
হেলেন কাছে গেলে ওরা চুপ হয়ে যায়। তার পরদিন দেখেন আবার হুমাকে নিয়ে বাচ্চাদের হটলা। আগের মতো কিছু হতে পারে ভেবে একটু বকা দিয়ে ওদের জায়গায় বসতে বললেন হেলেন।
তার পরদিন দেখেন আবার হুমাকে নিয়ে বাচ্চাদের জটলা। আগের মতো কিছু হতে পারে ভেবে একটু বকা দিয়ে ওদের জায়গার বসতে বললেন হেলেন।
একটু পর ক্লাস ক্যাপ্টেন এসে তাকে দুটা চিরকুট দেখিয়ে কিছু একটা বললো। চিরকুটে তুমি এতোটার সময় এখানে আসবে। কাউকে বলবে না। এই টাইপ কিছু লেখা।
হেলেন হুমাকে ডেকে বলেন, এগুলো তোমাকে কে দিয়েছে?
সে বললো, একটা বোরখা পরা মহিলা। হেলেন বলেন, জানালা দিয়ে দেখো তো বাইরে দেখা যায় নাকি?
সে অনেকের মধ্যে থেকে এক বোরখা পরা মহিলাকে দেখিয়ে দিল।
গভীল মনোযোগ দিয়ে তাকে অবজার্ভ করলেন হেলেন। সে সময় আবার কিডন্যাপারদের বেশ আনাগোনা বেড়েছিল। প্রিন্সিপালস্যার মিটিং করে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাবধান করে দিয়েছেন। আত্মা কেপে ওঠে হেলেনের।
হুমা জানালার পাশে বসে ছিল। তাকে তিনি সরিয়ে মাঝখানে বসান।
অন্য বাচ্চারা খুব কেয়ার নিতে থাকে হুমার। সে দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে ছিল। চোখ-মুখে টেনশনের ছাপ।
চিরকুটগুলো আবার মনোযোগ দিয়ে পড়েন হেলেন। একটা চিরকুটে নিচে নাম লেখা ছিল শিমুল। কচি হাতের লেখা। অন্য ক্লাসগুলো থেকে এ নামে তিনটা ছেলে ধরে নিয়ে আসেন তিনি। ওদের হাতের লেখা মিলিয়ে এবং অনেকক্ষণ ইন্টারভিউ নিয়ে বোঝা। গেল এ কাজ তাদের কারো নয়।
এদিকে হুমাকে সঙ্গে নিয়ে বাচ্চারা ছয় সদস্যের একটা গোয়েন্দা বাহিনী বানিয়ে ফেলে। তারা কিডন্যাপার ধরার প্ল্যান করে। তাদের অভিযানের স্বার্থে প্রত্যেকেরই বাড়ি ফিরতে দেরি হয়।
অনেক মা-বাবাই টেনশনে ফোন করে ফেলেন হেলেনকে।
তার তো টেনশনে হার্ড অ্যাটাক করার দশা। পরে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সবাই ফিরেছে শুনে স্বস্তি পান।
পরদিন হুমা স্কুলে এল। তার দিকে সারাক্ষণ সজাগ দৃষ্টি রাখছিলেন হেলেন। প্রথমে দেখা গেল, সে ব্যাগের ভেতর কি যেন খুজে খুজে হয়রান হচ্ছে আবার আশপাশের বাচ্চাদের সঙ্গে কি যেন গুজুর-গুজুর, ফুচুর ফুচুর করছে।
হুমা টয়লেটে গেল। ফিরলো আরেকটা চিরকুট নিয়ে।
কি করবেন, কি করা উচিত তা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না হেলেন। টেনশনে রাতে দুই চোখের পাতা এক করতে পারেননি তিনি। টিফিন পিরিয়ডে ওই গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের টিচার্স কমনরুমে যেতে বলা হয়। সেখানে তাদের শাস্তি হবে।
ওরা গুটি গুটি পায়ে গিয়ে দেকলো সেখান ওদের ক্লাস টিচারসহ বাকিরা সবাই গোল হয়ে বসে কি নিয়ে যেন মিটিং করছে। তাদের মুখভঙ্গি দেখে বোঝা যায় তারা হুমার ব্যাপারটা নিয়েই কথা বলছে।
একটু পর হেলেন হুমার ব্যাগ থেকে সব খাতা, ডায়েরী নিয়ে যান।
কিছুক্ষণ পর ছুটি হবে। সবাই বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হুমাকে ডেকে হেলেন বলেন, তোমার মা এসেছে?
হুমা মাথা নিচু করে বললো হু।
ছুটির পর ওনাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবে।
হুমা বেরিয়ে দেখতে পেল তার মা আতংকিত মুখে অন্য মায়েদের সঙ্গে কি নিয়ে যেন আলাপ করছেন। হাতে সেই চিরকুটগুলো যেগুলো সে সকালে ব্যাগে খুজে পায়নি। হুমার আর বোঝার বাকি থাকে না যে, মা তার ব্যাপারটা নিয়েই কথা বলছেন। হুমা কাছে গিয়ে কিছু বলার আগেই মা বললেন, আমি তোমার টিচারেরসঙ্গে কথা বলবো, চলো।
তিনি এলেন হেলেন তাকে গত দুই দিনের ঘটনা খুলে বললেন। তার পর হুমাকে বললেন, তোমার ম্যাথস খাতা বের করো।
তারপর দেখান খাতার মাঝের একটা পাতার কোণা ছেড়া। আজকের পাওয়া চিরকুটের আকার মিলিয়ে দেখেন এটা ওই পাতারই ছেড়া অংশ। তারপর চিরকুটের হাতের লেখার সঙ্গে হুমার খাতার লেখাগুলো মিলিয়ে দেখান একই হাতের লেখা।
হুমার মায়ের মুখের দিকে তাকালেন হেলেন।
কিছু বলে দিতে হয় না। দুই মিনিটের মতো স্তব্ধ হয়ে থাকেন তিনি।
হেলেন বললেন, আমি আমার বারো বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমনটি দেখিনি বা কল্পনাও করতে পারিনি। এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। কখনো ভুলবোও না এই ঘটনার কথা। প্রিন্সিপালের সঙ্গে শেয়ার করলে তো টিসি দিয়ে দিতেন আপনার মেয়েকে।
পরদিন আবার আগের মতো ক্লাস শুরু হয়। এ দুই দিনে হুমার অন্য একটা রূপ দেখেছিল সবাই। ঠিক যেন চঞ্চল হরিণের মতো। আজ যেন সে আগের থেকেও বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সে কি তাহলে এটা করেছিল একটু কেয়ার, একটা প্রায়রিটি পাওয়ার আশায়?জেদেরে কারণে এসব আর খেয়াল করেন না হেলেন। বরং একটি অংক ভুল করলে তাচ্ছিল্যের স্বরে তাকে বকাঝকা করেন আর অন্য বাচ্চারা মুখ টিপে হাসতে থাকে।
দুই
পাঁচ বছর পর দেশে ফিরেছেন হেলেন। এখানে তার কোনো কাজ নেই। একাকীত্ব কাটাতে বুক শেলফ হাতড়াতে হাতড়াতে চোখে পড়ে একই লেখকের তিনটা বই পাশাপাশি সাজানো। বই গুলোর প্রচ্ছেদ আর নামও বেশ সুন্দর। এর মধ্যে একটা উপন্যাস বেছে নেন তিনি। কেমন জানি নেশা ধরে গেল। সারাবেলা এর মধ্যে মুখ গুজে তিন দিনে বইটা পড়া শেষ করলেন তিনি। বইটাতে বলা হয়েছে, কছিু অপ্রয়ি সত্য। বইটা পড়তে পড়তে কখনো জোরে হেসে ফেলেছেন আবার কখনো চোখের কোণায় জমছে জল। কখনো ভুগে গিয়েছেন ভাবনার জগতে।
বইটা বন্ধ করতে গিয়ে বইয়ের পেছনে লেখিকার ছবি দেখে ভাবেন, এতো কম বয়সী মেয়ের লেখা! ছবরি দিকে আবার তাকাতে গিয়ে খেয়াল করেন কোনে একটা চেনা মুখের ছাপ যেন উকি দিচ্ছে। তিনি ছবির নিচের লেখাগুলো পড়ছেন। নুঝাত হুমায়রা । মানবাধকিার র্কমী। পড়ছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে গণিত বিভাগ।ে স্কুল ও কলেজ বিএএফ শাহীন কলেজ। মাধ্যমিক পাস করেন ২০০৮ সালে। এই তিনটা লাইনে চোখ আটকে যায় হেলেনের। কেমন নস্টালজিক হয়ে যান তিনি। হুমা ক্লাস টুতে পড়তো ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৮+৮=২০০৮ । তাহলে কি?!

সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



