
পরিবার শিক্ষা শেষ করে প্রাথমিক গন্ডির মাঝামাঝি সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা, মনে পড়লে আজও ভয়ে শিউঁরে উঠি, আজও লজ্যা দেয়।
সময়টি ছিল বর্ষার মাঝামাঝি্। তখন আমি তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। বড় আপুর বিয়ে ঠিক হল। ঐ বছর বণ্যার পানিতে আমাদের গ্রামের রাস্তা ঘাট প্রায় ডুবে যায়। বর পক্ষকে বিয়ে পিছানোর জন্য বললেও তারা বিয়ে না পিছিয়ে বর্ষাতেই বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করল। আমার কোন চাচা কিংবা বড় ভাই না থাকায় সব কাজ বাবা একাই করতে হয়। বিয়েতেও করল।ছোট দেখে অামায় কেউ কোন কাজের দায়িত্ব দেয়না। আমার খারাপ লাগার চেয়ে কাজে দায়িত্ব পাওয়ার কৌতুহল ছিল বেশি। এটি ছিল আমার দেখা পরিবারের প্রথম বিয়ে। বিয়ের এক সপ্তাহ আগ থেকে মেহমান আশা শুরু করল। পাকা রাস্তা থেকে এক কিঃমিঃ কাচা রাস্তা পার হয়ে আমাদের বাড়ীতে আসতে হত। বর্ষায় রাস্তা ডুবে যাওয়ায় সবাই মোটামুটি নৌকা দিয়েই পারাপার হয়। বর্ষার স্থায়ীত্ব তিন মাসের বেশি হওয়ায় গ্রামের সবাই ছোট ছোট নৌকা কিনে পারাপার হয়। শুধু অামাদের নৌকা ছিলনা। বাড়ীর অন্যদের দুটি নৌকা ছিল। ঐটাই আমরা ব্যবহার করতাম। বিয়েতে মেহমানরা আসলে আগে থেকে খবর দিতো, আব্বু কিংবা বাড়ীর অন্যলোক থাকলে তাদের নিয়ে আসতো।
দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে আসলো। ঘটনাটি ঘটল বিয়ের দু দিন আগে সন্ধ্যায়। আব্বু গঞ্জের হাটে গেলো বিয়ের বাজার করতে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। বৃষ্টি আসবে আসবে বলে গর্জন সংকেত দিচ্ছিলো। আমি ঘরের পেছনে টিউভ ওয়েলের পানিতে হাত-মুখ ধৌত করছিলাম। প্রত্যেক বিকেলে বাড়ীতে সমবয়সীদের সাথে খেলা-ধুলা করে নিয়ম করে সন্ধ্যার আগ মহুর্তে সবাই হাত-মুখ ধৌত করে পড়ার টেবিলে বসার নিয়ম ছিল। বাবা না থাকলেও সেটা পালন করতে হত। মা রান্না ঘরে ব্যস্ত থাকায় তিনিও তাড়া দেননি আজ। তাই টিউভ ওয়েলের দুয়ারে বসেও দুষ্টমি চলছে। হঠাৎ করে খলিল চাচা বাবার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে বলে তোদের মেহমান আসছে। রাস্তার মাথায় বসে আছে, বৃষ্টি আসছে তাড়াতাড়ি নিয়ে আয়, আমার নৌকা ভর্তি হওয়াতে আমি আনতে পারি নাই। তখন আমার বয়সী সবাই নৌকা চালাতে পারতো, আমিও পারতাম তবে এক কিলো কখনো চালাইনি। আম্মু রান্না ঘরের ব্যস্ততায় শুনতে পায়নি, খলিল কাকা কি বলল। আমি ভাবলাম খলিল কাকা আমাকে বলছে মেহমানদের নিয়ে আসতে। আমি কাউকে কিছু না বলে নৌকার লগি নিয়ে মেহমানদের আনতে রওনা হলাম। তখনো বৃষ্টি শুরু হয়নি।
তখনকার গ্রামের বিয়েগুলোতে অনেক পুরাতন কিংবা আত্মিয়ের আত্মিয়দেরও দাওয়াত দেওয়ার প্রচলন ছিল। মেহমান যাদের আনতে গেলাম তারা ছিল তিন জন, সাথে ছিল, দুধের বাচ্চা (৭ মাস) একজন মহিলা তিনজন পুরুষ। মহিলা ছিল আমার আম্মুর খালতো বোন, পুরুষ দু’জনের মধ্যে একজন ছিল, আম্মুর খালতো বোনের স্বামী আর একজন ছিল আম্মুর খালাতো বোনের, বোনের ছেলে। আম্মুর খালাতোবোনকে প্রথমে চিনলাম, বাকিদের পরে চিনেছি। উনিও আমায় চিনেছে। উনারা এ প্রথম আমাদের বাড়ী আসতেছে। নতুন মেহমান হিসেবে ঐ সময়ে বিয়েতে যা আনার তার কোন কমতি তারা রাখেনি। বিশেষ করে মিষ্টি, আপু এবং আপুর বরের জন্য আংটি।
আমি তাদের নেওয়ার জন্য যে নৌকাটি আনলাম ঐ নৌকায় করে পাঁচ জন একসাথে বহন করতে দেখেছি। সেখানে আমরা ছিলাম ৪ জন, আমিসহ। এখানে আমি শুধু জন-ই হিসাব করছি, কিন্তু তাদের সাইজ হিসাব করিনি। পুরুষ দু’জনিই ছিল নৌকা চালাতে অজ্ঞ। তারা জেলা শহরে থাকে। তারাও খুব কম নৌকায় ছড়েছে।
বৃষ্টি আসার আগে আগে পৌছাতে হবে। তাই তারা তাড়াহুড়ো করে নৌকায় উঠে পড়ল। প্রথমে খালা উঠলেন উনার কোলে দুধের বাচ্চা। তারপর উনার হাসব্যান্ড হাতে মিষ্টির বাক্স, তারপরের জনের হাতে আরও একটি বড় বাজারের ব্যাগ ছিল। তিনি উঠতেই নৌকা প্রায় পানির সাথে 5 আংগুলের পার্থক্য। উনারা ভাবলো আমি নৌকা ভালো চালাতে পারি। তাই তারাও প্রথমে এত ভয় পায়নি, শুধু খালা একটু ভয় পাচ্ছিল।
অামি আস্তে আস্তে লগি মেরে আগাচ্ছিলাম, খালা ভয় পায় দেখে, খালার হাত থেকে বাচ্চাটিকে খালু নিয়ে উনাকে নৌকার দুই পাশে দুই হাত দিয়ে বসতে বললেন। বাচ্চটি তাদের প্রথম সন্তান তখন বাচ্চার বয়স ছিল মাত্র সাত মাস। অপর জন হাতে লাইট। নৌকাতে বসার জন্য কোন ব্যবস্থা না থাকায় সবাই উরু হয়ে বসেছিল। নৌকায় উরু হয়ে বেশিক্ষন বসা যায় না। খালা এদিক ওদিক করতে লাগলো ভয়ে। হঠাৎ করে নৌকার এক পাশ একটু ডুবে কিছু পানি ঢুকল। খালা বড় বড় করে দোয়া-দুরুদ পড়তে লাগল। এদিকে বৃষ্টিও শুরু হল। নৌকায় পানি বাড়তে থাকলো। খালু বাচ্চা বুকে নিয়ে দোয়া পড়তেছে, খালা ভয়ে চিৎকার দিচ্ছিল, অপরজন বাটি দিয়ে পানি নিষ্কাশন করতে গিয়ে নৌকার একপাশ ডুবাইয়া আরও একটু পানি ঢুকাইল। এখন নৌকা থেকে না নামলে নিশ্চিত বাকিটাও ঢুবে যাবে। অামরা কি করব বুঝতে পারছি না। হুট করে আমি লাফ মেরে নেমে পড়ি।আমি জানতাম না আমি পানিতে ঠায় পাব কিনা। ভাগ্যিস আমার গলা সমান পানি ছিল। আমি লাফ মেরে নামতে আরও পানি ঢুকে নৌকা ডুবে যাচ্ছিল। আমি লগি রেখে দুই হাত দিয়ে নৌকা উঠাই ধরেছি। খালু বাচ্চাটিকে আন্টির কাছে দিয়ে উনিও নেমে পড়লেন, পরে বাকিজনও নামলেন। খালা ও তার বাচ্চাকে নৌকায় রেখে আমরা সবাই নেমে বাটি দিয়ে পানি কিছু নিষ্কাশন করেছি।তারপর আমি নৌকার সামনে দিয়ে ধরে আর বাকি দুজন নৌকার পিছনে ধরে ধরে সামনে এগুতে লাগলাম। সামনে এক যায়গায় পানি কম থাকাতে পুরুষ দুইজনকে ঐ যায়গায় রেখে আমি খালা ও তার বাচ্চাকে অনেক সতর্কভাবে বাড়ীতে রেখে নৌকা নিয়ে আবার ওদের আনতে গেলাম। আমি একটু যেতে দেখে উনারা ঢুবে ঢুবে চলে আসতেছিলো। পরে তাদের নৌকায় উঠার জন্য বললে তারা বিড় বিড় করে আমাকে কি কি বলে নৌকায় আর উঠেনি। শুধু বলল আর কদ্দুর বাকি। তোমার খালাকে ঠিকমত নিয়েছো? বাচ্চার কি অবস্থা? আমি বলি সব ঠিক আছে। আপনারা নৌকায় উঠেন। উনারা আর নৌকায় উঠলো না। অপরজন বলে ঐ যায়গাটাতে গিয়ে দেখো কিছু আছে কিনা সবতো ঢুবে গেলো। পরে আমি যাইয়া দেখি সব মিষ্টি পানিতে ভাসে, একেকটা একেক স্থানে। উনাদের কথায় এগুলো উঠাই নিলাম। পরে উনাদেরও উঠিয়ে বাড়ী ফিরলাম।
তারপর আরকি বাবার হাতে যা উত্তম মাধ্যম পাওয়ার তা পাইলাম পাকনামির জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ১১:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



