ঢাকা থেকে কুমিল্লায় বাস কিংবা ট্রেন দুই ভাবেই যাওয়া যায়, তবে দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসার জন্য বাস বেস্ট। কুমিল্লা যাওয়ার জন্য এসি এবং নন এসি দুই ধরনের বাসের ব্যবস্থা আছে। এসি বাসের জন্য যেতে হবে কমলাপুর আর নন এসির জন্য সায়েদাবাদ। এসি বাসের জন্য রয়েছে এশিয়া এবার কোন, রয়েল ইত্যাদি,ভাড়া ২৫০ টাকা। নন এসি বাসের জন্য রয়েছে তিশা পরিবহন,ভাড়া কাউন্টার থেকে উঠলে ২০০, আর রাস্তা থেকে যদি উঠতে পারেন তবে ১৫০ টাকায় যেতে পারবেন। কাউন্টার থেকে উঠলে আপনাকে সিট নং দিবে আসলে ভুয়া,তাই কাউন্টার থেকে না উঠে রাস্তা থেকে উঠবেন আপনার ৫০টাকা সেভ হবে।
যাইহোক আমরা বাসে উঠেছিলাম সকাল ৭.২০ মিনিটে কোটবাড়ি বিশ্বরোডে আমরা পৌঁছাই ৯.২০ এ। এইখানে উল্লেখ্য কুমিল্লায় ৩ টা বিশ্বরোড আছে,আপনি যদি ম্যাজিক প্যারাডাইস,ময়নামতি যাদুঘর, শালবন বিহার,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ,বৌদ্ধ মন্দির,BARD,পলিটেকনিক কলেজ,টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ইত্যাদি এইসব এড়িয়ায় যেতে চান তবে আপনাকে কোটবাড়ি বিশ্বারোড নামতে হবে।
আমরা কোটবাড়ি বিশ্বরোড নেমে ডিম,পরোটা, সবজি এবং চা দিয়ে ৫০ টাকায় সকালের নাস্তা সেরে ম্যাজিক প্যারাডাইস এর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এইখানে উল্লেখ্য যে আপনি দুই ভাবে যেতে পারেন, সি এন জি রিজার্ভ করে অথবা পার পারসন অনুযায়ী। এইখানকার সি এন জি গুলো ৫ সিটের হওয়ার সবচেয়ে ভালো হয় যদি ৫ জনের গ্রুপ নিয়ে ট্যুর করা যায়,এতে করে আপনার সময় ও টাকা দুটোই বেচে যাবে। কোটবাড়ি থেকে সি এন জি রিজার্ভ নিবে ১৫০ টাকা আর সিংগেল হিসেবে ভাড়া পরবে ৩০ টাকা,৫-৬ কিলো রাস্তা সময় লাগবে ১৫-২০ মিনিট।
আমরা ম্যাজিক প্যারাডাইস এ নেমে এন্ট্রি +ডাইনোসর ওয়ার্ল্ড+ ওয়াটার প্যারাডাইস ৪০০ টাকায় এই প্যাকেজটি নিয়ে নেয়। এইখানে ওদের আরো অনেক প্যাকেজ আছে।শুধু এন্ট্রি+ডাইনোসর ওয়ার্ল্ড পরবে ২০০ টাকা, আর ভেতরের রাইড গুলো ১০০ টাকা করে পরবে।ম্যাজিক প্যারাডাইস এ পিকনিক করার জন্য আলাদা জায়গা রয়েছে,যারা বড় গ্রুপ নিয়ে পিকনিক করতে চান তারা করতে পারেন। যাইহোক আমরা ভেতরে প্রবেশ করে কিছু ফটোশ্যুট করে ডাইনোসর ওয়ার্ল্ড এর দিকে যায়,আমার কাছে এই ডাইনোসর ওয়ার্ল্ডটা ইউনিক লেগেছে,এইখানে সেন্সর ব্যাবহার করা হয়েছে, সেন্সরে শব্দ পেলেই ডাইনোসরগুলো কেমন নড়েচড়ে উঠে, বিভিন্ন ধরনের শব্দ করে,দেখলাম বাচ্চারা অনেক মজা পাচ্ছে। যাইহোক অইখান থেকে বের হয়ে পাশের দোকান থেকে কোল্ড ড্রিংকস খেয়ে একটু ঠান্ডা হলাম,আশ্চর্য হলাম বোতলের রেট রাখার জন্য কারণ এইসব জায়গায় সচারাচর দাম বেশি রাখে। ওইখান থেকে আমরা গেলাম কিছু থিম টাইপের ওয়াল পেইন্টিং আছে যেটার সাথে আপনি নিজেকে খাপ খাইয়ে ছবি উঠাতে পারেন,যেমন প্রজাপতি, ফড়িং সাইকেল, দোলনা ইত্যাদি। আমরাও কিছু ছবি তুললাম এবং অনেক মজাও পাইলাম। ছবি তোলার পর ঘোরার মত জায়গা না থাকায় আমরা চলে গেলেম ওয়াটার প্যারাডাইস এ।ওয়াটার প্যারাডাইস এ ঢুকে সুইমিং এ ময়লা,পানির কালার ইত্যাদি দেখে তো পুরাই হতাশ।চিন্তা করলাম নামবো কি নামবোনা, ২০০ টাকার চিন্তা করে পরে নেমেই পড়লাম। এইখানে লকারের সিস্টেম আছে ভাড়া পরবে ১০০ টাকা।অনেককেই দেখতেছি লকার না নিয়ে বাইরেই জামা কাপড় রেখে সুইমিং এ নামতে। যাইহোক লকারে জিনিসপত্র রেখে আমরাও নেমে পরলাম সুইমিংএ। প্রথমে স্লিপারে গেলাম, পানির সল্পতার কারণে দেখি ঠিকমত স্লিপ হয়না,একজন আর একজন এর গায়ে ধাক্কাধাক্কি দেখলাম,তারপরও চিন্তা করলাম এত উপরে যখন উঠছি একবার অন্তত করি, যেই ভাবা সেই কাজ স্লিপারে নেমে পরলাম এবং রীতিমতো আমিও একজনকে ধাক্কা দিলাম এবং অনেকটা ধাক্কায় ধাক্কায় নিচে নেমে এলাম। এই খানে ৩ টাইপের স্লিপার আছে। যাইহোক চিন্তা করলাম যেহেতু এইটা ঠিকমতো হইলোনা আর এক টাই যায়,ওমা আর একটায় যাইতে যাইতে শুনি এখন আর স্লিপার হবেনা আপনারা ওয়েভে যান,অইখানে নাকি বিশাল বিশাল ঢেউ দেয়া হবে। ওয়েভে নামলাম ওমা ঢেওয়ের দেখি দেখা নাই। একটু পর এনাউন্স করা হলো ইলেক্ট্রিসিটি না থাকার কারণে ওয়েভ নাকি চালু করা যাচ্ছেনা। যাই হোক কি আর করার উঠে চলে আসলাম। চিন্তা করলাম ম্যাজিক প্যারাডাইস যে ম্যাজিক দেখাইলো।
যাইহোক আমরা ম্যাজিক কে বিদায় দিয়ে দুপুরের খাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলাম, গেটে জিজ্ঞেস করায় অনেকে বল্লো যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এর গেটে কিছু ভালো রেস্টুরেন্ট আছে ওইখানে যান। আমরা জনপ্রতি ১০ টাকা (যদিও ১ কিলোর একটু বেশি রাস্তা) দিয়ে অটো করে চলে এলাম গেটে, অটোওয়ালা একটা রেস্টুরেন্ট এর সামনে নামায়ে দিয়ে বল্লো এইখান কার খাবার ভালো। ওনার কথা অনুযায়ী আমরাও ঢুকলাম, ভর্তা,ভাজি,ডাল আর মাংস দিয়ে জনপ্রতি ১৫০ টাকায় দুপুরের খাবার খেলাম।
খাবার শেষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটু ফটোশ্যুট করে হেটে হেটে চলে গেলাম ময়নামতি যাদুঘরে। জনপ্রতি ২০ টাকায় ভিতরে ঢুকে কিছু সময়ের জন্য অতীতে ফিরে গেলাম।অতীত থেকে ফিরে পাশেই শালবন বিহারে ঢুকে পরলাম জনপ্রতি ২০ টাকা টিকেটের বিনিময়ে। শালবন বিহারে কিছুক্ষন চিলমিল করে হেটে হেটে চলে গেলাম পাশের বৌদ্ধ মন্দিরে। ওইখানেও দেখি টিকেটের সিস্টেম, যাইহোক জনপ্রতি ২০ টাকা টিকেটের মূল্য পরিশোধ করে প্রবেশ করলাম বৌদ্ধ মন্দিরে।
বৌদ্ধ মন্দিরে কিছুক্ষণ থেকে BARD এ যাওয়ার জন্য বের হলাম,ততক্ষণে বিকেল ৫ টা পেরিয়ে গেছে। বাহিরে বের হয়ে অটোওয়ালা কে BARD এ যাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করায় বল্লো যে অইখানে ৫ টার পরে কাউকে ঢুকতে দেয়না। উল্লেখ্য যে BARD এ নাকি ৩ টা পর্যন্ত ঢুকতে দেয় তাও আবার পরিচিত থাকলে (আমি শিওর না),আপনারা যারা যাবেন খোঁজ নিয়ে যাবেন।
BARD এ যেহেতু যাওয়া হলো না তাই প্ল্যান চেঞ্জ করে সিদ্ধান্ত নিলাম ধর্ম সাগরে যাওয়ার। ধর্ম সাগরে যাওয়ার জন্য বৌদ্ধ মন্দিরের গেট থেকে জনপ্রতি ১০ টাকায় প্রথমে চলে গেলাম কোটবাড়ি,কোটবাড়ি গিয়ে জনপ্রতি ৩৫ টকায় সি এন জি করে চলে গেলাম কুমিল্লার কান্দিরপাড়।উল্লেখ্য এইখান থেকে ২০০ টাকায় সি এন জি রিজার্ভ করে আপনারা ডাইরেক্ট ধর্ম সাগরে যেতে পারবেন। কোটবাড়ি থেকে সি এন জি তে ৩০ মিনিটের মত লেগেছিল কান্দিরপাড় যাতে।
কান্দিরপাড় থেকে আপনি হেটেও অথবা ১০ টাকায় রিক্সা ভাড়ায় যেতে পারবেন ধর্ম সাগরে। ধর্ম সাগরে চাইলে ১০০ টাকার বিনিময়ে ৩০ মিনিটের জন্য কায়াকিং করতে পারেন। ধর্ম সাগরে কিছুক্ষন থেকে গেলাম পাশের একটা পার্কে। পার্কের এক গেট দিয়ে ঢুকে অন্য গেট দিয়ে বের হয়ে ৩০ টাকায় রিক্সা ভাড়ায় চলে গেলাম মনোহরপুর অর্জিনাল মাতৃভান্ডারে।ওমা গিয়ে দেখি সেই এক বিশাল লাইন,লাইন দেখে রস মালাইয়ের শক মিটিয়ে চলে গেলাম আবার কান্দিরপাড়। কান্দিরপাড় থেকে জনপ্রতি ১০ টাকার ভাড়ায় গেলাম জাংগালায় ঢাকায় ফেরার গাড়ির জন্য। জাংগালায় গিয়ে জনপ্রতি ২৫০ টাকায় এশিয়া এয়ারকোনে করে আবার চলে এলাম ব্যস্ত নগরীতে। এইভাবে আমাদের চিলমিল করে কেটে গেলো একটা দিন।
এক নজরে খরচের হিসাবঃ
ঢাকা টু কোটবাড়ি বিশ্বরোড-২০০ (নন এসি)
জাংগালা (কুমিল্লা) টু ঢাকা-২৫০ (এসি)
সকালের নাস্তা-৫০
কোটবাড়ি টু ম্যাজিক প্যারাডাইস-৩৫
ম্যাজিক প্যারাডাইস এন্ট্রি+ডাইনোসর ওয়ার্ল্ড + ওয়াটার প্যারাডাইস -৪০০
ম্যাজিক প্যারাডাইস টু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় গেট-১০
দুপুরের খাবার -১৫০
ময়নামতি যাদুঘর এন্ট্রি -২০
শালবন বিহার এন্ট্রি-২০
বৌদ্ধ মন্দির এন্ট্রি -২০
বৌদ্ধ মন্দির টু কোটবাড়ি -১০
কোটবাড়ি টু কান্দিরপাড়-৩৫
কান্দিরপাড় টু ধর্ম সাগর -১০
ধর্ম সাগর টু মনোহরপুর-১৫
কান্দিরপাড় টু জাংগালা-১০
টোটাল-১২৩৫ (উল্লেখ্য নন এসি বাস এবং ওয়াটার প্যারাডাইস এ না ঢুকলে আরো ৩৫০ টাকা কম খরচে ভ্রমণ করা সম্ভব)।
(যেখানে যাবেন সেখানকার পরিবেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব আপনার। নিজে সচেতনতার পাশাপাশি অন্যকেও পরিবেশ সচেতনতায় এগিয়ে আসার আহবান করুন। সবার মিলিত প্রচেষ্টায় আমরাও বাংলাদেশকে একদিন সবার কাছে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে পারবো ইন শাহ আল্লাহ)।





সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মে, ২০২১ বিকাল ৩:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


