somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিপ্লব নাকি ইনকিলাব? নির্ধারক হইবে কে?

২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভাষা লইয়া সারাদিনের বাকবিতন্ডা কিঞ্চিৎ উপভোগ্য ছিলো বৈ কি, কিঞ্চিৎ পীড়াদায়ক'ও ছিলো বটে। সকল বিষয়ে নাক গলানোর স্বভাব বাদ দিয়া এই বিষয় উপেক্ষা করিব ভাবিয়াছিলাম, কিন্তু দু কলম না লিখায় আমার নাক দেখিলাম দু সেন্টিমিটার বর্ধিত হইয়াছে।

আমার মতে এই বিতর্কের মূলে রইয়াছে আমাদের জাতিগত হীনমন্যতা এবং রাজনৈতিক দুষ্টাচার।

৯০ এর পরে দ্রুত চলমান সাংস্কৃতিক মিথষ্ক্রিয়ার সাথে খাপ খাওয়াইতে গিয়া আমরা কোথায় যেন খেই হারাইয়া ফেলিয়াছি। ভাষা হিসেবে বর্তমান বাংলা ঠিক কতটুকু বাংলা রূপে আছে সেই বিতর্ক দিয়াই এই বিতর্কের সূত্রপাত হওয়া উচিত। ইংরেজি শব্দের ব্যাপক আগমন, সাধু > চলিতের পরে কথ্য ভাষাকে মূল ভাষা হিসেবে প্রচলনের চেষ্টা, আর বর্তমানে শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহার, সব আলাপ বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকিত যদিনা আমরা হীনমন্য না হইতাম। হীনমন্যতা বলিতে আমি বলিতেছি insecure থাকার কথা। আমাদের কেন মনে হইয়াছে গোটা দশেক বৈদেশিক শব্দের প্রবেশ সমগ্র ভাষাকে কলুষিত করিবে? এর মাঝে দু একটি ভাষা উর্দু বলিয়া? বাকি শব্দ সমূহ তো আরো পশ্চিমের দেশ হইতে আগত, তাহাদের সাথে আমাদের শত্রুতা কিসে? উর্দুতেই বা শত্রুতা কিসে? বাংলা ভাষার বহু শব্দের আগমন হইয়াছে উর্দু হইতে। জিন্নাহ উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলো বলিয়া কি উর্দুর সাথে শত্রুতা হইবে নাকি নাকি জিন্নাহর সাথে হইবে? আপনারা প্রায়শঃই বলিয়া থাকেন, ধর্মের দেশ নেই। সেই তর্কে ভাষার কি শত্রু থাকিতে পারে? আল্লামা ইকবালের কবিতার সহিত ভাষাগত কারণে কারো ঘৃণার উদ্রেগ হইলে তাহার মনের বিষ নিবারণের ঔষধ কাহারো কাছে পাওয়া যাইবেনা। হিন্দি ভাষীরা গোটা ভারতবর্ষে হিন্দি চাপাইয়া দিতে চাইয়াছিলো দেখিয়া কি হিন্দির সাথে আমাদিগের শত্রুতা তৈরী হইয়াছিল, নাকি সেই সকল রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সহিত?

এই বিতর্কে উর্দুর প্রতি ক্ষোভকে মূল রাজনৈতিক কারণ মনে হইলো না। উর্দুর প্রতি আপনাদের ক্ষোভ এতো থাকিলে রুনা লায়লা যখন উর্দু লোকগীতি বাংলা গানের মঞ্চে গাহিয়া উঠেন তখন এই ক্ষোভ আসেনা কেন? আপনাদিগের প্রাণের নেত্রী যেইদিন উর্দুতে শের আবৃত্তি করিয়াছিলো সেইদিন এই ক্ষোভ কোথায় তুলিয়া রাখিয়াছিলেন? কিংবা রাজনৈতিক দলের আদর্শ নীতিবাণীতে কেন 'জিন্দাবাদ' শব্দের ব্যবহার, তা নিয়া প্রশ্ন তুলিয়াছেন কবে? শুধু উর্দু নয়, ভারতীয় সংস্কৃতির যেই অনুপ্রবেশ আমাদের ঘরে প্রবেশ করিয়াছে দূরদর্শনের দ্বারা, তাহার সহীত যে অজস্র হিন্দি শব্দের 'অনুপ্রবেশ' ঘটিয়াছে, তাহা ঠেকাইবার জন্য কি কি উদ্যেগ গ্রহণ করিয়াছেন, বলিবেন কি?

আজিকার এই বিতর্কের রাজনৈতিক কারণ মূলত জুলাইয়ের স্বীকৃতি এবং মালিকানার সাথে আবদ্ধ। যেইসকল শব্দ ধারণ করিয়া জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ঘটিয়াছে, সেইসকল শব্দ সমূহকে রাজনৈতিক বিতর্কের দ্বারা ভূপাতিত করিতে পারিলে জুলাইয়ের শাব্দিক মৃত্যু ঘটিবে জানিয়াই এই বিতর্কের সৃষ্টি করা হইয়াছে। আর আরেকটি গোষ্ঠী মনে করিয়াছে যেহেতু এই শব্দগুচ্ছ তাহাদের উৎপাদিত নয়, সেইজন্যে মালিকানার দাবিদার হইতে হইলে আগে এই শব্দসমূহকে কলুষিত করা বাঞ্চনীয়।

জানিয়ে রাখুন, বাংলা ভাষা পাঁচ প্রকার: তৎসম, অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশি এবং বিদেশি শব্দ। প্রথম দুইটির উৎস সংস্কৃত, তৃতীয়টিও তাই কিন্তু পরিবর্তন বেশি হইয়া খাঁটি বাংলার রূপ ধারণ করিয়াছে, চতুর্থটি এই অঞ্চলের নিজস্ব, আর পঞ্চমটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ভিনদেশি শব্দ ভান্ডারের জন্য। যখন বুঝাইয়া বলা হইলো, তখন বাঁধ সাধিলেন, না বাপু, আপত্তি অন্য জায়গায়, বিদেশী শব্দের প্রবেশ ঘটুক, কিন্তু এতো দ্রুত ঘটিবে কেন? একটু রয়ে সয়ে আসুক! কিন্তু রয়েসয়ে সংস্কৃতি প্রবেশের যুগে তো আমরা নাই বর্তমানে! তা না হইলে তো আমরা জানিয়া যাইতাম রবি ঠাকুরের 'ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে' গানের সুর কিংবা নজরুলের 'শুকনো পাতার নুপূর পায়ে' সুর ধার করা! নজরুল প্রসঙ্গে, এই বিতর্ক নজরুলের জীবদ্দশায় হইয়াছে কিনা আমার জানা নাই, কিন্তু আজ নজরুল বাঁচিয়া থাকিলে কড়া ভাষায় এক প্রবন্ধ লেখিয়া আপনাদের এক হাত দেখিয়া লইতেন বলে আমি বিশ্বাস করি। আর বাপু, বাংলা তো সুমেরিয়ান, হিব্রু, তামিল কিংবা চৈনিক ভাষার মতন নয়! এই ভাষা চলমান, সময়ে সময়ে অন্য ভাষার সংষস্পর্শে আসিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছে।

এখন আমায় বলুন, এই রয়েসয়ে আসিবার ব্যাপারটি ঠিক করিবেন কারা? কোনো প্রতিষ্ঠান? কোনো এক সাংস্কৃতিক-ব্রাহ্মণ শ্রেণী? নাকি সময়?
যদি বলেন প্রতিষ্ঠান, তবে আপনাদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রসিকতা চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাই।

আমার স্কুলের ব্যাকরণের শিক্ষিকা মিনু শীল আপা প্রায়শঃই আক্ষেপ করিয়া (ক্রোধ বলিলে মানায় বেশি) বলিতেন, 'যেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বাংলা ভাষার স্বরূপ ধরিয়া রাখা, সেই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ আমরা করিয়াছি 'বাংলা একাডেমি'! একাডেমি কি বৈদেশিক শব্দ নয়? এর বিপরীতে কি বাংলা শব্দের অস্তিত্ব ছিলো না? এই প্রতিষ্ঠানের নাম 'বাংলা পরিষদ' হইলো না কেন?' বঙ্গদেশের বুদ্ধিজীবীদের মনস্তাত্বিক বৈকল্যের এক নগ্ন প্রদর্শন এই নামকরণ।

যদি প্রতিষ্ঠান না হইয়া সাংস্কৃতিক-ব্রাহ্মণ শ্রেণী হইয়া থাকে নির্ধারক, তাহা হইলে তাহাদের ব্যপক ইংরেজি প্রেম আগে থামাইতে হইবে কিনা? যেই এলিটমারানীরা বাংলা সংস্কৃতির রক্ষক সাজিয়েছেন, তাহাদের কথার প্রতি দুই চরণে গোটা দশেক ইংরেজি শব্দের প্রাচুর্য আপনার কানে বাজিবেই। তাহাদের উত্তরসূরিরা পাঠ লয় ইংরেজি মাধ্যমে। তাহাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে আবার হিন্দি গান আর উর্দু কাওয়ালীর প্রচলন প্রতিষ্ঠিত। এই দ্বিচারিতা স্বভাবের পরেও তাহাদের হাতে কিভাবে ভাষার ভবিষ্যৎ ছাড়িয়া দেওয়া যায় বলুন দেখি? এরা যে সময়ে অসময়ে মাইকেল মধুসূদন সাজিবার প্রয়াস লয়, তা তা আমাকে পীড়িত করে।

সবচাইতে নিরাপদ সিদ্ধান্তকারী হইলো সময়। কে কি গ্রহণ করিবে সেইটা না চাহিলেও সামষ্টিকভাবে সময়ের সাথে প্রতিষ্ঠিত হইয়া যায়। আমার বিশ্বাস জুলাইয়ে বিপ্লবে নতুন মাত্রা যোগ করিতে 'ইনকিলাব' কিংবা 'আজাদী'র আবির্ভাব ঘটে। এই দুই শব্দ কিছুকাল যাবতই ভারতবর্ষের তরুণ সমাজের বিপ্লবের ভাষা হইয়া উঠিয়াছে। সেই অনুপ্রেরণায় এই শব্দযুগলের প্রবেশ, কোনো নির্দিষ্ট দেশের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির কারণে নয়।

শব্দের উৎপত্তি যেখানেই হোক না কেন, স্বদেশী ভাষার প্রতি আপনার প্রেম হইতে হবে নিখাঁদ। তা না হইলে স্বন্দীপের কবি আব্দুল হাকিমের মতন আপনার সম্পূর্ণ অধিকার রইয়াছে তাহাদের জন্মপরিচয় লইয়া প্রশ্ন তুলিবার-
'যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী ,
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।'

পরিশেষে, ইংরেজি শব্দের সীমিত প্রবেশে যেমন বাংলাভাষার স্বরূপ পাল্টায় না, তেমনই ভাবে, আরবি-ফার্সির প্রবেশে বাংলা ভাষার ইসলামীকরণ হয় না। ইহা বুঝিবার বোধশক্তি আমাদের আছে। থাকিবার পরেও এই বিতর্কের উদ্দেশ্য জুলাইয়ে আসিয়া ঠেকে, এবং সাংস্কৃতিক-ব্রাহ্মণদের হিংসাত্বক মনোভাব হইতে আসে। তাহারা ভাবেন, 'ভাষার সমৃদ্ধি ঘটিবে আমাদের হাত ধরিয়া, আমাদের মতন করে। কোথাকার কোন হাদি আসিয়া বলিবে ইনকিলাব আজ হইতে বাংলার তরুণ সমাজের বিপ্লবের সমার্থক শব্দ, আর আমরা তা মানিয়া লইবো কেন?' মানিতে হইবে না জনাব, সাংস্কৃতিক হোক, রাজনৈতিক হোক, ক্ষোভ থাকিলে পুষিয়া রাখেন আর নিজের পশ্চাৎদেশ দিয়া জ্বালা উদগীরণ করেন। সময়ের হাতে ছাড়িয়া দিন বাংলা আদৌতে এই শব্দ সমূহকে গ্রহণ করিবে নাকি বর্জন করিবে।

বি:দ্র: আমি চলিত ভাষায় লিখিতে গেলে দুষ্ট শব্দচয়ন করিয়া ফেলি বিধায় সিদ্ধান্ত লইয়াছি ক্রোধ প্রশমনে সাধু ভাষায় লিখিব মাঝেসাঝে। গুরুচন্ডালি দোষে দুষ্ট হোক, মিশ্রিত শব্দ প্রয়োগ হোক, যতিচিহ্নের ভুল ব্যবহার হোক, কিংবা ভুল বানানেই হোক, আমি লিখিব আমার চেটের খুশিতে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:১০
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকে ট্রাম্পের মন ভালো নেই

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৩৫


যুক্তরাষ্ট্রের U.S. Supreme Court এক ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করেছে যে প্রেসিডেন্ট Donald Trump জাতীয় জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে যেভাবে ব্যাপক আমদানি শুল্ক (ট্যারিফ) বসিয়েছিলেন, তা তার আইনি ক্ষমতার সীমা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব ভাষা দিবসের সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:১৫



একুশ মানে মাথা নত না করা।
একুশ মানে ভাষার প্রশ্নে আপোষ না করা।

অমর একুশে আমাদের শেখায়—
আমাদের মাতৃভাষা কারও দয়ার দান নয়।
ভাষা আমাদের অর্জিত অধিকার।

যারা ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন, তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মাতৃভাষা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:০৯


রক্তে কেনা মাতৃভাষা
বিশ্বব্যাপী সম্মান।
দৃপ্ত শপথে অটুট রাখবো
বাংলা ভাষার মান। 

মায়ের ভাষা সবার কাছেই
সবচাইতে প্রিয়।
প্রত্যেক ভাষাভাষীকে তার
প্রাপ্য সম্মানটুকু দিও।

ভাষা নিয়ে বিদ্বেষ বিভেদ
রুখতে ফেব্রুয়ারিতে।
ঢাকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাষা আন্দোলনের ইতিকথা, স্বাধীনতার বীজ বপন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০৪


বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিকথা
ইতিহাসের পাতায় লেখা এক দিন
উনিশশো আটচল্লিশের মার্চের সকালে
জেগে উঠেছিল সময়ের রঙিন প্রাণ।

৪৮ এর এগারোই মার্চ, সভার ভেতর
করাচির গণপরিষদের প্রাঙ্গণ জুড়ে
একটি প্রস্তাব ধ্বনিত হলো দৃঢ় কণ্ঠে
নতুন রাষ্ট্রের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতে ইসলামী ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে ছিল না

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০২


জামায়াতে ইসলামীকে আমি এখন নতুন চোখে দেখি। মানুষ ভুল করতেই পারে, ইতিহাসে ছোটখাটো কিছু ভুল তো সবারই থাকে। যেমন ধরুন, একটা দেশের জন্মের বিরোধিতা করা, সেটাকে ভেঙে দিতে চাওয়া, বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×