somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার বাবা ও একটি কলম

২৪ শে মে, ২০১৩ রাত ৮:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ ৯ তারিখ, বৃহস্পতিবার, সাল ১৯৯৯। ডিসেম্বরের কোল বেয়ে শীত নামা সুন্দর কোনও এক সকাল। আব্বুর গলাটা জড়িয়ে ঘুম ঘুম চোখে বিছানা ছাড়লাম। এইরকম ঠাণ্ডায় কোন ক্রমেই গোসল করবনা এই নিয়ে আম্মুর সাথে খানিকক্ষণ খুনসুটির কারবার সেরে বাপ বেটারা এক সাথে নাস্তা করতে বসলাম। আমার বড় ভাই আজীবন দেখা দিব্বি ভাল মানুষ, এই শীতের সকালেও দেখলাম হেভি ফিটফাট। আমার কাজিনও সাথে আছে, আমি আর ও একই ক্লাসে পরি।

আজ দিনটা একটু অন্য রকম। আজ আমার বাবার জন্মদিন, তার থেকেও বড় কথা হল আজ আমার বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল দিবে। এই কথাটা বললাম কারন আব্বু কখনই নিজের জন্মদিন পালন করে না, আর এইসব নিয়ে মাতামাতিও করা পছন্দ করে না। এক্কেবারে পেশাদার বিজনেসম্যান। আব্বুর বাইকে আমরা চারটি মানুষ, আব্বু, আমি, আমার বড় ভাই আর আমার কাজিন স্কুলের পথে রওয়ানা দিলাম।

ফলাফল কি হবে এই চিন্তায় আমার প্রায় যায় যায় অবস্থা, কারন আমার কাজিন হচ্ছে আমার একমাত্র চির প্রতিদ্বন্দ্বী। আমি গত ২ বছর ধরে প্রথম হয়ে আসছি, এবার না জানি কি হয়। পরিবারের অন্য কেউ এভাবে একই ক্লাস থাকলে বিশাল ঝামেলা, অনেক চাপে থাকতে হয়। আমার বড় ভাইকে দেখলাম পুরাই চিন্তাহীন, ফুরফুরে মেজাজে আছে। ওর মত ছেলে বরাবরই প্রথম হয়। আমি এদিকে অস্থির হয়ে ঘেমে একাকার। টিপটিপ বুকের বাজনা শেষ পর্যন্ত থামতে বাধ্য হল। ফলাফল হাতে পেলাম, লজ্জার মাথা খেয়ে আব্বুকে ধরে কান্না শুরু করলাম, আমি এবারও প্রথম হয়েছি, আমার কাজিন দ্বিতীয়। আর বড় ভাই প্রথম শ্রেণীতে প্রথম, এটা বললাম কারন ও খুবই ভাল মার্ক পেয়েছে।

আমার বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন আর আমাকে বললেন, ছিঃ এত বড় ছেলের কাঁদতে নেই।
আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, আজ যে তোমার জন্মদিন। আর তোমার জন্মদিনে আমি কোনভাবেই দ্বিতীয় হতে চাই নাই।
আব্বু সাময়িক একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।
আমাদের সবাইকে জড়িয়ে ধরে বললেন, বাবারা তোমরা অনেক বড় হও।
আর কথা ঘুরিয়ে আমাকে বললেন, কি এবার সেভেন এর যাত্রা শুরু।
আমিও ঝটপট বললাম, এবার আমার সাইকেল এরও যাত্রা শুরু।
হাহাহা করে সবাই হেসে ফেললাম।


প্রথম হওয়ার সুবাদে একটা দামি কলম পুরস্কার পেয়েছিলাম, নিজেই আব্বুর শার্ট এর ফাঁকে তা গুজে দিয়ে বললাম, 'তোমার জন্মদিনের গিফট, এই কলম সবসময় সাথে রাখবা।'
আব্বু বলল, অবশ্যই রাখব বাবা।



আব্বু আমাদের সবাইকে কিছু খাবার কিনে দিয়ে বাসায় নামিয়ে দিয়ে সেদিনের মতো কাজে চলে গেল। আজ বেশ দেরি করতে হল আমাদের জন্য। আমি মনে মনে বিশাল খুশি, একেতো ফার্স্ট হয়েছি আর আব্বুকে বেশ কিছুটা সময় আজ পাশে পাওয়া গেল। শুক্রবার আর প্রতি রাতের ২-৩ ঘণ্টা ছাড়া আব্বুকে খুব একটা পাওয়া যায় না।

রাত ১০:৩০ টা, গায়ে বাতাশ লাগিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছি, পকেটে এখনও একশো টাকা আছে। ছোট চাচা টাকা দিয়েছে সবাইকে ক্রিকেট ব্যাট কেনার জন্য। বাসায় আমরা ছোটরা আমার বড় ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে ক্রিকেট ব্যাটের জন্য চাঁদা উঠানোয় ব্যাস্ত। নতুন ব্যাট আর টেনিস বলের চিন্তা তখন মাথায়। একটু পর পর সদর দরজায় উঁকি মারছি, আব্বু কখন আসে। এমনিতে আজ অতো দেরি কথার কথা না।

হঠাত বেবি ট্যাক্সির আওয়াজে দৌড়ে ছুট লাগালাম বাইরে। বেবি ট্যাক্সি মানেই বাসায় অতিথি কেউ এসেছে, আমাদের ছোটদের জন্য যা বরই মজার বিষয়। কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম, আমার ছক্ষু ছানাবরা।

আমাদের ফার্নিচার দোকানের ৩জন লোক, আমার ফুপা সবাই মিলে আব্বুকে ধরে নিয়ে নামছে। আমি এক চিৎকার দিয়ে বাসার ভিতরে ছুটলাম।

কাঁপতে কাঁপতে আমার মুখের কথা জরিয়ে যাচ্ছে, আমি ঠিক মত কিছু বলে উঠতে পারার আগেই সবাই আব্বুকে নিয়ে ঘরে ঢুকল। পুরো শার্ট মেখে আছে চাপ চাপ রক্তে, পকেট কোনও ভাবে ঝুলে আছে শার্ট এর সাথে, নাক বেয়ে তখনও নুইয়ে পরছে রক্ত। আব্বু অনেক শক্ত মানুষ তখনও দেখলাম।

ভাবখানা কিছুই হয়নি এমন করে শুধু বলল, বুকে অনেক ব্যাথা নিঃশ্বাস নিতে নাকি কষ্ট হচ্ছে। সবাই ধরাধরি করে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। একটুক্ষণ পরেই ডাক্তার আসলো, আব্বুকে ড্রেসিং করিয়ে কি জানি একটা ইঞ্জেকশান মেরে দিল। ঘুমিয়ে পরল আব্বু কিছুক্ষণের মধ্যেই। আমার ততোক্ষণে কান্না আঁটকে গেছে, আম্মুর দিকেতো কোনও ভাবেই তাকাতে পারছি না। আর থাকতে পারছিলাম না, বাইরে চলে এলাম, হোন্ডাটা দেখলাম, মনে হলো খুব একটা কিছু হয়নি।

রাতের খাবার নিয়ে এক সাথে বসার আয়োজন আজ রাতে আর হলো না। কোথায় যেন তাল কেটে গেছে, সকাল থেকে উদযাপিত সকল উচ্ছ্বাস এখন কোনও এক বেলায় হারিয়ে যাওয়া কৌতুক মাত্র। কিছুখন পর শুনতে পেলাম সবার এক বিস্তর আলোচনা, কিভাবে আব্বুকে হোন্ডা চালানো থেকে বিরত রাখা যায়।

ঘুমুতে যাওয়ার আগে আব্বুর শার্টটা কি মনে করে যেন হাতে নিলাম। কি আশ্চর্য, সেই সকালের দেয়া কলমের ক্যাপ। শার্টের পকেটের এক কোণায় লুকিয়ে ছিল। কলমটা কিন্তু খুজে পেলাম না। জমাট হয়ে যাওয়া রক্তে কেমন যেন অদ্ভুত দেখাচ্ছিল ক্যাপটা! সবার চোখের আড়ালে তা পকেটে পুরে ফেললাম।




কানের পাশেই গম গম করে উঠলো হঠাত একটা মিষ্টি স্বর, 'স্যার, উড ইউ লাইক অ্যানি ড্রিঙ্ক? আই বিন ওয়াচিং ইউ রাইটিং ফর আ লং টাইম'
বা হাত থেকে খসে পরল রঙ ফিকে হয়ে যাওয়া সেই কলমের ক্যাপটা।
চমকে উঠলাম আমি, 'জাস্ট আ ওয়াটার, থ্যাংক ইউ'
কেবিন ক্রু মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল, 'সরি স্যার আই ডিড নট মিন টু স্ক্যায়ার ইউ'
আমি বললাম, 'নো নো ইউ অলরাইট, থ্যাংক ইউ।'

আমার আসে পাশের যাত্রীরা সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আমার নেক্সট স্টপেজ থাইল্যান্ড। সেখানে টানা ১৫ ঘণ্টার যাত্রা বিরতি, জানি না আর কতখন লাগবে পৌঁছুতে। বাংলাদেশ যাচ্ছি প্রায় এক বছর পর। আমার বাবা অসুস্থ, আজ তিন দিন হল তিনি ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন। আমি জানি না তিনি এখন কেমন আছেন, বুকের ভিতর কষ্টের হাহাকার, একত্রিশ হাজার ফিট উপরে ভাসতে থাকা হাওয়ায় তা আজ বরই ক্ষীণ শুনায়। নিয়তির ভারে এতগুলো বছর ধরে বয়ে বেড়ানো কলমের ক্যাপটা আজ হঠাত বরই জ্বলজ্বলে দেখায়, এক করুন ইতিহাসের সাক্ষি হয়ে থাকা ক্যাপটার মরা কান্না হাজার মাইল দূর থেকে কয়েক শত কান্না ভেজা রাত্রির উপহাস মাত্র আজ। কুড়িয়ে তোলা ক্যাপটা কষ্টের ভাঁজে আবার লেপে দেই, পকেটের শূন্যতায় তা লুকিয়ে রাখি, যেমন রেখেছি গত চৌদ্দটি বছর ধরে।

ডাইরি আর চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে এক সাথে, সূক্ষ্ম কষ্টের জাল বুনে আছে পুরো পাতা জুড়ে আজ।
কি যেন লিখছিলাম এতক্ষণ!

'আমার শত সহস্র সাধনার ভিড়ে,
তোমাকে পেয়েছি,
রাত জাগা ভোরে, তোমার পদচারণ
আমি অনুভব করেছি।
অভয় দেখানো, ঐ কঠিন সততায়
বারে বারে হারিয়েছি,
তোমার দু চাকার জগতে কতইনা
আমরা ঘুরে ফিরেছি।
হঠাত করে আজ আমার আকাশটা বদলে গেল
আমার সব দিনের দেখা আকাশ,
আর আজকের আকাশ এক না।
বাবা, তুমি আমার আকাশটা
ঠিক করে দাও।
কি আর বলবো তোমায়,
আমার পুরো জগতটাই তোমার কাছে,
আজ না হয় তুমি, আকাশটাই দাও।'


(এটা কোনও গল্প নয়, আমার অথবা আমাদের প্রতিদিন জীবনের কিছু নির্মম সত্য যা দিন শেষে ভগ্নাংশে পরিনিত হয়)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০১৩ সকাল ৭:৫৮
২১টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সম্ভবত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবেই তারেক রহমান ভারতে যাচ্ছেন....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭

সম্ভবত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবেই তারেক রহমান ভারতে যাচ্ছেন, যদিও এখন পর্যন্ত সফরটি চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশের সম্মতি আদায়- এক্ষেত্রে বাংলাদেশের 'কচিকাঁচা কুটনৈতিকদের' হারিয়ে ভারতীয় 'প্রবীণ কুটনৈতিকরা' জয়ী হয়েছে।

শেখ হাসিনার আমলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর কারা মিষ্টি বিতরণ করেছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:১৬


যদি কোনোদিন টাইম ট্রাভেল মেশিন আবিষ্কার হয়, পঁচাত্তরের ঘটনা নিজের চোখে দেখার চেষ্টা করতাম। সে সময় কিছু মানুষ মিষ্টি বিতরণ করেছিল বলে শোনা যায় । আমি তাদের কাছ থেকে মিষ্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৭

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:০২



আজ জাতীয় শোক দিবসের।
জাতির পিতাকে আজকের দিনে স্বপরিবারে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। আজ শেখ মুজিবের ৩২ নম্বরের ভাঙ্গা বাড়িতে একজন গিয়েছেন শ্রদ্ধা জানাতে। তার হাতে ফুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

কুরআন থেকে মাদ্রাসার ছাত্রের বিস্ময়কর বিদ্যুৎ আবিস্কার :-ls

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫২

চারিদিকে বিদ্যুতের জন্য ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার মধ্যে মাদ্রাসার এই ছাত্রটি কুরআন গবেষণা করে আমাদের জন্য ফ্রি বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। বিজ্ঞান পড়েননি, পড়েছেন কুরআন-হাদিস! সেই মাদ্রাসাছাত্রই বানালেন মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে বিদ্যুতের যন্ত্র!

অবেশেষে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন এক মরীচিকা

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২৬


ফেসবুক এ কতজনই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায় সবার সাথে কথা হয় না। তানিম ছেলেটি কবে থেকে ফেসবুক এ ছিল মনে নেই। একসময় সে যোগাযোগ করল আমার লেখা, পড়ার আগ্রহ দেখালো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×