
আপনার দু-চারটি কন্যা আছে? নিশ্চিত থাকুন বৃদ্ধ বয়সে বিপদে পরবেন না। আপনার শুধুমাত্র ছেলে সন্তান(!) সম্ভবত বৃদ্ধাশ্রমই আপনার শেষ ঠিকানা।
এক বৃদ্ধ আজ যখন এমন আশংকার কথা শোনালেন, বেশ খানিকটা ঘাবড়ে গেলাম।
কেন এ কথা বলছেন? আমার তো মা আছে তিনি তো বৃদ্ধাশ্রমে নন আমাদের সাথেই থাকেন। উত্তরে তিনি বললেন তার কাছে আলাদা করে জানতে চাইবেন, তিনি কতটা ভাল আছেন। উত্তরটা পেয়ে যাবেন। চারপাশে যা ঘটে তার কতটুকুই বা আমরা লক্ষ্য করি। অলক্ষ্যে ঘটে যায় আরও অনেক মর্মন্তুদ ঘটনা।
বললাম বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করুন। বললেন ব্যাখ্যা কিছু নেই। চারদিকে চোখ বুলালেই দেখতে পাবেন। যে মেয়েরা তাদের মা-বাবার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ভাই, ভাইয়ের বউ দের সাথে নিত্য ঝগড়ায় লিপ্ত হয় সেই মেয়েরাই নিজ স্বামীর মা-বাবাকে চরম অযত্নে ফেলে রাখে।
কি বলেন! এটা কেমন কথা?
এটাই আসল কথা। আমরা পুরুষরা যারা সারাদিন কর্মব্যস্ত থাকি সাধারণত তারা অন্দর মহলের খবর নেই না বা নিতে পারি না। তাই বিষয়টি সহজে আমাদের চোখে পড়ে না।
এই অযত্নের বিষয়টা আমাকে একটু খুলে বলুন।
যেমন ধরুন আপনার বৃদ্ধ বাবা ঘন ঘন খেতে চান আপনার স্ত্রী তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, আমার সব শেষ করে ফেলল। অথচ সংসারের খরচটা আপনিই বহন করেন আর সেখানে আপনার মা-বাবার জন্য খরচ করতে আপনার খারাপ নয় বরং ভাল লাগারই কথা?
নিশ্চয়ই। সেটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?
আপনি বলছেন তাতে আপনার ভাল লাগে অথচ দেখুন আপনার মা বাবাকে শুনতে হল সে আপনার সব টাকা শেষ করে ফেলল। না আমি কথাটি আপনাকে বলছি না হয়ত আপনার ঘরে এমন কথা কখনো উঠেই না কিন্তু বেশিরভাগ সংসারের প্রবীণদের এটাই শুনতে হয়।
আবার ধরুন, আপনার বাবা বৃদ্ধ মানুষ হয়ত অল্পতেই কাতর হয়ে যান। কে জানে হয়ত বৃদ্ধ বয়সে আপনাকে কাছে পেতে চেয়েই একটু বেশিই কাতরাতে থাকেন। যেমনটি ছোট বেলায় আপনি চাইতেন। এটা দেখে আপনার স্ত্রী বললেন ''ঢং' করছেন।বলুন তো সেটা শুনে সেই বৃদ্ধ লোকটার মনের কি হাল হয়? এমন হাজারটা বিষয় আছে যা বলে শেষ করা যাবে না। একেকটি গৃহে একেক ধরনের বিষয় কিন্তু সব গৃহেই প্রবীণের যন্ত্রণাটা একই রকম। এ সব হল ভদ্রতার মুখোশে পারিবারিক অত্যাচার। এর বাইরে রয়েছে আরও অসংখ্য খারাপ নজির। যেমন ঠিক মত খেতে না দেয়া। তাদের পছন্দের খাবার না বানান। তাদের সেবা না করা। তাদের মুখে মুখে তর্ক করা।
এর থেকে বেশি খারাপ যারা করে তাদেরটা সবাই জানে। কাজেই তারা সমস্যার কম বেশি সমাধানও পেয়ে যান। সমস্যা হল যাদেরটা অজানা থাকে তাদের নিয়ে। আর তাদেরই একমাত্র রক্ষা কবচ মেয়ে সন্তান। যারা শেষ পর্যন্ত মা-বাবার খোজ রাখেন যত্ন নেন। যদিও শশুর শাশুড়ির বেলায় উলটো।
বৃদ্ধের কথার জবাব দিতে পারি নি। প্রতিবাদ তো নয়ই। সমাজ তো শুধুমাত্র আমাকে নিয়ে নয়। এ সমাজে অনেক মানুষ অনেক তার সমস্যা আর প্রতিদিনের খবরের কাগজটাও বৃদ্ধের কথাগুলিরই প্রতিধ্বনি করে। প্রতিবাদ নয় বরং নিজেকেই বললাম মা-বাবার প্রতি আমাদের অশেষ দায়িত্ব। এই মা-বাবাই আমাকে এখানে এনে দাড় করিয়েছেন। তাদের প্রতি আরো অনেক বেশি যত্নবান হওয়া উচিৎ। মরতে হবে সবাইকেই। মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে নিজেকেই। নিজের দায় নিজেকেই নিতে হবে।
একটি শিশু মা-বাবা ছাড়া যতটা অসহায় বৃদ্ধ মা-বাবাও সন্তান ছাড়া তেমনি অসহায়। মা-বাবা যদি সারাটা জীবন ত্যাগ স্বিকার করে যেতে পারে সন্তানের জন্য সন্তান কেন পারবে না। আজকে যে সন্তান বৃদ্ধ মা-বাবাকে অযত্ন অবহেলায় ফেলে রাখে কালকে কি সে নিজেই এমন অসহায় হয়ে পরবে না? সেদিন তার সন্তান কি তার যত্ন নেবে? নেবে না, নেয়ার কথা না। মা-বাবা অভিশাপ দেন না। তাদের অভিশাপ দিতে হয় না। কেবল দীর্ঘস্বাশেই সন্তান ভসম হয়ে যায়। প্রতিটি সন্তানের এটা মনে রাখা দরকার। মহান আল্লাহ নিজেই শেখিয়ে দিয়েছেন মা-বাবার জন্য সন্তান কিভাবে দোয়া করবে। ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ২৪)
অর্থ : ‘হে আমাদের পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন; যেমনিভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বার বার সতর্ক কর দিয়েছেন মা-বাবার সাথে সন্তানের আচরন কেমন হতে হবে সেই নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমনঃ মহান আল্লাহ বলেন,
وَقَضَى رَبُّكَ أَلاَّ تَعْبُدُواْ إِلاَّ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاَهُمَا فَلاَ تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلاَ تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا
তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং বাবা-মার সাথে উত্তম ব্যবহার কর।’
তাদের মধ্যে একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে, তাদের উহ' শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা বল।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ২৩)
وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বল, ‘হে আমার পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ২৪)
এমনকি মা বাবা যদি অমুসলিমও হয় তখনও মহান বলেন তাদের সাথে খারাপ আচরন করা যাবে না, মহান আল্লাহ বলেন;
وَإِن جَاهَدَاكَ عَلى أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا
পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরীক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে।’ (সুরা লোকমান : আয়াত ১৫)
আসুন আমরা মা-বাবার যত্ন নেই। তাদের সম্মান জানাই। তাদের সেবায় আরো বেশি যত্নবান হই।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



