somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে

১৬ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ৮:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোটবেলায় জ্যোৎস্না রাতে বাবা-মার মুখে শুনতাম চাঁদের মধ্যে একটা বুড়ি বাস করে সে একা একা বসে চড়কা কাটে! আমি শুনতাম আর নানান অদ্ভুত বিষয় নিয়ে কল্পনা করতাম। ছোট মাথায় বেশী চিন্তা আসত না যার কারনে চাঁদের বুড়িকে নিয়ে আর মাথা ঘামাতাম না! বড়বেলায় এসে লালন নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে একটু টাস্কি খাইলাম চাঁদের মধ্যে বুড়ি থাকত এইটা জানতাম কিন্তু লালন সাহেব নাকি চাঁদের মধ্যে নাকি "মা" দেখেন। কিভাবে?ক্যাম্নে? এই প্রশ্নের কিছু উদ্ধার করতে গিয়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম।

লালনের গান গুলো মেটাফরিক। বলছে এক কথা, বোঝাচ্ছে আরেক কথা। কিন্তু কী বলতে চায় তা-বুঝতে পারতাম না। এখনও যে খুব পারি তা-ও না। তবুও দিনশেষে বুঝতে চাই। যাইহোক লালনের "চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে" এই গান নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে স্বয়ং ফরিদা পারভীনের অভিমত এ রকমের! তবে এই গানের ঠিক অর্থ এখনো ঠিকভাবে কেউ বের করতে পারি নাই তবে অনেকটা করার চেস্টা করা হইছে আমার এই পোস্টে আমি চেস্টা করছি ঠিক অর্থটা দেয়ার। তবে এটা আদৌ ঠিক কিনা জানিনা :( নানান মানুষের লেখা এবং নিজস্ব কিছু মতামত দিয়ে এই লেখাটাকে একটু জাতে তোলার চেস্টা করেছি মাত্র!

চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে
আমরা ভেবে করব কি।
ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম;
তারে তোমরা বলবে কে

প্রতীকী গানটিতে দুইটি চাঁদের কথা বলা হচ্ছে। দুটি চাঁদ হচ্ছে মাতা-পিতা তথা পুরুষ নারীর সূক্ষ্মস্বত্বা,যা সৃষ্টির সৃষ্টির শুরু। ‘চাঁদের গায়ে’ বলতে ‘মাতৃরজ ডিম্বাণু’ এর গায়ে ‘চাঁদ লেগেছে’ অর্থাৎ ‘পিতৃরজ শুক্রাণু’ লেগেছে।এখানে পুরুষ নারী মিলনে নতুন সৃষ্টির প্রতীকী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

‘মায়ে-ঝিয়ে’ কথাটি বাংলার লোকসমাজে প্রচলিত আছে। এখানে মা বলতে "মা" কে এবং "ঝি" বলতে কন্যাকে বোঝান হয়। যেমন,মায়ে-ঝিয়ে মিলে সকাল থেকে কাজটি করে শেষ করলাম।প্রচলিত মতে মায়ের পেটে ঝি তথা কন্যার জন্ম হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে উল্টো বলা হচ্ছে। কিন্তু কেন? এখানে একটু গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। সন্তান জন্ম নেওয়ার আগে কি কাউকে মা বলে? বলে না। তাহলে সন্তান জন্ম দেওয়ার সাথে সাথে মা শব্দের সৃষ্টি হল। তাহলে ‘মা’ এই শব্দটির জননী কে হল? যে জন্ম নিল, সে। অর্থাৎ ঝি। সে জন্য বলা হল ‘ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম’। এখন ‘তারে তোমরা বলবে কি?’ কাকে কি বলা হবে? মায়ের জন্ম হয়েছে ঝিয়ের পেটে। অর্থাৎ যে মায়ের জন্ম হল ঝিয়ের পেটে, তাকে তোমরা কি বলবে? ঝিয়ের পেটে তো ‘মা’ এর জন্ম হল, তাহলে ঝিকে কি বলবে অর্থাৎ ঝি কি হবে? এখানে বলা হচ্ছে যে ভবিষ্যতে এই ঝিও সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে নিজে মা হবে। এটাই বলা হল। এটা সৃষ্টির ধারার চক্র।

৬ মাসের এক কন্যা ছিল
৯ মাসে তার গর্ভ হল;
১১ মাসে তিনটি সন্তান
কোনটা করবে ফকিরি?

৬ মাস পূর্ণ হলে পরিপূর্ণ মানুষের আকৃতি ধারণ করে। ৯ মাসে ভূমিষ্ঠ হয় । ১১ মাসে ৩ স্তর মানে শোয়া, হামাগুড়ি এবং দাঁড়াতে শেখে। মানে ১১ মাসে হাঁটতে শেখে।‘এগার মাসে তিনটি সন্তান’ কি কি? এগার মাস অর্থাৎ ভ্রূণ মিলনের এগার মাসের কথা তথা কোন শিশু ভূমিস্ট হওয়ার দুই মাসের কথা বলা হচ্ছে। আমরা জানি বা বিজ্ঞান বলে যে, দুই মাসের শিশু প্রথম চিন্তে শেখে, বা উপলব্ধির ক্ষমতা অর্জন করে। ভাবুকের ভাষায় এই সময় প্রথম শিশু চিন্তা করে ‘আমি কে’, ‘তুমি কে’ এবং ‘আমায় কে সৃষ্টি করেছে’। এই তিনটি চিন্তা তিনটি সন্তানস্বরূপ। এখন ‘কোনটা করবে ফকিরি?’ এর মাধ্যমে বলতে চাচ্ছে, এই তিন চিন্তার কোনটি প্রবল হলে ফকির হওয়া যায় বা ফকিরি করা যায়। এখানে বলা যেতে পারে যার ‘আমায় কে সৃষ্টি করেছে’ এই চিন্তা যার প্রবল হয়, সে ফকির হতে পারে। কিন্তু দুই মাসের বাচ্চা এত বড় চিন্তা করতে পারে না কিন্তু একবার মনের মধ্যে যদি এই টাইপ চিন্তা আসে তাহলে এই চিন্তা নিয়ে সে বড় হয়। পরবর্তীতে এই চিন্তা গুলো তাকে ফকিরি বানাতে সাহায্য করে!

ঘর আছে তার দুয়ার নাই
লোক আছে তার বাক্য নাই।
আবার কে তাহারে আহার যোগায়?
কে দেয় সন্ধ্যাবাতি?

ঘর বলতে ইউটেরাস কে বলা হয়েছে যেখানে শিশু থাকে কিন্তু তার কথা থাকে না। আর সময় না হলে এখান থেকে বের হবার পথও বন্ধ থাকে মানে দুয়ার নাই। এই ভ্রুণ মায়ের শরীর থেকে খাবার নেয়, এনার্জি নেয় এটা বোঝাতেই বলা হয়েছে কে তাহারে আহার যোগায় কে দেয় সন্ধ্যাবাতি। মাতৃগর্ভের এই সন্তানকে কে আহার দেয়? আমরা জানি যে মাতৃগর্ভে সন্তান মায়ের থেকে শক্তি গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। সে নিজে কোন আহার করতে পারে না। আবার ‘কে দেয় সন্ধ্যাবাতি?’ সন্তান চায় মাতৃগর্ভ থেকে বের হতে। কিন্তু সময় না হলে, ভূমিস্ট হতে পারে না। সন্ধ্যাবাতি জালানো অর্থাৎ আগমনরত আঁধারকে দূর করা। এখানে মাতৃগর্ভে থাকাকালীন তাকে কে রক্ষা করছে অর্থাৎ আলোর পথে নিয়ে যাচ্ছেন, তার সাধারণ জিজ্ঞাসা। এখানে আসলে সৃষ্টি কর্তার মহিমা কীর্তন করা হয়েছে। কারণ মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সব বিপদে আপদে সেই একমাত্র ভরসা।

ফকির লালন ভেবে বলে:
ছেলে মরে মাকে ছুঁলে,
আবার এই কয় কথার অর্থ নৈলে
তার হবে না ফকিরি।।

‘ছেলে মরে মাকে ছুলে’ কি বোঝানো হয়েছে এখানে? এখানেও সন্তান জন্মদানের কথা বলা হয়েছে। মৃত্যু মানে বিচ্ছেদ। এখানে মা এবং সন্তানের বিচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে। যখনই সন্তান জন্ম দানের সাথে মাতৃ শব্দের সৃষ্টি হচ্ছে, তখনই সন্তান তার জন্মদাত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, অর্থাৎ প্রসব করাকে বোঝানো হয়েছে। প্রসব করার সাথে সাথে সন্তান তার আশ্রয়দাত্রী মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় অর্থাৎ মা’ শব্দ সৃষ্টির সাথে সন্তান মায়ের গর্ভ থেকে প্রসব হচ্ছে। তাই বলা হল, ‘ছেলে মরে মাকে ছুলে’।এখানে বলা হয়েছে, উপরে বর্ণিত কথা গুলোর অর্থ যদি কেউ না জানতে পারে, তার ফকির জীবন সার্থক হবে না। কে ‘মা’, কে ‘ঝি বা সন্তান’, কাকে কে জন্ম দিচ্ছে। এই যে সৃষ্টিতত্ত্ব একে জানলেই তবে ফকিরি সার্থক হয়।

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:২৯
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×