
আমাদের দেশে বহুবিবাহ মানেই খারাপ একটি ব্যাপার। আমাদের কালচারে অনেকেই এমনটি ভেবে থাকেন। আমাদের দেশে সাধারণত নিম্ন শ্রেনীর লোকদের একাধিক বিয়ে করতে দেখা যায়- যাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই, ভবঘুরে, নৈতিকতার বালাই নেই। শিক্ষিত সমাজে অনেকে দায়ে পড়ে একাধিক বিয়ে করেন। যার প্রধানতম কারন- সন্তান কামনা অথবা ছেলে সন্তানের বাসনা।
সৌদি আরবে প্রথম যখন আসলাম একটু শক পেতেই হল-কালচারাল শক। এখানে বেশীরভাগ লোকেরই একাধিক স্ত্রী আছে। প্রত্যেকে স্ত্রী’র জন্য আলাদা আলাদা বাড়ী, সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা থাকে। কোন লোকের হয়তো ১০/১৫ জন সন্তান থাকে যাদের অনেকেই একজন আরেকজনকে চেনে না। কিন্তু এখানে সামাজিকভাবে একাধিক বিয়েকে কখনোই খারাপ চোখে দেখে হয় না।
সৌদি আরবে ২ মিলিয়নের মতো বিবাহযোগ্যা মেয়ে সিঙ্গেল আছে। অনেক সময় মেয়ের গার্ডিয়ান মেয়েকে বিয়ে দেয় না-মেয়ে ভালো উপার্জন করছে, তা পাবার আশায়। আবার আরেকদিকে স্বাধীচেতা মেয়েরা সৌদি ছেলেদের বিয়ে করতে চায় না। তাদের ভাষায় বেশীরভাগ সৌদি ছেলেরাই গভীর চিন্তার অধিকারী নয়। সৌদি ছেলেরা ফুর্তি, পার্টি, ড্রাইভিং নিয়ে ব্যস্ত- মোটকথায় তারা সাংসারিক নয়। পাশাপাশি মেয়ের বাবাদের উচ্চহারে মোহরানা আদায়ের কারনে ছেলে খুঁজে পাওয়া যায় না।
আমি যখন প্রথম এখানে আসি, আমার মাত্র একটি স্ত্রী আছে শুনে অনেকেই হাসাহাসি করেছিল। এক স্ত্রীতে কিভাবে চলে তারা ভেবে পায়না। তবে দিনে দিনে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। সৌদি অনেক ছেলে ১ টি বিয়েই যেখানে করতে পারছে না, তখন বহুবিবাহ স্বপ্নমাত্র। বিয়ে করার জন্য যে কোন ছেলেকে প্রচুর খরচ করতে হয়। এই টাকাটা আমাদের মতো তার পরিবার থেকে পায় না। নিজেকে আয় করে বিয়ে করতে হয়। মেয়ের বাবকে প্রায় ১ লক্ষ রিয়াল (২০ লক্ষ টাকা) দিতে হয় মোহরানা বাবদ। সে দিক থেকে আমরা ভাগ্যবান। আমাদের বাবারা ধুমধাম করে বিয়ে করিয়ে দেন, বাড়ীতেও থাকতে দেন। কিন্তু এখানে বিয়ে করার পর সম্পূর্ণ আলাদাভাবে ছেলেকে বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়। আমার এক পরিচিত টিএ বিয়ে করার জন্য তার গাড়ী বিক্রি করেছিল, তাকে নিজের বাসস্থানের চিন্তা করতে হয়েছিল। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে একাধিক বিয়ে এখন আর ছেলেখেলা নয়- মানি মেটারস।
তারপরও কিছু লোক আছে যাদের বিত্ত বৈভবের কমতি নেই। আমার পরিচিত একজনের কফিল (সৌদি স্পন্সর) এক সিরিয়ান মেয়েকে বিয়ে করে আনে। কফিলের নিজের বয়স ১০০ এর উপরে কিন্তু বিয়ে করেছে বাচ্চা মেয়েকে। সারাদিন বউকে পাহাড়া দিয়ে রাখে, নিজের আগের স্ত্রী’র ছেলেদেরকেও বাড়ীতে আসতে দেয় না।
ইসলামে বহুবিবাহ বৈধ, কিন্তু শর্ত স্বাপেক্ষে। ইসলামের দোহাই দিয়ে অনেকেই এর অপব্যবহার করেন। একাধিক বিয়ে করার সময় পুরুষরা কেউ বৃদ্ধা, স্বামীহারা, এতিম মেয়েদের বিয়ে না করে কুমারী/যুবতী মেয়ে খোঁজ করে। অথচ ইসলামের মূল দীক্ষা ছিল-একাধিক বিয়ের মাধমে একজন অসহায় মহিলা স্বাবলম্বী হবে। কিন্তু বাস্তবে কি ঘটছে? একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে যৌনতাই মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে উঠছে।
সৌদি আরবে কেউ মুখ ফুটে না বললেও সমাজে ভেতরে ভেতরে রয়েছে ব্যাভিচার। বৃদ্ধ পুরুষের যুবতী স্ত্রী প্রায়শঃ অন্য কারো সাথে সময় কাটাচ্ছে। বিভিন্ন কারনে বিবাহ বঞ্চিত মেয়েরা বিভিন্ন সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে। ইসলামিক নিয়ম নীতির যথাযোগ্য বাস্তবায়ন হলে সমাজের এই চিত্র দেখতে হত না।

বিয়ে নিয়ে এই ভূমিকার একটা কারন আছে। হঠাৎ করেই আমাদের মাঝে একাধিক বিয়ে করা/নাকরা নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হল। শুরুটা করলেন আমাদের মাঝের এক ভাই, সঙ্গত কারনেই যার আসল নামটি উল্ল্যেখ করছি না। ধরা যাক ওনার নাম– লিটন ভাই। লিটন ভাইয়ের ৩য় বিয়ে চলছে। ৩টি বিয়েই ছিল বিদেশী। উনি এখন ৪র্থ বিয়ে করে কোটা পূরন করতে চান। উনি মনস্থির করেছেন এবার একজন বাংলাদেশি মেয়েকে বিয়ে করবেন। কিন্তু বর্তমান ভাবী বেঁকে বসেছেন-আরেকটি বিয়ে করো ঠিক আছে, কিন্তু কোন বাংলাদেশি বিয়ে করতে পারবে না। হয়তোবা তিনি ভেবেছেন বাংলাদেশি বিয়ে করলে লিটন ভাইয়ের জীবনে নতুন বউ বিশেষ অধিকার আদায় করে নিবে। কিন্তু আমরা লিটন ভাইকে একজন বাংলাদেশি ভাবী আনার জন্য উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি।
সমস্যা এখানে নয়। সমস্যা হচ্ছে লিটন ভাই যখন বিয়ে করেন, আশেপাশে দু/একজনকে সাথে নিয়ে বিয়ে করেন। উনার পাল্লায় পড়ে তার নিজের বন্ধু, সৌদি মালিকসহ অনেকেই একাধিক বিয়ে করেছে। তাই এখন লিটন ভাইয়ের নতুন করে বিয়ে করার খবর শুনে রিমন ভাই, আজাদ ভাই, সজীব ভাইয়ের স্ত্রীরা এমনকি আমার স্ত্রী পর্যন্ত দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেছে। শাকিলা অস্ট্রেলিয়াতে আছে, একাকী আমাকে নিয়ে তার দুঃশ্চিন্তা হবে সেটাই স্বাভাবিক। আজাদ ভাই আমাদের সাথে রাতে হাটতেন ও ব্যায়াম করতেন। কিন্তু উনার স্ত্রী তা বন্ধ করে দিলেন। সন্দেহ করলেন- ব্যায়াম করে স্বাস্থ্য কমিয়ে আরেকটি বিয়ে করার পায়তারা করছে।
রিমন ভাই ইনিয়ে বিনিয়ে ভাবীকে বাংলাদেশে বেড়াতে যেতে বলেছেন কিন্তু ভাবী যথার্থ সন্দেহটি করে বসলেন। লিটন ভাইয়ের সাথে রিমন ভাইয়ের অতিরিক্ত মেশামেশি তিনি ভালো চোখে দেখছেন না।
আমি শাকিলাকে বললাম আবহায় আমাদের অনেকেই একসাথে গণ বিবাহ করবে। সে ধারনা করল- আমিও তাদের মাঝে থাকার পরিকল্পনা করছি। তারপর থেকে ১ দিন কথা বন্ধ।
অন্যান্য ভাইরাও কিছু বলতে গিয়ে ভাবীদের সন্দেহের তালিকায় পড়ে গেলেন। সবাই সবাইকে চোখে চোখে রাখছে, সবাই বড় বিপদে আছে।
অনেক বিষয় বিবেচনা করে সন্দেহ তালিকায় অভিযুক্ত স্বামীরা একমত- প্রয়োজনবোধে এবং শর্তপূরনসাপেক্ষে আমাদের একাধিক বিবাহ দরকার আছে। এটা পরকিয়া, ব্যভিচার থেকে আমাদের রক্ষা করবে। স্বামীদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য স্ত্রীদের মাঝে ভালোবাসার প্রতিযোগীতা থাকবে। কিন্তু আমাদের বর্তমান স্ত্রীরা তাদের সাম্রাজ্য শেয়ার করতে রাজী নয়। অতএব আমাদের মনের দূর আকাশে উঁকি দেয়া সামান্যতম আকাঙ্ক্ষার এখানেই মৃত্যু।
লিটন ভাইয়ের নতুন বিয়ের অনুষ্ঠানের অপেক্ষায় আছি। ভুরিভোজটা সবাই ওখানেই সারব।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ১১:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





