যারা '92 এর বিশ্বকাপ দেখেছেন তাদের অনেকেরই নিশ্চয়ই মনে আছে। পাকিস্তান দলের মিডল অর্ডারে খেলতে নামা দীর্ঘদেহী ছিপছিপে সেই তরুণের কথা। ধীর স্থির শান্ত ইনজামাম। ম্যাচের ভাগ্য চিন্তায় গ্রেট ইমরানের কপালেও যখন চিন্তার বলিরেখা নিজের স্থান পাকা করে নিতে চলেছে তখনও নির্লিপ্ত ইনজামাম। তার নিশ্চিন্ত ভাবখানা দেখে মনে হতেই পারে পরিস্থিতিটা বোধহয় ঠিকঠাক ঠহর করতে পারছেন না তিনি। কিন্তু ম্যাচ শেষে যখন জয়ের ঠিকানা হলো পাকিস্তান শিবিরে তখন দেখা গেলো সেই জয়কে পথ দেখিয়েছে সেই নির্লিপ্ত তরুণ ইনজামামের এর ব্যাট। এমন ভূমিকা প্রায় প্রতি ম্যাচেই। জেন্টল ম্যান গেমস্ ক্রিকেটে ইনজামাম উল হক একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক হিসেবেই পরিচিত ক্রিকেট বিশ্বে। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে গতবছর ইংল্যান্ড সফরে শেষ টেস্টে আম্পায়ায়ার ড্যারল হেয়ারের ওভালে যখন তিনি আম্পায়ার ড্যারল হেয়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চা বিরতীর পর খেলতে অস্বীকৃতি জানান তখন অনেকেই তার স্বভাব বিরোধী আচরণে অবাক হয়েছেন। তার এই সিদ্ধান্তের কারণে আইসিসি তাকে 4 ম্যাচের জন্য সাসপেন্ড করে। সে কারণে ভারতে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে খেলা হয়নি পাক কাপ্তানের। চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় পাকিস্তান। চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে দারুণ পারফর্ম করা ওয়েস্ট ইন্ডিজ খেলতে আসে পাকিস্তানে। নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত হোম সিরিজে সেই একই দল নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজ জিতে পাকিস্তান। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির দলের সাথে ঐ দলের পার্থক্য হলো এই অধিনায়ক ইমজামাম। তার প্রত্যাবর্তনে পুরো দলটাই যেন বদলে যায়।
ইনজামাম উল হক। গত 16 বছরে পাকিস্তান দলের মিডিল অর্ডারের নির্ভরতার নাম। 1970 সালের 3 মার্চ পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মুলতানে জন্ম হয় এই গ্রেট ক্রিকেটারের। 37 বছর বয়সী এই ক্রিকেটার তার বর্ণাঢ্য ক্রিকেট জীবনে খেলেছেন 119টি টেস্ট ও 377টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দেশে খেলেছেন ফয়সালাবাদ, ইউনাইটেড ব্যাংক, রাওয়ালপিন্ডি, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও মুলতানের হয়ে। তাছাড়া এশিয়া একাদশ ও আইসিসি বিশ্ব একাদশের হয়েও খেলেছেন।
ছোট বেলা থেকেই ক্রিকেটপ্রাণ ইনজি মাধ্যমিকের পাঠটা মুলতানেই চুকিয়ে দিয়ে লাহোর এসেছিলেন উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে। কিন্তু বুক পকেটে গোপনে নিয়ে এসেছিলেন ছোট্ট বেলা থেকে লালিত স্বপ্নটা। বড় শহর, সেখানে সুযোগ-সুবিধা করে নেয়াটাও সহজ হবে এমনটা তিনি আগেই বুঝে গিয়েছিলেন। সেই মাফিক শুরুটাও। এসেই অভিষেক প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে। তাও আবার টানা তিন সেঞ্চুরী দিয়েই অভিষেক। তারপর টানা তিন মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানে তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি কেউ। তারপরও যখন জাতীয় দল থেকে ঢাক এলো না তখন অনেকটা অভিমানে মুলতানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানালেন বন্ধু মোশতাক আহমদকে। ফেরার ঠিক আগের দিন রাতে মোশতাক তাকে ফোন বললেন,জরুরী প্রয়োজন, পরদিন গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে আসতে। তখনও ইনজামাম জানতেন না তার জন্য কি চমক অপো করছে। স্বয়ং ইমরান খান। পাক ক্রিকেট ইমরান তখন রীতিমতো দেব তুল্য। ব্যস পায় কোথায় ইমরান সঙ্গে নিয়ে এসেছেন ওয়াসিম, আকিব জাবেদদের। দলে সুযোগ চাইলে এদের বিপ েব্যাট চলাতে হবে। তরুণ ইনজির জন্য এটা আর এমন কি? সপাটে ব্যাট চালালেন। আর যায় কোথায় ইমরানের চোখে তখন রত্ম পাওয়ার আনন্দ ঝিলিক দিচ্ছে। সেই থেকে আছেন পাকিস্তান দলের সাথে।
1991 এর 22 নভেম্বর লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে স্বাগতিকরা মুখোমুখি হয়েছিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ঐ ম্যাচের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখেন ধীরস্থির শান্ত তরুণ ইনজামাম উল হক। ক্রিকেট বিশ্বে প্রথম থেকেই তিনি এই ইমেজের পাশাপাশি অলস হিসেবেও ভালো খ্যাতি অর্জন করেন। এই খ্যাতির কারণ হয়তো তার রান আউট হওয়াই দায়ি। ধীর স্থির হিসেবে পরিচিত হলেও ব্যাট হাতে যখন বোলারদের মুখোমুখি হন তখন তিনি কেমন যেন অশান্ত হয়ে উঠেন। সে পেস বোলিং হোক আর স্পিন হোক কোন কিছুরই ধার ধারেন না। সামনে পেলেই হলো নির্দয়ভাবে বলের উপর সপাটে ব্যাট চালাবেন। তার একটাই দুর্বলতা সিঙ্গেল রান নিতে গিয়ে দীর্ঘ শরীর নিয়ে ঠিকঠাক দৌড়াতে পারেন না। তাই প্রায়ই রান আউট হয়ে যান। যা হোক নিজের অভিষেক ম্যাচে অবশ্য আহামরি সাফল্য দেখাতে পারেননি ইনজি। সেই ম্যাচে পাকিস্তানের করা 186 রানের মধ্যে 67 বলে তার করা 51 রানের ইনিংসটা অবশ্য তখনই প্রশংসা কুড়িয়ে নেয় ক্রিকেটবোদ্ধাদের। অবশ্য ম্যাচে কোন দলই জয় ছিনিয়ে নিতে পারেননি। সেই শুরু। এরপর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ 16 বছর। এই দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি খেলে ফেলেছেন 377টি ওয়ানডে ম্যাচ। এরমধ্যে 349 ইনিংসে 10টি শতক ও 84টি অর্ধশতসহ 39.53 গড়ে তার সংগ্রহ 11,702 রান। যার মধ্যে 22 বার তিনি অপরাজিত ছিলেন। একদিনের ক্রিকেটে তার সর্বোচ্চ সংগ্রহ 137 রান।
এক বছরের ব্যবধানে টেস্ট অঙ্গনেও অভিষিক্ত হন ইনজামাম। জাবেদ মিয়ানদাদের নেতৃত্ত্বাধিন পাকিস্তান দল ইংল্যান্ড সফরে গেলে '92 এর 4 জুন কেপটাউনে স্বাগতিকদের বিপ েজীবনের প্রথম টেস্ট খেলতে নামেন তিনি। প্রথম টেস্টে মাত্র 14 বল খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন ইনজি। আর তাতেই 1টি চারসহ তিনি 8 রানে অপরাজিত ছিলেন। এরপর পেরিয়ে গেছে অনেক বর্ণময় দিন। ইতোমধ্যে মুলতানের সুলতান খেলে ফেলেছেন 119টি টেস্ট। 25টি শতক ও 46টি অর্ধশতসহ 198টি টেস্টে ইনিংসে 50.07 গড়ে তার তার মোট সংগ্রহ 8,813 রান। 22 বার অপরাজিত এই ব্যাটসম্যানের টেস্টে সর্বোচ্চ সংগ্রহ 329 রান। শেষ টেস্ট খেলেন দণি আফ্রিকা সফরে 4-8 জানুয়ারী।
তার বর্ণময় ক্যারিয়ারে তিনি 241টি ফাস্ট কাস ম্যাচে 387 ইনিংসে 58 বার অপরাজিত থেকে মোট সংগ্রহ করেছেন 16,679 রান। যার মধ্যে আছে 45টি শতক ও 86টি অর্ধশত।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




