somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হুমায়ূন আহমেদ এবং সাহিত্য

১৯ শে জুলাই, ২০১৪ ভোর ৫:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভেবেছিলাম হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের সমালোচনা লিখব। কিন্তু সমালোচনা বলতে যা বোঝায়, তা যদি লিখি, তবে যে পাঠক মর্মাহত হবেন তা নিশ্চিত। ভাবলাম, মর্মাহত করে কাজ নেই, কত সত্যই তো চেপে রাখি, প্রকাশ করি না; যাতে অমঙ্গল হয়, যে কথা অন্যকে আঘাত দেয় আমি তা কখনই বলার পক্ষপাতী নই।

যাঁরা সাহিত্য নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন, যাঁরা সাহিত্যের শিক্ষক বা শিক্ষার্থী তাঁরা সাহিত্য অঙ্গনে হুমায়ূন নামটিকে অন্তর্ভূক্ত করতেই অনিচ্ছুক। এর যুক্তিযুক্ত কারণ আছে। একটি রচনার সাহিত্যগুণে গুণান্বিত হয়ে ওঠার পূর্বশর্ত হচ্ছে জীবনবোধ ও মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব আর দার্শনিক ভাষ্যের চিরায়ত জিজ্ঞাসা। সাহিত্যকে জীবনের পূর্ণাঙ্গ না হোক, অন্তত জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হতে হয়। হুমায়ূন আহমেদের রচনাগুলোতে আপাতদৃষ্টিতে এসবের কোনটাই নেই। তবুও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই সফল লেখক বাংলাদেশে কোটি কোটি পাঠক সৃষ্টি করেছেন, মানুষের বই পড়ার প্রবণতাকে অবক্ষয়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া হতে ঠেকিয়ে এপার এবং ওপার বাংলায় বিপুল সংখ্যক মুগ্ধ পাঠক তৈরি করেছেন। এবং আরো সত্য হল, তিনি তাঁর বিপুল পাঠকনন্দিত বইগুলোর দ্বারা দেশের প্রকাশনা জগতকেও বাঁচিয়ে রেখেছেন।

আমি সমালোচনা করলে সেটাকে সমালোচনা না বলে "কুশপুত্তলিকা দাহ" বললেই যথার্থ শোনাবে। সমালোচক Zeon Amanza অত্যন্ত নিষ্ঠুর একজন ব্যক্তি। তবে আমি আজ সমালোচনা করছি না। আমি আজ হুমায়ূন আহমদের প্রশংসা করব, তাঁর পক্ষে কথা বলব।

হুমায়ূন আহমেদকে একজন সমালোচক বলেছিলেন, আপনি আবোল তাবোল লেখেন, আপনার লেখায় শিক্ষণীয় কিছু নেই।
হুমায়ূন উত্তরে বলেছিলেন, শিক্ষণীয় কিছু পেতে হলে পাঠ্যপুস্তক পড়বেন। আমি তো পাঠ্যপুস্তক লিখছি না।

হুমায়ূন আহমেদ শিক্ষণীয় কিছু যে লেখেননি এমনও নয়। তিনি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ওপর গবেষণা করেছেন এবং গণিতের একটি সূত্রেরও সম্প্রসারণ করেছেন। (রেফারেন্সটা খুঁজে পাচ্ছি না)

হুমায়ূন আহমেদ কি শুধুই আবোল তাবোল লিখেছেন? কী লিখেছেন তার বিশ্লেষণ আমি অল্প কথায় একটু পরে করব। আগে হুমায়ূন আহামেদ কী বলেছেন তা একটু দেখাই

"এই মহাবিশ্বের বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তরই আমাদের জানা নেই। আমরা জানতে চেষ্টা করছি। যতই জানছি ততই বিচলিত হচ্ছি। আরো নতুন সব প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা নিদারুণ আতঙ্কের সঙ্গে লক্ষ্য করছেন তাঁদের সামনে কঠিন কালো পরদা যা কোনদিনই উঠানো সম্ভব হবে না। কী আছে এই পর্দার আড়ালে তা জানা যাবে না।
আমার যাবতীয় রচনায় আমি ওই কালো পরদাটির প্রতি ইঙ্গিত করি। আমি জানি না আমার পাঠক পাঠিকারা সেই ইঙ্গিত কি ধরতে পারেন, নাকি তারা গল্প পড়েই তৃপ্তি পান?"
[এই আমি : আত্মজৈবনিক রচনা]

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতিচারণে পারিবারিক যেসব মজার পাগলামী এবং খামখেয়ালিপনার উল্লেখ করেছেন, তারই ছাপ পাওয়া যায় তাঁর চরিত্রগুলোতে। তাঁর চরিত্রগুলো এমন সব হাস্যকর আচরণ করে বসে যা বাস্তব জীবনে কাউকে করতে দেখা যায় না। আমাদের প্রত্যেকের মনেই উদ্ভট অযৌক্তিক অজস্র চিন্তা আসে এবং সেসব করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ন হবে ভেবে আমরা তা করতে পারি না। অথচ অবচেতনে সে বাসনাটা রয়েই যায়। হুমায়ূন এইসব উদ্ভট বাসনাকে তাঁর লেখার রসদে পরিণত করেছেন। এবং পাঠক এটা পছন্দ করেছে ।

এসব উদ্ভট আচরণ ও ভূমিকার কারণেই হুমায়ূনের চরিত্রগুলো সমাজ বাস্তবতাকে স্পর্শ করতে পারেনি। প্রকৃত সাহিত্যের দাবিদার হয়ে উঠতে পারেনি লেখাগুলো। "আশাবরী" উপন্যাসে একটি দরিদ্র পরিবারের করুণ চিত্র উঠে এলেও তা শুধু চরিত্রগুলোর উদ্ভট কার্যকলাপ আর পরিসমাপ্তির অসারতার কারণেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তাঁর লেখার আরেকটি বড়ো অসঙ্গতি বা ত্রুটি ছিল নামকরণের অযোগ্যতা। অধিকাংশ উপন্যাসেরই নামের সঙ্গে ন্যুনতম সংযোগ নেই।
এসব উপন্যাসের নাম তিনি বেশিরভাগই নিয়েছিলেন ঝোঁকের বশে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রত্যয় হতে।

যাইহোক, এসব নিয়ে বলতে গেলে নিন্দের পাল্লা ভারী হয়ে যাবে।

সাহিত্য লেখেন না বলে সৈয়দ শামসুল হক হুমায়ূনকে কটাক্ষ করেছিলেন। সাহিত্য বলতে যা বোঝায় তা কবি সৈয়দ শামসুল হক অজস্র লিখেছেন। কিন্তু পাঠক তা কিনেছে কজনে? কজন পাঠক জানে সেসব ধ্রুপদী রচনার কথা? খেলারাম খেলে যা উপন্যাসটি কজনে পড়েছে? আয়না বিবির পালা ও নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাস দুইটি দিয়ে যে সফল দুইটি ছায়াছবি হল তার খবর কজনে জানে? নীল দংশন, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ, দেয়ালের দেশ, সীমানা ছাড়িয়ে, দূরত্ব, এক মুঠো জন্মভূমি, ত্রাহি ইত্যাদি অসংখ্য সফল উপন্যাসের কয়টি পাঠক জানে? পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নুরলদীনের সারা জীবন, মুখোশ, গণনায়ক ইত্যাদি ঐশ্বর্যমণ্ডিত নাটক সম্পর্কে কজনের ধারণা আছে?

বাংলাদেশের বিবেক এবং বোধসম্পন্ন পাঠক তো মরে গিয়েছে সেই একাত্তরের পঁচিশে মার্চ আর ১৪ ডিসেম্বরে দেশের মেধাবী বুদ্ধিজীবী সন্তানগুলোর সাথে। সেই হতে আজ অবধি এদেশে কিছু হুজুগে প্রজন্মের চাষ হয়ে এসেছে। মেধাবী সন্তান জন্মেছে ঠিকই, তবে মেধার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার মতো একজন মুনির চৌধুরী তো আর শিক্ষক হয়ে এলেন না এই এতগুলো বছরে!

এদেশে সাহিত্যিক হয়ে ভবিষ্যত কী? সাহিত্যের কদর এদেশে কে বোঝে? তাই সাহিত্যিকেরা তো বাস করে ওই ওপার বাংলায়। সুনীল, শীর্ষেন্দুরা ওপারে গিয়েই যোগ্য কদরটি পেয়েছেন। এদেশে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ কিংবা শামসুল হক আধপেট খেয়ে জীবন কাটাতেই বাধ্য হয়েছেন।

খুব তো পণ্ডিতের মতো চশমা নাচিয়ে বলছেন যে, হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য লেখেননি, বলি, ওঁরা তো লিখেছেন, তা ওইসব খ্যাতিমান সাহিত্যিকের কয়টা বই ছুঁয়ে দেখেছেন এপর্যন্ত? পড়ার কথা জিজ্ঞেস করে আর লজ্জা দিলাম না।
এঁদের কয়টা বই কিনেছেন জীবনে?

হ্যাঁ, হুমায়ূন সাহিত্য লেখেননি। বিক্রয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সস্তা কৌশলের বই লিখেছেন তিনি। আমি বলি, ভালো করেছেন, বিচক্ষণ কাজটিই করেছেন তিনি। যদি হুমায়ূন সাহিত্য লিখতেন তবে অন্য সাহিত্যিকের মতোই না খেয়ে মরতেন। বছর বছর বই বেঁচে কোটি টাকা কামিয়ে নুহাশ পল্লী বা সমুদ্র বিলাস বানাতে পারতেন না। আসলে যা বলতে চাইলাম বলা হল না আরেকটি পোস্টে বলছি।

অনুরোধ : বই কিনুন। যোগ্য সাহিত্যিককে যথার্থ মর্যাদা দিন।
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×