somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন হুমায়ূন

২০ শে জুলাই, ২০১৪ ভোর ৫:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পাঠক যে শিরোনামটি দেখতে পাচ্ছেন, মূলত এই শিরোনামেই আমি কাল লিখতে বসেছিলাম। কিন্তু লেখা তার নিজস্ব বক্তব্য ধারায় এমনভাবে এগুতে লাগল যে রাশ টেনে ধরা সম্ভব হল না। অগত্যা শিরোনাম পাল্টাতে বাধ্য হয়েছিলাম।

গত লেখায় যা বলেছি তা মোটেও সমালোচনা ছিল না। হুমায়ূনকে ঘিরে সাহিত্যাঙ্গনে যেসব অপবাদ প্রচলিত আমি চেষ্টা করেছিলাম অল্প কথায় সেগুলোরই উত্তর দিতে। তারপরও পাঠক মর্মাহত হয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদ পাঠকের মনে এতটাই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার আসন তৈরি করে নিয়েছেন যে, পাঠক তাঁকে নিয়ে ন্যুনতম সমালোচনাও সহ্য করতে নারাজ।

সাহিত্যাঙ্গনের এক কথা, হুমায়ূন কোন সাহিত্য লেখেননি।
বেশ, তবে হুমায়ূন কী লিখেছেন? শুধুই বই? কী আছে সেই বইয়ে? কিচ্ছু নেই?
হতেই পারে না। কিছু না থাকলে এই লেখকের পক্ষে দেশে বিদেশে লক্ষ লক্ষ ভক্ত অনুরাগী অর্জন আপনা অপনি সম্ভব হত না। কাল যে লেখাটি দিয়েছিলাম সেখানে হুমায়ূনের লেখার অন্তর্নিহিত চেতনার উদ্ধৃতি আছে। আপনাদের হয়ত খেয়াল আছে।

সাহিত্যে খেলা বলতে যা বোঝায় সেই খেলাটিই হুমায়ূন খেলেছেন পাঠককে নিয়ে। উদ্ভট আচরণ আর সংলাপে পাঠককে হেসে গড়াগড়ি খাইয়েছেন, ফুসফুস আর হৃদয়কে এক করেছেন এই লেখক। পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে নিতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন লেখকদের যদি একটি তালিকা করা হয়, তবে হুমায়ূনের অবস্থান হবে বোধ করি সারা বিশ্বের মধ্যে প্রথম।

কেন প্রথম হবে বলি, হুমায়ূনের হিমু চরিত্রটি বাংলা ভাষাভাষী যুবকদের এতটাই আকৃষ্ট করেছে যে, তাদের মধ্যে হিমু হয়ে ওঠার হিড়িক পড়ে গিয়েছে। দলে দলে ছেলেরা খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবী পরে হিমু হয়ে পথে নেমে এসেছে এক ময়ূরাক্ষী পড়েই। হিমুর ব্যাপ্তি প্রথম ছড়ায় অবশ্য এই সিরিজের দ্বিতীয় বই দরজার ওপাশে প্রকাশের মাধ্যমে। বইমেলায় প্রতি বছর হিমুর ঢল নামতে লাগল। কলকাতায় হুমায়ূনের পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিল এক ধূতির উপর পাঞ্জাবী পরা হিমু। বেচারা রামকৃষ্ণ পরমহংসের পাশে হুমায়ূনের ছবি টাঙিয়েছে ঠাকুর ঘরে। ভেবে দেখুন, কী প্রগাঢ় ভক্তি!
জার্মানির ফ্রাংকফুর্টে বরফ পড়া ঠাণ্ডায়ও কাঁপতে কাঁপতে হাঁটা হলুদ পাঞ্জাবী হিমুর দেখা মিলেছে!
হুমায়ূন আহমেদকে সালাম দিয়ে জানাল যে, সে দুই বছর হল হিমু হয়েছে। যেন হিমু কোন ধর্মের নাম!

গুলশানের ড্রাগ য়্যাডিক্টেড এবং মানসিক পুনর্বাসনের জন্য খ্যাত মুক্তি ক্লিনিকের একজন স্বনামধন্য প্রফেসর (DMC'র) হুমায়ূন আহমেদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন এই অভিযোগ নিয়ে যে, হুমায়ূন সমাজে হিমু নামক একটি মানসিক অসুস্থতা ছড়াচ্ছেন!

কারণ, সেই ক্লিনিকে অসংখ্য বাবা-মা সন্তান নিয়ে এসেছে যারা হিমু নামক একটি অদ্ভুত মানসিক রোগে আক্রান্ত!

চিকিৎসাধীন মহিলা হিমুও পাওয়া গেছে! মেয়ে হিমুর সংখ্যাও আজ কম নয়।

অতঃপর ২০০৬ সালে হুমায়ূন বাধ্য হলেন হিমু হবার নিয়মাবলি ঘোষণা করতে। একটি চরিত্রের এরকম জনপ্রিয়তা পাওয়ার নজির পৃথিবীতে আর কি আছে?
হিমু চরিত্রটির সৃষ্টি নিয়ে অন্য একসময় বিস্তারিত বলব।

হিমুর পরে আর যে চরিত্রটি পাঠক নন্দিত হয়েছে তা হল মিসির আলি। বাংলা সাহিত্যে ফেলুদা কিংবা কাকাবাবুর চেয়েও মিসির আলির জনপ্রিয়তা বেশি। এবং এই চরিত্রটি অন্য যেকোন রহস্যভেদী চরিত্র অপেক্ষা অভিনব।

সাহিত্যের কাজ কী?
যদি আনন্দ দান সাহিত্যের কাজ হয়, তবে সে কাজটি হুমায়ূন আহমেদ অন্য যেকোন লেখকের চেয়ে বেশি সফলভাবে করেছেন।
সাহিত্য ভাঁড়ামি করে না। সাহিত্য চেতনাকে শাণিত করে। পাঠক-চেতনাকে হুমায়ূনও নিশ্চিতভাবে শাণিত করেছেন তাঁর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক রচনাগুলো দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো উৎসাহী এবং নিষ্ঠাবান লেখক আর দ্বিতীয়টি নেই।

হিমু চরিত্রের মাধ্যমে নির্মোহ শুদ্ধতার মহৎ চর্চাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন শত শত যুবকের অন্তরে। মোবারককে খুন সন্ত্রাস ছেড়ে ভালো কাজ করার প্রতিযোগিতায় নামিয়েছেন, শুভ্রের মতো নির্মল চরিত্রের একটি মডেল তৈরি করে দিয়েছেন হুমায়ূন এ দেশের যুবকদের জন্যে।

সততা ও সরলতার যে বিজয় নিশ্চিত, তার দৃষ্টান্তও দেখিয়েছেন তিনি প্রায় প্রত্যেকটি লেখাতে।
দার্শনিক অভিব্যক্তিরও কমতি কোথায় হুমায়ূনে?

দৈহিক লালসা বর্জিত নিষ্পাপ প্রেমের সঙ্গেও পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন হুমায়ূন, যেখানে আধুনিকতার নগ্ন স্নানে নিমজ্জিত হচ্ছে দেহগুলো নিয়ত।

হুমায়ূন কী দেননি আমাদের?

চিত্তে রসের সঞ্চার করা যদি সাহিত্য হয়, তবে সেক্ষেত্রে হুমায়ূনের মতো সফলতা আর কে পেয়েছেন বাংলাদেশে?

আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সাহিত্যের যা যা অভিপ্রায়, যা যা প্রক্রিয়া, তার সবই হুমায়ূন আহমেদের রচনায় আছে। শুধু পার্থক্য হল, হুমায়ূন আহমেদ ভিন্ন ধারার লেখক, স্বতন্ত্র পথের প্রবর্তক। অন্যদের মতো শব্দ, বাক্য আর উপমা অলংকারের কচকচানি রেখে নিতান্ত সহজ ভাষায়, যে ভাষায় সাধারণ মানুষগুলো ভাবে, কথা বলে, সেই ভাষাতেই পাঠকের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি একেকটি গল্প নিয়ে। হয়ত সাহিত্যিক মহলের আপত্তিটা এখানেই।

কোন সাহিত্যিকই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। আর কোন ত্রুটি বিচ্যুতির কথা আমি টানতে চাইছি না। সাহিত্য এবং হুমায়ূন সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব আশা করি এখানেই শেষ হবে।

কোন লেখকেরই সব লেখা চিরস্থায়ী রাজত্ব করতে পারে না। একসময় প্রভা হারিয়ে বিলুপ্ত হয়। তবে হুমায়ূনকে বুঝতে হলে, তাঁর সাহিত্যবোধের মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে হলে পাঠককে যে কয়টি বই অবশ্যই পড়তে হবে তা হল—

১. মধ্যাহ্ন (আমার মতে শ্রেষ্ঠ)
২. তিথির নীল তোয়ালে
৩. নন্দিত নরকে (সাহিত্য বিচারে শ্রেষ্ঠ বিবেচিত)
৪. দেয়াল (বিকৃত হয়ে গেছে)
৫. জোছনা ও জননীর গল্প (অগোছালো, সংস্করণ জরুরি)
৬. আমি ও আমরা (শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্বিক বই)
৭. ভয়

আমার ধারণা, অন্য বইগুলো হারিয়ে গেলেও এই সাতটি বই উজ্জ্বল হয়ে টিকে থাকবে অনেক অনেক বছর।

হুমায়ূন আহমেদের মোট বইয়ের সংখ্যা আনুমানিক ৩২২। গত বছর আমি দাবি করেছিলাম যে, হুমায়ূনের সমস্ত রচনাকে ভলিউম আকারে প্রকাশ করা হোক। এই লেখকের একটি লেখাও আমরা হারাতে চাই না।

সংশোধনী : পাঠক যে শিরোনামটি দেখতে পাচ্ছেন, কাল আমি এ শিরোনামেও লিখতে চাইনি। আমার উদ্দিষ্ট শিরোনামটি ছিল "হুমায়ূনের চরিত্রগুলি"। আজ লিখতে বসেছিলাম তাও হল না। সেই আগের আলোচনারই বিহিত করতে করতে বেলা ফুরাল।

আরেকটি লিখি?
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×