somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাহিত্যে অশ্লীলতা এবং কিছু বক্তব্য

০৮ ই মার্চ, ২০১৫ রাত ১:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাহিত্যের সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে আমরা দুইটি জিনিস দেখতে পাই, এক. অনুভূতির বহিপ্রকাশ, দুই. জীবনের প্রতিচ্ছবি বা জীবন জিজ্ঞাসা।

অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে সাধারণত কবিতায়। আর জীবনের সামগ্রিক রূপ, দর্শন, জিজ্ঞাসা প্রভৃতি প্রকাশ পায় কথাসাহিত্যে। ব্যতিক্রমও ঘটে। আগে তো জীবনের রূপ বা ঘটনা এবং গোটা সাহিত্যই ছিল কবিতাকে কেন্দ্র করে। এখনকার কবিতায়ও ব্যক্তির মতবাদ (Concept) বা দর্শন প্রকাশ পায়।

কবিতাকে বলি কবির ঐকান্তিক সৃষ্টি। লোক দেখানো বাজারী কবির মনোভাব জানি না, তবে যতটুকু বুঝি, কবি কবিতা লেখেন নিজের জন্য, তাঁর নিজস্ব অনুভূতি, নিজস্ব দর্শন এবং জিজ্ঞাসাকে তিনি আপন খেয়ালে শব্দ ও বাক্যে বন্দি করেন। আর সেই বাক্যসম্ভার যখন সাধারণ পাঠকের বা সমঝদার রসিকের হৃদয়কেও ছুঁয়ে দিতে পারে তখনই তা হয় কবিতা, সার্বজনীন সাহিত্য। টেনিসন তাঁর বন্ধুর মৃত্যুতে দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে রচনা করেন বিরহ গাঁথা In Memoriam, কেবলই তাঁর একান্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ছিল সেটি, কিন্তু পৃথিবীর মানুষ যখন তা পাঠ করল, সে দুঃখ তখন সবাইকেই গ্রাস করল, প্রত্যেকেই মিল খুঁজে পেল তাদের জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে, তাদের প্রিয়জন বিয়োগের সঙ্গে, প্রত্যেকেই পড়ে চোখ ভেজাল, সেটাই হয়ে উঠল সাহিত্য। এই সার্বজনীনতা যদি না থাকত, তবে তাকে সাহিত্য বলারও অবকাশ হত না। কিন্তু আরো বড়ো সত্য হলো এই যে, আমরা যাই লিখি, কিছুই তার একান্ত নয়, সবই সার্বজনীন, মানুষের বুঝতে হয়ত সময় লাগে এই যা! এ প্রসঙ্গে আমরা আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির কথা মনে করতে পারি। তার একার কথা আর একার হয়ে রইলো না।

যাইহোক, সাহিত্যে এই সার্বজনীন দিকটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এবার লক্ষ করি, সার্বজনীনতা বিষয়টা কী! যে সকল বিষয় সর্বত্র উপস্থিত; যেমন- সুখ, দুঃখ, অভাব, বিত্ত, প্রেম, কামনা ঘৃণা, প্রতিশোধ ইত্যাদি এবং সম্পর্কগুলোর আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব- এসবই সব কালে, সব দেশে ও যুগে দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া প্রেম সম্পর্কে আমরা এক বাক্যে যাকে পরকীয়া বলি, তার একটি বিশেষ অবস্থানও কালোত্তীর্ণ সাহিত্যগুলোতে দেখতে পাই। কেন দেখতে পাই সে আলোচনা অন্যত্র হবে, এখানে তা অনাবশ্যক। সাহিত্যে প্রকাশিত অনুভূতিগুলোর মধ্যে যৌনতার প্রভাবই সবচেয়ে প্রকট। এবং এটাকে কেবল যৌনতা বলারও উপায় নেই, এই অনুভূতি আমাদের অন্য সকল অনুভূতিরই কেন্দ্রবিন্দু। এই অনুভূতির রহস্যও বড় গভীর, যার থৈ মানুষ এখনও খুঁজে পায়নি। প্রাচীনকাল হতেই সাহিত্যে এর বৈচিত্র্য উপস্থাপন ও রহস্য অন্বেষণ আমরা অবধারিতভাবে দেখতে পাই। সেগুলো অবশ্যই শিল্প সমৃদ্ধ, নেহাত নষ্টামির উপস্থাপনা মাত্র নয়। সাহিত্যিক তাঁর মনোভাব কতটা যুঁৎসই শব্দে, কতটা হৃদয়ঙ্গম চিত্র প্রতীক বা উপমায় প্রকাশ করতে পারছেন তার উপরই তো সাহিত্যিকের সার্থকতা নির্ভর করে।

উত্তরটা এখানেই নিহিত আছে। আপনার উপস্থাপনা যদি পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য হয়, তা যদি কেবলই নোংরামি বলে সাধারণের নিকট প্রতীয়মাণ হয় তবে আপনি ব্যর্থ এবং সাহিত্য হিসেবে আপনার ওই রচনা বৃথা । অবস্থাভেদে তাকে আমরা অপসাহিত্য এবং অশ্লীল বলে নিন্দা করতেও বাধ্য হব।

ডি এইচ লরেন্স এর "The Lady Chatterly's Lover" বইটি অশ্লীলতার দোষে নিষিদ্ধ হয়েছিল, কারণ সেখানে সঙ্গমের বর্ণনা তীব্রভাবে ছিল। কিন্তু পরে মানুষ বুঝতে পেরেছে যে, এই বিবরণ আসলেই পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য অপরিহার্য ছিল। সমরেশ বসু'র "প্রজাপতি" উপন্যাসটির বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। এখানে লেখকগণের উদ্দেশ্য কখনই অসৎ ছিল না।
অতএব, উদ্দেশ্য বুঝতে পারাও পাঠকের জন্যে জরুরি একটা বিষয়। এজন্যই বলা হয়, সব বই সবার জন্য নয়, সব বই পাঠের যোগ্যতাও সবার থাকে না।
তাছাড়া লেখককেও তাঁর উদ্দেশ্য উপস্থাপন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, যাতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়।

সাহিত্যে রিয়েলিজম ব্যাপারটি আসার পরেই আমরা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হলাম, আমাদের নিরীক্ষা লাভ করল নতুন মাত্রা। আমরা বঙ্কিম- রবীন্দ্রনাথের ভৃত্যদের মুখে নির্ভুল শিক্ষিতের ভাষা দেখে প্রশ্নবিদ্ধ হলাম। আমরা তখন বাস্তবমুখিতার দিকে অগ্রসর হয়ে সাহিত্যে নিয়ে এলাম আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, একজন পতিতা বা একজন পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত রুচিহীন মানুষের মুখের যে ভাষা, আমরা সেটাকেই অবিকল তুলে ধরতে চেষ্টা করলাম- এটাই তো যৌক্তিক, এই তো সমাজের প্রকৃত চিত্রায়ণ। অন্যথায় তা নাটুকে ঠেকত, অনেকটা রিকশাওয়ালার গলায় টাইয়ের মতো।

তবু সব কিছু ছাপিয়ে আমাদেরকে যেটা মনে রাখতে হবে, আমাদের কলম যেন সমাজে বিষ না ছড়ায়। চলচিত্রের কথাই বলি, সেখানে ধর্ষণের চিত্র কখনও কখনও দেখানো হয়। এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল ছায়াছবির খল চরিত্রের প্রতি দর্শকের মনে ঘৃণার সঞ্চার, প্রতিশোধ স্পৃহার সঞ্চার; কিন্তু দুঃখের বিষয়, ধর্ষণের চিত্রটাকেই দর্শকের কাছে লোলুপ করে তোলা হয়, একটা হিংস্র আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া হয় দর্শকদের মধ্যে। এই ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে। আমরা নোংরামির চিত্র তুলে ধরতে পারি কেবল সমাজকে শোধরাবার জন্য, মানুষকে কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার জন্য। তার বদলে আমরা যদি নোংরামিকেই উস্কে দেই তবে স্পষ্টতই আমাদের কলম ছেড়ে দেওয়া উচিত, ওসব চলচিত্রকারদেরও অভিযুক্ত করা উচিত।

চার্লি চ্যাপলিন একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন- বক্তব্য হতে হবে মেয়েদের স্কার্টের মতো; ততটাই অনাবৃত যাতে মানুষ উৎসুক হয়, আবার ততটাই আবৃত যাতে মানুষের আগ্রহ ফুরিয়ে না যায়।

লেখককে তাঁর আত্মমর্যাদা ভুলে গেলে তো চলবে না। সমাজের নীচু স্তরের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনিও যদি ওই স্তরে নেমে যান, তবে আর তাঁর সম্মান রইলো কোথায়? বাস্তবতা বোঝাতে গিয়ে আমাদের তো নগ্ন হবার প্রয়োজন নেই। যদি উপমা দিয়ে প্রকাশ করতে না পারেন, তবে আপনি কেমন সাহিত্যিক?

সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে লেখককে মনে রাখতে হবে যে, তার জ্ঞান, তাঁর কলম সমাজের মঙ্গলের জন্য। চাইলেই আমরা যেকোন কিছু লিখতে পারি না, আমাদের লেখা পাঠকের মনে তথা সমাজে কী প্রতিক্রিয়া ফেলবে তা যদি আমরা মাথায় না রাখি তবে আমরা অবশ্যই অপরাধী বলে বিবেচিত হব। পরিশেষে বলি, যে কলম সমাজের অনিষ্টই করে শুধু, সে কলমকে আমরা নিরুৎসাহিত করি, সমাজের স্বার্থে একযোগে বয়কট করি।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:৪৮
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আত্মহনন ও পক্ষপাতিত্ব

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮


রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের নাগরিক ??!! শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং বাংলাদেশে কিছু সুশীলদের (ভালো নাপিত) তাকে নিয়ে নানা রকমের কলহ-বিবাদ-বিভক্তি তৈরী ব্যতিত; বাংলাদেশে তার আর অবদান কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

=মনে রং নেই আর=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫২


মন তো ছিল গোলাপী রঙ আভায় বন্দি, মন ছিল চন্দ্র মল্লিকা,
মন আর সেই মন নেই, মনের চারিপাশে এক সমুদ্দুর কুহেলিকা;
মন যেন পাথর হয়ে আছে, নেই অফুরন্ত ফুরসত
মন গোলাপী রঙ নয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতিতে আতঙ্ক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫০


দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা মধ্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মানুষজন । সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আছেন প্রবীণ নেতা নিতাই চন্দ্র রায়। এই অবস্থায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেয়ালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×