somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জাতিস্মর

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১২:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিজ্ঞান আমাদের দিয়াছে বেগ, কাড়িয়া লইয়াছে আবেগ । দিগ্বিজয়ের আনন্দে মানুষ দিকের সীমারেখা, কোথা হইতে যে তাহার শুরু হইয়াছিল, সে ইতিহাসও ভুলিয়া বসে । তাহারা বিজ্ঞানলব্ধ অতি যান্ত্রিকতায়, অতি তাত্ত্বিকতায় বিধাতাকে পর্যন্ত যেখানে ভুলিয়া যায়, অস্বীকার করিয়া বসে, সেখানে জাতিস্মর আর কোন মনে রাখিবার বস্তু ?

জাতিস্মর তত্ত্বটি লইয়া আমার একটি বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আছে । তবে সেই ব্যাখ্যাটি এক্ষণে এইখানে দিব না । ছাপার কাগজে দিব । নইলে জ্ঞান চুরি হইয়া যাবে । অন্য কেউ তাহা নিজের বলিয়া দাবি করিবে- যেমনটি আগেও করিয়াছে ।

সে যাহাইহোক, আমি আমার পূর্বজন্মের অনেক কিছু আবছা আবছা স্মরণ করিতে পারি । এবং উল্লেখ্য যে, আমার পূর্বজন্ম একটি দুইটি নয়, কম করিয়া হইলেও অর্ধ শতাধিক । তাহার মধ্যে একবার আমি দেবতা হইয়াও জন্মিয়াছিলাম । আজ সেই দেবজন্ম লইয়া বলিব না।
আজ বলিব অন্য এক জনমের কথা ।

সে বড়ো প্রাচীন ইতিহাস ।
সেকালে মানব সভ্যতা বিশেষ আগায় নাই । আমাদের পূর্ব- পুরুষেরা কেবল গুহা হইতে নামিয়া আসিয়াছে এমন একটি যুগ হইবে সেটি । অবশ্য ইতিহাস ঘাঁটিয়া বুঝিলাম, তাহা আসলে প্রস্তর যুগেরও পরবর্ত্তী ঘটনা, যখন বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছে তখনকার কিছু পরের হইবে ।

আমরা সে সমাজ বৌদ্ধ ছিলাম । আমরা বাস করিতাম কোন এক বিশাল সমূদ্রের উপকূলে। সে সমূদ্র এই সময়কার বঙ্গোপসাগরের ন্যায় প্রবল ঢেউ আনিয়া কূলে আছাড়িত না । তীরের ভাগটা অনেক শান্ত ছিল । সেখানে জলজ পানা আর নল খাগড়া- হোগলা সদৃশ বড়ো বড়ো গুল্মেরও অবস্থান সুনিশ্চিত ছিল ।

আমরা ছিলাম তিন ভাই । আমার নিজের নাম কী ছিল- তাহা আর স্মরণ করিতে পারি না ।
ভাইদিগের মধ্যে একটির নাম ছিল 'মাধায়'। মাধায় বড় অদ্ভুত প্রকৃতির নাম বলিয়া বোধ হইবে এই কালের মানুষের নিকট । মানুষ হিসেবেও সে অদ্ভুত ছিল । এবং সে ছিল মেজ । একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মাধায় মারা পড়িয়াছিল । সেই একই সংঘাতের সূত্র ধরিয়া সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতঃ চানুও হত্যা হইয়াছিল । আমাদের একমাত্র ভগিনি 'বাসুলী' অদূরে দাঁড়াইয়া তাহার ভ্রাতাদ্বয়ের অকাল মৃত্যু দর্শন করতঃ নীরব অশ্রু বিসর্জন করিতেছিল । সে দৃশ্য আমার স্পষ্ট চক্ষে ভাসে ।

সংঘর্ষটি হইয়াছিল সাধারণত্ব আর দেবত্ব লইয়া । তৎকালে একশ্রেণির মনুষ্য আপনাকে দেবতা বলিয়া দাবি করিত । তাহাদের কিঞ্চিত দেবতুল্য যোগ্যতাও ছিল । তাহারা ধ্যান করিত সেই সমূদ্র জলে বসিয়া । বোধকরি কোন দৈবশক্তিবলে তাহারা জলে ভাসমান হইয়া ধ্যানাবিষ্ট বসিয়া থাকিতে পারিত । ডুবিত না । সেই ধ্যানের জায়গাটি এবং তাহার জল গুল্ম লইয়া মাধায়ের সঙ্গে উহাদের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় ।

সেইসব দেবত্ব দাবিকারী ব্যক্তিবর্গের ছিল অত্যধিক ছ্যুত । অত্যধিক অহংকার । যাহার দোষে তাহাদের পতন হইয়াছিল আমাদিগের হস্তে । বধ করিবার দৃশ্যও আমার স্মরণ হয় । আমি উহাদিগের একেকটিকে যুদ্ধপূর্বক মাটিতে শায়িত করিয়া স্বীয় পদপ্রস্থ দিয়া কণ্ঠনালী চাপিয়া ধরিতাম । এতই চাপ দিতাম যে মস্তক ধর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যাইত । আমার দুই ভ্রাতঃ চানু এবং মাধায়ও একই উপায়ে বধ করিয়াছে এবং নিজেরাও শেষে বধ হইয়াছে । শুধু টিকিয়া রইয়াছিলাম আমি আর ভগিনি বাসুলী । বাসুলী নারী ছিল বলিয়া তাহার ওপর কোন আক্রমণ হয় নাই ।

যুদ্ধ জয় শেষে নিয়ম অনুযায়ী আমাকে গৃহত্যাগ করিতে হইবে, কেননা আমি ও আমার ভাইয়েরা দেবতা বধ করিয়াছি । সন্ন্যাস গ্রহণবশতঃ গৃহত্যাগী হইয়া উহার প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে- এমনই বিধান । বাসুলী নারী বিধায় সে সমাজে থাকিতে পারিবে । আহঃ । সেকালে নারীর বড় সম্মান ছিল ।

আমার সন্ন্যাসগ্রহণের বিধানটি পাইয়া আমি বড় উৎফুল্ল হইলাম । এখন আর আমার বাঁধা নাই । কোন পিছুটান নাই । প্রাণের মায়া নাই । এইবার আমি জীবন বাজি ধরিতে পারি নিঃসঙ্কোচে ।

দৌড়াইয়া গিয়া আমি আমার সেই লুক্কায়িত মানচিত্রটি বাহির করিলাম । এই সেই মানচিত্র ! রত্নদ্বীপে যাইবার মানচিত্র !

রত্নদীপ ! হীরে আর জহরতে ঠাসা, দুর্গম আর নিষ্ঠুর একটি দ্বীপ । যোজন দ্বীপের পরে । সুদূর কোন এক ভিন্ন মহাদেশে । তথায় যে যায়, সে আর ফিরিয়া আসে না । যাইতে যাইতে পথিমধ্যেই অনেকে মরিয়াছে । বাকিরা মৃত সহযাত্রীর মাংস আহার করিয়া জীবন ধারণ করিয়াছে । এমনই নৃশংস তাহার ইতিহাস !

বহুকাল আগে 'নিবাগী মাক্ক' মহারাজ সেখান হইতে ফিরিয়া আসিতে পারিয়াছিলেন। তিনি ফিরিয়াছিলেন বিপুল ধনরত্ন লইয়া । যাহার দৌরাত্মে তিনি অত্র অঞ্চলের রাজা হইতে পারিয়াছিলেন ।

রত্নদ্বীপে যে যাইবে তাহার ধর্ম এবং সমাজ উভয় হইতেই বিচ্যুতি ঘটিবে । এই ভয়ে আমি সেইবার বিরত হইয়াছিলাম । এবার আর চিন্তা কী ।

পিছন হইতে বাসুলীর আহাজারি শুনিতে পাইলাম । তাহার ক্রন্দনের সারার্থ এই যে, সে আমাকে কিছুতেই রত্নদীপে যাইয়া আত্মঘাতী হইতে দিবে না । আমি যাহাতে রত্নদীপে যাইতে অভিসন্ধি না করিতে পারি, তাই সে আমার সন্ন্যাস সঙ্গী হইবে ।

আহা ! এত মায়া এই সংসারে ! আমি অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া পড়িলাম । সম্মুখে ভগিনী বাসুলীর অশ্রুসিক্ত আঁখি ।


ණ পুনশ্চঃ →
¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯
আমরা এই জন্মেও তিন ভাই বোন । মেজ ভাইটি ইহলোক ত্যাগ করিয়াছে ।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:২১
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মুহাম্মদ আলি জিন্না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৫



১৮৭৬ সালে করাচিতে এক দুষ্ট বালকের জন্ম হয়।
এবং ৭৬ বছর বয়সে দীর্ঘদিন যক্ষা রোগে ভূগে- দেশ ভাগের পরের বছর মারা যান। এই দুষ্ট বালক'ই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। নাম তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতামত পোস্ট: ২২ সালে লিখেছিলাম: যে শঙ্কা ছিলো তা আজকের বাস্তবতা

লিখেছেন অর্ক, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৩১



আমাদের কওমি জননী সত্যি কি অসাম্প্রদায়িক? হলে কতোটা? প্রশ্ন থাকলো সবার কাছে। তেতুল হুজুর মাওলানা শফি খুব ভক্তিভরে তাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছিলেন। এমনি এমনি তো আর নয়। অত্যন্ত মহব্বত... ...বাকিটুকু পড়ুন

"রিকন্সিলিয়েশান"....ইহা কি খায় নাকি মাথায় দেয়?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:০০



সত্যি সত্যিই তাদের সুযোগ ছিলো ২৫ শে মার্চ এর পর যাবতীয় অপকর্ম জনগণের কাছে স্বীকার পূর্বক,
/মুক্তিযুদ্ধে তাদের দ্বারা নৃশংসতার শিকার জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা,
/তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এবং,
/সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেরা লেখক

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৭



বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো লেখক এক কথায় - হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস মধ্যাহ্ন বা দেয়াল - এর পাশাপাশি রাখার মতো বাংলাদেশে আর কোনো উপন্যাস আছে কিনা আমার জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

=ডায়াটে একদিনের খাবার=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫১

ডায়াটের প্রথম দিকে-একদিনের খাবার। বর্তমানে আমাদের দেহে রোগসুগের অভাব নাই। ডায়াবেটিস, প্রেসার, ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগ বলা নাই কওয়া নাই শরীরে এসে বাসা বাঁধে।

আর এসব রোগের একমাত্র কারণ আনহেলদি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×