somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল: আমার বৈষয়িক ভাবনা

১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৩০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এবার এসএসসিতে ৬ লাখ ৯০ হাজার পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। ২২৬ মাদ্রাসায় একজনও পাশ করতে পারেনি। স্কুল মাদ্রাসা মিলিয়ে মোট সাড়ে তিনশোর কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজনও পাশ করেনি, শতভাগ ফেল!

এ নিয়ে শিক্ষা অধিদপ্তর কী ভাবছেন আমরা জানি না। তবে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজনও পাশ না করতে পারার মানেটা সুস্পষ্ট। এখন সুস্পষ্ট বলতে যা বোঝায় তা আপনারাই বুঝে নেবেন, এ নিয়ে কথা বলতে গেলেই শিক্ষকের অবমাননা হয়ে যায়, বাসায় না পড়লে শিক্ষক কী করবে, বাবা মা সচেতন না হলে স্কুল কোনভাবেই কিছু করতে পারবে না— এমন বিবিধ যুক্তি এসে ভর করে!

আমি প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করেছি, যে কারণে আমি অভিযোগটা প্রায়ই করি যে, আমি শেখাতে আগ্রহী শিক্ষক খুব কমই দেখেছি। আমি বলছি না যে শিক্ষকেরা জানেন না বা পারেন না, আমি বলছি শেখাতে আগ্রহী শিক্ষক দেখেছি কম।

সম্প্রতি ববি হাজ্জাজ এক বক্তব্যে বলেছেন, প্রাইমারি স্কুলের চাইতে কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চাদের লেখাপড়া বেটার এবং পাঠ্যবিষয় জানার হার বেশি। হাজ্জাজ আক্ষেপ করে বলেছেন, কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা নামমাত্র বেতন পান, অথচ তারপরও তাদের শিক্ষার মান বেটার! এর পেছনে কারণ কী? কারণ বোধকরি জবাবদিহিতা, ম্যানেজমেন্টের স্ট্রিক্টনেস! ঘটনা সত্য।

আপনারা জেনে অবাক হবেন, এখনও এমন সব কিন্ডারগার্টেন আছে যারা শিক্ষককে বারোশো থেকে দেড় হাজার টাকা বেতন দেয়! এত কম বেতন দিয়েও খাটায় কিন্তু একশো একশো। এখন হাজার দেড় হাজার টাকায় শিক্ষক নিয়ে আপনি কতটা ভালো বা ডেডিকেটেড শিক্ষক পাবেন? আমি একবার একটা মাদ্রাসায় কয়েকদিন ক্লাস নিয়েছিলাম, শুনতে পেলাম, পাশের ক্লাসে শিক্ষক পড়াচ্ছেন ❝কখনও মিথ্যা বলো না! ডোন্ট টেল এ লি (Lie এর উচ্চারণ লি!!)❞
আমি ডাক দিয়ে বলেছিলাম, ওটা লি নয়, লাই!

এ নিয়ে টিচার্স রুম পর্যন্ত অভিযোগ গিয়েছিল যে আমি অন্যের ক্লাসে গিয়ে নাক গলাচ্ছি!

ছাত্রাবস্থায় যখন একটি প্রাইভেট উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়েছিলাম, তখন আমি দেখেছি, এসএসসির পরীক্ষার্থীরা সাধারণ ইংরেজি বাক্য গঠনই বোঝে না। এমন দুর্ভাগ্যের সঙ্গে সাক্ষাৎও আমার হয়েছে। দেখি, তারা হিসাববিজ্ঞানও বোঝে না,গণিতও না। এমন নাজেহাল দশা দেখে আমি তিন সাবজেক্টরই বাড়তি ক্লাস নিতে শুরু করলাম, বিষয়ভিত্তিক এ্যাসাইনড টিচারের বাইরে! ফলাফল দাঁড়াল, প্রিন্সিপাল বুঝে ফেলেছিলেন যে আমি স্টুডেন্ট বাগিয়ে নিয়ে টিউশন করে ইনকাম করার এক বিশাল ফাঁদ পেতে ফেলেছি! অতঃপর, আমি বাদ পড়ে গেলাম। আমি কখনই শিক্ষাকে ব্যবসায় হিসেবে নিতে পারিনি। যখন স্কুলে পড়াচ্ছিলাম, তখন টিউশন পড়িয়েছি ইন্টামিডিয়েট ও ডিগ্রির বুড়োদের, স্কুলের বাচ্চাদের না।

ধুত্তোরি, আমি চলে গেছি পারসোনাল আলাপে। তবে যা বললাম, তার গুরুত্বও আছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা দিতে গিয়ে কেউই পাশ না করার মানে এটুকু নিঃসন্দেহ যে, ওখানে বাচ্চাদের বড়জোর মুখস্থ করানো হয়েছে, কোনটা কেন হয় কীভাবে হয় এই জিনিসটাই শেখানো হয়নি!

একটা প্রতিষ্ঠানে কেউই পাশ না করলে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর তো তদন্ত কমিটি বসানো দরকার, শিক্ষকরা আসলে কী পড়িয়েছেন, কিংবা তাঁরা আদৌ পড়াতে জানেন কি না (নিজে জানা আর পড়াতে জানা ভিন্ন জিনিস; পড়াতে জানা আর বাচ্চারা একটা জিনিসকে সবচেয়ে বেটার কীভাবে বুঝবে তা আবিষ্কার করে সেইমতো পাঠদানের প্রক্রিয়া সাজানো আরো ভিন্ন জিনিস)— এ নিয়ে আবার পরীক্ষা নেওয়া উচিত। টিচার্স ট্রেইনিং নিয়ে আরো সোচ্চার হয়ে পাঠপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন থাকা উচিত। নুতবা সত্যিই বাচ্চাদের ফিউচার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে!

শিক্ষকদের আরো ডেডিকেশন বাড়াতে হবে, সেজন্য শিক্ষকদের সচ্ছলভাবে চলার মত বেতন নিশ্চিত করা উচিত। তাতে যদি একজন শিক্ষকের বেতন অষ্টম গ্রেডের সমানও করা দরকার পড়ে, আমি বলব করা হোক। এবং বেতন যখন দেবই, ভাই, পূর্ণ ডেডিকেশনও তো আদায় করে নেব! যেখানে একটা কিন্ডারগার্টেনে দেড় হাজার টাকা বেতনের শিক্ষকের কাছ থেকেও দিনরাতের কাজের বোঝা চাপিয়ে নিয়ে ঠিকই কাজ আদায় করে নেওয়া হয়, সেখানে একজন সরকারি স্কুলের বেলায় সম্ভব হবে না কেন? পাশাপাশি এটাও বলি, কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের বেতনের ক্ষেত্রেও একটা ন্যুনতম মানদণ্ড করে দেওয়া উচিত সরকার থেকে। নাহলে ডেডিকেটেড শিক্ষক তো দূর, অনেক জায়গায়ই এখনও ডোন্ট টেলেলি শেখানো হতে থাকবে।

অনেকে বেতন আরো বাড়ানোর কথায় নেচে উঠতে পারেন, আমি মনে করি, প্রতিটা শিশুর মধ্যেই যে সম্ভাবনা আছে তা বিকশিত করতে ডেডিকেটেড শিক্ষকের বিকল্প নেই। বাচ্চারা বড় হয়ে গেলে শেখার তাগিদ, পড়ার তাগিদ নিজেরাই বুঝতে পারে, কিন্তু প্রাইমারি লেভেলে একটি বাচ্চাকে সঠিক ফাউন্ডেশন দিয়ে গড়ে তোলাটাই সবচেয়ে আগে জরুরি। বেসিক স্ট্রং হয়ে গেলে ওই বাচ্চা হাইস্কুলে উঠে এমনিতেই শাইন করবে, আই এম জিপিএ ফাইভ বলবে না! এই ডেডিকেটেড শিক্ষক পাওয়া যেতে পারে উচ্চ বেতনের নিশ্চয়তা থেকেই। নাহলে আমরা যাদের শিক্ষক হিসেবে পাচ্ছি তাদের একটা বিরাট অংশই জাস্ট জয়েন করে জব বাগিয়ে রেখে এরপর আরো বেটার চাকরির প্রস্তুতি নিতে থাকে। এমন টিচারও পাওয়া গিয়েছিল (২০২২ সালের একটি নিউজ) যিনি কি না ক্লাসে বসে চাকরির গাইড পড়ছিলেন! যে এই পেশাতে আগ্রহই করে নাই সে চাকরি পেয়ে বসে জাস্ট টাইম পাস করবে না তো কী করবে? তার মন তো এখানে থাকবে না, পরবর্তী চাকরির পরীক্ষাতে থাকবে।

আরো একটি ব্যাপার আছে, ওই বড় চাকরির যুদ্ধে লড়াই করতে থাকাদের মধ্য হতে শেষমেশ যাদের আর কোথাও কোন চাকরি হয় না, তারা হতাশা নিয়ে এই চাকরিতে থেকে যায়! এই হতাশ মানুষটা তো তার এই কাজকে ভালোই বাসেনি কখনও, তার স্বপ্ন ছিল অন্য কোথাও, অন্য কিছু! তার কাছ থেকে কী ডেডিকেশন আশা করব আমরা? সবাই তো আর বিউটি রানী পাল হয় না।

অতএব, উচ্চমানের বেতন নিশ্চিত হলে শিক্ষকতায় যাঁরা আছেন, তাঁরা অসচ্ছলতার যন্ত্রণায় বা অজুহাতে কোচিং ব্যবসায়েও নামবেন না। পর্যাপ্ত বেতন, ঘরে শান্তি, ব্যস, পূর্ণ ডেডিকেশন বাচ্চাদের পড়ানোর মধ্যেই থাকবে।

অনেক লম্বা ভ্যাজর ভ্যাজর করে ফেলেছি, আরেকটা লাইন না বলে পারছি না, শিক্ষকদের সত্যিই মানসিক অবস্থার পরীক্ষা নেওয়া উচিত প্রতি তিন মাসে একবার। এবং স্কুল ম্যানেজমেন্ট, ভাই রে ভাই, এদেরকে কিন্ডারগার্টেনের প্রিন্সিপাল দিয়ে ট্রেনিং দেওয়ানো উচিত, সত্যিই উচিত। কাজ করলে করার মত কর, না হলে জব ছেড়ে দাও।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৩১
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে “উপজাতি” নাকি “আদিবাসী”? আন্তর্জাতিক আইন ও ইতিহাসের নির্ভেজাল সত্য!​

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭


সূচনা ও প্রেক্ষাপট:
লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০০১ সালে তিনি যখন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন, তখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে 'উপজাতীয়' (Tribal) হিসেবে ডাকা হতো। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালের দিকে সেখানে পুনরায় পোস্টিং পাওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হঠাৎ কেন ঢাকায় র প্রধান?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:২২


দিল্লী দখল ঠেকাতে ঢাকায় চলে এলেন র প্রধান!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনলেন। ক'দিন ঐ র‍্যাডিসন ব্লুতে বসে অনেকের হাতে-পায়ে ধরলেন; বললেন, "তোমরা প্লিজ দিল্লী আক্রমণ করো না। আমাদের মিসাইল, অস্ত্র সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী কারা

লিখেছেন কিরকুট, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬


বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের সামনে সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কথা আসে। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশের আদি জনগোষ্ঠী... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবী!

লিখেছেন করুণাধারা, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৩



১)
দেবী খুবই বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী। এক উচ্চাভিলাষী পরিবারে দেবীর জন্ম, এমনই উচ্চাভিলাষী যে তাদের একমাত্র ভাবনা কীভাবে সবাইকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠা যায়! দেবীর যখন জন্ম হলো তখন তার ভাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

র-প্রধানের ঢাকা সফর: খবর শুনেই হাসপাতালে ভর্তি পাকিস্তানের হাইকমিশনার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৭


রসিকতা বাদ দিয়ে বলি, দুটি ঘটনাই সত্যি। বাংলাদেশে RAW এর প্রধান পরাগ জৈন এসেছেন এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার এখন হাসপাতালে আছেন। দুটি ঘটনা আসলে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×