somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তপু এবং কিছু স্মৃতি

২৮ শে জুন, ২০১৩ সন্ধ্যা ৬:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ তপুদের বাড়িতে যাচ্ছি। আমরা চার বন্ধু। আমি, রায়্হান, শৈল্পিক, আর তপু। ট্রাকে করে যাচ্ছি। গতবার যখন গিয়েছিলাম, যাওয়ার সময়ও ট্রাকে করেই গিয়েছিলাম। অনেক মজা হয়েছিল। ওদের গ্রামটা সত্যিই অনেক সুন্দর। সেবার অনেক মজা করেছিলাম। তপু পুরা গ্রাম ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল। এমন কিছু বাদ ছিল না যা ও গাছ থেকে পেড়ে খাওয়ায়্নি। ট্রাকে করে ওদের বাড়ি যাওয়ার মজাই আলাদা।

আমরা চারজন একই ভার্সিটিতে পড়ি। আলাদা আলাদা বিভাগে। আবার আমরা একই সাথে থাকি। তপুর সাথে পরিচয় ওখানেই। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সে। খুব সহজ, সরল, ভদ্র একটা ছেলে। কিন্তু আবার দুষ্টামিতেও কম নয়। ওর জন্য কোনদিন রুমে এসে কেউ মন খারাপ করে থাকতে পারতো না। ও ঠিক হাসিয়েই ফেলতো। মন ভালো করার ম্যাজিকটা মনে হয় শুধু ও জানতো। পড়ালেখায় ছিল দুর্দান্ত। দুর্দান্ত ছাড়া আর কোন কথা হবে না।

তার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে খুব অল্পদিনেই মানুষের মন জয় করে নিয়েছিল। ছাত্র রাজনীতির সাথে জরিয়ে পড়েছিল। তবে তেমন ঘোরতর না। ভালো হিসেবেই সে সবার কাছে পরিচিত।

শুনেছিলাম একটা মেয়েকে নাকি পছন্দ করতো। নামটা সম্ভবত রিয়া। ওদের ডিপার্টমেন্টে পড়তো। বলতে গেলে খুব সুন্দর ছিল। প্রতিদিন এই মেয়েটার গুণগান তপুর মুখে শুনতে শুনতে কান পুরা ঝালাপালা হয়ে যেত। একদিন শুনলাম, তপু নাকি মেয়েটাকে প্রপোজ করে বসেছে। মেয়েটাও নাকি এক্সেপ্ট করেছে। সেদিন খুশিতে তপু আমাদের সবাইকে রেষ্টুরেন্টে খাইয়েছিল। এভাবেই চলছিল। বছরখানেক পর শুনলাম মেয়েটার নাকি কোথায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সে নাকি তপুর সাথে ব্রেক আপ করে ফেলেছে আর বলেছে তপু যেন আর কোনদিন তার সাথে যোগাযোগ না করে। বেচারা তপু। তাকে সেদিন প্রথম কাঁদতে দেখেছিলাম। লুকিয়ে কাঁদছিল। হঠাৎ আমি দেখে ফেললাম। কিছু বলিনি। কারণ কেঁদেই সে বুকের কষ্টগুলা কমাতে পারবে। এরপর মাঝখানে কয়েকদিন কারো সাথে কোন কথাই বলেনি। আমরা ওকে হাসানোর জন্য দুষ্টুমি করতাম। কিন্তু নাহ! কিছুই হতো না। আবার কয়েকদিন পর থেকে নিজেকে গুছিয়ে নিতে লাগলো।

আজ তপুটা কোন কথা বলছেনা। একদম চুপচাপ। সেদিন তো আসার সময় খুব দুষ্টামি করেছিল। গান ধরেছিল। ও যখন গীটার বাজিয়ে গান করে তখন আমরা সব কিছু ফেলে ওর গান শুনি।

ওই তপু, কিরে বেটা উঠনা! আর কতক্ষণ এভাবে শুয়ে থাকবি?? চুপচাপ বসে থাকতে ভালো লাগছেনা তো। উঠ। ওই রায়্হান, ওকে উঠতে বল তো! রায়্হানটাও চুপ করে আছে। আর শৈল্পিকটা তো দূরে গিয়ে বসে আছে। ওই তপু, ওঠ না। এই কফিনের ভেতর সাদা কাফন পড়ে আর কতক্ষন শুয়ে থাকবি?? ওই তো তোদের বাড়ি এসে গিয়েছি। ওই দেখ, তোর বাবা তোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ছেলে ঘরে ফিরবে। এই বুড়ো মানুষটাকেও কষ্ট দিবি তুই? ওঠ।

তপু উঠছেনা। আর কোনদিন উঠবেনা। তপু মারা গেছে। ওর লাশটা ওদের বাড়িতে পৌছে দিতে আসলাম।

মেয়েটার সাথে সম্পর্ক থাকা অবস্থায় একটা ছেলের সাথে তপুর সমস্যা হয়। ছেলেটা নাকি মেয়েটাকে খুব বিরক্ত করতো। ছেলেটা ঘোরতর ছাত্র রাজনীতি করতো। একদিন ছেলেটা মেয়েটাকে সবার সামনে অপমান করেছিল। তাই তপু কয়েকটা ছেলে নিয়ে ওকে বেধরক পিটিয়েছিল। ছেলেটাকে পুরো তিন মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। ঘটনা শুরু ওখান থেকেই।

সেদিন তপু টিউশনি করে ফিরছিল। হঠাৎ গলির মুখে কিছু ছেলে তাকে ধরে খুব পেটায়। ছুরি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। তারপর ওখানের কিছু লোক ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে তপু সেখানে মারা যায়। আমরা পরে খবর পেয়ে হাসপাতাল থেকে তার লাশ আনতে গিয়েছিলাম।

ওদের বাড়িতে পৌছে গেলাম। তপুর বুড়ো বাপটা উঠোনের মাঝখানে দাড়িয়ে আছে। তপুর মাকে কোথাও দেখলাম না। হয়্তো আহাজারি করতে করতে অচেতন হয়ে গেছেন। একমাত্র ছেলে তপু। কিছু আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী বাড়ির উঠোনটায় ভীর জমিয়েছে। আমরা কয়েকজনের সাহায্যে ট্রাক থেকে তপুর লাশ নামিয়ে উঠোনে রাখলাম।

এবার আমাদের ফেরার পালা। ওখানে থেকে কি হবে আর? তপু নেই। আমাদের সারাগ্রাম ঘুরে দেখাবে কে? গাছ থেকে পেড়ে ফল খাওয়াবে কে? তপু তো নেই। যে মেয়েটার জন্য আজ তপুর এই অবস্থা, সে হয়্তো আজ কারো ঘরের ঘরণী। হয়্তো এই মুহুর্তে সে খুব সুখে আছে। হয়্তো তপুর মৃত্যুর খবর তার কানে আর কোনদিন পৌছবেনা।

সূর্যটা অস্ত যেতে বসেছে। কিছুক্ষণ পরেই রাতের কালো আঁধার নামবে। তপুর বাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। আর হয়্তো কোনদিন এই বাড়িতে আসা হবে না। কাউকে আর তপু বলে ডাকা হবে না। কেউ আর মন খারাপ থাকলে হাসাবেনা। তপু আজ হারিয়ে গেছে। বিদায় তপু। ভালো থাকিস বন্ধু। খুব ভালো থাকিস।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধার-দেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেল কেন গুরুত্বপূর্ণ

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৯ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৭



ব্যক্তিগতভাবে আমি কাউকে টাকা ধার দেওয়ার পক্ষপাতী নই। কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ধার দেওয়া টাকা সময়মতো বা সম্পূর্ণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই কম থাকে। বর্তমানে প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনশন আপডেট

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০৭

আগামী শুক্রবার জাতীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ব্যারিস্টার সুমন ভাইয়ের মুক্তির দাবীতে ১ ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি করার লক্ষ্য স্থাপন করেছি। এই ১ ঘণ্টা আমি কোন খাবার বা পানীয় গ্রহণ করবো না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:২২



আজ শুক্রবার। শুক্রবার মুসলমানদের জন্য বিশেষ একটি দিন।
আজ বাংলা আষাঢ় মাসের ৫ তারিখ। যদিও বর্ষাকাল। আজ আকাশে মেঘ নেই। বরং রোদ উঠেছে। রোদের তাপ ভালোই। শাহেদ পথে বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফিনটেঁক কোম্পানী রিপাবলিক ইউরোপকে ছেড়ে দেওয়ার সত্য ঘটনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৩

বাংলাদেশের আইটি ফার্মগুলোর মাঝে আমার ফার্মই তাঁর ইঞ্জিনিয়রাদের সবচেয়ে বেশি বেতন দিতো। আমার সিনিয়র রুবি অন রেইলস ব্যাকএন্ড ডেভেলপার ছিলো রিফাত। বয়স ৩০, সেই বয়সেই সে মাসে পেতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে এসো পূর্ণিমায়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



তুমি ছাড়া ভালো লাগে না পূর্ণিমা চাঁদ, তুমি লুকিয়ে চন্দ্রিমার হলুদ বর্ণে। মায়াবী জোছনা মাখা রাত সবই যেন নিস্ফল, মন যেন হারিয়েছে আঁধারে সব সময় কাঁদে। চারিদিকে যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×