somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একজন আমি

০৩ রা নভেম্বর, ২০১৩ রাত ৮:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
আমি একজন। বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। সবার খুব আদরের। একমাত্র ছেলে হওয়ায় অনেকটা স্বাধীন। আমার বাবাটা খুব ভালো। মা একটু গরম, কিন্তু ম্যানেজ করে নিই। মোটামুটি ভালো ছাত্র হওয়ায় ভালো স্কুল থেকে ভালো রেজাল্ট করে বের হয়ে ভালো একটা কলেজে ভর্তি। সেখানেও ভালো রেজাল্ট করে ভর্তি হলাম একটা নামকরা ভার্সিটিতে। এখন সেই ভার্সিটির শেষ বর্ষের ছাত্র আমি।

বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে হওয়ায় কোনদিন কোনকিছুর অভাব বোধ করিনি। যখনই যা চেয়েছি সব পেয়েছি। এত কিছুর মধ্যে থেকেও নিজেকে কোনদিন নষ্ট হতে দিইনি। কারণ বাবা সবসময় বলতো "ভালো থাকাটা খুব কষ্টের। কিন্তু নষ্ট হয়ে যাওয়াটা খুব সোজা। নিজেকে যেন কোনদিন নষ্ট হতে না দেই।" দিইনি কোনদিন।

আমার অনেক বন্ধু আছে। ছোটবেলা থেকে যাদের সাথে বড় হয়ে ওঠা। যাদের সাথে জীবনের অর্ধেকটা সময় কাটানো। যারা আমার খেলার সাথী, আমার দুষ্টামির সহযোগী। বন্ধুদের সাথে থাকলে দুষ্টামিটা যেন বেড়ে যেত। আমার বন্ধুদের নিয়ে খুশি আমি।

আমার প্রিয় হচ্ছে গীটার। গীটার বাজাই, ভালো লাগে তাই। আমার শখ এটাই। সবার মতো ড্রইং করা বা বাগান করার মত শখ আমারও ছিল। কিন্তু মনের শান্তি খুঁজে পাই গীটার বাজিয়েই। একটা অদ্ভুত ফিলিংস। গোধুলীর সময় বন্ধুদের সাথে নদীর পাড়ে বসে গীটার বাজিয়ে গান করার মজাই আলাদা। গান করতে ভালবাসি। এটাও আমার শখ।

মাঝখানে আমার জীবনে এসেছিল আরেকজন। নাম অধরা। কলেজে পড়া অবস্থায় তার সাথে পরিচয়, কথা বলা, বন্ধুত্ব, ভালবাসা তারপরে প্রেম। অধরা খুব ভালো একটা মেয়ে ছিল। খুব সুন্দর, শান্ত শিষ্ট একটা মেয়ে। ওর শান্ত শিষ্টতা আর তার সেই মন ভোলানো হাসিটার প্রেমে পরেছিলাম আমি। পৃথিবীর প্রথম আশ্চর্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে সেই হাসিটা। তাকে ভালবাসার পর বুঝতে পারি তার শান্ত থাকার মধ্যে কতগুলো দুষ্টুমি লুকিয়ে থাকতো। ভালো লাগতো খুব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হৈমন্তী গল্পের সেই লাইনটাই খালি মনে হতো, "পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম।" আমি সত্যি তাকে পেয়েছিলাম। একদম আমার মনের গভীরে পেয়েছিলাম তাকে।

২.
কাল বিয়ে। অধরা আর জয়ের বিয়ে। আমি জয় নই। জয় আরেকজন, অধরা কাল চিরতরে যার হয়ে যাবে। তিন বছরের সম্পর্ক ছিল আমার আর অধরার। হঠাৎ একদিন এসে বলে সে আমাকে না, জয়্কে ভালবাসে। এবং তারা কয়েকদিন পরেই বিয়ে করতে যাচ্ছে। খুব কষ্ট হয়েছিল, তাকে ফেরানোর চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু লাভ হয়্নি। চলে গেছে। বাধা দিতে পারলাম না আর।

কাল অধরার বিয়ে। আর আজ আমি নির্বাকের মত ঘরের কোণে বসে আছি। হয়্তো অধরা আজ খুব খুশিতে আছে, আনন্দ করছে। কাল বিয়ে, তাই একটু লজ্জার মধ্যে আছে হয়্তো। নাহয় কাল কোন পার্লারে সাজবে, কি পড়বে, তার লিষ্ট করাতে ব্যস্ত। পৃথিবীটা আসলেই অনেক অদ্ভুত। যার সাথে জীবনে সুখী হওয়ার কথা ছিল, আজ সে আনন্দ করছে, আর আমি অন্ধকার ঘরে একা বসে আছি। আমার ভাগ্যে হয়্তো এটাই ছিল।

৩.
অধরার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর কেমন যেন হয়ে গেলাম আমি। এক অদ্ভুত আমাকে আবিষ্কার করলাম আমি। সারাক্ষণ একা একা থাকা, জীবনের সমস্ত কিছু ছেড়ে দেয়া। হাসি- আনন্দ, বন্ধু, পরিবার, লেখাপড়া, গান, গীটার, সব কিছুর বাইরে চলে গেলাম আমি। সম্পুর্ণ আলাদা।

ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারলো না। এদিকে আমার অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হতে লাগলো। অবশেষে এক বড় ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করতে দিল। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বাবা মাকে বললো আমার নাকি ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে। বড়জোর আর ৫ মাস। আমাকে কেউ কিছু বলেনি। কিন্তু মা বাবার অবস্থা দেখে বুঝতে পারলাম আমার বড় কিছু একটা হয়েছে। আস্তে আস্তে ব্যাপারটা জানতে পারলাম। অনেক চিকিৎসা করানো হলো। কিন্তু কিছুই হলো না।

এই কটা দিন হাসি খুশিতে কাটাতে চেয়েছি। কিন্তু পারিনি। জানিনা কেন। প্রতিমুহুর্তে আমার পাশে কেউ না কেউ থেকেছে আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য। মা, বাবা, নাহয় বন্ধুরা পাশে থেকেছে আমার। অবস্থা খারাপ হতে লাগলে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় আমাকে।

৪.
হঠাৎ এক সকালে চোখ খুলে দেখি আমি ঘুমিয়ে আছি। আমার আত্মীয় স্বজনেরা আমার চারপাশে বসে কাঁদছে। আমার মায়ের বিলাপ দেখছি। মায়ের কাছে গিয়ে তাকে থামাতে চাইলাম। কিন্তু আমার অস্তিত্বকে কেউ বুঝতেই পারছেনা, আমার কথা কেউ শুনতে পারছেনা। সবাইকে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে, আমি এখানে আছি। সবার চোখে পানি, সবাই কাঁদছে। বাবাকে কোথাও দেখলাম না। কোথাও গিয়ে লুকিয়ে কাঁদছে। হঠাৎ দরজায় চোখ আটকে গেল। অধরা। ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কাঁদছে। খুব কাঁদছে। আজ তার ভিতরের কষ্টটা, আমার প্রতি তার ভালবাসাটা আমি দেখতে পাচ্ছি। আজ যদি সে এসে আমার ঘুমন্ত শরীরের হাতটা ধরে বলে, "উঠো! আমি তোমার কাছে ফিরে এসেছি।" আমি উঠে যেতাম। কিন্তু সে বলবেনা। তাহলে কেন উঠবো আমি?

এই আমি... ঐ আমার মা, যিনি সারাজীবন আমাকে আগলে রাখতে চেয়েছেন। এই পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অধরা, যাকে আমি ভালবাসি, যার সাথে সারাজীবন সুখি থাকতে চেয়েছিলাম আমি। আর এই যে আমার নিথর দেহ।

হ্যাঁ, আবার উঠবো আমি। নদীর পাড়ে বসে বন্ধুদের সাথে গীটার বাজিয়ে গান করতে। আবার উঠবো আমি, কোন অধরার প্রেমে পড়তে।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধার-দেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং চ্যানেল কেন গুরুত্বপূর্ণ

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৯ শে জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৭



ব্যক্তিগতভাবে আমি কাউকে টাকা ধার দেওয়ার পক্ষপাতী নই। কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ধার দেওয়া টাকা সময়মতো বা সম্পূর্ণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই কম থাকে। বর্তমানে প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনশন আপডেট

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০৭

আগামী শুক্রবার জাতীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ব্যারিস্টার সুমন ভাইয়ের মুক্তির দাবীতে ১ ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচি করার লক্ষ্য স্থাপন করেছি। এই ১ ঘণ্টা আমি কোন খাবার বা পানীয় গ্রহণ করবো না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:২২



আজ শুক্রবার। শুক্রবার মুসলমানদের জন্য বিশেষ একটি দিন।
আজ বাংলা আষাঢ় মাসের ৫ তারিখ। যদিও বর্ষাকাল। আজ আকাশে মেঘ নেই। বরং রোদ উঠেছে। রোদের তাপ ভালোই। শাহেদ পথে বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইউরোপের সবচেয়ে বড় ফিনটেঁক কোম্পানী রিপাবলিক ইউরোপকে ছেড়ে দেওয়ার সত্য ঘটনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৩

বাংলাদেশের আইটি ফার্মগুলোর মাঝে আমার ফার্মই তাঁর ইঞ্জিনিয়রাদের সবচেয়ে বেশি বেতন দিতো। আমার সিনিয়র রুবি অন রেইলস ব্যাকএন্ড ডেভেলপার ছিলো রিফাত। বয়স ৩০, সেই বয়সেই সে মাসে পেতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে এসো পূর্ণিমায়

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৫৫



তুমি ছাড়া ভালো লাগে না পূর্ণিমা চাঁদ, তুমি লুকিয়ে চন্দ্রিমার হলুদ বর্ণে। মায়াবী জোছনা মাখা রাত সবই যেন নিস্ফল, মন যেন হারিয়েছে আঁধারে সব সময় কাঁদে। চারিদিকে যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×