এই দার্শনিক মতের ইতিহাস সম্পর্কে বিতর্ক আছে । রাষ্ট্রের জিঘাংসার মুখে পুঁথি ধ্বংস ভারতীয় দর্শনের খুব বেশী প্রামাণ্যকে টিকে থাকতে দেয়নি । চার্বাকমত বলে যা পরিচিত, তার উল্লেখ পাওয়া যায় চার্বাক বিরোধীদের পূর্বপক্ষ বর্ণনায়, যার অর্থ হচ্ছে ঐ মতের উৎপত্তি আধ্যাত্মবাদের উৎপত্তির পূর্বে । চার্বাক শব্দের অর্থ চারুবাক বা বাকপটু বা সাধারণ অর্থে চাপাবাজ । নামটি দেখে বোঝা যায় যে এটি মন্তব্য অর্থে দেয়া এবং মন্তব্যটি নেতিবাচক । ইতিহাসবীদ ও নৃবিজ্ঞানীদের মতে এই মন্তব্যটি ''চার্বাকমত'' বিরোধীদের দেওয়া । হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রমুখ মহামহোপাধ্যায়গণ তাই এই দর্শনিক মতের অন্য নাম ''লোকায়ত'' কেই গ্রহণ করেছেন । হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে ,''লোকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে এমন মতবাদ'' বা সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের মতে জণসাধারণের মধ্যে যার পরিচয় পাওয়া যায় তাই লোকায়ত ।
বৌদ্ধ,জৈন ছাড়া ভারতীয় দর্শনের বাকি সব দার্শনিক ধারার মূল পূ ঁথিতেই এই লোকায়ত মতকে খন্ডনের প্রয়াস দেখা যায় । ভারতীয় দর্শনে অন্য দার্শনিক মত সম্পর্কে আলোচনা করতে সেই মতামতকে উপস্থাপন বা ''পূর্বপক্ষ'' বর্ণনা করা হয় । লোকায়ত মতের সেই উপস্থাপন থেকেই আসলে জানা যায় যে লোকসমাজে অতিপ্রাচীনকালে এই ধরনের কোন দার্শনিক মতের অস্তিত্ব ছিল , যে মত সমাজের উপর রাষ্ট্রের র্কতৃত্বগড়ে ওঠার মুহুর্তে রাষ্ট্রীয় কতর্ৃত্বের আক্রমণের মুখে পড়ে এবং এর মূল পূথিসমূহ বিলুপ্ত হয় ।
পূর্বপক্ষ বর্ণনা থেকে যে মতের পরিচয় পাওয়া যায়, তা আসলে প্রাচীণ বস্তুবাদ , যার বয়স কমপক্ষে পাঁচ হাজার বছর অথবা আরও বেশী । এই বস্তুবাদের মূলকথা ছিল, দেহগঠণের উপাদান ভূতপদার্থগুলিরই কোন বকেপ্রকার বিশেষ পরিণামের ফলে চৈতন্য উৎপন্ন হয় । অতএব, ভূতপদার্থই প্রধাণ ; চৈতন্য অপ্রধান । মতটি তাই ভূত-চৈতন্যবাদ বা দেহাত্মবাদ নামেও পরিচিত , যেখানে দেহাতিরিক্ত আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে । অথর্াৎ দেহ ছাড়া আত্মা নাই । বলা হয়েছে প্রত্যক্ষের প্রাধান্যের কথা, অথর্াৎ প্রমাণের মধ্যে প্রত্যক্ষই প্রধাণ, অপ্রত্যক্ষ বিষয়ের অনুমান অবান্তর । স্বভাববাদ অর্থাৎ স্বভাবই জগৎবৈচিত্য্রের কারণ, অতএব জগৎস্রষ্টা বা ঈশ্বর অবশ্যই অলীক এবং পরলোক-বিলোপবাদ অথর্াৎ পরলোকগামী আত্মার অভাবে পরলোকের পরিকল্পনাও অবান্তর । লোকায়তিক মতের দেহাত্মবাদী ধারাটির রেফারেনস বিক্ষিপ্তভাবে পাওয়া যায় আউল-বাউল-সহজিয়াদের দর্শনে । দেহাত্মবাদ বিরোধীদের আক্রমণের ধরণ থেকেও বোঝা যায় এই মতের সমর্থকেরা সংখ্যায় নগন্য ছিলেন না ।
প্রাচীন বস্তুবাদের আলোচনার মূল উদ্দেশ্য মুক্তচিন্তা এবং রাষ্ট্রের মতসংঘর্ষের ইতিহাস থেকে ''অপৌরুষেয় সত্তা'' বা ঈশ্বরের ঐতিহাসিক স্বরূপ অনুসন্ধান । পরবতর্ী কিস্তিতে এই বিষয়ে নৃবিজ্ঞানের বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো ।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ১১:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




