রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্ক্সের তত্ত্বটি সমাজবিজ্ঞানে সবচাইতে প্রভাবশালী তত্ত্ব বলে পরিচিত । হেগেল বাদে পলিটিক্স-নৃবিজ্ঞান-সমাজবিদ্যার আর সকল রাষ্ট্র তত্ত্বই কোন না কোন ভাবে সমর্থন বা বিরোধীতায় অন্তত একবার মার্ক্সকে ছুয়ে গেছে ।তবে রাষ্ট্র বিষয়ে মার্ক্স নিজে আলাদা করে খুব বেশী কিছু লেখেননি। মার্ক্সের বস্তুবাদী দ্্বান্দ্বিকতার পদ্ধতি প্রয়োগ করে এঙ্গেলস প্রথম রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি থিসিস প্রণয়ন করেন । সেই মূল তত্ত্বটি থেকে পরবতর্ী দেড়শ বছরে মাক্সর্ীয় রাষ্ট্র তত্ত্ব বিকশিত হয়েছে এবং হয়ে চলেছে লেনিন, রোজা লুক্সেমবার্গ, গ্রামসী, গর্ডন চাইলড থেকে একবোরে হালের দেরিদা-হাবারমাস পর্যন্ত । এখানে বিকাশ শব্দটি বিজ্ঞানের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেইসঙ্গে মূলনীতি শব্দটিও । অথর্াৎ যেকোন তত্ত্ব বা হাইপোথিসিস কে ক্রিটিক্যাল জেনে ।
এই পোস্টে শুধু দ্্বান্দ্বিকতার নিয়ম এবং তার ভিত্তিতে এঙ্গেলস রাষ্ট্রের উৎপত্তিকে যেভাবে দেখিয়েছেন তার উল্লেখ করবো । সমকালিন বিতর্কের প্রেক্ষিত উপস্থাপনের আগে তার ভিত্তি গুলোকে চিহ্নিত করাটা জরুরি ।আমার নিজের বক্তব্য আসবে ধীরে ধীরে ।
মার্ক্স, হেগেলের দ্্বন্দ্ববাদের নিয়মটিকে পুরো উলটে দিলেন । সেই সঙ্গে ফয়েরবাখের বস্তুবাদকেও । হেগেলীয় দ্্বন্দ্ব যেখানে পরম বিন্দুতে বিলীন হয়ে যায়, মার্কস সেই পরম বা অ্যাবসলুটকে অস্বীকার করলেন । অপর দিকে ফয়েরবাখের বস্তুবাদ থেকে যান্ত্রিকতা দুর করে তাতে দ্্বন্দ্বের নিয়ম প্রয়োগ করলেন । অথর্াৎ ইতিহাসের বৃত্ত াকার অথবা সরল রৈখিক দুটি ইন্টারপ্রিটেশনকে বাতিল করে তৈরী করলেন materialistische Geschichtsauffassung অথর্াৎ ইতিহাসের বস্তুবাদী নিয়ম । পরমাত্মাকে অস্বীকার করার ফলে যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো দ্্বন্দ্বের যদি অবসান নাই হয় তাহলে রাষ্ট্র কি? রাষ্ট্রের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছিল?
এঙ্গেলসের ''পরিবার,ব্যক্তিমালিকানা এবং রাষ্ট্রের উৎপত্তি'' গ্রন্থে বস্তুবাদী দ্্বান্দ্বিকতার দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের একটি সংজ্ঞার্থ পাওয়া যায় :
''রাষ্ট্র বলতে আমরা যা বুঝি মানব সমাজে তার চিরকাল কোন অস্তিত্ব ছিল না । সমাজের বিকাশ ও বিবর্তনের এক বিশেষ পযর্ায়ে রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে এবং তার এই উদ্ভব শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত । শ্যেণীর উদ্ভবই রাষ্ট্রের উদ্ভবকে অনিবার্য করে তোলে । শোষক ও শোষিত শ্রেণীর পারস্পরিক দ্্বন্দ্ব-সংঘর্ষকে একটা সীমার মধ্যে ধরে রাখা , তার মাধ্যমে শোষন ব্যবস্থাকে চালু রাখাই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য । সে কারণে যে কোন রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে যারা শক্তিশালী তাদের স্বার্থে এবং তাদের দ্্বারাই পরিচালিত হয়ে থাকে । সুতরাং রাষ্ট্র কোনক্রমেই এমন কোন শক্তি নয় যা সমাজের উপর জোরপূর্বক বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়; 'নৈতিক ভাবের বাস্তবতা', 'যুক্তির প্রতিবিম্ব ও বাস্তবতা' - হেগেল যেমন মনে করেন সেরকম কিছু নয় । উপরন্তু বিকাশের এক পযর্ায়ে এটা সমাজেরই সৃষ্টি । এই সমাজ নিজের সঙ্গে সমাধানের অতীত এক দ্্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে, মিটমাটের অতীত এমন এক বিরোধীতায় বিভক্ত হয়েছে যা সে দূর করতে অক্ষম- এ হলো তারই স্বীকৃতি । কিন্তু এই বিরোধীতা , পরস্পরবিরোধী অর্থনৈতিক স্বার্থ সম্বলিত এই শ্রেণী সমূহ যাতে নি:স্ফল সংগ্রামে নিজেদের ও সমাজকে শেষ করতে না পারে , সে জন্যে প্রয়োজন হয়ে পড়লো এমন একটি শক্তির যা বাহ্যত: সমাজের উপর দাড়িয়ে থাকবে, যা সংঘর্ষের উপষম ঘটাবে এবং যা তাকে শৃংখলার সীমানার মধ্যে আবদ্ধ রাখবে । এই যে শক্তি সমাজের থেকে উদ্ভুত হয়, কিন্তু নিজেকে তার উপরে স্থাপন করে এবং অধিকতর ভাবে নিজেকে তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে যায় - সেটাই হলো রাষ্ট্র ।''
সুতরাং মার্ক্সিয় দৃষ্টিতে রাষ্ট্র বলতে সাদা কথায় পুলিশ, সেনা বাহিনি আর আমলাতন্ত্রের সমন্বয়ে একটি যন্ত্রকে বোঝায় যাকে নিয়ন্ত্রণ করে উদ্্বৃত্ত শোষণকারিরা । এখন পর্যন্ত গত দেড়শ বছরের সকল রাষ্ট্র তত্ত্ব পাকে-চক্রে হয় হেগেলীয় নয়ত মাক্সর্ীয় তত্ত্বের বিতর্ককে ধারণ করে গড়ে উঠেছে । রাষ্ট্র বিষয়ক আলোচনার প্রাক্কালে তাই দুটি ধারার অতিশয় সংক্ষিপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করলাম । আগামী পোস্টগুলোতে ধীরে ধীরে সমসাময়িক তর্কে প্রবেশ করবো ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে এপ্রিল, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




