প্রথম পর্বের জন্য Click This Link
দ্বিতীয় পর্বের জন্য Click This Link
“আমি বড় হয়েছি খুব জনবহুল একটা পরিবেশে। পৃথিবী থেকে অনেক দূরে ছিল ওটা। ওখানকার ট্রান্সপর্টেশন চ্যানেল তত ভাল না। খুব খরচ হত।
আমাদের গ্রহে মানুষের বসতির চারপাশে একটা বলয় ছিল। স্বচ্ছ আর পরিষ্কার। এই গ্রহের মতন মেটেরিয়ালসের ঘেরাও দিয়ে রাখা না। ওটা ছিল বিশাল একটা বলয়, আমাদের চারপাশে ঘিরে রাখত। কাচের গোলকে ভরা পুতুলের মত ছিলাম ওখানে।
খুব ভীড় ছিল আমাদের বসতিতে। সব গরীব মানুষ। পড়াশোনা করতে হয়েহিল খুব কষ্ট করে। মাঝে মাঝে ভাল লাগত না কিছু। বলয়ের প্রান্তে চলে আসতাম। একদম নির্জন দেখে একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছিলাম। আমাদের খুব প্রিয়। বলয়ে নাক মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বলয়ের বাইরে প্রচণ্ড ঝড় চলত সেই গ্রহে। ওপাশে ক্লোরিনের সমুদ্র। দেখতাম। ভয় লাগত, অথচ অসহ্য সুন্দর লাগত।”, ধীরে ধীরে বস আর স্যারকে আমার কথা বলা শুরু করেছি। কাপের কফি শেষ, কিন্তু উঠে আবার ভরতে ইচ্ছা করছে না। একটা দুটা রোবট টিকে থাকলে খারাপ হত না।
“ আমাদের প্রিয় জায়গা? ”, বস জিজ্ঞসা করলেন।
“ হমমম, আমাদের। আমাদের প্রিয় জায়গা ছিল একটা। আমি আর জোয়িনা। খুব সুন্দর মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ে, যাকে প্রচণ্ড রকম ভালবাসতাম। আমার চেয়ে বয়সে ৫ দিন বড় ছিল ও। এটা নিয়ে সারাদিন আমাকে খোকাবাবু বলে খেপাতো। কাচের মত এই বলয়টার পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকতাম। জোয়িনা বাইরে তাকিয়ে থাকত, আমি ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম। জোয়িনা মাঝে মাঝে অস্ফুটে বলে উঠত, “কী সুন্দর!”, আমিও মনে মনে বলতাম, “কী সুন্দর!” বলয়ের দেয়ালে ওপাশের সমুদ্রের ছাঁট লাগত। আমরা এ পাশ থেকে তাকিয়ে থাকতাম।কতগুলো দিন যে এভাবে কাটত, মনে হত এর চেয়ে বেশি আর কিছু চাই না।”, বসকে পুরানো কথাগুলো বলছিলাম। কষ্ট করে উঠতেই হল। কফি দিয়ে প্রথমে বস এরপর বসের বস পরে নিজের কাপটা ভরে নিলাম।
বলতে থাকলাম,” জোয়িনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম আর কবিতাও লিখতাম। স্বপ্নে থাকত ব্যলকনী আর ফুলের বাগান। কবিতায় থাকত পৃথিবী আর সমুদ্র। একা একা আবৃত্তি করতাম। ওকে শুনাতাম। মাঝেমাঝে মনে হত, আমার চেয়ে বোধহয় আমার কবিতাকেই বেশি পছন্দ করে ও, ওখানে যে পৃথিবীর কথা থাকত ! মাঝে মাঝে গুণগুণ করে গান গাইত। আমি শুনতাম, ভাবতাম , কীভাবে প্রথম দিন ওর সাথে কথা হয়েছিল, কত সাহস নিয়ে ওকে মনের কথা বলেছিলাম, আরও কতকিছু।”
আমার মনের সাথে মিল রেখেই কী না জানিনা, ঝুম বৃষ্টি নামল। বস উঠে যেয়ে পর্দা টেনে দিলেন। এখানকার বৃষ্টিতে প্রচুর সালফার কণা থাকে। স্থাপনা থাকলে ক্ষতি হত খুব। আমাদের ছোট্ট ফ্যাকাল্টির উপর সালফার প্রটেক্টর শিল্ড দেয়া আছে। সিকিউরিটি রোবটগুলাকে তাও ভিতরে আসতে বললাম।
“পৃথিবীতে যাবার খুব শখ ছিল জোয়িনার, কিন্তু পারমিশানের জন্য দেখানোর মত এত ইউনিট ছিল না তখন আমাদের কারও। আর তাছাড়া, ওখানে যেয়েই বা কী করবে ! স্বাভাবিকভাবেই জোয়িনা কখনও যেতে পারেনি। আমরা পৃথিবীর সমুদ্রের ছবি দেখতাম। অবাক হতাম। ওখানকার সমুদ্রও নীল। কিন্তু, আমাদের গ্রহের মত না। একদম অন্যরকম, পবিত্র। সেই সমুদ্রের পানিতে রঙের খেলা দেখার কথা ভাবতাম আমরা দুজন। বলয়ে পিঠ লাগিয়ে বসে থেকে।পাশাপাশি। আবার, পরে মনে হত, আমাদের গ্রহটাও সুন্দর। পিছন ফিরে তাকাতাম, ক্লোরিনের সমুদ্রটাকে দেখতাম। আমি আবারো জোয়িনাকে দেখতাম।”,বলছিলাম এসব। পুরোনো কথা মনে হতে কেমন যেন লাগছিল।
“ বস ত জানেন, পৃথিবীর মতন আরও কিছু গ্রহে পানি পাওয়া গেছে। ওখানেও সমুদ্র আছে। ওখানেও এখন গাছ লাগিয়ে শত শত কিলোমিটার বন বানানো হয়ছে। ওগুলাতে যেতে তখনও পৃথিবীর মত এত বেশি ইউনিট লাগত না। এসব গ্রহ গুলার মাঝে রেক্সিজো গ্রহটা সবচেয়ে সুন্দর ছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি।
সবার থেকে লুকিয়ে আমার একটা কিডনী বিক্রী করে দেই। আর, মৃত পরিবারের ফেলে যাওয়া কিছু সম্পত্তি। কিছু ইউনিট হাতে আসে। জোয়িনাকে লুকিয়েই সব করি।
ওকে দিয়ে লটারী কেনাই। পরে ওকে আমার ইউনিট গুলো দিয়ে বলি, এগুলো ও লটারীতে জিতেছে ।জোয়িনাকে এক মাসের পারমিট জোগাড় করে রেক্সিজোতে পাঠিয়ে দেই।”,সবাইকে বলছিলাম এসব। বৃষ্টি কমে গেছে। দমকা বাতাস এখন। সালফার শিল্ডের উপর ঘরঘর আওয়াজ হচ্ছে।
“ জোয়িনাকে ছাড়া একটা মাস খুব কষ্টে কাঁটে আমার। কানেক্টর পডটাও বিক্রী করে দিয়েছিলাম। তাছাড়া, এতদূর থেকে কানেক্টর পডে কথা বলার মত ইউনিট আমার ছিল না।একমাস পরে ফিরে আসে ও। সব ইউনিট শেষ। সারাদিন ওখানকার কথা আর এরপরে নিজের স্বপ্ন নিয়ে নিজেই বিভোর থাকত।ওর স্বপ্নে আমিও বিভোর থাকতাম। মাঝে মাঝে অবাক হতাম, আমার মতন একজন মানুষ কীভাবে এমন সুন্দর একটা মেয়েকে পেয়েছে, তাও এত সহজে !
একদিন খুব ভোরে আমার ঘুম ভাঙ্গে। হঠাত কী যেন মনে হওয়ায় দৌড়ে চলে আসি আমাদের প্রিয় সেই জায়গাটায়। অবাক হয়ে দেখি বলয়ের ওপাশে জোয়িনা। প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করি। ডাকি। কাঁদি । বলয়ের ওপাশে শব্দ যায় না। বলয়ের বাইরে যাবার এই দিকের দরজাটা কখনও খুলতে দেখিনি। দরজাটা কীভাবে খুলেছে জোয়িনা, আমি তা বুঝিনি। আমি দেখতে থাকি জোয়িনা একা একা ভোরের আলোয় সাগরের পাড় ধরে হাঁটছে সৈকতে। ”, বলতে ভাল লাগছিল না আর।
“ ওখানে বলয়ের বাইরেও সৈকত ছিল? আমি ভেবেছিলাম বলয়টা একদম সমুদ্র পর্যন্ত ছিল।এরপরে কী হল? ”, বস বলে উঠলেন।
আমি বলতে থাকলাম,” সৈকত বলতে যা বোঝায় তা ছিল না। খুব ক্ষীণ একটা মাটির রেখা বলয়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে। সমুদ্রের ঢেউ যখন ফিরে যায়, তখন দেখা যায়। একটু পর পর ওখানে প্রচণ্ড জোরে ঢেউ আসে। বলয়ের বাইরের দেয়ালে ধাক্কা খায়। সেদিন কেন যেন ঢেউ ছিল খুব কম। আমি ডাকতে থাকি। জোয়িনা পর্যন্ত পৌঁছায় না। ক্লোরিনের মত বিষাক্ত আবহাওয়ায় মানুষ বেশিক্ষণ বাঁচে না। জোয়িনার মৃতদেহ আমি দেখি নি, সমুদ্রে হারিয়ে যায় চোখের পলকে। ”
“ ও এরকম করল কেন? ”, বসের স্যার এতক্ষণ পরে কথা বললেন।
“ ওর মত মেয়েকে আমার এত সহজে পাওয়ার কথা ছিল না। আসলে রেক্সিজোতে যেয়ে এক সপ্তাহ পরে একটা ছেলের প্রেমে পড়ে ও। ওরা তখন একসাথেই ছিল নাকি। ফেরত আসার পর সেই ছেলেটাও নাকি জোয়িনার সাথে এখানে আসতে চায়। কিন্তু, আমাদের গ্রহে এমনিতেই অনেক ভীড়। ওই ছেলেকে অনুমতি দেয়া হয়নি। শোনা গেছে, এরপর নাকি ছেলেটা হারিয়ে গেছে। পুরো গ্যালাক্সীতে ওর খোঁজ পায় নি কেউ। হতে পারে ছেলেটা আমার কথা শুনেছে কারও থেকে।
এই খবর শুনে জোয়িনা নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। ক্লোরিন সমুদ্রের সৌন্দর্যে নিজেকে বিলিয়ে দেয়।”, উত্তর দেই।
দুজনেই একসাথে জিজ্ঞাসা করলেন, “ এরপর? ”
“এরপরে কিছুই না। আমি এখন আমার মতন থাকি।”, কথা শেষ করে বসের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসলাম। আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বস আর বসের স্যার বোধহয় বেড়িয়ে গেলেন। লঞ্চ প্যাড খোলার আওয়াজ পেলাম।উঠে যেয়ে ব্যলকনীতে দাঁড়ালাম।
---------------------------
“ মেসক্রটের কাহিনীতে কি যেন একটা সমস্যা মনে হল আমার কাছে। ত্রিশান সাহেব, এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন? ”, প্রফেসর সাহেব মেসক্রটের বসকে জিজ্ঞাসা করলেন।
“ স্যার, মেসক্রটের বায়োডাটা আমি পড়েছি। ও রেক্সিজো গ্রহ থেকে এসেছে।”, মেসক্রটের বস ত্রিশান সাহেব বেশ কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলেন।
হঠাৎ দুজনেই অবাক হয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
প্রফেসর সাহেব চিন্তিত মুখে বললেন,“ মেসক্রট আসলে সুস্থ না, ও নিজেকে জোয়িনার প্রথম প্রেমিক ভাবছে। ওকে কী রিক্রুট করা ঠিক হয়েছে আপনার?”
মেসক্রটের বস আস্তে করে উত্তর দিলেন, “ এতদূরে আসতে কেউ রাজী হয় নি। তাছাড়া পুরো গ্রহে একজনও মানুষ নেই শুনে কেউ আসতে চায় নি। শুধু মেসক্রটই প্রচণ্ড আগ্রহ দেখায়। ”
দুজনের মনে পড়ল, মেসক্রটের নিজের সত্যিকারের কাহিনী তারা জেনেছেন মাত্র এক লাইনই। মেসক্রট বলেছিল, “শোনা গেছে, এরপর নাকি ছেলেটা হারিয়ে গেছে। পুরো গ্যালাক্সীতে ওর খোঁজ পায় নি কেউ। হতে পারে ছেলেটা আমার কথা শুনেছে কারও থেকে।”
মেসক্রটের গ্রহে আরও জোরে বৃষ্টি পড়া শুরু হল।
© আকাশ_পাগলা
এই সায়েন্স ফিকশানের নতুন একটা সেশন শুরু করেছি। কাহিনী একটু অন্যদিকে নিলাম। কারও সময় থাকলে দেখতে পারেন।
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১১:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



