
আগের পর্বের জন্য Click This Link
[এই ডায়েরীতে রেক্সোজা গ্রহের লোকাল সময় ,তারিখ উল্লেখ করা আছে। যা ইন্টারন্যাশনাল সময়,তারিখের সাথে মিলবে না বলে এখানে আগ্রাহ্য করা হল।]
[দ্বিতীয় এই ডায়েরীটার এই অংশে খুব কমই লেখা। আর, এখানে দিনেরটা দিনেই লেখা হয়েছে। প্রথম অংশের মত মেসক্রটের বিস্তারিত নিজস্ব চিন্তাধারা এখানে কমই এসেছে। তাছাড়া অনেক অংশ মর্মোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি।]
আমি জোয়িনাকে লুকিয়ে রেখেছিলাম কয়েকদিন। এসল্ট ডিসক্লেইমার ফোর্সের কেউ ওকে পায় নি খুঁজে। ফোর্স আমার বাসায় আসলে আমি জোয়িনাকে এক বন্ধুর বাসায় পাঠিয়ে দেই। সেখানে ফোর্স গেলে, আমি নিজের বাসায় নিয়ে আসি।
জোয়িনাকে ক্রীনা সহ্য করতে পারেনা। কারণ, আর সবার মতই ক্রীনাকে আমি ভালবাসি শুনে জোয়িনাও হেসে ফেলেছিল। “ক্রীনাকে একটা রোবটের কপোট্রনে সেট আপ করনা কেন? তাহলেই ত তোমরা পাশাপাশি গল্প করতে পারবে। ওর ফটোসেলের চোখে চোখ রাখবে, এন্টেনায় হাত বুলাবে”, এসব বলছিল আর হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল জোয়িনার। জোয়িনা মেয়েটা ভালই, কিন্তু আমার ক্রীনা সম্পর্কে কেউ এভাবে বললে নিজের মাথা খারাপ হয়ে যায়।
আমি জোয়িনার দিকে তাকাই। ওর চোখের দিকে। নিজের অজান্তেই যেন শিউরে উঠি। ও হাসি তামাশায় আমার ভিতরের ভয়টা বের করে এনেছে। আমি কুঁকড়ে যাই।
-------
ক্রীনা আমাদের ব্যাপারটাকে ভালভাবে নিতে পারছে না। এটাই বোধহয় স্বাভাবিক। আমি আর জোয়িনা সমুদ্র পাড়ে না যেয়ে থাকতে পারিনা। আমরা ওখানে পাশাপাশি বসে থাকি। এটা ক্রীনার ভাল লাগে না আমি বুঝি। তবুও এ নেশাটা ছাড়তে পারিনা। আমি ত সত্যিকারের মেয়েদের সাথে কখনও তেমন মিশিনি।
ক্রীনার জন্য খুব দ্রুত একটা ব্যবস্থা নিতে হবে, সেটা মাথায় ঘুরতে থাকে।
--------------
আমি ভাবি বোধ হয় এটাই ঠিক। কী জানি ! হয়ত। কিন্তু, এটা খুব বড়ো একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। ক্রীনার কথা মাথায় আসতে থাকে বার বার। একটা বিহিত করতে হবে। এনড্রয়েড বডি কেনার মত ইউনিট নেই আমার। আর, থাকার কথাও না। ক্রীনাকে নিয়ে কী করব ভেবে পাচ্ছি না। একটা সুযোগ এসেছে। এসব চিন্তা, বাঁধা থেকে মুক্ত হবার। আমি ভাবছি ব্যাপারটা। আজকে আর কিছু লিখব না।
---------------
খবরটা আমাকে আসলেই আলোড়িত করেছে। আমি ব্যাপারটা কিছুটা ঘাঁটাঘাটি করেছি। আমার মনে হয়েছে প্রজেক্টে কোনই ভুল নেই। যদিও ওরা কোন নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। জোয়িনার সাথে আমার সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে। তাছাড়া, আমি বুঝি আমার প্রতি ওর একটা আগ্রহ আছে। ক্রীনা এখন আর আগের মত নেই। আমি ব্যাপারটা বুঝি। আসলে সময় এসে গেছে। এনড্রয়েড বডির লাইসেন্স আমি পাব না। অতএব, সমস্যা থেকে মুক্ত হবার একটা উপায়।
---------------
(খুব কাঁপা কাঁপা হাতে অল্প কিছু লেখা এই পৃষ্ঠার মর্মোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি।)
--------------
অপরাধবোধে ভুগছি আমি। ডায়েরীতে কিছু লেখার মন মানসিকতা নেই আর।
--------------
(পরের পৃষ্ঠাগুলো টেনে টেনে ছেঁড়া।)
প্রফেসর সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “ এরপর? ” ত্রিশান সাহেব বললেন, “ডায়েরীতে এরপরে আর কিছু লেখা নেই।” “ না না, আরও অবশ্যই কিছু জানার আছে। মেসক্রটের কোন একটা রেকর্ড ত পাওয়া যাবেই। আমাদের কোম্পানীতে মেসক্রট জয়েন করার কয়দিন আগে শেষ পাতা লেখা হয়েছে? খবর নিয়ে কিছু একটা বলছিল ও। সে সময়ের রেকর্ড গুলা চেক করেন না একটু।” প্রফেসর সাহেব আরও একটু উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলেন।
“ ইয়ে, স্যার, আজকে আমার শালীর জন্মদিন। তাছাড়া রাতও হয়েছে। স্যার আজকে যাই। কালকে স্যার খুঁজা যাবে। বাসায় না গেলে সমস্যা হবে স্যার। আপনি অনুমতি যদি দিতেন। ”, ত্রিশান সাহেব অনেক ভেবে কথাগুলো বললেন। আসলে তিনি নিজেও একটু কনফিউজড। বউকে তার বেশি ভয় নাকি বসকে।
“ হমমমমম, আচ্ছা যান। তবে, আমি অবশ্যই কালকে আপনার কাছে থেকে বিস্তারিত কিছু জানতে চাইব। শালীর জন্মদিনে পারলে মেসক্রটকে নিয়ে যান। যদি ও রাজী হয়। আর, ওর থেকে এসব গোপন রাখবেন। ”, প্রফেসর সাহেব একটু বিরস মুখে বললেন।
পরের দিন। প্রফেসর সাহেব ব্যস্ত ছিলেন খুব। পার্টির হুইপ এখানে আসবেন। অনেক ইচ্ছা থাকা সত্যেও মেসক্রটের কাইনী নিয়ে বসতে পারলেন না।
“ ত্রিশান সাহেবকে ডাক দাও।আর কোন পারফিউম ব্যবহার কর তুমি? তোমাকে ভালই মানাচ্ছে।”, উৎসাহী গলায় পরের দিন পার্সোনাল সেক্রেটারীকে ডাকে নির্দেশ দিলেন প্রফেসর সাহেব। তার অফিসটা খুবই ছিমছাম। এখানে সবাই আসার সুযোগ পায় না। যদিও দুর্জনেরা বলে প্রফেসর সাহেব নাকি শুধু সুন্দরী স্টাফদেরই এখানে বদলী করে আনেন।
“ সরি স্যার, আসতে একটু দেরী হল। খবর পাওয়া মাত্র ছুটে আসছি।”, প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পরে ত্রিশান সাহেবের আগমন। “ আরে, আপনার খবর না, যে খবর জানতে চাই সে খবর বলেন।”, প্রফেসর সাহেব এগিয়ে এসে বসলেন। “স্যার, সে সময়ে অনেক খবর ছিল। মেসক্রট ঠিক কোন খবরের কথা বলেছে আমি বুঝিনি। আমি সে সময় রেক্সোজা গ্রহ, জোয়িনার গ্রহ, এনড্রয়েড কীই ওয়ার্ড দিয়ে খোঁজাখুজি করি। অদ্ভূত দারুণ একটা খবর পাই। আমি মোটামুটি একটা হাইপোথিসিস দাড়া করেছি।”, ত্রিশান সাহেব উত্তর দিলেন।
ত্রিশান সাহেব নিজের মত করে টানা বলে যান, “ রেক্সোজায় এনড্রয়েড বডির খুব দাম। মেসক্রট নিশ্চয়ই ক্রীনাকে এন্টেনাওয়ালা রোবটের কপোট্রনে বসাবে না। এটা সহজ কমনসেন্স। তাই, ওর অবশ্যই ক্রীনাকে বসানোর জন্য এনড্রয়েড বডি লাগবে। কিন্তু, এর দাম অত্যাধিক। শুধু, বডি না, বডির লাইসেন্সও লাগে।যেটা আরও দুষ্প্রাপ্য।”
“ আর জোয়িনার সাথে ওর খাতিরের কথা আমরা আগে থেকেই জানি। ক্রীনার প্রোগ্রাম নিশ্চয়ই ও অফ করে দিছে।”, প্রফেসর সাহেব বলে উঠলেন।
“ স্যার আমার হিসাব একটু অন্যরকম। আমি সেসময়ের একটা খবরে দেখি, একটা কোম্পানী মানুষের দেহতে কপোট্রন বসানোর প্রজেক্টের প্রস্তাব করে। ওরা দাবী করে ওরা সফল। পরে সেটা অনুমোদন পায় নি। কারণ, ওরা মুখে যতই দাবী করুক, সেটার প্রমাণ দেখাতে পারে নি। এটাকে ভণ্ডামী হিসেবে উড়িয়ে দেয়া হয়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, আসলে ওরা ঠিকই পেরেছিল। একটা না একটা পরীক্ষা ওরা নিশ্চয়ই করে। আমার ধারণা, পরীক্ষাটা জোয়িনার উপর চালানো হয়। আমরা আগেই জানি, মেসক্রটের সাথে জোয়িনার সম্পর্ক ভাল ছিল। ও নিশ্চয়ই মেসক্রটকে সন্দেহ করবে না। খুব সম্ভবত মেসক্রট জোয়িনাকে খুন করে। ওর দেহতে কপোট্রন বসানোর জন্য। সেখানে ক্রীনাকে বসানো হয়। লাইসেন্সের ঝামেলা আর রইল না। এনড্রয়েড বডিও কেনা লাগল না।” ত্রিশান সাহেব প্রফেসর সাহেবের অবাক মুখের উপর দিয়ে বলতে থাকেন, “ এরকম একটা কাজ করার সময় ওই কোম্পানী বাঢা দেয় নি। একে ত খুন করেই ফেলেছে। এরপরে, মাঝখান দিয়ে তারা একটা পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ পেল। কিন্তু, ওদের ধারনা ছিলনা যে ক্রীনার বুদ্ধিমত্তা কতটুকু উন্নত।কোন ভাবে ক্রীনা আর মেসক্রট পালায় সেখান থেকে।ক্রীনার পরিচয় তখন জোয়িনা।”
“ এরপর নিশচয়ই ক্রীনাকেও মেসক্রট শয়তানটা মেরে ফেলল। ”,প্রফেসর সাহেব ঢোক গিলে বললেন। “ আরে আশ্চর্য, ক্রীনার মৃত্যুর খবর খালি জানতে চাচ্ছেন কেন? আর, ক্রীনাকে মারার কারণও দেখি না। ”, ত্রিশান সাহেব বলতে থাকেন, “ মেসক্রট খুব সম্ভবত অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখনই সম্ভবত ওর মানসিক সমস্যাটা দেখা দেয়। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যায় ক্রীনা, যার পরিচয় তখন জোয়িনা। সেখানে সে এসল্ট ডিসক্লেইমার ফোর্সের কাছে জোয়িনা হিসেবে ধরা পড়ে। তাকে জোর করে জোয়িনার গ্রহে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এটা নিয়ে ছোট্ট একটা ফিচার খব বেরোয় তখন। যে একজনকে তার নিজের গ্রহে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সেখানে একটা মজার ব্যাপার চোখে পড়ে, খবরের শেষ দিকে। মেসক্রটের মানিসিক সমস্যার একটা কারণ হাতে পাই আমি।” “সেটা কী?” প্রফেসর সাহেব প্রশ্ন করলেন।
“স্যার, আসতে পারি?”, ঘরে প্রফেসর সাহেবের সেক্রেটারীর প্রবেশ, “ স্যার মেসক্রট এসেছেন। উনার প্রজেক্টের ফাইনাল কপিটা জমা দিতে। উনাকে কী আসতে বলব? ” “ আরে না না, ওই খুনীটাকে বাইরে রাখ।”, প্রফেসর সাহেব ধমকে উঠলেন। সেক্রেটারী মেয়েটা ভুরু কুঁচকে তাকাতে ত্রিশান সাহেব তাড়াতাড়ি হো হো করে হেসে ব্যাপারতা সামাল দিলেন, “ঠিকই বলেছেন স্যার। মেসক্রটকে দেখতে খুনীর মতই লাগে। ”
সেক্রেটারী মেয়েটা যাবার পরে প্রফেসর সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকানোয় ত্রিশান সাহেব আবার শুরু করেন, “ আমার ধারণা, ক্রীনা নিজেই ধরা দেয়। কারণ, ৬ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ফুটেজের শেষ মুহূর্তে পেছন থেকে একটা চিৎকার আসে যে, “ ওই মেয়ের চোখ মরা। ওকে দেখতে চাই না আর। মরা চোখ দেখতে চাই না। ” সেটা খুব সম্ভবত মেসক্রটের কণ্ঠস্বর। যাই হোক, ক্রীনা নিজে ধরা দেক, আর ধরাই পড়ুক, সে জোয়িনার গ্রহে ফেরত যায়। কয়েকদিনের মাথায় মেসক্রটও সুস্থ হয়ে ওঠে। হাসপাতাল থেকে ক্রীনার নামে চিঠি যায় যে, সে যেই রোগী ভর্তি করিয়েছে সে সুস্থ। ক্রীনা সেখানে জোয়িনার প্রথম প্রেমিকের সাথে পরিচিত হয়। সে জোয়িনা হয়ে অভিনয় করতে থাকে। সে জোয়িনা সম্পর্কে যা যা জানত সব কিছু লিখে মেসক্রটকে পাঠায়।” “লিখে পাঠাতে হবে কেন?” প্রফেসর সাহেবের প্রশ্নের উত্তরে ত্রিশান সাহেব বলতে থাকেন, “ কানেক্টর পডে রেক্সোজা গ্রহে কথা বলার মত ইউনিট জোয়িনার নেই এটা আমরা আগেই জেনেছি তাই না? সে যাই হোক, ক্রীনা সম্ভবত মেসক্রটকে সেখানে যেয়ে ওকে নিয়ে আসতে বলে। মেসক্রট আসেও। কিন্তু, ডক স্টেশনে মেসক্রট জোয়িনার শরীরের ক্রীনাকে দেখে আবারও ভয় পেয়ে যায়। আর, ভয়ে অদ্ভূত আচরণ করে। খুব সম্ভবত এজন্যই মেসক্রট সেই গ্রহে ঢোকার অনুমতি পায় নি। এটাও আমরা আগেই জেনেছি। যদিও আমরা ভেবেছিলাম অন্য কারণ।”
ত্রিশান সাহেব বলতে থাকেন, “ ক্রীনার বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে ডায়েরীতে আমরা কিছুটা ধারণা পেয়েছি। সে আত্মহত্যার পরে মেসক্রট আরও বেশি একা হয়ে পরে। আর লোকালয় থেকে দূরে থাকার জন্য আমাদের চাকরীটায় এপ্লাই করে। সে সময় কিছু একটা হয় আমি বলতে পারবনা, মেসক্রট সব ভুলে যায়। সীমার বাইরে কষ্টের ইতিহাস মানুষের মস্তিষ্ক ধরে রাখতে পারেনা। তার কাছে তার অতীত প্রমাণ বলতে জোয়িনার কাহিনী জানিয়ে ক্রীনার পাঠানো সেই লেখাটুকুই ছিল। যা এখন ওর কাছে ওর নিজের অতীত।”
ত্রিশান সাহেব কথা শেষ করে বসে রইলেন। “ প্রথম যেদিন মেসক্রটের সাথে কথা হয়েছিল, সেদিনই ও বুঝিয়ে দিয়েছিল ও রেবেল পার্টির নয়তো ফেডারেশন পার্টির। আমার মনে হয়, বিরোধী পার্টির সবাই এরকম খুনীই হয়। কী বলেন? ”, প্রফেসর সাহেব উৎসুক দৃষ্টিতে ত্রিশান সাহেবের দিকে তাকালেন। ত্রিশান সাহেব হতাশ ভঙ্গিতে একবার কাঁধ ঝাকালেন।
এক সময়ে খুবই উঁচু মাত্রার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এখন যার কোন অস্তিত্ব নেই) তৈরী করা মেসক্রট রুমের বাইরে অপেক্ষা করতে লাগল।
© আকাশ_পাগলা
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১১:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



