somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ড। মুহাম্মাদ ইউনুস ও তাঁর ধর্ম বিশ্বাস

১১ ই জুন, ২০২৫ সকাল ১১:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর ধর্ম বিশ্বাস

মুহাম্মদ ইউনূসের বাবা-মা ধার্মিক ছিলেন। তাঁর পিতা দুলা মিয়া নিয়মিত নামায পড়তেন। হজ্বও আদায় করেছেন। মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই লিখেছেন-
আমার আব্বা ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। তিনবার তিনি হজ্ব করতে মক্কায় গিয়েছিলেন। তাঁর সময় কেটে যেতো দোকান, নামায ও সাংসারিক কর্তব্য সাধনে। (গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন, পৃ.২৭)
অন্যত্র লিখেছেন-আমার আব্বা, আম্মা অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ। ( প্রাগুক্ত, পৃ.১২০)

সুতরাং বলা যায়-মুাহম্মদ ইউনূস ধর্মপ্রাণ পিতা-মাতার সন্তান। তবে তার নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও বোধে ধর্ম সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি, যতোটা তার পিতা-মাতার মাঝে ছিল। তিনি তরুণ বয়সে তথাকথিত সেকুলার বাম ভাবধারায় প্রভাবিত ছিলেন। মার্কসীয় অর্থনীতিতে আকৃষ্ট ছিলেন। ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি (Vanderbilt University)-এর রুমানিয়ান অধ্যাপক নিকোলাস জর্জেস্কু-রোগেন (মৃ.১৯৯৪ইং) (Nicholas Georgescu-Roegen) ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূসের অর্থনীতির শিক্ষক ও গুরু। তিনি ছিলেন তার পথপ্রদর্শক। মার্কসবাদের পাঠ মুহাম্মদ ইউনূস তার থেকেই গ্রহণ করেন। (গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন, পৃ.৪১-৪২)

ধর্ম নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের বিশ্বাস কেমন-তা নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা তিনি নিজেই করেছেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন’-এ তিনি লিখেছেন-
‘আমার তরুণ বয়সে আমি বাম ভাবধারায় অনুপ্রাণিত প্রগতিশীল ছিলাম। কারণ যা চিরকাল হয়ে আসছে তাকে অপছন্দ করতাম, পুরনো রক্ষণশীল ধ্যানধারণার প্রতিও আমার শ্রদ্ধা ছিল না। আমার প্রজন্মের বহু বাঙালির মতো আমিও মার্কসীয় অর্থনীতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম। ...আমি গোঁড়া মুসলিমও ছিলাম না। তবে আমার নিজস্ব ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে কখনও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিনি। আমি কখনও এত প্রবল মুক্তমনা হতে চাইনি যা আমার মনে নিজ ধর্মের প্রতি অনীহা এনে দেবে। (গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন পৃ.২০১)

তাঁর নিজের বর্ণনা থেকেই বোঝা যায়, তিনি একটি মধ্যমপন্থী অবস্থান নিতে চেয়েছেন—যেখানে ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করে, মুক্তচিন্তারও কিছু জায়গা রেখেছেন। তবে এতে স্পষ্ট কোনো আদর্শিক অবস্থান গড়ে ওঠে না, বরং একটি দোদুল্যমান মনোভাব প্রতিভাত হয়। তাই বলা যায়—তিনি না সুস্পষ্টভাবে ধার্মিক মুসলিম, না পুরোপুরি বামপন্থী বা মুক্তমনা চিন্তাবিদ। তিনি একদিকে নিজ ধর্মচর্চার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি, আবার অন্যদিকে প্রথাগত রক্ষণশীলতাকেও গ্রহণ করেননি। ফলে, তাঁর অবস্থান একরকম আদর্শহীন নিরপেক্ষতার মাঝে থেকে গিয়েছে।

নি:সন্দেহে এটি একজন মুসলিমের পরিচয় হতে পারে না। ইসলামে কোনও মুসলিম বা মুমিন আধা বা অর্ধেক মুসলিম হওয়ার ধারণা নেই। ইসলামকে পুরোপুরি ধারণ করাই ইসলাম। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ كَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَكُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ


হে মুমিনগণ! তোমরা পুর্ণাঙ্গভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শক্ৰ। (সূরা বাকারা: ২০৮)

কেউ যদি মনে করে সে কেবল Cultural Muslim –হবে। যে কেবল ঐতিহ্যগত ও সামাজিক পরিচয়ে মুসলিম হবে, তবে ইসলামি বিশ্বাস ও আচরণে পূর্ণরূপে নিয়োজিত থাকবে না। সে আদতে মুসলিম নয়। অথবা চিন্তা করল, সে কেবল Religious Pluralist or Liberal Muslim –হবে। ইসলামকে কেবল একটি নৈতিক আদর্শ হিসেবে দেখবে, কিন্তু শরিয়াহ-ভিত্তিক জীবনব্যবস্থাকে মান্য করবে না। এটিও মুসলিমের পরিচয় নয়।

অনেকাংশেই এধরনের ব্যক্তিদের মাঝে ইসলামের মৌলিক আকীদা বিশুদ্ধ থাকে না। ফলে বাহ্যত তারা মুসলিম নামধারী হয়ে থাকলেও ভিতরে নাস্তিক হয়ে থাকেন। তাই ইসলাম আমাদেরকে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হতে বলে। আকীদা, বিশ্বাস ও আমলে। এরপরও আমলে ত্রুটি-বিচ্যূতি থাকতে পারে। তবে মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসে কোনও প্রকার ত্রুটি থাকা যাবে না। আকীদা হল ইসলামের মৌল ভিত্তি। মৌলিক আকীদায় সামান্যতম অবহেলা কিংবা মুক্তমনা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দিতে পারে।

‘পুরনো রক্ষণশীল ধ্যানধারণার প্রতি শ্রদ্ধা না থাকা’, ‘গোঁড়া মুসলিম না হওয়া’-কথাগুলো বেশ ভয়ঙ্কর। এর আড়ালে যদি বুনিয়াদি আকিদায় দুর্বলতা থেকে যায়, বুনিয়াদি আমলে ত্রুটি থেকে যায়, তবে সেটি মুসলিম পরিচয়কে সংকটে ফেলে দিবে। বিশেষত ‘বাম ভাবধারায় অনুপ্রাণিত’ থাকা-এটি সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী কথা। বাম ধারায় অনুপ্রাণিত থাকা আর মুসলিম থাকা সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা। কেউ একই সাথে সেকুলার হবে, আবার মুসলিম হবে-এ হবার নয়।

আমরা দোআ করি-আল্লাহ তা’আলা ড.মুহাম্মদ ইউনূসকে আকীদা-বিশ্বাস ও আমলে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়ার তৌফিক দিন। আমীন।
টিকা: ০১
ড. ইউনুস আমেরিকায় অবস্থানকালে ১৯৭০ সালে ভিরা ফোরোস্টেনকো নামে একজন খ্রিষ্টান রুশ তরণীকে বিয়ে করেন এবং তাদের একটি কন্যা সন্তানও হয়। (গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন, পৃ.৪৪)। পরবর্তীতে তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে যায়। জানা যায়, ২০১৭ সালের ৯ এপ্রিল ভিরা মারা যান। উক্ত বিয়ে ইসলাম ধর্ম অনুসারে সঠিক হয়েছিল কি না তা সন্দেহপূর্ণ। কারণ, বর্তমান খ্রিষ্টানগণ সাধারণত নাস্তিক হয়ে থাকেন। ‘আহলুল কিতাব’ হওয়ার ন্যূনতম যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো সাধারণত অনুপস্থিত থাকে। সংবাদ পত্রের মাধ্যমে জানা যায়, ইউনুস এই তরুণীকে রাশিয়ান ডোনেশন লাভের জন্য বিয়ে করেছিলেন। এরপর যখন ভিরা বুঝতে পারলেন ইউনুস সেই অর্থ দিয়ে সুদী ব্যবসা শুরু করেছেন। তখন থেকেই তাদের মাঝে বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধ বিচ্ছেদে রূপ নেয়। (ভোরের পাাত, ১৫ মার্চ, ২০২৩, শিরোনাম: “খ্রিস্টান তরুণীকে বিয়ে করে আবার ডিভোর্সও দেন ড. ইউনূস”) তবে এসব তথ্যের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
টিকা: ০২
নিকোলাস ছিলেন Degrowth (প্রবৃদ্ধিবিরোধী) মতের প্রবক্তা। এটি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধারণা, যা বলে—
অবিরাম নিয়ন্ত্রনহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (endless economic growth) মানুষের জন্য উপকারী নয়, বরং তা পরিবেশ, সমাজ ও মানবিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর। বরং আমাদের উচিত অপ্রয়োজনীয়, অপচয় উৎপাদন ও ভোগ কমানো, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গ্রহণ করা এবং সামাজিক সমতার উপর গুরুত্ব দেওয়া। Traditional Growth Model সব সময় জিডিপি গ্রোথ এর উপর গুরুত্বারোপ করে। যেমন, গাড়ি উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে। এতে পরিবেশের ক্ষতি হলেও গ্রোথ করতেই হবে। অপরদিকে Degrowth বেশি গাড়ির বদলে সাইকেল ও পাবলিক ট্রান্সপোর্টে উৎসাহ দিবে। ভোগ কমাতে বলবে। পরিবেশ রক্ষা করতে উৎসাহিত করবে। মোটকথা, ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতির সাথে অনেক দিক থেকে এর মিল রয়েছে। সাথে আখিরাত ও তাওহিদভিত্তিক মূলনীতি যুক্ত করে নিলে এটি পুরোপুরি ইসলামি অর্থনীতির জন্য একটি উপযোগী “conversation partner” হয়ে উঠতে পারে।




সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০২৫ সকাল ১১:১৫
৯টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একাত্তরের ইতিহাস অন্য কিছুর সঙ্গে মিলবে না, সত্যিই?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৮


স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, একাত্তর কখনো অন্য কোনো ইতিহাসের সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাধীনতা বলতে আপনি কি বুঝেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:০৩


২০২৩ সালের কথা। আমরা কয়েকজন মিলে অনলাইনে একজন ইংরেজি স্যারের কাছে কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম। একদিন ক্লাস চলছে, স্যার হঠাৎ বই থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা ছোটবেলায় যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:১৪



বিশেষ দিন গুলো শাহেদ জামালের জন্য কষ্টকর।
যেমন ইদের দিন শাহেদ কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? তার তো কেউ নেই। এমনকি বন্ধুবান্ধবও নেই। তার এমন'ই পোড়া কপাল মেসেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই যে জীবন

লিখেছেন সামিয়া, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:২৪



এই যে আমার জীবনে কিছুই করা হলোনা, সেটা নিয়ে এখন আর খুব বড় কোনো আফসোস করি না। জীবন আসলে নিজের মতোই চলতে থাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠি, রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এঁনারা কিসের আশায় দালালি করে যাচ্ছেন?

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ২৮ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:০৫



১. ১৫ আগস্ট টাইপ কিছু বা ৭ নভেম্বর টাইপ কিছু না ঘটলে আওয়ামী লীগ সহসা আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। জুলাই-এর মত কিছুও বার বার হয় না। তাই ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×