
১
সুনীলের আজ মন খারাপের আরেকটা দিন।
পুরো দিন সুনীল ঘরের ভিতরেই ছিল।বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না।
সন্ধ্যায় যদি মা দেখে সুনীল ঘরের ভিতরেই আছে,নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হবে।ইচ্ছা না থাকা সত্তেও সুনীল বাইরে বের হল ।
বাইরে বের হয়ে সুনীল চিন্তা করতে থাকল ,সে কোথায় যাবে ??
সিন্ধান্ত নিল,ফাহিম দের বাসায় যাবে।কিন্তু ফাহিম ত বাসায় নাই !!ঢাকা গেছে জুরুরী কাজে,কবে ফিরবে জানা নাই।
সুনীলের বন্ধু ফাহিম।
ফাহিমের পরিবার সুনীলকে ভাল ছেলে হিসেবে ভাল চিনে জানে।তাই ফাহিমের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করে।
ফাহিমের বাবা নেই।বাসায় মা আর বড় আপু ফারজানা।
ফাহিমের মত ফারাজানা আপুর সাথে সুনীলের চমৎকার সম্পর্ক ।
সুনীল উদাস মনে হাটতে হাটতে ফাহিমদের বাসায় পৌছে গেছে।
বাসায় পৌছতেই বিদ্যুৎ চলে গেল।দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে আন্টি দরজা খোলে দিল।
আন্টিকে কেমন আছেন,জিজ্ঞাসা করে ফাহিমের ঘরে প্রবেশ করে দেখে ফারজানা আপু শুয়ে আছে।
আপুকে সন্ধ্যায় শুয়ে থাকতে দেখে,সুনীল ফারজানা আপুকে জিজ্ঞেস করছে।
-কি ব্যাপার ?সন্ধ্যায় শুয়ে আছো যে?
-শরীর ভাল নেই।
-তাই বলে সন্ধ্যায় শুয়ে থাকবে?আমি আসলাম তোমার সাথে আড্ডা দিতে আর তুমি কিনা !!
ফারাজানা আপু খুব আন্তরিক হয়েই সুনীলকে বললেন।
-শুয়ে আছি ত কি হয়েছে।তুই আমার পাশে বস।তর সাথে কথা বলি ।ভার্সিটি থেকে ফেরার পর থেকেই মাথা ব্যাথা তাই শোয়া থেকে উঠতে ভাল্লাগছে না।
সুনীল ও দুষ্টমী সুরে বলছে।
-তাইলে তোমার মাথা টিপে দেই।
ফারজানা আপু ভাল লাগার হাসি দিয়ে সম্মতি প্রকাশ করে বলল।
-আয় মাথাটা ম্যাসাজ করে দে।
সুনীল যখন ফারজানা আপুর মাথার কাছে গিয়ে ,আপুর কপালে হাত রাখল,অমনি পিছনে তাকিয়ে দেখে।দরজায় আন্টি দাড়িয়ে আছে !!!
সুনীল তখন বিব্রতকর পরিস্তিতি সামাল দিতে পুরাই বেসামাল।
২
সুনীল বাসার কম্পিউটার সুইচ অন করে বসে আছে। সে যে ফেসবুকে লগইন করবে তা ভূলেই গেছে।
সুনীল কম্পিউটার টেবিল এর সামনে বসে ভাবছে-
ফারজানা আপু খুব আন্তরিক ।ফারজানার আপুর সাথে সুনীল অনেক কিছুই শেয়ার করে।সেদিন ও কিছু শেয়ার করতে ফাহিমদের বাসায় গিয়েছিল কিন্তু এমন বিব্রতকর পরিস্তিতিতে পড়তে হবে সে ভাবেনি।
আমরা কাজ করি কিন্তু খুব কম ভেবেচিন্তে করি।
সুনীলের রিং বাজছে।ক্রিং ক্রিং ক্রিং
ভাবনার জগত থেকে ফিরে সুনীল ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে রুনার ফোন।
রুনা সুনীলের তালত বোন।বড় ভাইয়ের শ্যালিকা।
ভাবির চেয়ে একটু বেশি সুন্দরী রুনা।
ফোন রিসিভ করে সুনীল বলছে।
-হ্যালো
-সুনীল কেমন আছো ?
-ভাল
-ভাত খাইছো?
-হ খাইছি !!
-আপুরে নিয়া বাসায় আস না কেন ?
-আচ্ছা আসব।
আজকাল সুনীল রুনার সাথে সাধারণ কথাবার্থা বলে।কিন্তু আজ থেকে ১ মাস আগে এরকম ছিল না।সুনীল ই রুনাকে ফোন দিত আর রসালো আলাপ জমাতো।তাদের সেই সব আলাপ ছিল রোমান্টিকতায় ভরপুর ।এই ত গত শীতে সুনীল রুনাকে ফোন দিয়ে বলেছিল -
-রুনা তুমি শীত হয়ে যাও।
-কেন ?
-আমি রোদ হয়ে তোমায় উষ্ণতা দেব !
সুনীল রুনাকে কবিতাও শুনিয়েছিল-
''শীতে একবার জড়িয়ে দেখ,পৃথিবীর সকল উষ্ণতা পাবে তুমি।
তুমি শীত হয়ে যাও,আমি রোদ হয়ে তোমায় উষ্ণতা দেব।
তোমার পদ চিহ্নে চুম্বন এঁকে দিব,তুমি শিশির ভেজা ঘাস হয়ে যাও ।'
গত একমাসে রুনার প্রতি সুনীলের এমন পরিবর্তন,রুনা বোঝতে পারছে না।
৩
আইয়ুব ।সুনীলের কাজিন।
দুজনই সমবয়োসী। ঘুরাফেরা,নিয়মিত আড্ডা দেয়া।ভাল মন্দ শেয়ার করা সব চলে একসাথে ।
তাই সুনীল এবং আইয়ুবের মধ্যে কম্প্রোমাইজ,সেক্রিফাইস সমান তালে ঠিক আছে।
আইয়ুববের বাইক ছিল।প্রায় সন্ধ্যায় সুনীল আইয়ুবের বাইকে চড়ে সপ্তাহে একদিন রুনাদের বাসায় যেত।
সপ্তাহে একদিন রুনার সাথে সময় কাটানোর আনন্দ , পুরো সপ্তাহের মন খারাপের দিন গুলো সুনীলকে পুষিয়ে দিত।
তারপর বাসায় ফিরতি পথে আইয়ুবের সাথে সুনীলের খুনসুটি ।
সুনীলের মত আইয়ুব ও যে স্বপ্ন দেখা শুরু করছে।গত মাসে টের পেল।
আইয়ুব ত সুনীলকে বলেই দিল।
দেখ সুনীল তুই রুনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দে।
সুনীল বলছে -
কেন ??
আমি কেন স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেব !তুই বরং ছেড়ে দে।
রুনার চেয়ে তুই ভাল সুন্দরী মেয়ে পাবি।
সমাজে তর পরিবারের সম্মান আমার চেয়ে বড়।সো সহজেই মেয়ে পাবি।
তুই দেখতে আমার চেয়ে আকর্ষণীয় ।নিজের একটা বাইক আছে।
যেকোন মেয়েই তর প্রতি দুর্বল হতে পারে।
আমি সাধারণ আছি ।রুনাকে পাওয়ার জন্য আমি নিজেকে যোগ্য করব।
ইতিমধ্যে আমি রুনার কাছ থেকে গ্রীন সিগন্যাল পেয়েছি।তুই এখানে ইনভ্লবড থাকলে সেটা হবে না।
খুব উত্তেজিত হয়েই সুনীল কথাগুলো বলল।
আইয়ুব ও সুনীলকে ছাড়তে দিতে রাজী না। আইয়ুবকে সুনীল বলল
- তুই চেতিস না।আমি জানি রুনার চেয়ে ভাল মেয়ে পাব কিন্তু যদি পিউর ভালবাসা পাই,আমি রুনাকেই বিয়ে করব।
সুনীল তখনি আইয়ুবকে থামিয়ে দিয়ে বলল।
তুই আমার গরম ভাতে পানি ঢালবি না প্লিজ।আমি সিরিয়াস বলছি রুনাকে তর দুর্বলতা দেখালে সে তর প্রতি দুর্বল হবে জানি।কিন্তু পরে দেখা গেল ,মেয়েটাকে তুই বিয়ে করলি না এবং তর সাথে সম্পর্ক থাকার কারনে আমিও মেয়েটাকে বিয়ে করতে অনীহা প্রকাশ করলাম।তখন কিন্তু তুই শুধু রুনাকে না সাথে আমাকেও ঠকালি !
আইয়ুবের সাথে কিছু মৃদু ঝগড়া করার পর সুনীল একা একা বাসায় ফিরছে আর ভাবছে –
রুনার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চললে।একদিন তার প্রতি ভালবাসা তৈরি হবে।ততদিনে সে রুনার যোগ্য করে তুলবে।
থাকার জন্য একটা ফ্লাট,নিজের একটা চাকরী ,মা,বাবা র সাথে রুনা এবং সুনীলের সংসার।
মাঝখান থেকে ঝামেলা পাকালো আইয়ুব।
সুনীলের আর ভাল লাগে না।
তারপর বেশ কিছুদিন কেটে গেল।
সুনীল দেখতে পেল।
রুনা সুনীল কে ফোন দেয় মাঝে মাঝে খুব প্রয়োজনে ।আজকাল আইয়ুবকে রুনা নিয়মিত কল দিচ্ছে।সুযোগ পেলেই আমার অগোচরে তাদের কথা হয় ।
সুনীল আইয়ুবের অজান্তে মোবাইলের কল লিস্ট চেক করেই বোঝতে পারল।
সেই থেকেই রুনা সুনীল কে ফোন দিলে,আগের মত রোমান্টিকতায় আলাপ জমায় না।
তাদের কথামালা এখন হাই/হ্যালো থেমে থাকে।
গতকাল ও রুনা ফোন দিয়েছিল।
-হাই সুনীল
-রুনা
-হা ,কন্ঠ শুনে বোঝতে পারনা।
-বোঝতে পারি।
-রাতে খাইছো
-হা খাইছি
-কি খাইছো
-ডাল দিয়া ভাত।
-শুধু ডাল !!!
৪
সুনীল রুনাকে নীরব বিসর্জন না দিয়ে ।একান্ত নিজের করে চাইতে পারত।
আইয়ুবের প্রতি রুনার দুর্বলতা সুনীল মেনে নিতে পারছে না।তাই নিজের ভালবাসা দেখানোর কোন চেষ্টাই করছে না।
সুনীলের বিদেশী একটি কোম্পানীঁতে চাকরী হয়ে গেল।
সুনীল ফ্রন্ট ডেস্কে বসে।
রুনার কথা ভূলে যাচ্ছে। নিজেকে সে এগিয়ে নিতে ব্যাস্ত ।
রোজ সকালে অফিস করে। ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে।
সুনীলের ক্লান্ত শরীরে রুনাকে ফোন দিতে ইচ্ছা করে।
দেয় না।
মানুষ সুনীল এখন কঠিন হয়ে গেছে ।
সুনীলের ক্লান্ত শরীর রুনাকে নিয়ে ভাবছে না।
প্রেম ভেঙ্গে গেলে "জান" রুপ নেয় জানোয়ার এ।একদিন যাকে মনে হত তাকে ছাড়া বাঁচা অসম্ভব ,আজ তাকে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই না।
প্রেম ভেঙ্গে যাওয়ার পরও একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ রাত ১০:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


