somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যিলহজ্জ মাস ও আমাদের করণীয়ঃ

১০ ই জুন, ২০২১ সকাল ৯:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আরবী বারো মাসের মধ্যে জিলহজ্জ মাস শেষ মাস। জিলহজ্জ মাস মানে হজ্জের মাস। হজ্জের তিনটি মাস শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ্জ। এর মধ্যে প্রধান মাস হলো জিলহজ্জ মাস। এই মাসের ৮ থেকে ১৩ তারিখ-এই ছয় দিনেই হজ্জের মূল কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়। কোরআন মাজিদে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি, যা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী সেই দিন থেকে চালু আছে, যেদিন আল্লাহ তা’আলা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান’ (তাওবাহ : ৩৬)। এই চার মাস হলো জিলকদ, জিলহজ্জ, মহররম ও রজব।
যিলহজ্জ মাসের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ সময় হল আশারায়ে যিলহজ্জ বা যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশক। কুরআন-হাদীসে এই দশকের বিশেষ ফযীলত ও অসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা এই দশকের সম্মান ও পবিত্রতা প্রকাশান্তে এই দশকের রজনীগুলোর নামে শপথ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে। শপথ ভোরবেলার, শপথ দশ রাত্রির। (ফজর : ১-২)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জিলহজ্বের দশ দিনের ইবাদত আল্লাহর নিকট অন্য দিনের ইবাদত তুলনায় বেশী প্রিয়, প্রত্যেক দিনের রোযা এক বছরের রোযার ন্যায় আর প্রত্যেক রাতের ইবাদত লাইলাতুল কদরের ইবাদতের ন্যায়। (তিরমিজী শরীফ : ৭৫৮, সুনানে বায়হাকী কুবরা : ৩৭৫৭, কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আকওয়াল ওয়াল আফআল : ১২০৮৮)
হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হল যিলহজ্বের দশ দিন। জিজ্ঞাসা করা হল, আল্লাহর রাস্তায়ও কি তার সমতুল্য নেই? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায়ও তার সমতুল্য নেই, তবে ঐ ব্যক্তি, যার চেহারা ধূলিযুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ শাহদাতের মর্যাদা লাভ করেছে। (মুসনাদে বাযযার : ১১২৮; মুসনাদে আবু ইয়ালা : ২০১০) অন্য বর্ণনায় হযরত জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যিলহজ্বের দশ দিনের চেয়ে কোনো দিনই আল্লাহর নিকট উত্তম নয়। (সহীহ ইবনে হিববান : ২৮৪২)
হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,আল্লাহর নিকট যিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও (এর চেয়ে উত্তম) নয়? তিনি বললেন, না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে হ্যাঁ, সেই ব্যক্তির জিহাদ এর চেয়ে উত্তম, যে নিজের জানমাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য বের হয়েছে, তারপর কোনো কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি। (সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৮; সহীহ বুখারী: ৯৬৯; সুনানে তিরমিযী : ৭৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৭২৭; মুসনাদে আহমদ : ১৯৬৮; সহীহ ইবনে হিববান : ৩২৪)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা’আলার নিকট আশারায়ে যিলহজ্বের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা সেই দিবসগুলোতে অধিক পরিমাণে তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ও তাকবীর (আল্লাহু আকবার) পাঠ কর। (মুসনাদে আহমাদ : ৫৪৪৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১৪১১০; বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান : ৩৭৫০; ত্ববারানী : ১১১১৬; মাজমাউয যাওয়াইদ: ৫৯৩২; শরহু মুশকিলিল আছার : ২৯৭১)
এই দশকের নেক আমল, বিশেষত আল্লাহর যিকির সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, নির্দিষ্ট দিনসমূহে তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে সেই সকল পশুর উপ, যা তিনি তাদের দিয়েছেন। (হজ্জ: ২৮) এই ১০ দিনের মধ্যে শেষের দু’দিন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যাকে হাদীসের পরিভাষায় ‘ইয়াওমে আরাফা’ ও ‘ইয়াওমে নাহর’ বলা হয়। এ দুটি ইবাদত এ মাসের প্রথম দশককে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তোলে। যে দুটি ইবাদত জিলহজ্জ মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে আদায় করা সম্ভব নয়। এমনকি রমজানেও নয়। একটি হলো হজ্জ, অপরটি কোরবানী। ইমাম বুখারী (রাহ.) বলেন, হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) বলেছেন,‘‘সুনির্দিষ্ট দিনসমূহ’’ দ্বারা যিলহজ্বের দশ দিনই উদ্দেশ্য। অনুরূপভাবে হযরত ইবনে ওমর (রাঃ), হাসান বসরী (রাহ.), আতা (রাহ.), মুজাহিদ (রাহ.), ইকরামা (রাহ.), কাতাদাহ (রাহ.), ইমাম নাখায়ী (রাহ.), ইমাম আবু হানীফা, যিলহজ্বের দশ দিনই বোঝানো হয়েছে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর : ৩/২৮৯; লাতায়িফুল মাআরিফ : ৩৬১) ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী (রাহ.) বলেন, আল্লাহকে স্মরণ ও তার নাম উচ্চারণ শুধু যবেহ করার সময় নির্দিষ্ট নয়; বরং সুনির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম উচ্চারণ অর্থ হল, আল্লাহ তা’আলা তার বান্দাদের যেসব নেয়ামত দান করেছেন, বিশেষত জীবজন্তুকে তাদের অধীন করে দিয়েছেন, তাদের খাদ্য বানিয়েছেন, ইত্যাদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। (প্রাগুক্ত)
কুরআনের উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহের আলোকে স্পষ্ট বুঝা যায়, এই দশ দিনের যে কোনো নেক আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। তাই মুমিন বান্দার জন্য অধিক পরিমাণে সওয়াব অর্জন, আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহের এরচেয়ে উপযুক্ত সময় আর কী হতে পারে? এজন্য পূর্ববর্তীদের জীবনীতে এই দশকের আমল সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন এই দশকের দিনগুলোর আগমন ঘটত এত অধিক আমল ও মুজাহাদা করতেন, যা পরিমাপ করাও সম্ভব নয়। আমাদেরও উচিত বিভিন্ন নেক আমলের মাধ্যমে এই দশকের রাত-দিনগুলোকে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত করে তোলা। এই দশক যেহেতু নেক আমলের বিশেষ সময় তাই এই দশ দিনের যেকোনো আমল যেমন আল্লাহর নিকট প্রিয় ও পছন্দনীয় অধিক পরিমাণে নফল নামায আদায় করা, রোযা রাখা, যিকির-আযকার, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ তাহলীল ইত্যাদি। তাই আল্লাহর নেয়ামত ও বিশেষ অনুগ্রহ মনে করে এই দশকে সাধ্যমতো নেক আমলের পাবন্দী করা একান্ত প্রয়োজন। তাছাড়া বিভিন্ন হাদীসে এই দশকের বিশেষ কিছু আমলের কথাও বর্ণিত হয়েছে।
১. হজ্জ করাঃ
যাদের ওপর হজ্জ ফরজ হয়েছে তাদের জন্য উচিত বিলম্ব না করে হজ্জ আদায় করা। আমাদের সমাজে অনেক বিত্তবান আছেন, যাদের ওপর হজ্জ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও তা আদায়ে বিলম্ব করে থাকেন। মুসলমান হিসেবে কোনো পুণ্যময় কাজে অবহেলা কিংবা বিলম্ব করা উচিত নয়। কোরআন কারিমে আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘হজ্জ সম্পাদন সুবিদিত মাসসমূহে। অতঃপর যে কেউ এই মাসগুলোতে হজ্জ করা স্থির করে, তার জন্য হজ্জের সময়ে স্ত্রীসম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহবিবাদ বিধেয় নহে। তোমরা উত্তম কাজে যা কিছু করো, আল্লাহ তা জানেন এবং তোমরা পাথেয়র ব্যবস্থা করবে, আত্মসংযমই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ, তোমরা আমাকে ভয় করো’ (বাকারা : ১৯৭)। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘মক্কা শরীফ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তির উপর আল্লাহর জন্য হজ্জ আদায় করা ফরয’ (ইমরান : ৯৭)। ‘তোমরা আল্লাহর জন্য হজ্জ ও উমরাহ পালন কর’ (বাকারা : ১৯৬)। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিবেদিতভাবে, সর্বপ্রকার পাপ, অন্যায় ও অশ্লীলতা মুক্ত হয়ে হজ্জ আদায় করলো, সে মাতৃগর্ভ থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরলো’(বুখারী : ১৫২১; মুসলিম : ১৩৫০)। তিনি আরও বলেছেন; একবার উমরা আদায়ের পরে দ্বিতীয়বার যখন উমরা আদায় করা হয়, তখন দুই উমরার মধ্যবর্তী গোনাহ আল্লাহ্ মাফ করে দেন। আর হজ্জে মাবরুর বা পুণ্যময় হজ্জের একমাত্র পুরস্কার হলো জান্নাত’ (বুখারী : ১৭৭৩; মুসলিম: ১৩৪৯; তিরমিযী : ৯৩৩; নাসায়ী : ২৬২৯; ইবনে মাজাহ : ২৮৮৮)। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা’আলা যে স্বচ্ছল সামর্থ্যবান ব্যক্তি সত্তর হজ্জ আদায় করে না তাকে হতভাগা ও বঞ্চিত আখ্যায়িত করেছেন।
২. কুরবানী আদায় করাঃ
যাদের ওপর কোরবানী ওয়াজিব, তারা তো অবশ্যই কোরবানী আদায় করবেন। এমনকি যাদের ওপর কোরবানী ওয়াজিব নয়, তাদেরও কোরবানী করার চেষ্টা করা উচিত। আগ্রহ ও ইচ্ছা থাকলে নিঃস্ব ব্যক্তিকেও আল্লাহ তা’আলা সামর্থ্যবান করে দিতে পারেন। বাহ্যিক সামর্থ্য ও আর্থিক সচ্ছলতা তো আল্লাহ তা’আলার হাতে। সে কারণেই কোরবানী ওয়াজিব না হলেও কোরবানী করার চেষ্টা করা উচিত। জিলহজ্জের ১০, ১১ ও ১২ যেকোনো দিন, কোনো ব্যক্তির মালিকানায় নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা এর সমমূল্যের সম্পদ থাকলে তার ওপর কোরবানী করা ওয়াজিব। পুরুষ ও নারী সবার জন্য এ বিধান প্রযোজ্য (ইবনে মাজাহ : ২২৬)। হযরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–এর কাছে সাহাবাগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ! এ কোরবানী কী?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আঃ)–এর সুন্নত।’ তাঁরা পুনরায় বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! তাতে আমাদের জন্য কী সওয়াব রয়েছে?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘কোরবানীর পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি সওয়াব রয়েছে।’ তাঁরা আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ! ভেড়ার লোমের কী হুকুম? (এটা তো গণনা করা সম্ভব নয়)’, তিনি বললেন, ‘ভেড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি সওয়াব রয়েছে’ (ইবনে মাজাহ : ২২৬)।
রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, কুরবানীর দিনে বনী আদম এমন কোন কাজ করতে পারে না, যা আল্লাহর নিকট রক্ত প্রবাহিত করা তথা কুরবানী করার চেয়ে বেশি প্রিয়। কুরবানীর পশু সকল শিং, তাদের পশম ও তাদের খুরসহ কেয়ামতের দিন (কুরবানীদাতার পাল্লায়) এসে হাজির হবে। আর কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর নিকট সম্মানের স্থানে পৌছে যায়। সুতরাং তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে কুরবানী করবে। (সুনানে তিরমিজী : ১৪৯৩, মুসতাদরাকে হাকেম : ৭৫২৩, কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আক্বওয়াল ওয়াল আফআল : ১২১৫৩)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে’ (ইবনে মাজাহ: ২২৬)।
৩. চুল, নখ, মোচ ইত্যাদি না কাটাঃ
যারা কুরবানী করার ইচ্ছে পোষণ করছেন, তারা জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে হাত পায়ের নখ, মাথার চুল ও অবাঞ্ছিত চুল ইত্যাদি কাটবে না, যদি ৪০ দিন না হয়ে থাকে এগুলো না কাটার মেয়াদ। যদি ৪০ দিনের বেশি হয়ে থাকে, তাহলে এসব কেটে ফেলা আবশ্যক। নতুবা ১০ দিন পর (কুরবানীর পর) পরিস্কার করবে। এ কাজটি সুন্নাত। হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন যে, যখন (জিলহজ্বের প্রথম) ১০ দিনের সূচনা হয়, আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছে করে, সে যেন চুল-নখ ইত্যাদি না কাটে। (সুনানে নাসায়ী কুবরা : ৪৪৫৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১৪৯, সুনানে বায়হাকী : ১৮৮০৬, মুসনাদুল হুমায়দী : ২৯৩, মুসনাদে আবী আওয়ানা : ৭৭৮৭, মুসনাদুশ শাফেয়ী : ৮৪৬, মাশকিলুল আসার : ৪৮১১)
৪. কুরবানী করতে যারা সক্ষম নয়ঃ
যে ব্যক্তি কুরবানী করতে সক্ষম নয় সেও এ আমল পালন করবে। অর্থাৎ নিজের চুল, নখ, গোঁফ ইত্যাদি কাটবে না; বরং তা কুরবানীর দিন কাটবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-আমি কুরবানীর দিন সম্পর্কে আদিষ্ট হয়েছি (অর্থাৎ এ দিবসে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে আল্লাহ তা’আলা তা এ উম্মতের জন্য ঈদ হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। এক ব্যক্তি আরজ করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানীহা থাকে অর্থাৎ যা শুধু দুধপানের জন্য দেওয়া হয়েছে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না; বরং সেদিন তুমি তোমার চুল কাটবে (মুন্ডাবে বা ছোট করবে), নখ কাটবে, মোচ এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর কাছে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে। (মুসনাদে আহমদ : ৬৫৭৫; সহীহ ইবনে হিববান : ৭৭৩; সুনানে আবু দাউদ : ২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী : ৪৩৬৫) অর্থাৎ যারা কুরবানী করতে সক্ষম নয় তারাও যেন মুসলমানদের সাথে ঈদের আনন্দ ও খুশি উদযাপনে অংশীদার হয়। তারা এগুলো কর্তন করেও পরিপূর্ণ সওয়াবের অধিকারী হবে।
৫. ঈদের দিন ছাড়া বাকি নয় দিন রোযা রাখাঃ
আশারায়ে যিলহজ্বের আরেকটি বিশেষ আমল হল, ঈদুল আযহার দিন ছাড়া প্রথম নয় দিন রোযা রাখা। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নয়টি দিবসে (যিলহজ্জ মাসের প্রথম নয় দিন) রোযা রাখতেন। (সুনানে আবু দাউদ : ২৪৩৭; মুসনাদে আহমাদ : ২২২৩৪; সুনানে নাসায়ী : ২৪১৬)
হযরত আবু কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন-আরাফার দিনের রোযার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, এ রোযা তার পূর্বের ও পরের বৎসরের গোনাহ মুছে ফেলবে। (সহীহ মুসলিম : ৭৪০) তবে যারা হজ্বে গিয়েছেন, তাদের জন্য এদিন রোযা না রাখা উচিত। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সাঃ) আরাফার দিনে আরাফার ময়দানে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ : ২৪৪২, সুনানে বায়হাকী কুবরা : ৮১৭২, কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আক্বওয়াল ওয়াল আফআল : ২৩৯২৩, আল মুজামুল আওসাত, হাদীস নং-২৫৫৬) হযরত উম্মুল ফযল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-লোকেরা আরাফার দিন নবী কারীম (সাঃ) রোযা রেখেছেন কি না? তা নিয়ে সন্দেহে পতিত হলে আমি রাসূল (সাঃ) এর পানীয় প্রেরণ করলাম, আর নবীজী (সাঃ) তা পান করলেন। (ফলে সবাই নিশ্চিত হলেন যে, রাসূল (সাঃ) রোযা রাখেন নি। (সহীহ মুসলিম : ২৬৫১)
অন্য হাদীসে হযরত হাফসা (রাঃ) বর্ণনা করেন-চারটি আমল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ছাড়তেন না। আশুরার রোযা, যিলহজ্বের প্রথম দশকের রোযা, প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোযা, ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামায। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস :২৪১৫; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৬৪২২; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস : ৭০৪২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ২৬৩৩৯)
৬. বিশেষভাবে নয় তারিখের রোযা রাখাঃ
আরাফার দিন, অর্থাৎ ৯ জিলহজ্জ নফল রোজা রাখা বিশেষ সুন্নত আমল। তবে আরাফায় উপস্থিত হাজি সাহেবদের জন্য এই রোজা প্রযোজ্য নয়। হযরত আবু কাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আশাবাদী যে আল্লাহ তা’আলা তার (রোজাদারের) বিগত এক বত্সরের ও সামনের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন’ (তিরমিজি, সহীহ মুসলিম : ১১৬২; সুনানে আবু দাউদ : ২৪২৫; জামে তিরমিযী : ৭৪৯; সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৭৩০) আরেক হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি আরাফার দিন রোযা রাখবে তার লাগাতার দুই বছরের গুনাহ ক্ষমা করা হবে। (মুসনাদে আবু ইয়ালা : ৭৫৪৮; মাজমাউয যাওয়াইদ : ৫১৪১) যারা যিলহজ্বের নয় রোযা রাখতে সক্ষম হবে না তারা যেন অন্তত এই দিনের রোযা রাখা থেকে বঞ্চিত না হয়।
৭. তাকবীরে তাশরীক বলাঃ
যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখের ফজর থেকে ১৩ জিলহজ্জের আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক বলা প্রত্যেকের জন্য ওয়াজিব। তাকবিরে তাশরিক হলো ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’
নামাজ একাকী কিংবা জামাতের সঙ্গে, পুরুষ-মহিলা প্রত্যেকের ওপর একবার এ তাকবির বলা ওয়াজিব। পুরুষ উচ্চস্বরে আর নারী অনুচ্চস্বরে তাকবির বলবে। (প্রমাণ-ফাতওয়া শামী-তৃতীয় খন্ড, ৬১ পৃষ্ঠা,সালাত অধ্যায়,ঈদ পরিচ্ছেদ,ইলাউস সুনান, সালাত অধ্যায়, তাকবীরাতুত তাশরীক পরিচ্ছেদ, ৮ম খন্ড, ১৪৮ পৃষ্ঠা)
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) আরাফার দিন তথা ৯ই জিলহজ্বের ফজর থেকে আইয়ামে তাশরীকের শেষ দিন পর্যন্ত পর্যন্ত তথা ১৩ ই জিলহজ্জ (আসর নামায) পর্যন্ত তাকবীরে তাশরীক পড়তেন। (সুনানে বায়হাকী কুবরা : ৬০৭১, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ৫৬৮১)
৮.ঈদুল আজহার রাতে বেশি বেশি ইবাদত করা উত্তমঃ
যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাতে সওয়াবের নিয়তে জাগরিত থেকে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকবে, তাহলে যে দিন অন্যান্য দিল মরে যাবে সেদিন তার দিল মরবে না। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৭৮২, শুয়াবুল ঈমান : ৩৭১১, কানযুল উম্মাল ফি সুনানিল আক্বওয়াল ওয়াল আফআল : ২৪১০৫, জামিউল আহাদীস : ২৩২৯৬) (এ হাদীসটি দুর্বল)

আল্লাহ তা’আলা আশারায়ে যিলহজ্বের মতো অন্যান্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দিনগুলোতে ইবাদত-বন্দেগী করার তাওফীক দিন। আমীন।


সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০২১ সকাল ৯:০০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশে শিক্ষিত বেয়াদব ধান্দাবাজ লোকের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ২৪ শে জুন, ২০২১ দুপুর ১২:৫১




আমাদের দেশে শিক্ষিত বেয়াদব ধান্দাবাজ লোকের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে। সত্যি চিন্তার বিষয়।।

নওম চমস্কি পৃথিবীর অন্যতম জীবিত দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, বলা যায়, উনি একটি প্রতিষ্ঠান।
এত বড় একজন মহামানবকে যে সাক্ষাৎকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ প্রতিযোগিতা সম্পর্কিত কিছু আপডেট এবং বিচারক প্যানেল।

লিখেছেন কাল্পনিক_ভালোবাসা, ২৪ শে জুন, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:০৯

প্রিয় ব্লগার বৃন্দ,
ছবি ব্লগ প্রতিযোগিতা ২০২১কে অভাবনীয় সাফল্যমন্ডিত করার জন্য আপনাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। ছবি ব্লগ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ন আপডেট এখানে যুক্ত করা হলোঃ

১। ইতিপূর্বে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ ২:

লিখেছেন সুমন জেবা, ২৪ শে জুন, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:১০

ছবি ১: ঝুমকোলতা ফুল
ঝুমকো লতা কানের দুল, উঠল ফুটে বনের ফুল



ছবি ২: জারুল
তোমায় দিলাম অযূত জারুল ফুল।



ছবি ৩:রঙ্গন
ফুল যদি নিয়ে আসো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি প্রতিযোগিতা ২ (আমার দেশের বাড়ি ভ্রমণ)

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৪ শে জুন, ২০২১ রাত ৯:২৯



চাঁদের হাসি




বলুনতো এটা কি ফুল, আমি জীবনে প্রথম দেখেছি।




আকাশ মেঘে ঢাকা।




কচি, একদম কচি।



পথ চিরদিন সাথি হয়ে রইবে আমার




অনেক হলো পরিশ্রম,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ও ক্যামেরার গল্প!

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৪ শে জুন, ২০২১ রাত ১১:১৩


গল্পটা ছোটবেলার! মফস্বলে ছিলাম বলে শহর থেকে(বিশেষ করে ঢাকা থেকে) অনেকখানি পিছিয়ে ছিলাম আমরা- তাই সময়টা খুব বেশি পেছনের না হলেও বেশ পুরনো বলেই মনে হবে।
আমাদের ওখানে একমাত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×