আজ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। AddressBangladesh-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণের জন্য তাকে স্বাগত জানাই।
মাহমুদ টোকন: আপনি আপনার প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ব্যস্ততা সত্ত্বেও ওয়াকিং ফর চিটাগাং(Walking for Chittagong) নামে একটি মুভমেন্ট শুরু করেছেন। গবেষণা, লেখালেখি, সেমিনার ইত্যাদির পরেও কেন আপনার এই উদ্যোগ?
হোসেন জিল্লুর রহমান: এই উদ্যোগটির প্রায় ৩বছর হলো। মূল বিষয় হলো চট্টগ্রাম আমার জন্মের শহর।ফলে একটি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা ছিল। ক্লাস সেভেন থেকে আমি এই শহর থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিলাম। তো একটি উদ্দেশ্য ছিল যোগসূত্র তৈরি করা। আমারই জানার আগ্রহ ছিলো শহটির বিবর্তন সম্পর্কে। আরেকটি ছিল জাতীয় পর্যায়ে যেহেতু চট্টগ্রাম আমাদের অন্যতম বন্দর এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এছাড়া এশিয়ার অর্থনীতি যেভাবে আগাচ্ছে সেক্ষেত্রে ভৌগলিক কারনেই চট্টগ্রাম বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকাওে ছিলোম তখন আমার কয়েকবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়া হয়। সবাই বলছে যে চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতীক মানের করতে হবে। তখন একটা উপলব্দি আসে যে একটি আন্তর্জাতীক মানের বন্দর একটি মফস্বল টাইপের শহরের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে না। ঠিক এভাবে মানায় না। সিঙ্গাপুরকে আমরা সিঙ্গাপুর বন্দর হিসেবে আলাদাভাবে চিনি না। এটি একটি কম্বাইন্ড প্যাকেজ। শহরও হবে বিশ্বমানের বন্দরটিও বিশ্বমানের। আমস্টারডাম নিউইয়র্ক লন্ডন যেগুলোকেই চিন্তা করি বন্দর এবং শহর আলাদা করে চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। বন্দর যদি বিশ্বমানের হয় শহরকে অবশ্যই বিশ্বমানের হতে হবে। এই একটি উপলব্দি থেকে যে শহর এবং বন্দর দু’টিকেই একসঙ্গে মানসম্পন্ন হতে হবে। বিশ্বমানের শহরের ক্ষেত্রে সে রকম কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে অর্থনৈতিকভাবে চট্টগ্রাম যদিও সমৃদ্ধ কিন্তু এক ধরণের মফস্বলীয় চিন্তা চেতনার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে কারনে কয়েক বছর আগে স্থানীয় কর্পোরেট সংস্থা এ কে খান ফাউন্ডেশন এর সহায়তায় চিটাগাং রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ অর্থ্যাৎ সিআরআই নামে একটি প্রতিষ্ঠান করি। সেখানে আমরা শিক্ষা এবং অন্যান্য বিষয় কাজ করেছি। এরকমই একটি উদ্যোগ হচ্ছে- ওয়াকিং ফর চিটাগং। এখানে আমাদের একটি অন্যতম উপলব্দি হয়েছে যে যখন আমরা বিশ্বমানের শহরের কথা বলছি তখন কল্পনায় হয়ত কোনো বিশাল কনভেনসন সেন্টার বা স্থাপনার কথা ভেসে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে উপলব্দি হলো যে আসলে বিশ্বমানের শহর শুরু করতে হবে অ আ ক খ থেকে অর্থ্যাৎ অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। আমি বহুমূল্যবান বাড়ি বানালাম আর সেখান থেকে বেড়িয়েই ডাস্টবিন বা ময়লার মধ্যে পা দিতে হচ্ছে এই বাস্তবতায় বিশ্বমানের শহর বলা যায় না। মূল বিষয় হচ্ছে একবারে প্রথম থেকে শুরু করা অর্থ্যাৎ আমাদের শহরটিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তুলতে হবে। এটি যদিও চট্টগ্রামে শুরু করেছি, পর্যায়ক্রমে এটি অন্যান্য শহরেও করতে হবে। মূল বিষয় হচ্ছে বাসযোগ্যতা। আজকাল আমরা অর্থনীতিবিদেরা অর্থনীতিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকের কথা বলছি। জিপিপি গ্রোথ রেট কেমন হচ্ছে, রপ্তানি কেমন হচ্ছে ইত্যাদি। কিন্তু আজকের বিশ্বে একটি উপলব্দি এসেছে যে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম একটি সূচক হচ্ছে বাসযোগ্যতা। আর বাসযোগ্যতার অন্যতম বিষয় হচ্ছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। রাস্তাঘাট, বাসগৃহ ও শহরের সর্বত্র পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এবং এই কাজটি শুধু নিধারিত একটি সংস্থা করে দিবে, এটি তার দায়ীত্ব এরকম ভাবার কোনো অবকাশ নেই। কারণ এটি করতে গেলে আমাদের নিজেদের ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। নিজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না থাকলে, দায়ীত্বশীল না হলে যত দক্ষ সংস্থাই থাকুক কিছুই ঠিক হবে না। এ বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা করে দেখলাম এটি আসলে সেমিনারের বিষয় নয়। এটি মানুষকে সরাসরি জানান দিতে হবে। এটি সামনে রেখে ২০১৪সালের জানুয়ারি থেকে ব্যাপক আলোচনা করেছি বিভিন্ন গোষ্ঠির সাথে। যুব সমাজ, নারী, শ্রমিক গোষ্ঠি, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী, স্থানিয় সরকার, স্থানীয় নেতৃত্ব সবার সাথে। পওে একটি বৈচিত্রময় প্রোগ্রামের বিষয়টি মাথায় এসেছে। আজকাল আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করেছি যে রাজনৈতিক পরিবেশটি কেমন গুমোট। যারা ক্ষমতায় এবং যারা ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ময়দানে, এদের কর্মকাণ্ডে মনে হয় নাগরীকদের যেন কোন মূল্য নেই। এক্ষেত্রে মনে হয়েছে নাগরীকদেও সক্রিয়তা খুব জরুরী এবং সেটি দৃশ্যমান হওয়া জরুরী। সেজন্য অনেক আলাপ-আলোচনার পরে ৩টি বিষয় আমরা চিহ্নিত করলাম এবং ৩টি স্লোগানও তৈরি করলাম। একটি হচ্ছে- পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। এর স্লোগানটি হলো, ’পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকব, বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ব’। অন্যরা করবে সে চিন্তা না করে আগে নিজের দায়ীত্ব পালন করা। অর্থ্যাৎ সাধ্যেও মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও রাখা।
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, যানজট। চট্রগামে অসহনীয় যানজট। যানজট উন্নত বি্েশ্বও হয় কিন্তু এখানকার যানজটের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি অপ্রয়োজনীয় এবং অযৌক্তিক। অফিস ছুটির সময় যানজট সবখানেই কমবেশি হয়। কিন্তু এখানে যানজট হচ্ছে সবসময় যা নিয়ম না মানার কারণে ঘটছে। এজন্যও আমরা একটি স্লোগান করেছি- ’নিয়ম মানব, অনিয়মের সংস্কৃতি ভাঙব’। তৃতীয় বিষয়টি মনে হয়েছে যে বাংলাদেশের মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন নয়, ফিট নয়। দৌঁড়তে পারে না। কিছুটা দৌঁড়ে হাঁফিয়ে যায়। শুধু যুবসমাজ নয়, আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, নারীসমাজ সবার ফিট হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমাদের স্লোগান হচ্ছে- আমি ফিট, দেশ ফিট । এখন কথা হচ্ছে কিভাবে ফিট হবো? এর উত্তর হচ্ছে- walking। এজন্যই Walking for Chittagong । এটি করতে গিয়েই আমরা পরিচ্ছন্নতার কথা বলবো, নিয়ম মানার বিষয়টি উপস্থাপন করবো।
ঔপনিবেশিক আমল থেকেই আমাদের মধ্যে এক ধরণের প্রবণতা রয়েছে- অন্যের কাছে দাবী করার, চাওয়ার। সরকার বা শক্তিমান কেউ আছে তাদের কাছে এটা চাই, ওটা চাই ইত্যাদি। এখানেও আমরা একটি দার্শনিক উপলব্দি থেকে স্লোগান করেছি- ’চাই চাই নয়, করব, গড়বো’। অন্য কেউ করে দিবে তা নয়, আমরাই করব, আমরাই গড়বো। বাসযোগ্য নগর বাসযোগ্য চট্টগ্রাম আমরাই গড়বো। বাসযোগ্য বাংলাদেশ আমরাই গড়বো। এই বোধের উন্মেষ ঘটানোর জন্যই আসলে Walking for Chittagong । এটি শুধু আমরা কয়েকজন মিলে করব এমন ছিলো না, এজন্য আমরা ব্যাপক আলোচনা করেছি। নানান গ্র“পের সাথে কথা বলেছি। কয়েকবার রেকি করেছি। পরবর্তীতে একটি বৃহৎ পরিকল্পনা করি। মূল শহরের ভেতর দিয়ে বহাদ্দারহাট থেকে ডিসি হিল পর্যন্ত আমরা প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হাঁটি। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন দাঁড়িয়েছে যে রাস্তায় কোনো প্রোগ্রাম করা হলে মানুষ আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মনে করে ভাংচুর হবে, বিশৃংখলা হবে ইত্যাদি। প্রথম থেকেই আমাদের সিদ্ধান্ত ছিলো একটি নিয়মতান্ত্রিক এবং সুশৃংখল প্রোগ্রাম করবো। এজন্য আমরা সিটি কর্পোরেশন, পুলিশসহ সবার সাথে আলাপ করেছি। বিএনসিসি স্বেচ্ছাসেবকেরা আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত প্রোগ্রাম করেছি। আমরা ভেবেছিলাম হয়ত শ’পাঁচেক লোকজন হবে কিন্তু দেখা গেল ৩-৪ হাজার লোকের সমাগম হয়েছে। খাস্তগীর স্কুল এর সামনে দিয়ে যাবার সময় প্রায় ২০০জন ছাত্রীও আমাদের সঙ্গে কিছুদূর হেঁটেছে। নারীরাও ছিলেন। প্রচণ্ড গরম থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন বয়েেসর লোকজন, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অনেকেই ছিলেন। পথে পথে আমরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় ভূমিকা রেখেছি। সার্বিকভাবে Walking for Chittagong আমাদের জন্য ভীষনরকম অনুপ্রেরণামূলক ছিল। এ থেকে আমাদের উপলব্দি হলো যে কাজ করা যায়। আমাদের উদ্যোগ যদি শুভ হয় তাহলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। ডিসি হিলে অত্যন্ত আনন্দমূখর একটি সমাপনী অনুষ্ঠিত হয় যেখানে কবিগান ইত্যাদিও ছিল।
এই উদ্যোগে শুরু থেকেই আমরা সোস্যাল মিডিয়া বিশেষকরে ফেসবুক ইত্যাদি ব্যবহার করেছি। সবাইকে আপডেট রাখার চেষ্টা করেছি। এতে বিশেষকরে তরুনদের সম্পৃক্ততা ছিলো উৎসাহব্যঞ্জক। সবাই প্রতিমূহুর্তে জেনেছে, পরামর্শ দিয়েছে, কাজ করেছে। গণমাধ্যমও ভালোভাবে সম্পৃক্ত ছিলো, সহযোগিতা করেছে, উৎসাহও পেয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা ছিলো। আমরা বলেছিলাম আমাদের জন্য নয়, এই উদ্যোগের মধ্যে যদি ভালো কিছু থাকে তবে তারা প্রচার করুক।
আমরা Walking for Chittagong করেছি। এরপর Walking for Sylhetসহ দেশের অন্যান্য শহরেও করবো। স্থনীয় নাগরিকদের সাথে সম্পৃক্ততা থাকলে সকল স্থানেই এ প্রোগ্রাম করা সম্ভব।
মাহমুদ টোকন: মূলত: সিটি কর্পোরেশনের দায়ীত্ব হলেও আপনি ব্যক্তি উদ্যোগে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছেন। এক্ষেত্রে সহযোগী হিসেবে বিশেষকরে সিটি কর্পোরেশন, এনজিওসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা চান কি-না?
হোসেন জিল্লুর রহমান: এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার কওে নেয়া প্রয়োজন যে আমরা কাউকে বাদ দিয়ে আমাদের এই প্রোগ্রাম করছি না। আমরা প্রথম থেকেইে বলেছি যে আমাদের অন্যকে দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। অন্যকে দোষারোপের মাধ্যমে বাংলাদেশে ভালো কিছু করা যাবে না। রাজনীতিবিদেরা দোশারোপ নিয়েই থাকেন হয়ত, আমারাও অনেক সময় কে কি দোষ করেছে তাই নিয়ে থাকি। আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু ঘাটতি রয়েছে। সিটি কর্পোরেশন একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র। সে তার প্রাতিষ্ঠানিক দায়ীত্ব পালক করবে। কিন্তু আমাদের নাগরীক দায়ীত্ব নাগরীকদেরই পালন করতে হবে। আমার দায়ীত্ব তো সিটি কর্পোরেশন পালন করবে না। আমাকে আমার অবস্থান থেকে নিজ দায়ীত্ব পালন করতে হবে। আমার নিজের ময়লা একটি নির্দিষ্ট স্থানে আমাকেই ফেলতে হবে, আমার কাজটি কিন্তু সিটি কর্পোরেশন করে দেবে না।
আমাদের মূল দায়ীত্ব হচ্ছে নাগরীক বোধকে জাগ্রত করা। সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বে দেখুন, শুধু কি সংস্থা আছে বলেই সবকিছু হচ্ছে? লন্ডন, নিউইয়র্ক, আমস্টারডাম, এবং সাম্প্রতিক কালের চায়নার শহরগুলো যদি বলি সেখানে নাগরীকেরা নিজ দায়ীত্ব পালন না করলে শহরগুলো এতো সুন্দর হতো না। সুতরাং এখানে আমরা সম্পূরক কাজটি করছি। এ কাজে সিটি কর্পোরেশন এবং এনজিওরা আমাদের ব্যাপক সহযোগিতা করেছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে এসেছে। এখানে কিছু খরচের প্রয়োজন ছিলো। সেক্ষেত্রে এ.কে. খান ফাউন্ডেশন, ইস্পাহানি গ্র“প, আবুল খায়ের গ্র“প, এবং বিএসআরএম নামের একটি প্রতিষ্ঠানও এসেছে। কেউ দিয়েছে টি-শার্ট, কেউ দিয়েছে পানি, এভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের সহযোগিতা করেছে অন্যান্য ক্ষেত্রে। এনজিওরাও প্রবল উৎসাহ পেয়েছে। তারাও সম্পৃক্ত ছিলো। তাদের প্রচলিত সেবামূলক কাজের বাইরে সামাজিক আন্দোলনভিত্তিক কিছু নাগরিক কর্মকাণ্ডে সবার সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন, তারা সেভাবেই অংশগ্রহণ করেছেন।
মাহমুদ টোকন: দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামের গুরুত্ব সর্বাধীক। আপনাদের এই ক্যাম্পেন চট্টগ্রামের কি কি পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান: আমি প্রথমেই বলেছি এ ব্যাপারে। বাণিজ্যিক রাজধানীতে কারা থাকে? মানুষ থাকে। শহর যদি পরিকল্পিত না হয় সেখানে মানুষ থাকেবে না। ব্যবসায়িরা থাকতে চাইবে না। পরিচ্ছন্ন না হলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও পালাবে। বিশ্বমানের বন্দরের স্লোগান উঠেছে, তার সাথে যেটি প্রয়োজন বিশ্বমানের শহর, সেটি অর্জনের জন্যই আমরা এই আন্দোলন করছি।
মাহমুদ টোকন: এই ক্যাম্পেন করতে যেয়ে সাধারণ মানুষের কি ধরণের সাড়া পেয়েছেন এবং এক্ষেত্রে কোনো ধরণের বাধার সম্মূখিন হয়েছেন কি-না?
হোসেন জিল্লুর রহমান: না, বাধা আসবে কেনো? Honestly বলবো আমরা কোনো বাধার সম্মূখিন হইনি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে কে বাধা দেবে। আমরা কয়েকবার ওই স্থানগুলো পরিদর্শন করেছি। মানুষকে আশ্বস্ত করেছি যে আমরা আপনাদের এলাকা পরিচ্ছন্ন করতে এসেছি, ভাংচুর করতে আসিনি। আমরা গুরুত্ব দিয়েছি আমাদের পরিশ্রমী উদ্যোগের বিষয়কে। আমরা ভালো একটা কিছু বল্লাম আর কেউ আসলো না, এভাবে ভাবলে হবে না। চেয়ারে বসে থাকলে হবে না। কষ্ট করে মানুষের কাছে যেতে হবে। পরিশ্রম করতে হবে। ঘাম ঝরাতে হবে। তবেই কাজ হবে। আমরা নানা কাজে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মূল বাধাটা হচ্ছে- দায়ীত্ব পালনে আমরা শতভাগ প্রস্তুত কি-না। আরেকটি বাধা হচ্ছে সময় না দেয়া।
মাহমুদ টোকন: ইতোমধ্যে আপনি ওয়াকিং ফর চিটাগাং এর প্রথম ধাপ শেষে করেছেন, এ পর্যায়ে এসে আপনার সার্বিক মূল্যায়ন কি? ওয়াকিং ফর চিটাগাং নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
হোসেন জিল্লুর রহমান: মূল্যায়ন হচ্ছে এটি আমাদের জন্য একটি পরীক্ষা ছিলো। আমদের সেমিনার, ওয়ার্কশপ ছাড়া রাস্তায় এরকম প্রোগ্রামের অভিজ্ঞতা ছিল না। কিছুটা শংকিত ছিলাম যে পারবো কি-না। পুরোপুরী কনফিডেন্ট ছিলো না। এখন আমরা অনেক বেশি কনফিডেন্ট। এটি হচ্ছে প্রথম অর্জন। দ্বিতীয় অর্জনটি হচ্ছে- এই কাজের মাধ্যমে একটি ধাক্কা দেয়া। এখন সিটি কর্পোরেশন অন্যরাও বিষয়টি নিয়ে বেশীরকম আলোচনা করছে। শুধু আমরা করবো তা নয়। আরো অনেক সংস্থা আছে তারাও যাতে এগিয়ে আসে, তাহলে পরিবর্তন ঘটবে।
আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে আছে যে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ সমস্যা রয়েছে। ছোট ছোট কিছু জায়গা রয়েছে সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। চকবাজার বাজারের কিছু স্থান খুবই আবর্জনাময় এবং দুর্গন্ধযুক্ত। আমরা সেখানে গিয়েছি। সির্টি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে সবচে দুর্গন্ধযুক্ত যে ডাস্টবিন সেটি যাতে ঈদ পর্যন্ত সহনীয় পর্যায়ে থাকে সে রকম ব্যবস্থা করা গিয়েছে। রিয়াজুদ্দীন বাজার বলে একটি জায়গা রয়েছে সেটিও ভয়ানক দুর্গন্ধযুক্ত। মেয়র আমাদেও বলেছিলেন যে আমরা ওখানে কিছু করতে পারি কি-না। আমরা সেটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। কখনো ওসব এলাকায় যাওয়া হয়নি। আমরা সেখানে গিয়েছি, ব্যবসায়ীদেও সঙ্গে আলাপ আলোচনা করেছি যে কি করা যায়। আমাদের আরো বড় প্লান রয়েছে। ১০ কিলোমিটারের মতো Walking করার। চট্টগ্রাম শহরটিও এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। সে সকল স্থানেও যেতে হবে। আবার এগুলো করতে গিয়ে সবার সম্পৃক্ততায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এগুলো করতে কিছু অর্থায়নেরও প্রয়োজন। এই অর্থায়নের প্রশ্নে অনেক সময় নাগরিক উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়ে যায়। কারন কে অর্থায়ন করবে? কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কাছে গেলে একবার হয়ত হাসিমুখে দেবেন। দুবারে বিরক্ত হবেন। তিনবারে হয়ত ফোন রিসিভ করবেন না। আর এটা তো ঠিকও নয়। একটা সময় তারা হয়ত এটিকে চাঁদাবাজি ভাববেন। সেজন্য আমরা ক্যাম্পেন ফর ক্লিন চিটাগং বা(সি কিউব) নামে একটি ফাণ্ড করব। এখানে সবাই সম্পৃক্ত হতে পারবে। যারা সম্পৃক্ত হবেন তারাই আবার ওয়ার্ক ফোর্স হিসেবে কাজ করবেন। এরকম একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আমরা দেখতে পাছি। আপাতত এটুকু দেখতে পাচ্ছি। আমরা এটুকুতেই আপাতত খুশি। আর এই কাজের মধ্যে ব্যাপক আনন্দও রয়েছে। সেটিও কম পাওয়া নয়।
মাহমুদ টোকন: AddressBangladeshকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
হোসেন জিল্লুর রহমান: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ AddressBangladesh-এর মতো একটি উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য। AddressBangladesh একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। আমি আশা করবো যে তরুণদে্র এই উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের মধ্যে ভিন্ন ধরণের যোগাযোগের একটি মাধ্যম তৈরি করতে হবে। যোগাযোগের বাস্তবতা তৈরি করতে হবে। আমার মনে হয় সমাজে এক ধরণের মানুষ কথা বলতে পারে। সেমিনারে, রাজনৈতিক ক্ষেত্র ইত্যাদিতে আমরা সেটি প্রত্যক্ষ করি। কথা বলারও একটা গণতন্ত্রায়ণ দরকার এবার। কতোজন কতো ভালো আইডিয়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের কথা বলার সুযোগ দরকার। সেখানে সুচিন্তিত উদ্যোগ দরকার । এখানে AddressBangladesh একটা ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমি মনে করি। এবং এক্ষেত্রে আমাদের সবরকম সহযোগিতাও থাকবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




